রাষ্ট্র ২
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবছর ইংল্যান্ডে তাদের শেয়ার মালিকদের বাৎসরিক প্রতিবেদন এবং লভ্যাংশের হিসেবে বুঝিয়ে দিতো। সামুদ্রিক বাণিজ্য লেনদেন নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা অর্জন করে ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে নিজের উপনিবেশসীমানা বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং মানবতাবাদী ধ্যান ধারণার বিকাশের ফলে ইংল্যান্ডে ঈশ্বরবিমূখ শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো। খ্রীষ্টান ধর্মযাজকেরা এইসব ঈশ্বরবিমুখ মানুষদের ঈশ্বর অভিমুখী করে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কেম্ব্রীজ- অক্সফোর্ড শিক্ষিত ধর্মযাজকেরা নিজস্ব ধর্ম প্রতিষ্ঠানের নির্দেশে বন্দর এলাকায় চার্চ প্রতিষ্ঠা করে এইসব হৈ-হুল্লুড়ে বেহদ্দ মাতালদের যীশুর ভালোবাসার পথে নিয়ে আসতে চাচ্ছিলেন।
এই সময়টাতেই বিজ্ঞানের আবিস্কারের প্রতি মানুষের আগ্রহ উপলব্ধি করে ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ উদ্যোগে বিজ্ঞান পুস্তক প্রকাশনা ব্যবসায় নেমে যায়। তাদের বিজ্ঞান সাময়িকী এবং কি হয়, কেনো হয়, কিভাবে হয় প্রকাশনাগুলোর স্বল্প মূল্য শ্রমিক ও উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাঠকদের আকৃষ্ট করে। বিজ্ঞান লেখকেরা লেখালেখিকে পৃথক পেশা হিসেবে গ্রহন করেন। কোনো কোন বিজ্ঞান বিষয়ক বই ২০ থেকে ১০০ হাজার কপি বিক্রী হয়েছে। বিজ্ঞান বিষয়ক পুস্তক ব্যবসায় ধর্ম প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহন সাধারণ পাঠকের বৈজ্ঞানিক কৌতুহল নির্মাণ করেছিলো কিন্তু তাদের বৈজ্ঞানিক মানস নির্মাণ করতে পারে নি।
ইউরোপে মূলত খ্রীষ্টান নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাবনার বিকাশ হয়েছে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রথম যুগের অধিকাংশ "ন্যাচারাল ফিলোসফার" খ্রীষ্টান ধর্মমতে বিশ্বাসী ছিলেন। গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, কেপলার, নিউটন মোটা দাগে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী হলেও তারা একই ধর্মমতে বিশ্বাসী ছিলেন না। উপনিবেশায়ন এবং শিল্প বিপ্লবের কল্যানে ইউরোপের দেশগুলোতে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ব্যপকতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মপুস্তক এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সিদ্ধান্তগুলোর ভেতরে সংঘাতের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ধর্মযাজকেরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের ধর্মব্যাখ্যা নির্ধারণ করেছেন। প্রতিটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে যাচাই-বাছাই করে সেটার তাত্ত্বিক ভিত্তি নিশ্চিত হওয়ার পর সুকৌশলে নিজেদের ধর্ম ব্যাখ্যায় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। পুরোপুরি কেতাব মেনে চলা গোঁড়া ধার্মিক এবং উচ্চ শিক্ষিত ধর্মযাজকদের ভেতরে অন্তত বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনায় স্পষ্ট তফাত ছিলো।
পরবর্তী সময়ের বিজ্ঞানের ইতিহাস লিখেছেন তারা বলেছেন বিজ্ঞান ভাবনার অগ্রগতিতে খ্রীষ্টান ধর্ম সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যযুগের প্রেক্ষাপটে মুসলিম শাসিত দেশগুলোতে বিজ্ঞানচর্চা নিরুৎসাহিত হয়েছে, কায়রোতে দ্বদশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্যে বিজ্ঞানীকে নির্যাতিত হয়ে হয়েছে , মধ্যযুগে যীশুকে কটুক্তি করা এবং ধর্মীয় পবিত্র বিষয়গুলোতে আঘাত হানা এবং অশ্রদ্ধা প্রকাশের জন্যে ব্রুনোকে চার্চের নির্দেশে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, গ্যালিলিও চার্চের নির্দেশনা না মেনে সৌরকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের ধারণা বিশ্বাস করা এবং তার ছাত্রদের সৌরকেন্দ্রীক মহাবিশ্ব বিষয়ক পাঠ প্রদানের জন্যে গৃহান্তরীন রাখা হয় কিন্তু এই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে খ্রীষ্টান ধর্মযাজকেরা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ভেতরেই ধর্মবোধ সাজানোর চেষ্টা করেছেন। দৃশ্যমান জগত থেকে ঈশ্বরকে নির্বাসন দিয়ে তারা প্রাকৃতিক নিয়মকে ঈশ্বরের অলঙ্ঘনীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন, হালের ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন, ক্রিয়েশনিজম ধ্যানধারণার সূচনা হয়েছিলো খ্রীষ্টান পাদ্রীদের হাতে। বৈজ্ঞানিক ভাবনার অগ্রগতিতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রভাব থাকার ধারণাটা একেবারেই অগ্রহনযোগ্য কিন্তু ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে নিশ্চিত বলা যায় খ্রীষ্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে খুব বেশী আক্রান্ত বোধ করে নি বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস ক্রমাগত সংশোধন করেছেন। বেদ আর কোরান ঘেঁটে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীর সব গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার করছে এই ধারণা থেকে অন্তত উপমহাদেশের শিক্ষিত মানুষেরা এখনও সরে আসতে পারে নি।
নিবেদিতপ্রাণ খ্রীষ্টান তৈরীর ইউরোপিয়ান উদ্যোগ খুব বেশী সফল হয় নি, কিন্তু একই সময়ে উপনিবেশগুলোতে ব্যপক সংখ্য আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করে উপনিবেশিক ক্ষমতার জাল এবং যীশু প্রেমবিস্তারে সক্রিয় ছিলেন খ্রীষ্টান মিশনারীরা। তারা উপমহাদেশে ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা চাচ্ছিলেন। খ্রীষ্টানুরাগ বৃদ্ধির নানামুখী তৎপরতাগুলো অন্তত উপমহাদেশে খুব বেশী সাফল্য অর্জন করে নি। একদল মিশনারী ভেবেছিলেন এই দেশের পৌত্তলিক প্রথাকে আক্রমণ করে, তাদের প্রথাগুলোর অসারতা এবং ধর্মপুরুষদের তীব্র অপমান করলে বিজিত জাতি নিজের ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করে ফেলবে। পুরাণ-কোরান-হাদিস-উপনিষদ ঘেঁটে তারা বিভিন্ন ধর্মপুরুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপন এবং অনুসৃত প্রথাগুলোকে অশোভন আক্রমন করেছেন কিন্তু এই অশোভন আক্রমনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখে অন্য মিশনারীরা উপলব্ধি করেছেন এই অপমানমূলক প্রক্রিয়ায় খ্রীষ্টাপ্রেমানুরাগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে না।
ধর্ম সমন্বয়ের উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে ধর্মগুলোর ভেতরে সখ্যতা এবং খ্রীষ্টান ধর্মের তূলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলে উপমহাদেশের মানুষেরা ধর্মান্তরিত হবে- এমন ভাবনা থেকে তারা আন্তঃধর্ম সংলাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মবিতর্ক, ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধ রচনার প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছেন তবে সে প্রচেষ্টাও সফল হয় নি। শিক্ষানীতির নির্দিষ্ট পাঠক্রম অনুসরণ করতে গিয়ে মিশনারী পরিচালিত স্কুলগুলো ধর্মদীক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সফল হতে পারে নি। তবে শত বছরের প্রচেষ্টা থেকে তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে ব্যক্তিগত জীবনযাপনে, জীবন দর্শণে একমুখী একাগ্রতা এবং সততার প্রমাণ রাখতে পারলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে কোনো একসময় ধর্মদীক্ষিত হতে পারে- ফলে উপমহাদেশের ধর্মযাজকেরা মানবতার কণ্ঠস্বর, মানবপ্রেমী আদর্শ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন এবং সামাজিক মর্যাদা ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন।
খ্রীষ্টান শিক্ষাবিদদের ধারণা ছিলো পৌরাণিক এবং কোরানিক বক্তব্যের সাথে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অসামঞ্জস্যতা স্পষ্ট হলে অন্তত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নিজের ধর্মকে প্রশ্ন করবে। একই সাথে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সুক্ষ্ণ খ্রীষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক জেনে বুঝে এইসব শিক্ষিত মানুষ নিজ ধর্মের অসারতা বুঝে এবং বিজ্ঞানবাদী ধর্ম হিসেবে খ্রীষ্টান ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করে ধর্মান্তরিত হবে। উপমহাদেশের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের জন্যে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায় নি, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো সরকারী চাকুরির যোগ্যতা অর্জন করা। নিজের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণের নয় বরং ইংরেজী শিক্ষা তাদের কাছে উচ্চ উপার্জনের সহজসাধ্য উপায় হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছিলো। ১৮৮১ এবং ১৯০১ সালের আদম শুমারীতে ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যাবন্টনের তালিকা দেখলেই বুঝা যায় ধর্মান্তরণের সবগুলো কৌশলই উপমহাদেশে ব্যর্থ হয়েছে। ইংরেজ শিক্ষিত উচু বর্ণের হিন্দুদের ভেতরে ইংরেজদের সমকক্ষতার(চাকুরীতে সমান মর্যাদা, সমান অর্থনৈতিক সুবিধা) দাবীতে এক ধরণের রাজনৈতিক চেতনা তৈরী হয়, একই সাথে হিন্দুত্ববাদী জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাও বিকশিত হয় উপমহাদেশে। আর্য ধর্ম এবং আর্য শ্রেষ্ঠত্বের অনুসারী মানুষের সংখ্যা মাত্র বিশ বছরে কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যায়।
কৃষ্ণ এবং মুহাম্মদের চেয়ে যীশুকে অধিকতর শুদ্ধ, পবিত্র এবং মানবতাবাদী হিসেবে উপস্থাপনের কৌশল উপমহাদেশের ধর্মপ্রেমী মানুষদের ধর্মচেতনা আহত করেছে, বিজ্ঞানবাদী হিসেবে খ্রীষ্টান ধর্মকে উপস্থাপন করে খ্রীষ্টান ধর্মএর জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব নির্মাণের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়ে শিক্ষিত হিন্দুদের নিজস্ব প্রতিক্রিয়ায়। তারা পুরাণ আর ইতিহাস ঘেঁটে দৃষ্টান্তসমেত প্রমাণ করতে পেরেছে নিউটন বেদ-উপনিষদের ধারণা মেরে দিয়ে নিজের গতিবিদ্যাবিষয়ক সূত্র প্রতিপাদন করেছে। ইংরেজী শিক্ষা শিক্ষিত হিন্দু ভদ্র সন্তানেরা আধুনিক বিজ্ঞান এবং পৌরণিক গাঁথা দুটোতেই বিশ্বাস করতে সক্ষম। পার্থিব বাস্তবতা এবং আত্মিক বাস্তবতার দুটো পরস্পরবিচ্ছিন্ন জগতে সহজাত গতায়তের অসম্ভব ক্ষমতায় এরা বিশ্বাস করে দুরবর্তী গ্রহ-নক্ষত্রেরা মানুষের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারে না কিন্তু নিজের ভবিষ্যত এবং সন্তানের ভবিষ্যত জানতে তারা ঠিকই জ্যোতিষির কাছে ছুটে যায়। এরা বিশ্বাস করে পৃথিবীর অভিকর্ষজ ত্বরণের ফলে যান্ত্রিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো মানুষই শূণ্যে ভাসতে পারবে না তবে প্রত্যেকেই বিশ্বাস করে সন্ন্যাসীরা শূণ্যে ভেসে হিমালয়ে যেতে পারে।
ইংরেজ মিশনারী প্রবর্তিত স্কুলগুলোতে অন্ত্যজ হিন্দুরা প্রবেশাধিকার পায় নি, সেখানে মুসলমান শিক্ষার্থীরা ছিলো সংখ্যালঘু, বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে গড়ে ওঠা সরকারী বেসরকারী স্কুলগুলোতে স্বল্প সংখ্যক মুসলমান ছাত্র ভর্তি হলেও বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোই ছিলো মুসলমান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রধান অবলম্বন। সেসব স্কুলে আবশ্যিক ধর্ম শিক্ষার বদলে কৃষি -বিজ্ঞান- বৃত্তিমূলক প্রায়োগিক শিক্ষা প্রদানের দাবীতে একাট্টা ছিলেন হিন্দু মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা। ফলে অন্তত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে কখনও ধর্ম আবশ্যিক বিষয় ছিলো না। অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ধর্ম শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে ধর্ম শিক্ষাকে গ্রহন করতো না। পার্থিব জগত এবং আত্মিক জগতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো প্রেক্ষাপটে রেখে এক ধরণের দ্বিচারী জীবনযাপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত বাস্তব।
সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব এবং করুণায় নিঃসংশয়ে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী নির্মাণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে আমাদের ২০১২ সালের শিক্ষা নীতিতে। ধর্ম শিক্ষাকে আবশ্যিক ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হয় নি শিক্ষা কমিটি বরং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে নৈতিক শিক্ষা প্রদানের আবশ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে এখানে। এমন ধর্মবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনী ব্যবস্থার বাইরে ধর্মবেত্তারাও ধর্মীয় বিধানে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতার রাখেন। হাইকোর্ট ফতোয়া নিষিদ্ধ করে নির্দিষ্ট রায় ঘোষণা করলেও রাষ্ট্রপ্রধান বলেছেন ফতোয়া নিষিদ্ধ হবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন মদীনা সনদ অনুসারে দেশ পরিচালিত হবে, এই দেশে কোরান সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন হবে না। শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা আছে এমন ব্যক্তিই ফতোয়া দিতে পারবেন।
ইসলামী বিধানমতে মাশায়েখরাই ফতোয়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন- তবে আমাদের প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় মাশায়েখ সনদ প্রদান করা হয় না কিন্তু ক্বাওমী মাদ্রাসাবোর্ড চাইলে তাদের শিক্ষার্থীদের মাশায়েখ সনদ দিতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ক্বাওমী মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি দেয় না, বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্বীকৃত মাশায়েখ সনদদাতা কোনো প্রতিষ্ঠান নেই কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র মাশায়েখের ধর্মীয় বিধান মতে বিচার করার এবং ধর্মীয় বিধানে অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্যে শাস্তি নির্দিষ্ট করে দেওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
এই অদ্ভুত শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষিত সমাজে "বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্ন মত পোষণের স্বাধীনতা" অদ্ভুত সব বিপরীত রীতি নীতি সামাজিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রিত বিষয়। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রকেরা রাষ্ট্রের ভাবমুর্তি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত বাক্যগুলো আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উত্থাপন করে সচেতন ভাবেই নিজস্ব পুলিশী ব্যবস্থা দিয়ে "ভিন্ন মত" দমন করে। তারা এই ধরণের ভাবমুর্তি, বন্ধু দেশের ভাবমুর্তি রক্ষায় সদাতৎপর।
তথাকথিত প্রগতিশীল মানুষেরা প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা রুখতে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়গুলোর উপরে পবিত্রতা আরোপের দাবী জানাচ্ছেন। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলো ধর্ম নেতা- ধর্মনীতি এবং ধর্মীয় কেতাবগুলোর উপরে পবিত্রতা আরোপ করেছেন অনেক আগেই, এখন তারা এই পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে রাষ্ট্রের সক্রিয় হস্তক্ষেপ দাবী করছেন, বলছেন ধর্ম অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। তারা ধর্ম অবমাননার শাস্তি মৃত্যুদন্ড নির্ধারণের দাবী করেছেন। রাষ্ট্র কিছুটা নমনীয় হয়ে ধর্ম অবমাননার শাস্তি নির্ধারণ করেছেন যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং কোটি টাকা জরিমানা।
আমাদের চারপাশে বায়বীয় বিষয়াসয়গুলোর উপরে পবিত্রতা আরোপের এই প্রগতিশীল- প্রতিক্রিয়াশীল প্রবনতার ভেতরে মানুষ মূল্যহীন, মানুষের আত্মমর্যাদা, অহংকার উপেক্ষিত। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে পরলৌকিক রকেটে চেপে। অচিরেই কোরআন- গীতা- ত্রিপিটক-বাইবেল- ১৫ খন্ডের মুক্তিযুদ্ধের দলিল পত্র - সংবিধানসম্মত পবিত্র দলিল হয়ে উঠবে বাংলাদেশে।





প্রিয়তে রেখে দিলাম .---------------
কোন ধরণের কার্যকলাপ ''ধর্ম অবমাননা'' বলে গণ্য করা হবে?
মন্তব্য করুন