যুদ্ধপরিস্থিতি
আক্রান্ত সিরিয়া থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী সীমান্তের কাঁটাতার অবজ্ঞা করে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, সমুদ্রে ভাসাচ্ছে ভেলা, রাতের অন্ধকারে অনিশ্চিত পথ পারি দিচ্ছে, ভীষণ অমানবিক জীবনের গল্পগুলো প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, ভাইরাল ভিডিও, মীম, অবজ্ঞা, আশংকা, ঘৃণা, সমবেদনা ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে এক হাত দেখে নেওয়ার সুযোগ কেউ হেলায় ছাড়তে নারাজ।
সিরিয়ার শরণার্থী সংকট টক ওফ দ্যা ইউনিভার্স হয়ে ওঠার পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গোত্রগত, জাতিগত সহিংসতার বলি আক্রান্ত মানুষেরা, যারা একই রকম অসহায়ত্ব নিয়ে বন্ধুর প্রতিকূল পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় খুঁজছে কিছুটা উদ্বিগ্ন, হয়তো তাদের দুঃখ দুর্দশা অসহায়ত্ব প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাবে না। শরনার্থীর রাজনীতিতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সিরিয়ার আক্রান্ত মানুষ। এই টানা-পোড়েন আশংকা উদ্বেগ স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া।
যেদিন জাপানী বৈমানিকেরা পার্ল হার্বারে আত্মঘাতী হামলা চালালো, আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে কর্মরত সকল জাপানী নাগরিকদের সাম্ভাব্য গোয়েন্দা বিবেচনা করে কয়েক লক্ষ জাপানী নাগরিককে ঘেটোতে বন্দী করা হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত জাপানীদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দুটো পারমাণবিক বোমার ক্ষতের সাথে কর্মচ্যুত এইসব মানুষের চাপ সামলে জাপান বিশ্বযুদ্ধের ২ দশক পরে জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাদের নিয়মতান্ত্রিকতা, তাদের পেশাগত সততার প্রতিফলন। তবে উন্নয়নের প্রথম দশকে, বিশেষত বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের গল্পটা এমন ছিলো না। কোনোক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের একজন সৈনিককে আকৃষ্ট করে, তার প্রেমিকা, স্ত্রী হিসেবে জাপানের অভিশপ্ত ভূখন্ড ছেড়ে যাওয়ার তীব্র তাগিদ জাপানী মেয়েদের ছিলো। জাপানের নিয়মতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে যেখানে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব ভূমিকার পরিসর চিহ্নিত, এইসব পরিত্রান খোঁজা জাপানী বধুদের আমেরিকা পদাপর্ণ পরবর্তী জীবন খুব বেশী আনন্দময় ছিলো না। ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যবধানের সাথে পার্ল হারবার আক্রমনপরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরী হওয়া তীব্র জাপানী বিদ্বেষের সাথে লড়াই করতে হয়েছে তাদের।
যুদ্ধাক্রান্ত প্রতিটি দেশের গল্পই এমন। সাময়িক সংকটের ভেতরে অপ্রস্তুত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্ধকারের ভেতরে আলো খোঁজার অনুপ্রেরণা এবং পরের দিন বেঁচে থাকার কৌশল নির্ধারণের প্রয়াসগুলোর মাঝেও অভ্যস্ততা খুঁজে নেওয়ার তাগিদ থাকে। শরনার্থী মা যুদ্ধের ডামাডোলের ভেতরেও সন্তানের জন্যে দুধ-ভাতের প্রত্যাশা করে, অবিশ্রান্ত বুলেট বৃষ্টির মাঝে কোথাও কেউ লাঙল ঠেলছে, কোথাও নিড়ানী দিচ্ছে জমিতে কৃষক, সে মানুষটাই বুলেটের শব্দ শুনে সাময়িক আড়াল খুঁজছে। যুদ্ধ অবসান এবং পুনর্গঠনের মধ্যবর্তী সময়ের অবশ্যসম্ভাবী দারিদ্র, মানবিক সংকট, সামান্য ভালো থাকার, পরিমিত জীবনের জ্বালানী খুঁজে নেওয়ার মানবিক প্রয়াস অবজ্ঞা অবহেলা কিংবা ঘৃণাযোগ্য কিছু না, এটাই মানুষ্এর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।
প্রত্যক্ষ যুদ্ধের প্রকাশ্য অমানবিকতার তুলনায় নীরব যুদ্ধের প্রতিনিয়ত অবমাননার গল্পগুলো মর্মান্তিক। আপাত শান্তির সময়ে এই ধরণের নীরব যুদ্ধের শিকার মানুষেরা কোথাও আশ্রয় পায় না। তাদের অনিশ্চয়তা, আহত অনুভুতি কোনো প্রতিকার খুঁজে পায় না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুনর্গঠনের সময়ে প্রথমত ভারতে অবস্থান নেওয়া এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করা রাজনীতিসচেতন একদল মানুষ সম্পূর্ণ অকারণেই মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী প্রশাসনের সাথে জড়িত, পাকিস্তানী প্রশাসনের অনুগত মানুষদের পরোক্ষ যুদ্ধসহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাজনীতিসচেতন মানুষের ঘৃণার রাজনৈতিক ব্যপ্তি শুধুমাত্র পাকিস্তানী প্রশাসনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ভেতরে অমর্যাদাবোধ জন্ম দেয় নি বরং একই সাথে এই মানসিকতার বলি হয়েছে আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু উপায়ান্তরবিহীন সাধারণ মানুষেরা। এই দেশে বিভিন্ন কারণে রয়ে যাওয়া ৬ কোটি মানুষকে যখন ভারতের শরনার্থী শিরিবের তালিকা ভুক্ত এক কোটি মানুষের একাংশ পাকিস্তানীদের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে, ৬ কোটি মানুষের একাংশ স্বাভাবিক ভাবেই এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীনতাকে প্রশ্ন করবে। ভারতের শরনার্থী শিবিরের অতিরিক্ত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরের উদ্বিগ্ন নিম্নমাত্রার দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীর দ্বন্দ্ব বুদ্ধিজীবী পর্যায় থেকে দৈনিক পত্রিকার কলামে প্রকাশিত হলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরী হয়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক ভারতে গিয়েছিলেন? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক ভারতে শরনার্থী হিসেবে গিয়েছিলেন? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক ভারতে গিয়েছিলেন? শতকরা ১০ জন? শতকরা ২০ জন? বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড দিবসে যাদের মৃত্যুতে শরনার্থী উচ্চবর্ণ দেশপ্রেমিকেরা হাহাকার করে তারা সবাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আটকে থাকা দেশপ্রেমিক মানুষ। তাদের অকালমৃত্যুই প্রমাণ করে তারা পাকিস্তানের দালাল ছিলেন না। যারা এই তালিকায় নেই, যারা কখনও দেশের রাজনীতিতে খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন নি, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান দেশের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ প্রসারে কোনো ভুমিকা রাখে নি তারা কেউই হত্যার জন্যে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীর তালিকায় ছিলেন না। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিসচেতন বড় একটা অংশ যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন না, তারা সবাই শুধুমাত্র অবরুদ্ধ বাংলাদেশে বেঁচে থাকার অপরাধে পাকিস্তানের দালাল হয়ে গেলেন।
অবরুদ্ধ বাংলাদেশে বেঁচে থাকার অপরাধে পাকিস্তানের দালাল হয়ে যাওয়া বাংলাদেশী নাগরিকদের মানসিক পীড়ার মীমাংসা হয় নি অদ্যাবধি। এখনও তাদের পাকিস্তানীপণা নিয়ে মাঝেমাঝে শরনার্থী শিবিরের উন্নত দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা কলাম নামিয়ে ফেলেন। এইসব বুদ্ধিজীবীদের বাচালতায় অনুপ্রাণীত ক্ষুদে বুদ্ধিজীবীরাও তাদের শীর্ণ কলমে জিঘাংসাগাঁথা লিখে।
নুরুল কাদিরের ২৬৬ দিনে স্বাধীনতা বইটি পড়ার পর মনে হলো নুরুল কাদির সাহেব পরিণত বয়েসেও বাঙালী সংস্কৃতির পাকিস্তানী পাঠ ভুলতে পারেন নি। সালোয়ার কামিজ, বোরখা যেভাবে ইসলামী সংস্কৃতির প্রকাশ্য নিদর্শণ হয়ে উঠেছে, বাঙালীর প্রচলিত শাড়ী সে তুলনায় যথেষ্ঠ ইসলামসম্মত পোশাক হয়ে উঠতে পারে নি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুঘেঁষা সংস্কৃতির দায় চুকাতে হয়েছে পূর্ব বাংলার ধর্মভীরু মানুষদের।
ইসলামসম্মত পাকিস্তান নির্মাণের কোনো প্রয়াসের অংশ হিসেবে নয় বরং ধর্মের নামে অর্থনৈতিক শোষণ মেনে নিতে অসম্মত রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু মানুষকে পদানত করে, তাদের জন্মভুমিকে অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত করার জন্যে পরিকল্পিত হত্যাকান্ডকে বৈধ্যতা দিতে কোনো একটা আদর্শিক ছলের প্রয়োজন ছিলো, ইসলামীকরণ তেমনই একটি আদর্শিক ছল। স্বাধীনতার ৪ দশক পর আমরা জাতিগতভাবেই এই আদর্শিক ছলকেই আদর্শ মেনে নিয়েছি। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে। স্বকীয় সংস্কৃতি উপেক্ষা করে বুলিতে, বেশে আরও বেশী উদ্ভট হয়ে উঠছি আমরা।
নুরুল কাদির ১৯৭১ এ অভিযোগ করেছিলেন প্রবাসী সরকারের মেডিকেল কোরে হিন্দু ডাক্তার বেশী। বিদ্যমান হিন্দু মুসলিম নাগরিক অনুপাতের প্রতিফলন সেখানে নেই। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী তালিকায়, শরনার্থী শিবিরের জনগণদের মনোবল দৃঢ় রাখতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় ছিলো, তাদের শিল্পী তালিকায় মুসলমান গায়ক-গায়িকার সংখ্যাও এই দেশের হিন্দু মুসলিম নাগরিক অনুপাতের যথার্থ প্রতিফলন ছিলো না। মহারাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রনে বোম্বে এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় যে ১৩ জন শিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মী সফর করেছিলেন, সেখানে হিন্দু শিল্পীর সংখ্যা ছিলো ৯ জন।
আক্রান্ত নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবচ্ছেদ করার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও শরনার্থী শিবিরে, মুজিবনগর সরকার সংশ্লিষ্ট মানুষদের ভেতরে এমন ধর্মভিত্তিক বিভাজনের মানসিকতা ছিলো। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলো হিন্দুদের সাথে অর্থনৈতিক লড়াইয়ে টিকে থাকার একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী, যেখানে মুসলমান শিক্ষিত যুবকেরা মধ্যবিত্ত হয়ে উঠতে পারবে, পাকিস্তানী শোষণের ২৩ বছরেও এই প্রতিযোগী মানসিকতার বদল হয় নি। শরনার্থী শিবিরে, প্রবাসী সরকারের কর্মকান্ডে ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাতে চাকুরি বন্টনের অসভ্য দাবী এটার করুণ প্রমাণমাত্র।
যুদ্ধ নিতান্ত সাধারণ মানুষের ভেতরে পশুপ্রবৃতি জাগিয়ে তোলে। আক্রান্ত মানুষেরা নিজেদের ভেতরে সহিংসতায় লিপ্ত হয়। সহানুভুতি প্রাপ্তির পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় আক্রান্ত মানুষের ভেতরে ঘৃণাবোধ জন্মায়। ঘৃণার ধর্মীয় ভিত্তি খোঁজা, ঘৃণার ভেতরে চামড়ার রঙ খোঁজা, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি খোঁজার প্রয়াসগুলো হয়তো প্রাসঙ্গিক, তবে বাস্তবতা হলো মানুষের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়গুলোর পারস্পরিক সংঘাতে প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যুদ্ধ চলছে বিশ্বে, মানুষকে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া কিংবা স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবনতা প্রচলিত না হলে বিশ্বজুড়ে শরনার্থী শিবির খুলেও যুদ্ধের মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।





মন্তব্য করুন