ইউজার লগইন

জিয়াউর রহমান

১৫ খন্ডে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রকাশিত হয়েছিলো। ৯ম খন্ডে স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বর্ণনা আছে। চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহন করা শমসের মুবিন চৌধুরী এবং হারুন আহমেদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার আছে সেখানে। কি প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হলো তার কিছুটা বর্ণনা সেখানে পাওয়া যায়। শমসের মুবিন চৌধুরীর সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিলো ২০শে অক্টোবর ১৯৭৩ এবং হারুন আহমেদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিলো ১৭ই জানুয়ারী ১৯৭৫ এ।

২৩শে মার্চ খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অলি আহমেদ, মাহফুজুর রহমান, শমসের মুবিন চৌধুরী এবং হারুন আহমেদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের বাসায় আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে তাদের জানান " আমরা আপনাদের সাথে আছি। আপনাদের পক্ষ থেকে যদি ঠিক সময়ে কোনো সাড়া বা আভাস পাই আমরা কিছু করতে পারি।"
আওয়ামী লীগের নেতারা তাদের জানান শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক সমাধানের আশা করছেন।
তারা আওয়ামী লীগের নেতাদের বলেন, " আমরা মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত আছি। আপনারা ঢাকা থেকে খবরাখবর নিয়ে আগামী কাল আমাদের জানাবেন।"
এই সাক্ষাৎকারের পর শমসের মুবিন চৌধুরী ধারণা করেন তাদের আসলে কোনো বিকল্প প্রস্তুতি নেই। জিয়াউর রহমানের সাথে ক্যাপ্টেন রফিক, শমসের মুবিন চৌধুরী, হারুন আহমেদ চৌধুরী এবং অন্যান্য প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহন করা সামরিক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ছিলো। ২৫শে মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রাম শহরে গোলাগুলি শুরু হওয়ার পর জিয়াউর রহমান ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্ণেল জানজুয়াকে গ্রেফতার করে ব্যাটলিয়নের সবাইকে বলেন
" আজ থেকে আমি ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনে করার সংকল্প ঘোষণা করলাম। এবং আমার নির্দেশেই সবকিছু চলবে। আপনারা সবাই আমার সাথে থাকবেন। এখন এখানে থাকা আমাদের জন্যে নিরাপদ নয়। আমরা সবাই কালুরঘাটের দিকে যাবো, সেখানে গিয়ে আমরা সবকিছু রিওর্গানাইজ করবো এবং আমাদের পরবর্তী কর্মস্থল নির্ধারণ করবো।"

শমসের মুবিন চৌধুরীর ভাষ্যমতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টেই লে কর্ণেল জানজুয়া সহ অন্যান্য বন্দী অফিসারদের হত্যা করা হয়। কালুরঘাটে পরাজিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান এবং তার সঙ্গের যোদ্ধাদের সাথে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এ আর মল্লিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ব্যক্তির সাক্ষাৎ হয়। আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিচারণমূলক বই আমার ৭১ এ এই সময়ের বর্ণনায় লিখেছেন জিয়াউর রহমান কয়েকজন বিহারী কিংবা পাকিস্তানীকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করেন এবং তাদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়ার ধকল সহ্য করতে না চাওয়ায় সেখানেই তাদের হত্যা করা হয়।

২৫শে অগাস্ট ১৯৭৩ সালে গৃহীত মাহফুজুর রহমানের সাক্ষাৎকারঃ
" Sometime at 11 o'clock night, while having rest with the coy at KRahman's COCA COLA factory, I received a tel call from the city. An unknown person in a panic and hurry was trying to pass an important message to some of his relative in the factory and asked my identity. I was no duty here3, I replied. The man thought me as one of the Police guard there in the factory and said- "we have received a telephone call now from Dacca that firing has started there, Pakistanis have started killing the public en mass and all are trying to face them." I thanked the unknown man for giving me such an information in telephone and dropped the
receiver.

As we approached a little towards our unit at Sholashahar I found Subedar Sabed Ali Sarkar rushing towards me and whispered in Bengali to reach the unit line immediately. I understood the rest. Rushed with my troops at sholashahar and found Major (now Brig) Ziaur Rahman getting all of our troops closed together in the line.

It took about an hour to get all the scattered troops from different places together. Maj (now Brig) Ziaur Rahman took over the Command of 8E Bengal and addressed the troops for few minutes- Tigers, Pakistanis have started killing Bengalis en mass they have already disarmed some of the E Bengal battalions, they have decided to kill all of us. They already trapped me but luckily I was saved. We will have to organize
quickly and face them at any cost to save the country, are you all ready to do that with me? We all agreed and promised by the name of Allah to do that."

শমসের মুবিন চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে বলা ভাষণ এবং মাহফুজুর রহমানের স্মৃতিচারণের ভাষণের ভাষায় মিল নেই তবে দুজনেই যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, জিয়াউর রহমান সচেতনভাবেই ৮ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব গ্রহন করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেন। ২৭শে মার্চ জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ভাষণ দেওয়ার সময় নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এমন কিছু প্রতিবেদন পাওয়া যায় তবে পরবর্তী সময়ে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব মেনে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন এমন ভাষ্যসম্বলিত ভাষণ প্রদান করেন।সে ভাষণের ভাষ্য স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে লিপিবদ্ধ আছে।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই, তবে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্যাংককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৈয়দ ফারুক রহমান বলেন তিনি তার পরিকল্পনার কথা জিয়াউওর রহমানকে জানিয়েছিলেন এবং জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে তার বাসার রক্ষীদের নির্দেশ দেন এই ব্যক্তি যেনো কখনও তার সাথে সাক্ষাত করার সুযোগ না পায়। হত্যাকান্ডের উদ্যোগ সম্পর্কে জিয়াউর রহমান সরাসরি অবগত ছিলেন কিংবা ষড়যন্ত্রে সরাসরি অংশগ্রহন করেছেন বিষয়টা নিঃসংশয়ে প্রতিষ্ঠিত না হলেও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে নিশ্চিত হয়ে যায় বিদ্যমান পরিস্থিতি জিয়াউর রহমানকে বাড়তি ক্ষমতা দিয়েছিলো। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনপ্রতিষ্ঠার নামে তিনি অসংখ্য সেনাকর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন, বিদ্রোহের অভিযোগে অনেককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০০৯ কিংবা ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে একজনের সাথে কথা হলো। তিনি জেড ফোর্সের সদস্য ছিলেন। তিনি আমাদের জানালেন ১৬ই ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান সিলেটের আশেপাশে ছিলেন না। তাকে জেড ফোর্স থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং সে অবস্থায় জিয়াউর রহমান তার সাথে হুইস্কি পান করছিলেন। আমাদের কান কথা ইতিহাস প্রকল্পের অংশ হিসেবে তার এই বক্তব্য ইতিহাস হয়ে যায়। অবশ্য জেড ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার হাফিজউদ্দীন আহমেদ এবং ৩য় বেঙ্গল ব্যাটলিয়নের কমান্ডিং অফিসার শাফায়েত জামিল তাদের স্মৃতিকথায় জিয়াউর রহমানের বরখাস্ত হওয়ার সপক্ষে কোনো বক্তব্য রাখেন নি। মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের বিভিন্ন আক্রমনের বর্ণনা আছে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রের ১০ খন্ডের ৪৭৬ পৃষ্টা থেকে ৫১০ পৃষ্টায়, সেখানে অন্তত কমান্ডার হিসেবে জিয়াউর রহমানের উপস্থিতির কথা জানা যায়। হাফিজউদ্দিন এবং শাফায়েত জামিল উভয়েই তাদের স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন ১৬ই ডিসেম্বর সিলেট ডিসি অফিসে জিয়াউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

আমাদের রাজনৈতিক আবেগ অন্তত তথ্যগত বাস্তবতা মানে না। ব্যক্তিগত অনুভুতি, ব্যক্তিগত বিশ্বাসে এইসব রাজনৈতিক অন্ধ মানুষেরা ইতিহাসকে নিজের মতো বয়ান করে সাময়িক বাহবা পায়। জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বেচে জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রধানপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে বিএনপি নিজের রাজনীতি পরিচালনা না করলে সম্ভবত জিয়াউর রহমানকে নিয়ে এমন পরিস্থিতি কখনও তৈরী হতো না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দখল নিয়ে দুই রহমান পরিবারের রাজনৈতিক বৈরীতা তাদের সমর্থকদের ভেতরে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। এই পারিবারিক কলহে জড়িয়ে গিয়েছে আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। ইতিহাস চর্চা বাদ দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পেছনে ছুটে বেড়ানো ঐতিহাসিক পণ্ডশ্রমগুলোর পেছনের লোভ-লালসার বাইরে এইসব ইতিহাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এরই ফাঁকে শর্মিলা বসু ডেড রেকনিং গবেষণাগ্রন্থের তথ্য সংগ্রহের জন্যে বাংলাদেশে আসেন এবং তানভীর মোকাম্মেল, রশীদ হায়দার, মফিদুল হক এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কর্মকর্তারা তাকে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ইতিহাসের রাজনৈতিক দখলের নানামাত্রিক লড়াই থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো শর্মিলা বসু কতটুকু গ্রহন করেছেন এবং কতটুকু আবর্জনা ভেবে ছুড়ে ফেলেছেন আমার জানা নেই। তবে এইসব মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের প্রধানপুরুষদের সহযোগিতার সত্ত্বেও শর্মিলা বসু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যে বয়ান লিখেছেন সেটা আমাদের জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশী মননকে আহত করেছে।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.