ক
গত ১ বছরে জীবনযাপনের ধরণ বদলে গেছে। পরিবর্তন কাঙ্খিত ছিলো কি না তা যাচাই করার অবসর তৈরী হয় নি। একটি রাজনৈতিক গোলোযোগ থেকে অপরাপর গোলোযোগের মুখে কোনোমতে টিকে থাকা,একটু নাক উঁচিয়ে সামান্য শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার গল্পের ভেতরে তেমন মহত্ব নেই। গতানুগতিক আক্ষেপ কিছু আছে। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝে, ক্ষোভ-বিক্ষোভ-আক্ষেপের ভেতরেও বেঁচে থাকতে হয়। মানুষ বেঁচে থাকে, ক্যালেন্ডারের পাতার দিনগুলো, ঘড়ির কাঁটা ক্রমাগত ঘর বদলায়, উদ্বেগ- অনিশ্চয়তা- নিরাশা- হতাশা যখন ক্লান্ত করে ফেলে তখনও বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
কয়েকদিন আগে রিকশা করে সপরিবারে বাসায় আসছি। ঋতকে বললাম মা মনি ঘুমাও, তোমার চোখে ঘুম দৌঁড়াচ্ছে।
না ঘুম দৌড়াচ্ছে না। বাবা টোনাটুনি কোথায়?
রাত হয়ে গেছে, সবাই ঘুমাতে গেছে, তুমিও ঘুমাও
না ঘুমাবো না। বাবা প্লেন কোথায়?
প্লেনও ঘুমাতে গেছে।
না প্লেন ঘুমায় না, ওরা সারাদিন সারাদিন শুধু আকাশে ঘুরাঘুরি করে।
লোড শেডিং এর অন্ধকারে ছাদে গিয়ে টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার, মুন আর প্লেন দেখি, অন্ধকারে ঋত, ঋক ছাদে দৌড়ায়, ওদের আনন্দের কমতি নেই। মরচে রঙয়ের অর্ধেক অলস চাঁদ ঝুলে আছে আকাশে, মেয়ে বললো বাবা একটা প্লেন এসে চাঁদ খেয়ে ফেলবে, তখন তুমি আর চাঁদ খুঁজে পাবে না।
দুটো আলাদা রিকশা নিলে সমস্যা কেটে যেতো হয়তো কিন্তু আলাদা রিকশা নেওয়ার সমস্যা ঋক ঋত দুইজনই এক রিকশায় উঠতে চায়,
ঋত সকাল বেলা বললো " বাবা ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে ফিডারে নরম পানি দাও"। নরম পানির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখলাম সমস্যাটা আমাদের নিজেদের ভেতরে, শিক্ষার চাপে কিংবা নেহায়েত অভ্যাসে বাক্যের ভেতরে অহরহ ইংরেজী শব্দ ঢুকে যাচ্ছে।আমরা সব সময় ওকে শেখাতে চাই- ফ্রিজ থেকে বের করে সরাসরি ঠান্ডা পানি কিংবা কোক কখনও খাবে না । কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, বাইরে রেখে 'নরমাল' হলে তুমি খেতে পারবে। সেটা সম্ভব না হলে বাইরের পানির সাথে একটু ঠান্ডা পানি মিশিয়ে তোমাকে দেওয়া হবে।
ঋক- ঋতের কথা বলা অনুসরণ করলে বোঝা যায় আমরা কারণে অকারণে, প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে কত ধরণের ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করি কথ্য ভাষায়। কম্পিউটারের নার্সারি রাইমস, বার্নী এন্ড ফ্রেন্ডস, টম এন্ড জেরী, রাজ্যের এনিমেশন মুভি , কার্টুন নেটওয়ার্ক সব মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি ভাষিক পরিস্থিতির ভেতরে বেড়ে উঠছে ওরা। সেসবের প্রভাব পরছে ওদের শব্দ চয়নে। ঋক অবশ্য সচেতন ভাবে ইংরেজী শব্দগুলোর অনুবাদ করার চেষ্টা করে, কিছুক্ষেত্রে ইংরেজীতে চালিয়ে নেয়, আবার বিপদের পরিস্থিতিতে ইংরেজী শব্দের স্বল্পতায় বাংলা ইংরেজীচোখ মুখ হাত মিলিয়ে নিজের বক্তব্য প্রকাশের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা করে। ঋতের ক্ষেত্রে এসবের বিকার নেই।
জানালা আর বারান্দা দিয়ে ঋকের খেলনা, নিজের খেলনা ফেলে দিয়ে অনায়াসে বলতে পারে বাবা নীচ থেকে চামচ, থালা আর টি পট নিয়ে আসবা, ওরা নিজে নিজে নীচে পরে গেছে। ছাদে দাঁড়িয়ে হুম-হাম বাতাস খায়, প্লেন আর হেলিকপ্টার দেখলে বলে বাই প্লেন বাই হেলিকপ্টার, অর্ধেক চাঁদের সামনে প্লেন এগিয়ে যেতে দেখে বললো বাবা এখন প্লেনটা চাঁদটাকে খেয়ে ফেলবে, তখন কি হবে, তখন তো তুমি আর চাঁদ পাবে না।





মন্তব্য করুন