কখন
প্রতিটি জাতীয়তাবাদী ধারণাই সংখ্যালঘুর প্রতি নির্মম হয়ে উঠতে পারে। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতিচর্চার আরোপিত রাজনৈতিক কাঠামোতে বঞ্চনার ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং ন্যায্য অধিকার আদায় করে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অবধারিতভাবেই একই ভৌগলিক পরিসরে বসবাসরত ভিন্ন ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতিজীবী গোষ্ঠী অপর হয়ে যায় এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের স্বর হারিয়ে ফেলে।
নেহেরু-গান্ধী-জিন্নাহ-প্যাটেলের রাষ্ট্রকাঠামোগত মতাদর্শিক বিরোধ ফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বশাসনের মাত্রা নির্ধারণজনিত বিরোধ। কেন্দ্রের হাতে কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া যুক্তি সংগত সে বিষয়ে তারা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেন নি। জিন্নাহ ধারণা করেছিলেন কেন্দ্রের হাতে বৈদেশিক নীতি, রাজস্ব এবং অর্থনীতি নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা থাকলে মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলোতে মুসলমানদের অধিকার লঙ্ঘিত হবে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর প্রতিনিধিরা কেন্দ্রে সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা অন্তত ভোট-ভেটোর ক্ষমতা দিয়ে নিজেদের অধিকার অর্জন করতে পারবে না। কয়েকজন রাজনীতিবিদের প্রদেশ-কেন্দ্রের ক্ষমতাভারসাম্যজনিত বিরোধ কয়েক কোটি মানুষের দুর্ভাগ্যের কারণ হয়েছে।
জিন্নাহ যে মতাদর্শিক কারণ দেখিয়ে ভারত সংঘ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামো শক্তিশালী কেন্দ্রের ধারণা থেকে বের হতে পারে নি। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীরা সব সময়ই প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবী তুলেছেন। প্রতিটি প্রদেশকে সমানমাত্রায় স্বশাসন দেওয়া, তাদের প্রাদেশিক ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। ক্রমাগত বঞ্চিত হতে হতে তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে স্বশাসনের অধিকার অর্জন করেছেন।
পাকিস্তানের ধারণায় বিশ্বাস করে বিহারের ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি স্বজনের লাশ আত্মঅবমাননা এবং সহায়সম্পদ ফেলে পূর্ব বাংলায় যেসব অবাঙ্গালী এসেছিলেন পাকিস্তান এইসব বাস্ত্যুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা দিয়েছে। তারা নিজেদের পরিশ্রমে নিজেদের ভাগ্যনির্মাণ করেছেন। সর্বহারার উদ্যম এবং কষ্টসহিষ্ণুতা তাদের ছিলো, তারা পূর্ব বাংলায় সংখ্যালঘু হলেও ক্রমশঃ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন। কলকারখানার শ্রমিক হিসেবে, মেকানিক হিসেবে তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা প্রমাণ করে তারা পূর্ব বাংলায় নিজেদের অবস্থান সংহত করেছেন তবে পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাদের খুব বেশী অংশগ্রহন ছিলো না। যে আরোপিত কাঠামোতে বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নির্মিত হয়েছে সেখানে তাদের অংশগ্রহনের সীমিত সুযোগ ছিলো।
ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরে এবং মীরপুরে অবাঙালীদের সরকারী খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিলো। শিল্পঘন অঞ্চলগুলোতে শিল্পশ্রমিক হিসেবে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা হিসেবে অবাঙালীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকলেও রেলওয়ে কলোনীগুলোতে অবাঙালী পরিবারের সংখ্যা ছিলো বেশী। স্বাধীনতাযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালী অবাঙালী জনগোষ্ঠীর পরিমাণ, অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবাঙালী- বাঙালীর অংশগ্রহন এবং তাদের উপার্জন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে, ১৯৭০ সালে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রতিবেদন যেহেতু আমার কাছে নেই তাই একেবারে সঠিক তথ্য দেওয়া সম্ভব হলো না। উৎসাহী গবেষকেরা আগারগাঁও কিংবা বাংলা একাডেমী কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে এইসব অর্থনৈতিক সমীক্ষার সংকলন খুঁজে পাবেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেসব দলের কর্মীদের সচেতন অংশগ্রহনে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে অসহযোগ আন্দোলনচলাকা্লীন সময়ে অবাঙালী মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা তাদের বসতভিটায় আগ্রাসনের ঘটনা ঘটে নি। মোহাম্মদপুর, পল্লবী, রংপুর, খুলনায় অবাঙালী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সাথে সংগ্রাম কমিটির নেতাদের নিয়মিত বৈঠক হয়েছে। উভয় পক্ষই পরস্পরকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।





মন্তব্য করুন