keno
বিয়ে শুধুমাত্র অঙ্গীকারপত্রে সাক্ষর করে নতুন জীবনধারার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া নয় বরং একটা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। প্রাক-কৈশোরে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই যে পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। শাররীক আগ্রহের বদলেকৈশোরকাল শুরু হওয়ার আগেই সামাজিক প্রেষণাতে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়। তারপর সময়ের সাথে সেই পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট, আরও সংবদ্ধ হয়। বিবাহ উদযাপনের প্রতিটি সামাজিক উৎসব এই পরিকল্পনায় নতুন নতুন অনুসঙ্গ যোগ করে। সুতরাং যৌবনকাল শুরু হওয়ার আগেই নিজের জীবনসঙ্গী এবং বিবাহ উৎসবের খসরা ছবিটা মোটামুটি আঁকা থাকে কল্পনায়।
আকাশ সংস্কৃতির দাপটে হিন্দি চলচিত্র-সিরিয়ালের উপস্থাপনায় শুধুমাত্র ব্যক্তি নয় বরং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভেতরেও উদযাপনের একটা পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। প্রথাগত ঐতিহ্যের গায়ে হলুদ, বরযাত্রা, বৌভাতের অনুষ্ঠানের মাঝখানে "ফিলার প্রোগ্রাম" হিসেবে আরও কিছু উদযাপন সংযুক্ত হচ্ছে। বিয়ের পোশাক, বরযাত্রার পোশাক, বৌভাতের পোশাক বাছাই করা, সাজ-সজ্জ্বা চুড়ান্ত করা, তালিকা ধরে প্রতিটা সুক্ষ্ণাতিসুক্ষ্ণ বস্তু বাজার ঘেঁটে নিজের পছন্দমতো কিনে আনা এবং সেসব দেখে কল্পনায় উদযাপনের যে ছবিটা আঁকা হয়েছে সেটার কতটুকু পুর্ণ হলো অনুমাণ করে নেওয়া এবং অবশেষে উদযাপন শেষ হয়ে যাওয়ার পর সংক্ষিপ্ত দীর্ঘশ্বাস- আরও কিছু করা সম্ভব ছিলো যা করা সম্ভব হলো না। পরবর্তীতে অন্য কারো বিয়ের সময়ে এটা করতে হবে।
বহুরঙে সজ্জ্বিত বিবাহ উৎসবগুলো দর্শকের কল্পনায় এমনতর উদযাপনের তাগিদ তৈরি করছে, হিন্দু সিনেমায় কিংবা হিন্দি সিরিয়ালের বার্ণাঢ্য বিবাহ উদযাপনের বাণিজ্যিক সাফল্য এখানেই। শহরের স্বচ্ছল পরিবারের কয়েকটি বিয়েতে সামান্য অংশগ্রহনের কল্যানে চিরায়ত প্রথাগত বিবাহ সংস্কৃতির রূপ বদলে যাওয়ার সাথে সাথে বিবাহের অর্থনৈতিকবিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টা উপলব্ধি করেছি।
বিয়ের মতো একটা বিষয় ঘিরে এত আয়োজন এত পরিকল্পনা দেখে নিজের প্রাক-কৈশোরকালের কথা স্মরণ করতে চাইছিলাম। কৈশোরিক আবেগ- মোহ- ভালো লাগা- ভালোবাসা- প্রেম-বিচ্ছেদ-বিরহ - অনুতাপগুলোর সাথে প্রায় নিয়মিত সমাপনী বক্তব্যে "বাসায় পাত্র দেখছে কিছু একটা করো " তাগিদ বিয়ের আয়োজন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে নি। বিয়ের আঙটি, বিয়ের পোশাক কিংবা এমনতর কোনো কিছু নিয়েই স্পষ্ট- অস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিলো না। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিয়ের উদযাপনে ক্ষণিক উপস্থিতির পরে আরও নিশ্চিত হয়েছি আমি এসবের কোনোটাই কখনও করতে চাই নি। বরং অন্য কেউ যদি আমাকে এমন ধারাবাহিক একটা প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করে ফেলতো আনন্দিত হওয়ার বদলে বিরক্তই হতাম , সময় আর উদ্যমের অহেতুক অপচয় দুর থেকে দেখতে ভালো লাগে কিন্তু তাতে সক্রিয় অংশগ্রহন এক ধরণের বিড়ম্বনা।
প্রথম সন্তানকে হাতে ধরার আগে আমি কখনও বুঝতে পারি নি আমার ভেতরে কতটা তীব্র "বাবা" হওয়ার আকাঙ্খা ছিলো। সন্তানের জন্মের পর থেকে থিতু হওয়া, কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে,আমার উদ্যমের অভাব এবং পরিপার্শ্বিকতার সম্মিলিত প্রভাবে গোছানো জীবনে যা কিছু চাই তার কোনোটাই অর্জিত হয় নি।
স্কয়ারফুট মাপা বসতভিটা আমার পছন্দ না। কল্পনায় মধ্যযুগের মধ্যসত্ত্বভোগী বিলাসি জমিদারের প্রসাদের সাথে কিছুটা আধুনিকতা মিলিয়ে যে ছবি আঁকা সেখানে আকাঙ্খা আর আগ্রহের বিষয়গুলোই প্রধান্য পাচ্ছে। যদি কখনও সচ্ছলতা আসে আমি কি ধরণের পরিবেশে বসবাস করতে চাই সে ছবিটা স্পষ্ট হলেও সেই পরিবেশে নারীর উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি বিষয়ে তেমন বাড়তি ভাবনা নেই।
জীবনের অনুসঙ্গ হিসেবে একটা খোলা মেলা উজ্জ্বল লাইব্রেরী, লাইব্রেরী ঘরে লেখার টেবিল। কাছাকাছি একটা ফাঁকা জায়গায় টেবিল টেনিস খেলার ব্যবস্থা আর একটা আড্ডাঘর- এই কয়েকটা প্রয়োজনীয় উপকরণের সাথে রাতে ঘুমানোর জন্যে কোনো একটা বন্দোবস্ত হলেই হয়।





মন্তব্য করুন