খোঁজ
চৈত্রের কাকের মতো আকাশে মেঘের রেখা খুঁজি, আমাদের পশ্চিমমুখী ঘর, সারাদিন সুর্যের আলো খেয়ে তেতে থাকে, মাঝরাতে বেড়ালের মতো বাচ্চার ঘাড়ে ধরে মায়ের ঘরে রেখে আসি, অন্তত ওদের রাতের ঘুমটা ভালো হোক। ১০ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎপ্লাবনের সময়েও ঘড়ির কাঁটা ধরে লোড শেডিং মেপে পূর্বের চিলতে বারান্দায় বসি আর জাম গাছের ডালে বসা পাখীদের শুমারি করে দুপুর কাটাই। মুনিয়া, টুনটুনি, চড়ুই, দোয়েল, শালিক,বুলবুলি, মৌটুসী দেখি,মাঝেমাঝে হলদে ল্যাজ ঝোলা কোনো একটা পাখী দেখি যার নাম জানি না, কিন্তু ঢাকা শহরের সন্ধ্যার আকাশ ঢেকে দেওয়া তোতা পাখীর ঝাঁক দেখি না, তার সম্ভবত শহর ছেড়েছে দাবাদহের আগেই।
পাশের বাসার ট্যাংকি উপচে পানি পরে, সে পানিতে নাইতে আসে শালিক দোয়েল বুলবুলি, আমি মেয়েকে পাখীদের গোসল দেখাই আর ছাদের ড্রামের আম গাছ দেখে মেয়ে ছড়া শোনায় আমটি আমি পেরে খাবো। আমরা সংশোধন করে বলি আমটি আমি খাবো পেরে। প্রায় প্রতি রাতেই ছেলে গাইগুই করে, আজ রাতে এ ঘরে ঘুমাবো।
যাও এখন ঐ ঘরে ঘুমাও, রাতে ঘর ঠান্ডা হলে তোমাকে আনবো।আমাদের ঘরের কোনো দরজা নেই, মাঝরাতে নিজেই ঘুম থেকে উঠে কখনও এই ঘরে ঘুমাতে চলে আসবে ওরা সে আশংকায় কখনও দরজা বন্ধ রাখি না, কখনও ঋত কাঁদে,তখন ঘুম ভাঙে, না হলে ভোরের আঁচ গায়ে লাগলে পাশে তাকিয়ে দেখি ঋত ঋক বিছানায় এলোমেলো শুয়ে আছে।
এক বিছানায় গাদাগাদি ঘুমাবো বলে ফরমায়েশী খাট কেনা হয়েছে কিন্তু প্রকৃতিবিরূপ। বেড়াল ছানার জীবনে কতটা অসহিষ্ণু ঋক বুঝলাম ওর স্কুলে গিয়ে। ক্লাশ পার্টির ঘর সাজাচ্ছিলো ওরা ৩ জন, একজন আমাকে দেখে বললো আঙ্কেল আপনাদের বাসায় এসি নাই? বললাম না নাই তো, কেনো? ঋকের জন্যে একটা এসি কিনে ফেলেন না। ও তো এসির কথা বলে। বুঝলাম ওর যখন রাতে ঘর এসির মতো ঠান্ডা হবে তখন এই ঘরে এসে শুতে পারবে কল্পনাটা বন্ধু মহলেও আলোচিত হচ্ছে।
আমরা নিয়ম মেনে ইন্টারনেটে বৃষ্টির পূর্বাভাস দেখি, প্রতিদিনই বৃষ্টির সম্ভাবনা পিছু হটে যায়। মধুমাসের মধু উপভোগের বদলে বৃষ্টির ছাঁটে গা ভেজানো পরম আকাঙ্খিত মনে হয়- তাই বৃষ্টি যখন নামলো তখন কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ঋক ছাদে দৌড়ে গিয়ে ভিজলো ইচ্ছামতো। পরের দিন দুপুরে বৃষ্টিতে ঋতকেও ছাদে ভিজতে নিয়ে গেলাম। নীচের ফ্ল্যাটের দুই ছেলে মেয়ে ছাদে এসেছে বৃষ্টিতে ভিজতে, সবাই হুটোপুটি করে বৃষ্টিতে নাইলো, বৃষ্টি আর বাতাসের ছাঁটে হিম হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে ঘরে আসলো।
জীবন, পরীক্ষার সময়সূচি সবই নিজস্ব নিয়ম মেনে চলে, এইসব সাময়িক আনন্দ সাময়িক বিপত্তির কোনো তোয়াক্কা করে না, ঋকের বিজ্ঞান বই খুলে ঋত পড়ছে, আচ্ছা বলতো দেখি এইটা কি?
আপেল।
ঠিক হয়েছে, তাহলে এবার অন্য একটা প্রশ্ন করি, আচ্ছা বলতো দেখি এটা কি?
কমলা।
না এটা তরমুজ।
আচ্ছা বলোতো দেখি এইটা কি?
আমি শোয়া থেকে উঠে কোনোমতে চিঁচিঁ করে বললাম আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।
এইটা তোমার সামনের পাশে, আচ্ছা বলোতো দেখি এইটা কি?
এইটা টাইগার।
ঠিক বলেছো। এইবার বলোতো দেখি এইটা কি?
এইটা লায়ন।
লায়ন রা আআআআআআআআআআরররররররররর
আচ্ছা এবার বলো তো দেখি এইটা কি?
এইটা একটা ছাগল।
ঠিক বলেছো এইটা ব্যা আআআআআ ছাগল, এইটা আমাদের দিনাজপুরে আছে না।
আচ্ছা বলোতো দেখি এইটা কি।
এইটা গরু।
না এইটা হইলো মাম্মি ছাগল।
আর এইটা আমরা জু-তে দেখছি না?
আমাদের জু-তে এইটা ছিলো
জাম গাছে মৌমাছি দেখে হাত তুলে বলে মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি দাঁড়াও না একবার ভাই, ঐ ফুল ফুটে বনে যাই মধু আহরনে দাঁড়াবার সময় তো নাই, দাঁড়াবার সময় তো নাই।
রেল গাড়ীর ছবি দেখে বলে আইকুম বাইকুম তাড়াতাড়ি যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ী রেল গাড়ী ঝমাঝম পা পিছলে আলুর দম।
এসবের সাথে বাঁদরামির পরিমাণও বাড়ছে। এই বয়েসের নিয়ম মেনে জানালা দিয়ে জিনিষপত্র ছুড়ে ফেলার প্রবনতা বাড়ছে। খেলনা থেকে শুরু করে জামা কাপড় ঔষধ সব নীচে ফেলছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নিয়মমতো স্যরি বাবা বলার অভ্যাস বাড়ছে। আজকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো আমাকে দেখে কোনো কথা না বলে মুখ গুঁজে ঘরে ঢুকে যাওয়ায় বুঝলাম গুরুতর কিছু করছে, ঋকের খেলনা বাঁশী বারান্দা দিয়ে নীচে ফেলে চুপচাপ আম্মার কোলে উঠে বসে আছে। ঘরে তুলে নিয়ে গিয়ে বললাম কি দুষ্টামি করছো তুমি?
কিছু না
হাতে ধরা বাঁশী দেখিয়ে বললাম এইটা কি,চেহারা কান্না কান্না করে বসে থাকলো। এই চেহারার ভঙ্গিটা তাৎক্ষণিক কিছু না। এটা পরিশীলিত, চর্চিত একটা ভঙ্গি, অবসরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও কান্নার প্রাক্টিস করে।
লুকোচুড়িঃ
ঘরের ভেতরে ঋক ঋত ছোটো বোনদের সাথে কানামাছি আর লুকোচুরি খেলে। মাঝেমাঝে ছাদে গিয়েও খেলে আমার সাথে,ছাদের দরজায় নাক ঘষে ওয়ান টু থ্রি..।.।.।.।.।। টেন।
লুকানোর জায়গা নির্দিষ্ট করাই আছে। সিঁড়িঘরের এপাশে কিংবা অন্য পাশে, সেখানেই খোঁজা, সেখানেই একটিপ বলা কিংবা ছুঁয়ে দেওয়া, ঋতের সাথে লুকোচুড়ি খেলার সময় কিছুটা জায়গা বদল করে রেলিং এর কাছের আড়ালে লুকালাম, একেবারে নিয়ম মেনেই সিঁড়ি ঘরের দুই পাশ খুঁজে আবার সিঁড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কেঁদে উঠলো। আমার বাবা হর্স কোথায়? বাবা হর্স হারায় গেছে। অথচ আমি ঠিক তার চোখের সামনে ১০ ফুট দূরে বসে আসি অর্ধেক শরীর বের করে। সেখান থেকে দৌড়ে গিয়ে ওকে কোলে নিলাম, কান্না থামিয়ে ও প্রশ্ন করলো ও বাবা হর্স তুমি কোথায় চলে গেছলা?
যা যেখানে থাকার কথা সেখান থেকে সামান্য সরে গেলে মানুষ খুঁজে পায় না কিংবা মানুষ আসলে ঠিক সেভাবে খুঁজেও দেখে না। প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব একটা অবস্থান আমরা নির্ধারণ করে রেখেছি, সে অবস্থানের বাইরে অন্য কোথাও তার উপস্থিতি থাকতে পারে এমনটা বিশ্বাস আমরা করি না। সুতরাং চোখের সামনে দিয়ে প্রিয় বন্ধু হেঁটে গেলেও যেহেতু তার আগমন প্রত্যাশিত নয়, আমরা তাকে চিনি না। ঘরের কোনো জিনিষ রাস্তায় সাজানো থাকলে এটাকে কোথায় যেনো দেখেছি অসস্তিটুকু থাকে কিন্তু সেটাকে নিজের বলে ধারণা করা সম্ভব হয় না।
সময়ের সাথে খোঁজার পরিসর বাড়বে, খোঁজার ধরণ বদলাবে, সম্পর্ক বদলাবে, আমরা একই রকম ঘনিষ্ঠ থাকবো অথবা থাকবো না। আমাদের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, সম্পর্কের এই পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। হয়তো কোনো একদিন আমিও ঘুম থেকে উঠে ওকে দেখে বলবো ও বেবী হর্স তুমি কোথায় চলে গেছলা।





কি দারুন!
কেমনে লেখেন ?
ধরে নিচ্ছি ভালো লিখছি।
১৬ থেকে ১৮ মাসের ভিতরে কথা বলা শুরু করবে, ২৪ মাসের ভিতরে বাক্য গঠন করা শুরু করবে, রাইমস মনে করতে পারবে। আর ৮ মাস থেকে ১০ মাস পর তোর বলার মতো অনেক গল্প থাকবে। এই গল্পগুলা লিখে রাখতে হয়। এক দিন মেয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করবে তখন ঠিকমতো মনে করতে পারবি না।
দারুন হয়েছে।
এটা বোধহয় কমন আজকাল, আমরা খুব একটা করিনি এই কাজ।
আমি আমার মেয়ের জন্য শাসতি ঠিক করেছিলাম, দুষটুমি করলে সিংগেল শাসতি আর মিথ্যে বললে ডাবল, এই বয়সে
অনেক ভালো লাগলো।
শুভকামনা রাসেল।
আমারো মনে হয় কেমনে লিখেন? মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ি।শেষের কথাগুলো মন কেমন করা যেন।
ভাল লাগলো লেখা
চমৎকার লেগেছে।
মন্তব্য করুন