আমাদের যন্ত্রযুগে
রোমান সম্রাজ্য কিংবা গ্রীক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সময়েও " দাস" কখনই স্বাভাবিক মানুষের মর্যাদা পায় নি। মানুষের অধিকার সম্পর্কিত কোনও ভাবনায় 'দাস' আলাদা মানবিক অস্তিত্বসমেত দৃশ্যমান হয়ে উঠে নি। পরবর্তী দেড় হাজার বছরেও কোনো মহামানবই 'দাস' প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করেন নি, দাসদের প্রতি আরও একটু মানবিক হয়ে ওঠার উপদেশ প্রদানের বাইরে 'দাস'দের স্বাধীনতা প্রশ্নে নিস্পৃহ থেকেছেন। তাদের এই সচেতন নির্লিপ্ততা তাদের ব্যক্তিগত অমানবিকতার চেয়েও বরং তাদের সময়ের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কে দাস শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতিস্বরুপ।
সভ্যতায় যন্ত্রযুগের আবির্ভাবের আগে 'দাস' উৎপাদক হিসেবে পেটচুক্তি শ্রমিক, এমন এক উপকারী জীব যাকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা যায় এবং যাদের প্রতি মানবতাবাদী মনোযোগ কোন না কোন ভাবে উৎপাদন সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করবে। যদিও সাধারণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন " স্বাধীন মানুষের" উৎপাদনের যাঁতাকলে কলুর বদলের মতো জুড়ে যাওয়া সমর্থনযোগ্য নয় কিন্তু এই মনোভাব অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সভ্যতার ইতিহাসে বিদ্যমান ছিলো।
উৎপাদন ব্যবস্থায় একজন দাস তার শয়নে, জাগরণে, জনন ও যৌনমিলনে সব সময়ই অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, তারা মালিকের নিজস্ব শস্যক্ষেত আর পশুপালের রক্ষণাবেক্ষণ করছে এবং তাদের জনন ভবিষ্যত দাসের নিশ্চিত যোগান দিচ্ছে। তাদের সন্তানের উপরে তাদের অধিকার নেই, তারাও মালিকের সম্পদ এবং শস্যক্ষেতে উৎপাদিত সম্পদের মতো সে সম্পদও গাড়ীতে উঠিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়া যায়, সেখানে উৎকৃষ্ট দাসদের নগদ পয়সায় বেচে দেওয়া যায়।
অর্থনীতির এই একমুখী যাত্রায় দাসদের গল্প কখনও তাদের নিজস্ব গল্প হয়ে ওঠে না, তারা সব সময়ই অন্যের ইচ্ছাধীন জীবন যাপন করেছে। সময়ের মহাপুরুষেরা সবাই তাদের উপস্থিতি বিষয়ে সচেতনভাবে বিস্মৃত, এই সচেতন বিস্মৃতি এক ধরণের মানসিক পীড়ন থেকে কিংবা অপরাধবোধ থেকে বক্তা ও ভাবুককে নিরাপদ দুরত্বে রেখে দেয়। তার অনুশোচনাবোধগুলো স্বাধীন মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশার মর্মন্তুদ উপস্থাপনে ব্যায়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বাঙালী আশরাফ সমাজেও বাঁদী গৃহকর্তার সম্ভোগের বস্তু হয়েছে, প্রতিটি অনটনে, দুর্ভিক্ষে গ্রাম থেকে কিশোরী কন্যা আর যুবতী বৌকে গঞ্জে কয়েকটা টাকায় বিক্রি করেছেন গৃহকর্তা, ক্ষুধা স্বেচ্ছাবেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য করেছে অনেককে, রামমোহন বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ সতীদাহ, উঁচু বংশের পুরুষদের শিক্ষা নিয়ে ইংরেজ শাসকদের সাথে দরকষাকষি করেছেন, মহাত্মাদের নজর বাজারে গলায় রশি বেঁধে দাঁড়া করিয়ে রাখা এইসব অনুঢ়াদের প্রতি পরে নি কখনও, বরং পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজন যৌনকেলীতে সিদ্ধহস্ত দাসী কিনেছে।
আমরা সে সময় পেরিয়ে এসেছি, প্রতিটা অনটন এখনও শহরের নিষিদ্ধ পল্লীতে কয়েকজন নারীর উপস্থিতি বাড়ালেও মোটের উপরে নগদে মানুষ কেনা বেচা হয় না এখন। আমদের জিডিপি বাড়ছে, মাথা পিছু আয় বাড়ছে। কিন্তু একই সাথে আমরা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির নেশায় ভুলে যাচ্ছি যন্ত্রের সাথে জুড়ে যাওয়া শ্রমিকও একজন সাধারণ মানুষ, তার মানবিক অধিকারগুলো পূরণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপরেই বর্তায় কিন্তু বাংলাদেশ সে দায়িত্ব নিতে অপরাগ।
আমাদের দৃষ্টিসীমায় তাই স্বাধীন যন্ত্রদাসের উপস্থিতি অনিবার্য, যাদের সঙ্গম একখন্ড শংকিত বিনোদন, বহুজাতিক নিরোধ সেখানে প্রশান্তি বয়ে আনে আর মিল মালিকের পক্ষে থাকা বিধিব্যবস্থা এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে সাভারের ধ্বসে যাওয়া ভবনে দুজন নারী সন্তানের জন্ম দেন। যাদের একজন সেই ধ্বংসস্তুপের ভেতরেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, পরবর্তীতে উন্মুক্ত পৃথিবীতে নবজন্ম লাভ করে আর অন্যজন তার সকল সম্ভাবনাসমেত চাপা পরে থাকে ধ্বংসস্তুপে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ক্ষমতাসীনদের দরদ আর কন্যা বেচে অন্ন কেনা পিতার বাৎসল্যবোধের পরিমাণ সমান। রাষ্ট্র মুনাফাগুণে, ইনসেনটিভ ভাগ করে নিজেদের ভেতরে।
তবুও মানুষের ভেতরে প্রবল বেঁচে থাকার আকাঙ্খা। রেশমা সভার ট্রাজেডীর ১৭তম দিনে জীবিত উদ্ধার হয়েছে। এই ১৭দিন কিসের প্রত্যাশায় নিঃসঙ্গ বেঁচেছিলো রেখমা। নিঃসঙ্গ কারাবাসও ততটা মর্মান্তিক নয় যতটা নিষ্ঠুর এই ধ্বসে যাওয়া ভবনের এক একটা অবরুদ্ধ দিন, এক একটা অবরুদ্ধ সন্ধ্যা।
অবশ্য তার জীবন কিংবা সম্মিলিতভাবে অধিকাংশ গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন এমন নানাবিধ অপ্রাপ্তি আর বিমানবিক ঘটনাবহুল। সেই ভোর বেলায় নিজেকে সেলাই কলে জুঁড়ে দেওয়া আর মালিকের দৈনিক উৎপাদন তালিকা পূর্ণ করে সন্ধ্যাবেলায় কিংবা গভীর রাতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে আসা, ঘুম।
কয়েকটা কাগজের টুকরা দিয়ে কিশোরীর সকাল সন্ধ্যা সেলাই কলের সুঁতোর সাথে বেধা রাখা অমানবিক প্রগতি আমরা অর্জন করেছি। আমরা সভ্য হয়েছি জ্যান্ত দাস না বেচে বেচছি যন্ত্রদাস।





এই সময়ে এসেও পোশাক কারখানা পরিচালনার মধ্যে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া নেই, এসব কারখানা চালায় সেই সামন্তবাদি ধরণেই
এভাবে যুগের পর যু আসবে যাবে শোষিত বঞ্চিতরা নতুন নতুন পন্থায় শোষিত হতেই থাকবে? শুধু গার্মেন্টস কেন, প্রতিটা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বলেন, কেঊ তেল মেরে ফাঁকি মেরে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। আবার কেঊ গলদ ঘ র্ম হয়ে কাজ করেও কাজ শেষ করতে পারছে না।
খুব সত্যি কথা
যার হাতে পাওয়ার তার চিনতাই থাকে মিসইউজের
আমরা আজীবন দাস রয়ে যাবো
যোগসূত্রটা যুৎসই।
যদিও শ্রমিক হত্যার হোলি খেলায় দাস প্রথার অমানবিকতাও আজকাল ম্লান মনে হয়।
মন্তব্য করুন