বসন্ত
শীতের সম্পূর্ণ সময়টা উষ্ণ সূর্যের প্রতীক্ষায় ছিলা। স্যাঁতস্যাঁতে শীত রাতের বিছানায় সরীসৃপের মতো শরীর আকড়ে ধরে । ঘরের দরজা খুললেই দুরের সাদা পাহাড় দেখার প্রথম উত্তেজনা ক্রমাগত ফিকে হয়ে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলের মতো কবে আটপৌরে শীতল দৃশ্যপট চোখের আড়াল হবে- অপেক্ষায় ছিলাম। এই ভয়াবহ শীতের ভেতরেও ফুল ফুটেছে। রাস্তায়, এপার্টমেন্টের সামনে ফুলের কেয়ারী সাজানো শুরু হয়েছে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে। জলবায়ু প্রতিবেদন বলছে মার্চে ৮ দিন তুষার পরবে, ৭ দিন পরেছে সব মিলিয়ে। বাতাসের উষ্ণতা বেড়েছে। ফুটপাতের ফুলের কেয়ারীগুলোতে নানা রঙ এর ফুল ফুটেছে। ততটা চমক ছিলো না দৃশ্যগুলোতে।
গ্রীষ্ম আর বর্ষার বাইরে ঢাকা শহরে অন্য কোনো ঋতুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কংক্রীট ঋতুর আঁচ লাগতে দেয় না শহরের গায়ে। রমনা আর সোহওয়ার্দির এলেমেলো গাছের গায়ে চকিত বসন্তের ছোঁয়া লাগতো । আমরা নিপূণ অস্ত্রোপচারে শহরের শরীর থেকে সেসব অনাবাসী ঋতুর সংক্রামণ মুছে ফেলেছি। আমার তারুণ্য আর যৌবনের অবচয়ের দিনগুলোতে আমি শহরে শরত, হেমন্ত, বসন্ত খুঁজে পাই নি। শহরে বাংলা ক্যালেন্ডার মেনে নবান্ন আর বসন্তবরণ উৎসব হয়েছে, পত্রিকায় ছবি দেখে বুঝেছি শহরে বসন্ত এসেছে।
দীর্ঘ অনেক দিন পর শরীরে বসন্তের ছোঁয়া লাগলো। এই বসন্তে মুগ্ধ হলাম। তুষারের শুভ্র আড়ালে সম্পূর্ণ সময়টা জুড়েই পাতা ঝরে যাওয়া গাছেরা বস্তন্তের প্রস্তুতি নিয়েছে, নামহীন তৃণ, ঘাসফুলের কেয়ারী, ক্রিসেন্থিমাম, টিউলিপ এবং পরিচিত-অপরিচিত সব তৃণলতা শীতের মলিনতার আড়ালেই নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছিলো, মার্চের প্রথমে যখন দীর্ঘ ৩ মাস পর তুষারের আড়াল থেকে মাথা উচিয়ে প্রথম সূর্য দেখলো ঘাসগুলো, তাদের ফ্যাকাশে হলুদ শরীরে খুব বেশী প্রাণের ছোঁয়া ছিলো না। উষ্ণতার সাথে তাদের শরীরে তারুণ্যের সুবুজ আভা জমেছে, ন্যাড়া পাহাড়ের গায়ে অল্প অল্প সবুজ উঁকি দিয়েছে, প্রায় প্রতিদিনই একই পথ হেঁটে যাই, হেঁটে আসি, খুব বেশী পরিবর্তন নজরে আসে নি। হঠাৎ পর্ণমোচী বৃক্ষের ফুলেল অভ্যর্থনায় বসন্ত আসলো, বাধানো নদীর দুই পাশের ন্যাড়া গাছগুলোতে এখনও পাতা আসে নি, সাদা আর গোলাপী ফুলে ভরে আছে ডালগুলো।
কদিন আগেই ব্যস্ত চড়াইয়ের কিচিরমিচির আর দুরের পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা তুষারের স্তুপের আড়ালে কখন শীতে ঝরে যাওয়া পাতাগুলোর আড়ালে কুড়ি ফুটলো ঠাওড়





মন্তব্য করুন