বিপ্লব কতদুর?
প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সম্পর্কিত কোনো জ্ঞান আমার নেই। যদিও আমার স্ত্রী একমত হবে না আমার সাথে তারপরও আমার ধারণা সামান্য হলেও কান্ডজ্ঞান আমার আছে। রাশিয়া, চীন, কিউবা বলিভিয়া আর্জেন্টিনার বিপ্লবের ইতিহাস পড়ে অনেক জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কখনও হয় নি। তাই দেশ বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত হয়েছে কি না, কিংবা কোন পথে বিপ্লব সংঘটিত হবে এই সংক্রান্ত আলোচনাগুলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বিশেষজ্ঞ পক্ককেশ এবং অপক্ককেশী বিপ্লব বিশেষজ্ঞদের জন্যেই বরাদ্দ রাখা ভালো। তারা হিসেব কষে, রাস্তা মেপে যখন বলবেন এই পথ থেকে সামনে সামান্য বাঁয়ে গেলেই বিপ্লবের শুরু হবে, তাদের মতামতের প্রতি আমি যতই আস্থাহীনতায় ভুগি না কেনো তাদের বিশেষজ্ঞতাকে সম্মান জানাবো।
সামান্য কান্ডজ্ঞান থেকে আমি জানি একক মানুষের ভাবনা অনুসরণ করা কঠিন, নারীর মনই শুধু পৃথিবীতে দুর্বোধ্য এমন না প্রতিটি মানুষই নিজেকে যুক্তিবাদী বলে অভিহিত করলেও অধিকাংশ সময়ই তাদের আচরণে যুক্তি অনুপস্থিত থাকে। এক ধরণের অভ্যস্ততার ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয় তাদের ভাবনা কিন্তু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অভ্যস্ততা এবং সীমিত ভবিষ্যতটুকু অনুমান করে তাদের সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়, সেখানে নির্দিষ্ট কোনো ধারাবাহিকতা খোঁজা ঠিক হবে না। তবে সামগ্রীক ভাবে একটি ঘটনার খুব নির্ধারিত কয়েকটি প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব এবং সেই নির্ধারিত প্রতিক্রিয়াগুলোর ভেতরে সিদ্ধান্তহীনতার দোলাচলে অস্থির মানুষ যেকোনো একটি বেছে নেয়। সামগ্রীক মানুষও খুব বেশী ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে না, বরং তার-তাদের মতকে প্রভাবিত করা সম্ভব। অস্থির মুহূর্তগুলোতে যেকোনো একজন যদি দৃঢ় ভাবে কিছু বলে, যদি সেখানে কোনো "কমান্ডিং ভয়েস" তৈরী হয়, বাকী সব মানুষ সেই মতবাদকে অনুসরণ করা শুরু করে। ঘটনাগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন তাদের লুপ্তবোধ ফিরে আসে তখন তারা স্মৃতিচারণ করে নিজের পদক্ষেপের ভুলগুলো অনুমাণ করে এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পরে তারা অনুতপ্ত কিংবা আনন্দিত হয়।
অঘটনের জন্যে একদল মানুষকে হঠকারী হওয়ার অনুপ্রেরণা দেওয়া সহজ, সামান্য অর্থনৈতিক লোভ এবং কোনো একভাবে তাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা ক্ষোভকে উগড়ে দেওয়ার সহজ পন্থা হিসেবে হঠকারীতা খুব চমৎকার মাধ্যম হতে পারে এবং যা তারা ঘটাতে যাচ্ছে সেটাই তাদের ক্ষোভের একমাত্র উপশম - এই প্রবোধ দেওয়া সহজ। কিন্তু তাদের বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুত করার কাজটা অনেক কঠিন। আদর্শিক, ধর্মীয় এমন কি সাংস্কৃতিক কারণে মানুষ অনেক বৈষম্যে ক্ষুব্ধ হলেও সেসব বৈষম্য মেনে নেয়। সুতরাং রাষ্ট্র-সমাজের মানুষগুলোর ভেতরে নানা ধরনের সাম্যবস্থা থাকে, সাম্যাবস্থায় অভ্যস্ত মানুষ খুব বেশী সহজে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতায় আগ্রহী নয়। দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতায় তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হলে ভিন্ন কিছু সামাজিক অনুঘটক প্রয়োজন হয়।
বিরোধ সমুহের ঐক্য, ঐক্যসমুহের ভেতরে বিরোধ, সংশ্লেষণ সংমিশ্রণ জাতীয় শব্দগুলো এক ধরণের চুলকানীর অনুভুতি জন্মায় আমার ভেতরে। সেসব শব্দের হয়তো সাদামাটা বাংলা করা সম্ভব ছিলো কিন্তু সাদামাটা বাংলায় হয়তো বৈপ্লবিক ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করা সম্ভব হতো না। ভাবনার আভিজাত্য কিংবা কৌলিন্য বজায় রাখতে গিয়ে এক ধরণের আরোপিত বাংলা অনুবাদে আমরা যে ধরণের সমাজবিশ্লেষণের তত্ত্ব পাই সেটার ভাষাজড়তা আমাকে কোনোভাবেই সেসব পুস্তক পাঠে আগ্রহী করে নি। সুতরাং আমি নিজের মতো করে সমাজকে অনুভব করি, নিজের চারপাশের মানুষকে দেখে সমাজের অস্তিত্ব উপলব্ধি করি এবং আশেপাশের মানুষের চাহিদাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলে সেসব প্রত্যাশাপুরণের প্রচেষ্টা করি। সুতরাং কাঠখোট্টা সমাজ বিশ্লেষণী তত্ত্ব কিংবা ইহা যথেষ্ট যৌক্তিক ও পার্টি লাইন সম্মত কি না সেসব ভাবনা আমাকে কখনও পীড়িত করে নি। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মপন্থা অনুসারী দলের ছাতার নীচে না থেকে নিজের মতো রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে সমর্থন কিংবা অংশগ্রহনের কাজটা অনেক সহজ ছিলো।
সকল মানুষের সমান মর্যাদা, রাষ্ট্রের সকল সম্পদে সকল মানুষের সমান অধিকার, রাষ্ট্রের সকল নাগরিক একই রকমের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, একই ধরণের আইনী অধিকার ভোগ করবেন। বর্ণ, গোত্র কিংবা ধর্ম পরিচয় সেসব রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা অর্জনে কোনো বাধা হবে না- সংবিধান যেভাবে নাগরিকদের ভেতরে সমতা বিধান করেছে- রাষ্ট্র কি সেভাবে সবার জন্যে সমতা নিশ্চিত করতে পেরেছে? রাষ্ট্রের সমতানিশ্চিত করার ব্যর্থতার প্রতিবাদ কোন পর্যায় থেকে হবে, কিভাবে লঙ্ঘিত অধিকারগুলো রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে? আমাদের নাগরিক অধিকার অর্জনের লড়াইটা আদালতের কক্ষে শুরু হবে এবং সেখান থেকে আইনানুগত রাষ্ট্র পরিচালকের সেসব অধিকার সকলের ভেতরে সমান মাপে বন্টন করবেন?
মূলত রাজনৈতিক কৌশলের ভিন্নতার সূচনা এখানেই। যেহেতু সকল মানুষের ভেতরে এক ধরণের সমতার ধারণা ধর্ম- সমাজ- রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার কল্যানে আমাদের অগোচরেই আমাদের ভাবনায় উপস্থিত হয়েছে তাই আমাদের সকল মানুষই সমান ভাবনাটুকু আমাদের কাছে খুব অভ্যস্ত ধারণা। কিন্তু এই মানুষের পরিচয় আমাদের কাছে কিভাবে উঠে আসছে? আমরা কি আমাদের পরিচিত সমাজকেই আমাদের মানুষ হিসেবে অনুমাণ করছি?
১৯৭০ এর ঘুর্ণিঝড়জনিত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানী এবং ত্রানকার্যে পশ্চিম পাকিস্তানের নিস্পৃহতা পূর্ব বাংলার মানুষের ভেতরে বঞ্চনাবোধের আগুণে ঘি ঢেলেছে। ২৫শে মার্চের বর্বর গণহত্যার ব্যপকতা দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছে ফেডারেল ব্যবস্থার অধীনে একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তান এক হতে পারে না।
কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষ যে তাদের ন্যয়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই ধারণাটা সর্বপ্রথম পূর্ব বাংলার অর্থনীতিবিদরা উদঘাটন করেছেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারনী মহলের সাথে এইসব অর্থনীতিবিদদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। ৬ দফা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্যের খতিয়ান তুলে ধরে আরও বেশী ন্যায়সংগত অধিকার দাবী করা অর্থনীতিবিদগণ নিয়মিতই শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করেছেন। আবুল হাশিমের তত্ত্বাবধানে মুসলীম লীগ গড়ে তোলা এবং সুহওয়ার্দির সাথে সারা দেশ ঘুরে আওয়ামী লীগ এবং মুসলীম লীগের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো শেখ মুজিবুর রহমান সারা দেশে আওয়ামী লীগের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং লীডার হয়ে ওঠার আগে তিনি সারা দেশের সকল আওয়ামী লীগের সংগঠক ও কর্মীদের কাছে মুজিব ভাই হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
অর্থনীতিবিদদের সাথে সখ্যতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক বঞ্চনার তাবত পরিসংখ্যান এবং বৈষম্য দুরীকরণে পূর্ব বাংলার ন্যায়সংগত দাবী কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা এবং কর্মীদের সে দাবী অর্জনের রাজনৈতিক লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান সমসাময়িক অপরাপর রাজনীতিবিদদের তুলনায় নেতৃত্বের লড়াইয়ে অনেক বেশী এগিয়ে ছিলেন। ব্যপক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় পরিশ্রম এবং জনগণের দাবী উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী রাজনৈতিক দাবী উত্থাপনের ফলে ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে পূর্ব বাংলার স্বাধীকারের দাবী উপস্থাপনের অনুমোদন পেয়েছিলো।
অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বৈষম্য-বঞ্চনা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও বৈষম্য দূর হয় নি, বরং বৈষম্যের পরিমাণ বেড়েছে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামর্থ্য সীমিত কিন্তু সেই সীমিত সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহারের অদক্ষতা নাগরিকদের দুর্ভোগের কারণ। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় রাষ্ট্রের তীব্র অনাগ্রহ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো সমবন্টনের প্রধান বাধা।





মন্তব্য করুন