hudai 1
দেশের সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৌশল বিষয়ের শিক্ষার্থীর পরিমাণ বাড়ছে, প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিজ্ঞান বিষয়ে বিভ্রান্ত। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের বিজ্ঞান মানসিকতার অপরিনত অপুষ্ট বিকাশের কারণে এখানে ধর্ম এবং বিজ্ঞানের লড়াইটা কদর্য কলহে পরিণত হয়েছে।
ধারাবাহিক নিয়মতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণের ফলাফলের পরিশীলিত বিশ্লেষণের পথ ধরে তাত্ত্বিক বিমূর্তায়নের পর্যায় অতিক্রম করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলগুলো খুব সীমিত সংখ্যক মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। বর্তমানের বিজ্ঞানের কোনো একটি বিকাশমান ধারায় গবেষকের সংখ্যা ১০০ থেকে ১০০০ জন। এই সীমিত সংখ্য পাঠকের জন্যে লেখা কোনো গবেষণাপত্র বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করা অধিকাংশ ব্যক্তির জন্যেই অনুধাবন করা কঠিন।
আমাদের সামগ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন কারণে এত বেশী পর্যুদস্ত, বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানমানস অপুষ্ট। আমাদের বোধগম্যতার জগত এবং বিমূর্তায়িত বিজ্ঞানের জগতের মৌলিক প্রশ্ন এবং উত্তর খোঁজার ধরণটা সম্পূর্ণ আলাদা। কোনো একজন ব্যক্তি যখন নিজের জীবনের উদ্দেশ্য এবং পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে জীবন সম্পর্কে কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়- সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটা তার প্রেক্ষাপটে এক ধরণের দার্শণিক সমস্যা। ব্যক্তি এই দার্শণিক সংকটে অস্তিত্ববাদী, বস্তুবাদী, আধ্যাত্মবাদী কোনো একটা প্রচলিত ধারা আকড়ে ধরতে পারে। সামগ্রীকভাবে সমাজের উদ্দেশ্য- মানবের করনীয় সম্পর্কে নৈতিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন এবং ক্ষেত্রবিষয়ে নৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সমাজ সংস্কার আন্দোলন কিংবা রাষ্ট্রবিপ্লবের নিজস্ব দার্শণিক প্রেক্ষাপট থাকতে পারে। "বিজ্ঞান" এই ধরণের ব্যক্তিকেন্দ্রীক, সমাজকেন্দ্রীক নৈতিকতা উপস্থাপন, নৈতিকতার যথার্থতা প্রতিপন্ন করা কিংবা নৈতিকতাকে নাকচ করে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে না।
আমাদের বাস্তবের জগতে সূর্য উদিত হয়, অস্ত যায়, বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্ত মেনে নিলে পৃথিবী পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঘুরে, আমাদের পায়ের নীচে মাটি আর উপরে আকাশ। যদিও মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে এমন কোনো উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিকনির্ধারনী কম্পাস কোথাও নেই। নিউটন অনেক অংক কষে হিসেব মিলিয়ে দেখিয়েছেন মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করে । গণিত বলছে অসীম সময় ধরে এই ধরণের আকর্ষণ বলবত থাকলে বস্তুকণাগুলো জটলা পাকাবে। "জট পাকানো মহাবিশ্ব" এই ধরণের আকর্ষণের যৌক্তিক পরিণতি। যেহেতু এখনও মহাবিশ্ব জট পাকায় নি সুতরাং মহাবিশ্বের একটা সূচনা আছে- সাড়ে তিনশ বছর আগে এমন একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো মানুষেরা বিগ ব্যাং, আইনস্টাইনের মহাকর্ষতত্ত্ব কিংবা হাবল টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে না জেনেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে।
পৃথিবীর বুকে সর্বগ্রাসী সর্বভুক আমরা যতই দাপটে চলাফেরা করি না কেনো, মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে আমাদের পৃথিবী খুবই সাধারণ মাত্রার একটা পাথরখন্ডের বেশী কিছু না, সেই পাথরখন্ডের গায়ে লেপ্টে থাকা মানুষ আর এমিবা ব্যাক্টেরিয়ার ভেতরে তফাত করে একটা উৎকৃষ্ট এবং অন্যটিকে নগন্য ঘোষণা করা মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে চুড়ান্ত অর্থহীন ভাববিলাসীতা। চুড়ান্ট অর্থহীনতার ভেতরে ধর্ম বিভাজন এবং ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে মানুষ মানুষের মতাদর্শিক আধিপত্যবাদীতার সংঘাতগুলো এত বেশী অর্থহীন এবং চারপাশে এই অর্থহীন সংঘাতের মাত্রাতিরিক্ত আবেগী প্রকাশ দেখে মনে হয় মানুষ অহেতুক অনেক কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করে।
পৃথিবী সূর্যের চারপাশে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে এটাই এমমাত্র কিংবা চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সত্য না, আমাদের অনুধাবনযোগ্য দিক বিভাজনের প্রেক্ষিতে এটা একটা সিদ্ধান্ত। আমাদের সৌরজগতে এমন গ্রহও আছে যারা পৃথিবীর ঘুর্ণন বিবেচনায় উলটো দিকে ঘুরছে। যেকোনো নক্ষত্রের চারপাশে পরিভ্রমণরত যেকোনো গ্রহের ক্ষেত্রে মাত্র দুটো দিকে ঘোরার স্বাধীনতা আছে, সুতরাং গ্রহকে এই দুটো পথের যেকোনো একটা গ্রহন করতে হবে। হাজার পাতা অংক কষে শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাবে না নক্ষত্রটি নির্দিষ্ট এই শর্তগুলে পুরণ করলে তার চারপাশের গ্রহগুলো পৃথিবীর মতো পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঘুরবে।
বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের ফলাফলে উত্তর- দক্ষিণ- পূর্ব- পশ্চিম- উপর- নীচ- ঈশাণ- নৈঋত কোণের কোনো গুরুত্ব না থাকলেও আমাদের অভিজ্ঞতার জগতকে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের প্রচলিত সামাজিক শব্দগুলো ব্যবহার করতে হয়। শব্দ ব্যবহার করে ভাবনা নির্মানের প্রক্রিয়ায় আমরা একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ যে ভাষায় উপস্থাপিত হতে দেখছি- সেটা বৈজ্ঞানিক সত্য!! বলা যাবে না।
আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার জগতকে আমাদের প্রচলিত শব্দে উপস্থাপনের প্রক্রিয়াতে বৈজ্ঞানিক তথ্য কিছুটা হলেও সার্বজনীনতা হারায়- এটা সংকটের একটি মাত্র দিক। এই সংকটের অসংখ্য মাত্রা আছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে পরিশোধিত, বিমূর্তায়িত জ্ঞান হিসেবে অনুধাবনের ক্ষেত্রে সংকটের প্রতিটি মাত্রাই আমাদের উপলব্ধির জগতকে প্রভাবিত করে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের অজ্ঞতার সমতা তৈরী করে।





মন্তব্য করুন