মিত্র কিংবা মৃতের তালিকায় দেখা নামগুলো
অনুভুতিগুলো খুব পরিচিত। শাহবাগের মাঝপথে যেদিন রাজীব খুন হলো সেদিন থেকেই নিশ্চিত ছিলাম লাশের মিছিলে আরও অনেকের নামই যুক্ত হবে। এইসব দৃশ্য দেখে জন্মভুমির পরিচিত ভাষা, পরিচিত বন্ধুর মুখ, মিছিলের উদ্যত হাতের সাথে উত্তোলিত অপরাপর হাত দেখে ভেতরে জন্ম নেওয়া প্রত্যয় আর ছদ্মনিরাপত্তার বোধ ভেঙে যায়, তখন মিছিল শেষে ফেরার পথে পেছনের পথটাতে চোখ রাখা, ভীড়ে খুব কাছে চলে আসা মানুষের হাতের দিকে সন্দিগ্ধ তীক্ষ্ণ নজর রাখা, হঠাৎ করে সেখানে চাপাতি উঠে আসবে কি না ভেবে ভয়ে সিঁটকে থাকা, আবছা অন্ধকার গলির সামনে মানুষের জটলা দেখলে সন্তর্পনে হেঁটে যাওয়া, হয়তো সেখানেই ঘাতক দাঁড়িয়ে আছে উদ্যত ছুরি হাতে, ঘাড়ে কিংবা গলায় চালিয়ে দিবে দ্বিধাহীন। নিরাপত্তাহীনতার বোধ শব্দ দিয়ে এই অনুভুতি প্রকাশ করা যায় না। ক্লাস্টোফোবিক মানুষকে যদি স্যুটকেসে ভরে চলন্ত এস্কিলেটরে ফেলে দেওয়া হয় তার ভেতরে যে ধরণের তীব্র আতংক জন্মাবে প্রতি মূহূর্তে তেমন একটা তীব্র আতংক নিয়ে রাস্তায় নামা, ঘরে ফিরে আসা এবং ঘরের অন্য সব মানুষ ফিরে না আসা পর্যন্ত একই ধরনের আতংকে জীবনযাপনের বাস্তবতাটুকু মেনে নিতে হয়েছিলো সে বছরই।
কোনো প্রয়োজন নেই তবুও মেয়েকে সাথে নিয়ে মহল্লার এই মাথা থেকে ঐ মাথায় রিকশায় একটা চক্কর দিয়ে আসা, মেয়ের উৎফুল্ল মুখ দেখার শান্তি ত্যাগ করতে হয়েছিলো। মাঠের বদলে ছেলেকে নিয়ে খেলতে হয়েছে ভাড়া বাসার ছাদে, পরিচিত প্রিয় অভ্যাসগুলো বাদ দিতে হয়েছে- শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকবার তাড়নায় টিকেটের তোয়াক্কা না করে চলন্ত বাসে লাফিয়ে উঠে পরার মতো প্রবাসে চলে আসার ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারি নি। অনেক ধরণের সীমাবদ্ধতার ভেতরেও একটা প্রশান্তি নিরাপদে বেঁচে আছি, ঘরের বাইরে বের হলে ঘন ঘন পেছনের রাস্তায় আর ঘনায়মান অন্ধকারে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয় না। তবু গতরাতে ঘুমের মাঝখানে শুনলাম অভিজিতকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিলো অভিজিত না আরিফুর, ও বাংলাদেশে আছে, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে বলেছে ও টিএসসি যাবে। পরিবারের সদস্যদের উদ্বিগ্ন মুখ আর সাবধানবানী মানুষের ভেতরে এক ধরণের অহেতুক চাপ তৈরী করে, এইভাবে প্রতিমূহূর্তে মৃতবত বেঁচে থাকার চেয়ে ঘাতকের হাতে খুন হয়ে যাওয়া ভালো- এটাও আসলে আতংকের একটা পর্যায়, অভিজিৎ এর মৃত্যুর পর আতংকের এই পর্যায় থেকে ক্ষোভ আর প্রতিশোধপরায়নতার বোধ তৈরী হবে- তারপর পুনরায় হতাশা আর নিরাপত্তাহীনতার বিষন্নতার অতলে তলিয়ে যাবে সব অনুভুব। অনুভুতিশূণ্য বেঁচে থাকার পর্যায় শুরু হবে ওর।
বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতিতে পরমতঅসহিষ্ণুতার সার্বজনীন গ্রহনযোগ্যতা আছে। "সালিশ মানি কিন্তু তালগাছ আমার" এবং " পরশ্রীকাতরতা"র মতো অনবদ্য ভাবপ্রকাশক শব্দগোষ্ঠী আছে বাংলায়। ভাষায় এই ধরণের শব্দকাঠামোর উপস্থিতি নিশ্চিত করে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরণের মানসিকতা লালন করছি। জাফর ইকবাল স্যার মুক্তিযুদ্ধের ফিল্টারে মানুষ দেখেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফিল্টারে মানুষ ছাঁকে, অন্তর্জালিক দেশপ্রেমিক জনতা ছাগুমিটার মেপে তর্কবিতর্ক করে, ব্লগে- ফেসবুকে মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য এবং সেসবের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝা যায় আমার মতের মতো না হলে সবাই আমার শত্রু এই মানসিকতাটুকু ধীরে ধীরে প্রবল হয়ে উঠছে এখানে।
স্বাধীন মতপ্রকাশের বিরুদ্ধের তীব্র সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে, সর্বজনপ্রিয় হয়ে ওঠার মোহ কাটিয়ে, কোনো দলের বিরাগভাজন হতে না চেয়ে এবং উগ্র ধর্মবাদী সংগঠনগুলোকে ক্ষিপ্ত না করে বর্তমানের বাংলাদেশে একটা বাক্য লেখার পরিশ্রম করার চেয়ে সিলিন্ডার ছাড়া এভারেস্ট শৃঙ্গে ওঠা সহজ। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পলিটিক্যালী কারেক্ট থাকতে চাওয়া এবং সোনার পাথরবাটির জন্যে হাপিত্যেশ করা একই কথা। রাজনৈতিক শ্লোগানে, উজ্জ্বল প্লাস্টিক ব্যানারে আর দেয়াললিপিতে যতই উন্নয়ন অগ্রগতির সংবাদ লেখা থাকুক না কেনো বাংলাদেশ মানুষের বসবাসঅযোগ্য একটা জায়গা- এখানে মানুষ বাস করে না। মানুষের শিশুরা বেড়ে উঠতে উঠতে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ- জাতীয়তাবাদী-পাকিস্তানপন্থী- ধার্মিক- নাস্তিক হয়ে যায়। নামের সাথে পৈতা ঝুলানোর মতো এই ধরণের বিভিন্ন বিশেষণ যুক্ত না করে বাংলাদেশে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
আমাদের শিক্ষা আন্দোলনের সম্পূর্ণ ইতিহাসটাই ধর্মবাদীদের সাথে আপোষের ইতিহাস। মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকায়নের সব পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত হাতে পানি পায় নি। সরকারী জমি হাতিয়ে সেখানে মসজিদ আর মাদ্রাসা তুলে বড় দানবীর হয় মানুষ এখানে, আকণ্ঠ দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের ভেতরে পরকালভীতি প্রবল। রাজনৈতিক ক্ষমতায় ইহলৌকিক জগতে তারা বিচারের উর্ধ্বে থাকলেও শৈশবের সংস্কার থেকে তারা জানে এইসব অপরাধের বিচার হবে পরকালে, তারা স্রষ্টাকে ঘুষ দিয়ে পরলৌকিক শাস্তি এড়াতে চায়- সরাসরি স্রষ্টাকে খুঁজে না পেয়ে ধর্মবাদীদের সঙ্গত দেয়। তাদের তুষ্ট করতে পারলেই যেনো পরলৌকিক জগতে মুক্তি পাওয়া যাবে।
আল্লাহ এবং মুহাম্মদের পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে ব্যতিব্যস্ত উগ্র এবং মডারেট মুসলিমদের দেখে আমি প্রতিনিয়ত আশ্চর্য হই। মুহাম্মদের জীবনের আলোকে নিজের জীবন গড়তে চাওয়া মানুষেরা মুহাম্মদের জীবন এবং সংগ্রাম থেকে বিন্দুমাত্র শিক্ষা গ্রহন করেছে এমনটা আমার নজরে পরে না। চোখের সুর্মা, আলখাল্লার আর চুলের ছাঁটে মুহাম্মদকে ধারণ করতে চাওয়া ধর্মবাদীদের দেখে করুণা জন্মায়।
একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যত প্রতিকূলতা- সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন মুহাম্মদ, নিজের প্রজ্ঞায় কিংবা সহকর্মীদের পরামর্শে সকল ধরণের সমঝোতা করে, আপোষ রফা করে ধর্মের নৈতিক কাঠামো ঠিক করেছেন। ব্যপক বাধার মুখোমুখি হলে আরোপিত অনুশাসন বিলুপ্ত করেছেন। তার অনেক আচরণকে আজকের দিনের নৈতিকতায় বৈধ্যতা দেওয়া কঠিন। মাঝের ১৪০০ বছরে আমাদের নৈতিকতা এবং মূল্যবোধে ব্যপক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের জীবন সংস্কৃতিতে ব্যপক পরিবর্তন এসেছে। তার যেসব আচরণ বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অগ্রহনযোগ্য- গলায় তরবারী চালিয়েও সেসব আচরণের গ্রহনযোগ্যতা তৈরী করা যাবে না। ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের ইতিহাস পড়া, মুহাম্মদের জীবনি খুঁটিয়ে পড়া সকল মোল্লা মাওলানা এইসব তথ্য জানে- আশেকানে মোহাম্মদ বিধায় তাদের কাছে এইসব ঐতিহাসিক তথ্য অলৌকিকতার মোড়কে মোড়ানো কিন্তু সেই একই ঐতিহাসিক তথ্য যখন বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতের সাথে তুলনা করে উপস্থাপন করা হয় তখন তারাও উপলব্ধি করে আমাদের বর্তমানের সংস্কৃতিতে এই ধরণের আচরণগুলোর গ্রহনযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের এই উপলব্ধির প্রকাশ করতে গিয়ে তারা মৃদু বিতর্কে জড়ায়, তারপর মুহাম্মদের এবং ইসলামের মানসম্মান হানি ঘটছে অনুযোগ করে, তারপর এই ধরণের তথ্য উপস্থাপন করা ব্যক্তিকে ঘৃণা করে। তাদের মনে হয় শুধুমাত্র তাদের কোমল হৃদয়ে আঘাত দেওয়ার জন্যেই এইসব পাপিষ্টরা এই ধরণের স্পর্শ্বকাতর তথ্যগুলোকে বারংবার সামনে নিয়ে আসছে। তাদের কোমল অনুভুতি আহত হয় এবং এই অনুভুতির আঘাত সহ্য করতে না পেরে আরও একদল মানুষ চাপাতি হাতে মানুষ হত্যা করতে রাস্তা টহল দেয়।
পরমতসহিষ্ণু, যেকোনো পরিস্থিতিতে যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী মানুষদের আমি নিজের মিত্র ভাবি। যুক্তিবাদী মানুষদের একাংশ জানে সমাজ- সভ্যতা সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল, তারা ১৪০০ বছর আগের সংস্কৃতি কাঠামোতে নিজের জীবন যাপন করতে আগ্রহী না। তাদের ভেতরে যারা প্রচলিত ধর্মকাঠামোতে আস্থা হারিয়েছে, তারা প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে নেয় তবে সবাইকেই যে প্রচলিত ধর্মকাঠামোতে আস্থা হারাতে হবে- এটাই বর্তমানের ধার্মিকতা এমন জেহাদী মানসিকতা তাদের অধিকাংশের ভেতরে নেই। এইসব মিত্রদের তালিকায় থাকা মানুষদের নাম অপমৃত্যুর তালিকায় উঠছে। তালিকায় থাকা সবগুলো নাম অপমৃত্যুর তালিকায় চলে গেলে আনুষ্ঠানিকভাবেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটবে-





কথাগুলো মুক্তমনায় লিখেছিলাম প্রায় দশ বছর আগে। অভিজিত ভাই, বন্যা আপা, জাহেদ, মেহুল, ফরিদ ভাই, কী টীম ছিলো আমাদের .।.।.।।
মন্তব্য করুন