নিজস্ব ভাবনা
আমার সীমিত ধারণায় আমি যা বুঝেছি "ডিএনএ" প্রতিটি প্রাণীর বাহ্যিক-আভ্যন্তরীণ সকল রূপভেদকে নিয়ন্ত্রন করে। এক কোষী প্রাণীর বিকাশ-বিপাক- আভ্যন্তরীণ কাঠামো, তার কোষীয় আবরণবহির্ভুত যে জগত, সে জগত থেকে কতটুকু উদ্দীপনা কি পরিমাণে সে গ্রহন করবে, সেই উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়ায় সে তার কোষের অভ্যন্তরে কি ধরণের পরিবর্তন আনবে, সবকিছু এই ডিএনএ র প্রোটিন সংগঠন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। ডিএনএর বিভিন্ন প্যাঁচে সংযুক্ত প্রতিটি প্রোটিন অন্যান্য প্রোটিন এবং জৈব-অজৈব রাসায়নিক কণিকার উপস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হয়। এক কোষী জীব "বাইনারী ফিশন" প্রক্রিয়ায় নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, এবং এক কোষী প্রাণীর বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়া গবেষণাগারে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে মানুষ। কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিকের উপস্থিতিতে এই ধরণের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়, কোনো কোনো রাসায়নিক উদ্দীপনায় কোষবিভাজন প্রক্রিয়াকে ত্বরাণ্বিত করা যায়। যদি ধারণা করা হয় ।"বাইনারী ফিশন" প্রক্রিয়ায় অবিকল প্রতিরূপ তৈরী হয়, তবে আমার অনুমান "বাইনারী ফিশন" প্রক্রিয়াতে অবিকল প্রতিরূপ তৈরী হয় না। অবিকল প্রতিরূপ তৈরীর প্রক্রিয়াটা বিবর্তন ধারণাকে সমর্থন করে না।
কোষবিভাজন মুহূর্তে যখন দ্বিভাজিত ডিএনএ দুটো পৃথক কোষকণিকার প্রবেশ করছে, সে মুহূর্তের পরিপার্শ্বিক অবস্থা ডিএনএর প্রোটিন কাঠামোর ভেতরে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে, এই সামান্য পরিবর্তন পরবর্তী পরিবর্তনের ধাপগুলোকে নিয়ন্ত্রন করবে এবং ধারাবাহিক পরিবর্তন শেষে একটি নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটবে প্রাণীজগতে। আমরা মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে এক জীবনে ব্যাক্টেরিয়াকে কোনোভাবেই হাইড্রায় রূপান্তরিত হতে দেখবো না। গত অর্ধশতাব্দীর প্রতি দশকেই ভিন্ন বৈশিষ্ঠ্যের ব্যাক্টেরিয়ার উদ্ভব দেখেছি আমরা। আমাদের প্রচলিত এন্টিব্যাক্টেরিয়াল ড্রাগ এই ধরণের ব্যক্টেরিয়াগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে। মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যক্টেরিয়া একটা বাস্তবতা এবং আমরা মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাক্টেরিয়ার অস্তিত্বর প্রমাণ পেলেও কি প্রক্রিয়ায় এরা ড্রাগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলছে নিজের ভেতরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আমাদের জানা নেই। আমরা প্রতিনিয়ত এই ধরণের বিবর্তন দেখছি এবং যারা প্রাণ সংহারী সংক্রামণের বিরুদ্ধে মানবপ্রজাতী এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে প্রয়োজনীয় প্রাণীগুলোকে প্রতিনিয়ত সুরক্ষা দিতে উদগ্রীব তারা ধরেই নিয়েছেন ব্যাক্টেরিয়াকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
বিবর্তনের উদ্দীপনা পরিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে আসে কিংবা এটা নিতান্তই প্রকৃতির উদ্ভট খেয়াল প্রশ্নটা এখনও অমীমাংসিত। শুধুমাত্র বাইনারী ফিশন প্রক্রিয়ায় অবিকল প্রতিরুপ নির্মিত হয় ধরে নিলে প্রকৃতির উদ্ভট খেয়াল ধারণাটা বাতিল করা যায় সেক্ষেত্রে অবশ্য বাক্যটাকে কিঞ্চিৎ সংশোধন করে বলতে হবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি ব্যাক্টেরিয়া ১০ ঘন্টার কয়েক লক্ষবার বিভাজিত হওয়ার পর আমরা যে শতকোটি ব্যাক্টেরিয়া পাচ্ছি তাদের প্রতিটি প্রথম ব্যক্টেরিয়ার অবিকল প্রতিরূপ। এবং আমার ধারণা এই শতকোটি ব্যাক্টেরিয়ায় অন্তত হাজারখানেক ব্যাক্টেরিয়া অবিকল প্রতিরূপ হবে না। এই হাজারখানেক ব্যক্টেরিয়া কিঞ্চিৎ বিবর্তিত হয়েছে এবং এরাই পরিবর্তনের সূচনা করে। সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় না। বিবর্তন অণুগুলোর পারস্পরিক রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া।
আমার ব্যক্তিগত অবস্থান বিবর্তন কোষআভ্যন্তরীণ রাসায়নিক অণুগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া, কয়েকলক্ষ অণু কিভাবে একে অন্যকে প্রভাবিত করছে, কিভাবে প্রাণরাসায়নিক বিক্রিয়ার পথ ও প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রন করছে এক্ষেত্রে খুব নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব হবে না।
অযৌনজনন কিংবা কোষবিভাজন প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার তুলনায় যৌনজনন প্রক্রিয়ায় বংশ বৃদ্ধিতে বৈচিত্রের সম্ভাবনা বেশী। যৌনজনন প্রক্রিয়ায় দুটো ভিন্ন শরীরের একটিতে কোষবিভাজিত হয়ে ডিম্বানু অন্যটিতে শুক্রাণু তৈরী হচ্ছে। গাণিতিকভাবে প্রতিটি ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু অন্তত বৈশিষ্ঠ্যে পৃথক হতে পারে। এ ধরণের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ঠ্যের দুটো অর্ধাংশ সংযুক্ত হয়ে যখন নতুন জীবনের সূচনা করছে, সেখানে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বেশী। ডিম্বানু, শুক্রাণুর কোনটি কখন কি বৈশিষ্ঠ্য ধারণ করবে, অন্তত মানুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর ধরণ বয়েসের সাথে পরিবর্তিত হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের বেশী বয়েসে সন্তান গ্রহনের সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মের গুরুতর শাররীক ত্রুটির কারণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে কি পরবর্তীতে মানুষের ক্ষেত্রে আইন করে সন্তান ধারণের বয়সসীমা নির্ধারিত হবে? এই ধরণের কোনো আইন যদি তৈরী হয়েও যায়- সেটার পক্ষে এবং বিপক্ষে জনমত কিভাবে নির্মিত হবে?
বিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রজাতি পরিবর্তনের স্বাভাবিক শর্ত হলো ভিন্ন ভিন্ন বিবর্তনীয় বিবেচনায় ঘনিষ্ট( পূর্বে কোনো এক সময় একই প্রাণী থেকে উদ্ভুত দুটো ভিন্ন জাতের প্রাণী) প্রাণীদের ভেতরে আন্তঃপ্রজননে সক্ষম পুরুষ প্রজাতির উদ্ভব হবে না। নারী প্রাণী হবে উর্বরা, অর্থ্যাৎ তারা সন্তান ধারণে সক্ষম হবে এবং আরও কয়েক প্রজন্ম আন্তঃসংকর প্রাণীর জন্ম হতে পারে। চিড়িয়াখানায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাঘ এবং সিংহী, সিংহ এবং বাঘিনীর ভেতরে অন্তঃপ্রজনন প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া পুরুষ প্রাণী বন্ধ্যা কিন্তু একই প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া নারী প্রাণীগুলো পুনরায় বাঘ কিংবা সিংহের শুক্রাণুতে গর্ভধারণ এবং দ্বিতীয়- তৃতীয় প্রজন্ম সংকর প্রাণীর জন্ম দিতে পারে। লাইগার, টাইলন, টাইটাইল, লাইটাইগার এই ধরনের সংকর প্রাণীগুলো চিড়িয়াখানায় বেড়ে উঠছে। শুধুমাত্র শখের বশে এই ধরণের ক্রস ব্রীডিং কি কোনো এক সময় প্রাণী অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর চাপে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে? এই ধরণের নিষেধাজ্ঞার পেছনে কি কি যৌক্তিক কারণ থাকবে?
বিবর্তনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু অসস্তি আছে। যেহেতু আমার জানাশোনা সীমিত তাই অসস্তিগুলো দুর করার সঠিক পথ আমার জানা নেই। আমরা বিবর্তনের ক্ষেত্রে যে অবস্থান গ্রহন করেছি সে বিষয়ে সামষ্টিক সম্মতি আছে, সংখ্যাগুরু গবেষক কতিপয় বিষয়কে সঠিক ধরে নিয়ে তাদের ধারণা বিকশিত করছেন।
গত এক শতাব্দীতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় উদ্যোগে আমরা প্রকৃতিকে বদলে ফেলেছি। আমাদের এই ধরণের উদ্যোগগুলো অনেকগুলো প্রাণীর বিলুপ্তির প্রধানতম কারণ। আমাদের এই ধরণের হস্তক্ষেপ প্রাণী ও উদ্ভিদজগতকে বিবর্তিত হতে বাধ্য করছে। আমরা বিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছি।
পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশে যে ধরনের প্রাণ বিকশিত হচ্ছে, আমাদের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার উদ্যোগ, আমাদের রাসায়নিক সার এবং বিভিন্ন কীটনাশকের ব্যবহার আমাদের পুষ্ঠির উপাদানগুলোকেও প্রভাবিত করছে। আমরা পুষ্টি হিসেবে যা গ্রহন করছি, সে রাসায়নিক সংগঠন আমাদের নিজস্ব বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে, শরীরের অস্বাভাবিক স্থানিক পরিবর্তন ( টিউমার কিংবা ক্যান্সার) হয়তো এই ধরণের পুষ্টি গ্রহনের প্রতিক্রিয়া।
যদি আমরা ধরে নেই টিউমার কিংবা ক্যান্সারের সাথে আমাদের পুষ্টি উপাদানগুলো জড়িত, আমরা যেভাবে প্রকৃতির উপর দখলদারিত্ব কায়েম করেছি সেটার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আরও বেশী অতিবেগুনী রশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে, স্কীন ক্যান্সারের হার বাড়াচ্ছে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাই এক দিক থেকে দেখলে প্রকৃতির প্রতিশোধ, অন্য দিক থেকে ভাবলে খুব স্বাভাবিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। প্রকৃতি সব সময়ই অসংখ্য বিকল্প সামনে নিয়ে আসে। পরিবর্তিত পরিবেশে যে বিকল্প সবচেয়ে সহজে মিশে যেতে পারে, টিকে থাকতে পারে, সেটাই টিকে থাকবে- সার্ভাইভ্যাল ফর দ্যা ফিটেস্ট তত্ত্বের মোদ্দা কথা এটাই।
আমরা যেটাকে ক্ষতিকর রোগব্যাধী চিহ্নিত করছি- ক্ষতিকর জেনেটিক মিউটেশন অভিহিত করছি তা হয়তো খুব স্বাভাবিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া। আমরা নিজেদের উদ্যোগে প্রকৃতি এবং এর জীবসংগঠনকে বিবর্তিত হতে বাধ্য করছি এবং আমরা আমাদের নিজস্ব কাঠামোগত, আভ্যন্তরীন বিবর্তনকে প্রাণঘাতী ধরে নিয়ে সে বিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।শাররীক কাঠামোর জন্যে চিঙড়ি মাছ, তেলাপোকা, ব্যাক্টেরিয়া অন্তত যে মাত্রায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে মাত্রার চেয়ে বেশী মাত্রার অতিবেগুনী রশ্মির অভিঘাত সহ্য করতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি কোনো বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় মানুষের চামড়ার বদলে অতিবেগুনী রশ্মি প্রতিরোধক বহিরাবরণ তৈরী হয়, সেটা আমরা মানুষের জন্যে ভালো বিবেচনা করবো না কি এটার বিরোধিতা করবো-
আমরা এই ধরণের প্রক্রিয়াকে ক্যান্সার ধরে নিয়ে এটার চিকিৎসা করবো না কি সে বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াটাকে সমর্থন করবো?





মন্তব্য করুন