রাষ্ট্র
আমাদের মাথার উপরে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার খাঁড়া ঝুলছে। ২০১৩ সালের সংশোধনীর পর হীরক রাজার দেশের এই অদ্ভুতুরে আইন আরও বেশী নির্মম, আরো বেশী কণ্ঠরোধী। নতুন সংশোধনীর পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ব্যবহার কিংবা অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপনের প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনী যদি মনে করে অন্তর্জালিক পরিসরে কোনো ব্যক্তি " রাষ্ট্রের ভাবমুর্তি ধ্বংসের চক্রান্ত করছে", " মিথ্যা তথ্য উত্থাপন করছে", মানী ব্যক্তির মানহানী করছে কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ড করছে- আদালত কিংবা কতৃপক্ষের লিখিত আদেশ ছাড়াই তারা সে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে।
বর্তমানের বাংলাদেশে অন্তর্জালিক পরিসরে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করা হত্যাকান্ড, সহিংসতা কিংবা ধর্ষনের তুলনায় গুরুতর অপরাধ। আদালত সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের, খুন কিংবা ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের বিশেষ বিবেচনায় জামিন দিলেও দিতে পারেন কিন্তু ৫৭ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনঅযোগ্য অপরাধী। অপরাধের শাস্তিও ভয়ংকর- অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং কোটি টাকা জরিমানা।
২০০৬ সালে অনুমোদিত এ আইনের ব্যপক প্রয়োগ শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের পর থেকে। হেফাজতে ইসলামীর দাবীর কাছে নতিস্বীকার করে স্বাধীন মতপ্রকাশকারীকে আরও কঠোর শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে। ৫৭ ধারার অপরাধের কোনো স্পষ্ট বিবরণ নেই। বেশ কিছু অস্পষ্ট শব্দ আরও অস্পষ্ট কিছু বিশেষণে জড়িয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থাপিত প্রতিটি বাক্যই যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হওয়ার মতো অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশ করছে তাদের স্বাধীন মতপ্রকাশকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করলেও অপরাধক্ষেত্রের ধরণটা রাষ্ট্র- আদালত এখনও নির্ধারণ করে দেয় নি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যক্তির সামাজিক উপস্থিতির নতুন মাত্রা তৈরী করেছে। সামাজিক সংযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপন বিজ্ঞাপনের নতুন পরিসর দিয়েছে। ব্যক্তি শব্দ-ছবিতে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সর্বক্ষণ। সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত উপস্থিতি আদতে ঘরের জানালা খুলে অন্দরমহলের বিজ্ঞাপন না কি জনপরিসরে সমষ্টির একজন হিসেবে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া? ব্লগ-ফেসবুক এবং এই ধরণের মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তর্জালিক উপস্থিতি কি আদতে তার পার্সোন্যাল স্পেস না কি এটা একটা সোশ্যাল স্পেস?
রাষ্ট্র তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে নাগরিকের শোবার ঘরে ঢুকতে পারে না কিন্তু রাস্তার মিছিলে দাঙ্গাপুলিশ লেলিয়ে দিতে পারে। কয়েক ডজন মামলা হওয়ার পরও এখনও আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তি করে নি। ব্লগ-ফেসবুক পার্সন্যাল স্পেস হলে এই ব্যক্তিগত পরিসরে নিজস্ব অভিমত উপস্থাপন, ক্ষোভ ক্রোধ প্রকাশ করা এবং নিজস্ব পরিচিত জনদের ভেতরে সে মতামত জানান দেওয়া রাষ্ট্রের আইনী কাঠামোর মাথাব্যাথার কারণ হতে পারে না। যদি ব্যক্তিগত ব্লগ কিংবা ফেসবুক একাউন্ট জনপরিসর হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সেখানে রাষ্ট্রের নজরদারির নৈতিক বৈধ্যতা তৈরী হয়। একজনের ব্লগ এবং ফেসবুক একাউন্ট কি কি কারণে পার্সোন্যাল স্পেস থেকে সোশ্যাল স্পেসে রূপান্তরিত হবে আমরা এখনও জানি না।
ব্যক্তিপরিসর-জনপরিসর বিবাদ মীমাংসিত হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মতামত উপস্থাপনের দায়ে মূলতঃ নিধর্মী মানুষদের উপরে পরিকল্পিত প্রাণঘাতি আক্রমন হচ্ছে। নিঃধর্মী মানুষদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় অস্পষ্টতায় চিহ্নিত অপরাধগুলোকে সামনে রেখেই পরিকল্পিত সহিংসতা অব্যহত রাখা ব্যক্তিরা নিজেদের কর্মকান্ডের সপক্ষে সহানুভুতিশীল জনমত তৈরী করতে পেরেছে। তারা নিঃধর্মী মানুষদের বিরুদ্ধে " ধর্মীয় অনুভুতি" আহত করা, "ধর্ম প্রচারকের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা, মানহানী", ধর্ম গ্রন্থ অবমাননা"র অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ধর্মের পাহারাদারের প্রকাশ্য সমাবেশে ঘোষণা দিয়ে বলেছে " নিঃধর্মী মানুষদের হত্যা করা বৈধ্য।" এ ঘোষণার সপক্ষে ধর্ম ব্যখ্যার প্রাচীন পুঁথির যৌক্তিক সমর্থন আছে।
" আমি তোকে খুন করে ফেলবো"- বাক্যটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবহৃত হলেও বক্তার পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় আদতে বাক্যটা প্রচ্ছন্ন হুমকি না কি নেহায়েত ঠাট্টা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন কোনো ব্যক্তি এমন হুমকির মুখোমুখি হয়, উন্নত বিশ্বের মানুষেরা অন্তত আইনী নিরাপত্তার আবেদন করতে পারে। হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনী অভিযোগ উত্থাপন করার পর আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে হুমকিদাতাকে শাস্তিও দেয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে নিঃধর্মী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদানের দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে নিজেই মুক্তি দিয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও স্পষ্ট বলা নেই ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষেরা বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারবে না, কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষদের নাগরিক মর্যাদা কম। অতীতের উদাহরণগুলো বিবেচনা করলে নিশ্চিত বলা যায় রাষ্ট্র সংখ্যাগুরু মানুষেরা প্রতিক্রিয়াশীলতার শঙ্কায় ধর্ম অবিশ্বাসী মানুষকে পরত্যাগ করেছে। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল মানুষেরা প্রকাশ্যে হামলা করলেও রাষ্ট্র ধর্ম অবিশ্বাসী মানুষদের নিরাপত্তা দেয় নি, তাদের কাউকে কাউকে নির্বাসনদন্ড দিয়েছে, কারো নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। রাষ্ট্রের এমন স্বৈরাচারী অমানবিক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ হয় নি। সংখ্যাগুরুর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার ভয়ে এ দেশের বিবেকবান বুদ্ধিজীবীরা চুপ থেকেছেন। এ ধরণের স্পর্শ্বকাতর বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানাতে চান নি।
সবার সম্মিলিত মৌনতায় ধর্মের নামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করতে চাওয়া একদল ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে তারা ধর্মের ঢাল তুলে যেকোনো দাবী, যতই অন্যায্য হোক না কেন্ একবার উত্থাপন করে ফেললে রাষ্ট্র যে দাবী গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। রাষ্ট্র বারংবার প্রমাণ করেছে ধর্মব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের সে ধারণা সঠিক। রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নির্বাহী তাদের বিভিন্ন অদ্ভুতুড়ে দাবীকে সম্মান জানিয়েছেন। নাগরিক অধিকার পরিপন্থী হলেও মেনে নিয়েছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চাইছেন যারা ধর্ম বিশ্বাসী তারা গুরুতর নির্বোধ। এইসব নির্বোধ মানুষের বোধবুদ্ধি তৈরী হলে তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে। আপাতত ব্যপক অশিক্ষিত- অপশিক্ষিতদের দেশে ধর্ম বিষয়ে স্পর্শ্বকাতর কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা অনুচিত। আমরা এখনও বাক স্বাধীনতার যোগ্য হয়ে উঠতে পারি নি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রন ব্যতীত নিশ্চিত করা সম্ভব না। রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে, নিজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই পরিবেশ নির্মাণ করতে হবে। তবে রাষ্ট্র এই ধরণের প্রেক্ষাপট নির্মাণে নিতান্তই অনাগ্রহী।
আমাদের রাজনৈতিক নির্বাহীরা জানেন শিক্ষানীতিতে ধর্মতান্ত্রিক ঝোঁক রেখে, মদীনা সনদে দেশ পরিচালনার প্রতিজ্ঞা করে কখনও যে সকল নাগরিকের সকল ধরণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব না। কিন্তু যেহেতু আমাদের মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা এমন সোনার পাথরবাটি পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন নি, এর গলদগুলো সবার সামনে তুলে ধরেন নি, ফলে রাজনৈতিক নির্বাহীরা ধরেই নিয়েছেন তারা যে বাক্যে, যে ভঙ্গিতে প্রবোধ দিবেন সে ভঙ্গিই সবাই মেনে নিবে। প্রতিবাদী মানুষেরা রাষ্ট্রের কঠোর পুলিশী নির্যাতনের শিকার হবেন। ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে প্রতিবাদী কণ্ঠরোধের সব আয়োজন চুড়ান্ত। প্রকাশ্য রাজপথে পুলিশী সন্ত্রাসের ভীতির মুখে খুব বেশী জোড়ালো প্রতিবাদ আয়োজিত না হলেও অন্তর্জালিক পরিসরে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজস্ব ঘরের নিরাপত্তায় থেকেই নিজের ক্ষুব্ধ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে। ২০১৩ সালের সংশোধিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এই ধরণের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দমনের কার্যকর অস্ত্র।
নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে সব সময়ই ভোটের হিসেব মাথায় রাখতে হয়। জনগণের মেজাজ-মর্জি বুঝে কখনও কিছুটা মডারেট কখনও অনেকটা ধার্মিক পরিচয় ধারণ করতে হয়। শাহবাগ গণজাগরণের সূচনায় আওয়ামী লীগ গণজাগরণকে পূর্ণ মানসিক সমর্থন দিয়েছে, সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা নিয়মিত শাহবাগ চত্ত্বরে উপস্থিত থেকেছে। রাজীব হায়দার খুন হয়ে যাওয়ার পর তার জানাযায় তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় উপস্থিত ছিলেন। রাজীব হায়দারের ব্যক্তিগত অন্তর্জালিক দিনলিপিতে টুকে রাখা বক্তব্যগুলোর টুকরো টুকরো অংশ দৈনিক আমার দেশ এবং কাছাকাছি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় ১০ দিন জাতীয় বীরের সম্মান ভোগ করা ব্লগারেরা রাতারাতি গণশত্রুতে পরিণত হলো। রাজীব হায়দারের জানাযায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে তার জন্যে বিব্রতকর একটি পরিস্থিতি তৈরী করলো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিঃধর্মী পরিচয়ে পরিচিত ৩ জন ব্যক্তি গত ৩ মাসে নৃশংস ভাবে খুন হয়েছেন। পুলিশ এই অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে খুব বেশী আগ্রহী না। সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সের সাথে সাক্ষাৎকারে যেভাবে এই হত্যাকান্ডগুলোকে গুরুত্বহীন করে তুললেন, সে প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের অনাগ্রহটুকু আরও স্পষ্ট হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি ছিলো বৈষম্যহীন রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার। ৪ দশকের পথ পারি দিয়ে আমরা রাষ্ট্র হিসেবে যেখানে পৌঁছেছি- সে বাংলাদেশে কপালে ঈশ্বরবিশ্বাসের উল্কি না এঁকে জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব। যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্মহীনতা কিংবা ধর্মবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে তাকে খুন করে ফেলা সম্ভব এই দেশে। এসব অপরাধের বিচার হবে না। খুন হয়ে যাওয়া ব্যক্তির পরিবার ন্যায়বিচার পাবে না। এই ধরণের অপরাধগুলোর ইনডেমনিটির ক্ষেত্র তৈরীতে আমরা সফল। রাষ্ট্র এবং ধর্মবাদী গোষ্ঠী নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে একাগ্র নিষ্ঠায় আর অসংখ্য পরিচিত মানুষের মৃত্যুর শঙ্কায় আমরা দিনযাপন করছি।





হায়েনা যখন রক্তের স্বাদ পেয়েছে তখন রক্ত সে খাবেই। নিঃধর্মীদের পর কাদের পালা সেটা এখন দেখার বিষয়
এক অন্ধকার দুঃসময়ে সময়ে আটকে আছি আমরা! সহসা আলো দেখার উপায় নেই!
মন্তব্য করুন