দেখা
এমনিতেই পৌঁছেছিল দেরীতে। ইমিগ্রেশানের কাজ করতে করতে অনেক দেরী হয়ে গেল। সোমা বিমানে ঢুকলো একেবারে সবার শেষে। হাত ব্যাগ তার দুটো, দুটোই সম্ভবতো তার নিজের ওজনের চেয়ে বেশী ভারি। ব্যগ দুটো টানতে এই প্রথম কাউকে সাথে পাওয়া গেল না; পেল্লায় সাইজের ব্যগ টানতে মাথা ওল্টাউল্টি করছে।
কোলকাতা-চট্টগামের লোকাল বাস তুল্য বিমানে চড়তে অভ্যস্ত সোমা থাই বিমানের পেটের মধ্যটা দেখে অবাক হতে হতে নিজের সিট খুঁজে পেল। জানালার কাছে আসন, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতন।শুধু ওপরে উঠবার সময় কানে আঙুল গুঁজে চোখ বন্ধ করে থাকবে সোমা, তারপর- নীল আকাশ, সাদা মেঘ, নিচে দেখতে পাওয়া ধরিত্রীকে মনে হবে ষষ্ঠ শ্রেণির চয়নিকা বই এর পাতার ছবি!
-হাই! সোমা! ঠিক পেছলের সীট থেকে! অবাক হবার আগেই ওপার থেকে সামনে চলে এলো একটা হাত। হাতের একটু পরে মানুষটা দৃশ্যমান হলো।
-আমাকে মনে আছে তো?, বলেছিলাম, আবার দেখা হবে!
একধরণের বিচিত্র আন্দোলন অনুভব করলো সোমা মনে মধ্যে। এই কন্ঠস্বর ভোলার মত নয়। কিছু কিছু মানুষের কন্ঠস্বর সারাজীবন মনে থাকে। এই কন্ঠ সেইরকম। সে খুব ধীরে ধীরে বলল- তাই, বলেছিলেন নাকি?
-আপনার পাশে বসতে চাই। নেবার কে একটু অনুরোধ করতে পারেন, পেছনে, আমার সীটে এসে বসতে? ভালো ম্যাগাজিন আছে, তার সময়ও ভালো কাটবে।
-হুম, বসার প্রয়োজন তো আপনার, আপনিই বলুন না!
সে খুব চৌকষ ভাবে ব্যপারটা ম্যানেজ করে কিছুক্ষণের মধ্যে এসে সোমার পাশে বসল আন্দোলিত ভঙ্গীতে।
-নিউ এম্পায়ারে 'স্টেপ মম' দেখতে গিয়েছিলাম, আপনাকে দেখিনি একবারও।
-আশ্চর্য, আমার কাজ কি সিনেমা হলে ঘুরে বেড়ানো? পার্ক স্ট্রিটে যাইনে অনেকদিন, তাছাড়া 'স্টেপ মম' আমি বাসায়, কম্পিউটারে দেখে নিয়েছি।
-আমি অবশ্য এর মধ্যে আপনাকে একবার স্বপ্নে দেখে ফেলেছি...
স্বপ্নে দেখা বিষয়টা ব্যক্তিগত, সোমা স্বপ্নের ব্যপারটা জানতে সাহস পেলনা। বলল-
- আসলে থার্ড পেপারের থিসিস নিয়ে একটু বিব্রত ছিলাম। বেরোইনি একেবারে।
-কি জানি কেন, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হতো, দেখা হোক; আপনার মত একজন বন্ধু হোক আমার।
শুভ্রর সাথে সেদিন শপিং করতে এসে সিনেমা দেখার প্ল্যান হয়েছিল। শুভ্রর কমন স্বভাবের মধ্যে একটি হলো, কেনাকাটা করে সে সেই সদ্য ক্রয়কৃত জিনিস দোকানে ফেলে আসবে। সে বরাবরের মত তার ফেলে আসা দ্রব্য খুঁজে আনতে গেছে শ্রীরাম আর্কেডে। সোমা টিকেট কেটে লবিতে বসে একটা সিগ্রেট ধরিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে অবাক হয়ে আবিস্কার করল, শুধুমাত্র চেয়ে থাকা নয়, ফুটপাথের ব্যাগের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন তার দিকে হাত নাড়ছে। তাকেই যে নাড়ছে তাতে কোন ভুল নেই। এই মুখটি চেনা, নন্দনে, বাংলা একাডেমীতে অনেকবার দেখেছে তাকে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে সে তার ধুম্রপানে মনোযোগ দিল। মিনিটখানেকের মধ্যে হাত নাড়ানো ব্যক্তিটি তার সামনে এসে উপস্থিত।
-আপনি একা, সোমা? আপনার বন্ধুটি গেলো কোথায়?
নিজের নাম এর মুখে শুনে অবাক হলো না সোমা। নিশ্চই একটু আগে এই লোক তাদের শ্রীরাম আর্কেডে দেখে থাকবে। আর যেহেতু শুভ্র আস্তে কথা বলতে পারে না, সোমার নামটি তাই শোনা বিচিত্র নয়। শুভ্রর সব ডাকাডাকিই হচ্ছে চীৎকার!
পাশে বসতে বসতে সে বলল,' হাত নেড়েছি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে, আমি জানি সেটা খুব শোভন নয়!'
সোমা হাসল," ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি।'
-আমি অবশ্য ভয় পেয়েছিলাম, কথা বলার জন্যে যে আগ্রহবোধ হচ্ছিল তা দমানো গেলো না। দেখে মনে হয় আপনি সবসময় রেঁগে আছেন! আপনাকে বহুবার নন্দনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে দেখেছি আমি।
-আমি তো গান গাই না। শুনতে আসি। ভুল দেখেছেন। যা হোক সিগ্রেট খাবেন? আমার কাছে গোল্ডফ্লেক কিং রয়েছে।
সে হাত বাড়িয়ে সিগ্রেট নিয়ে ধরালো।
-আপনি চাইলে সিনেমাটা আমি আপনাদের সাথে একত্রে দেখতে পারি।
-মনে হয় না সিনেমা শুরুর আগে আমার বন্ধুটি আসতে পারবে। আপনার সময় নষ্ট করতে চাই না।
-আমি এসে ঝামেলা বাঁধিয়ে দিলাম না তো?
-না, আপনি আসায় আমায় বরং একা একা ওয়েট করতে হচ্ছে না।
-আমারও তাই, একা একা ওয়েট করতে হচ্ছে না, বরং একজন ভালো দেখতে তরুনীর পাশে বসে ধোঁয়া টানার বিরল সৌভাগ্য ঘটল। আপনার অসীম দয়া!
সিনেমা শুরুর আগে সোমা বলল,' শুরু হয়ে যাবে সিনেমা, আপনি বরং চলেই যান। আমার বন্ধুটি কোন অবস্থায় রয়েছে আমি সেই সন্ধানে যাই। আমি আসছি, কেমন? আবার দেখা হবে।
-মনে হয় সেরকম সম্ভাবনা নেই!
সে চলে গেল। লবিতে ভিড় ক্রমশঃ পাতলা হচ্ছে। সবাই ভেতরে চলে যাচ্ছে। এই সময় রাস্তার ওপার থেকে শুভ্রর ডাক,'সোমা, সোমারে!"
রাস্তার পাশে এগিয়ে আসতেই ধীরগতিতে একটি লাল গাড়ি পাশে এসে থেমে গেল,' আবার দেখা হবে সোমা!'
বিমান নড়ে উঠেছে, সোমা দুই কানে আঙুল গুঁজল। উড্ডয়নের সময় তার কানে সমস্যা হয়।
-ব্যাঙ্কক পর্যন্ত যাবেন?
সোমা মাথা নাড়ল,' আমি ট্রাঞ্জিট প্যাসেঞ্জার।'
-আমার একটা চাকরী হয়ে গেল থাইল্যান্ডে, হেলথ অর্গানাইজেশানের চাকরী।
সোমার জানতে ইচ্ছে করছে সে ডাক্তার নাকি ফার্মাসিস্ট, নাকি এম,বি,এ। সাধারণ কৌতূহল। কিন্তু বেশী প্রশ্ন করতে তার ভাল লাগে না। যে কোনো মানুষকে নিজে থেকে বলবার সুযোগ দিলে দেখা যায় সে খুব ভালো বলে।
-কোলকাতায় কবে ফিরবেন? আমি কোলকাতা ছেড়ে বেশীদিন কোথাও থাকতে পারি না। এখানেই তো বড়। জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে শহরটি। ঠিক নিজের শরীরের অংশের মত।
সোমা জবাব দিতে পারে না।আসলে কোলকাতা ফেরবার সোমার আর তেমন কোনো সম্ভাবনাই নেই। সেই ভেবে বেশ কিছুদিন ধরে তার হৃদয়ে জ্বর। কাছের মানুষগুলো ফেলে চলে যেতে হচ্ছে, তার থেকেও বেশী সে এই শহরকে মিস করবে। এর পথে-ঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার অসাধারণ কিছু সময়, কিছু অনবদ্য স্মৃতি!
-আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি এখানকার নন। কতদিন আছেন কোলকাতায়?
-পাঁচ বছর। ভাবতেই কষ্ট হয় নন্দনে যেতে পারব না, বাংলা একাডেমীতে না, কলেজ স্ট্রীট আসতে পারবনা যখন তখন। দক্ষিণাপণে বৌদির আলুর-দম মিস করবো! আর ক্যাম্পাসের আড্ডা! আমাদের ক্যাম্পাসের বকুলগাছগুলো......
বিমানের ক্রু ঘোষণা দিচ্ছে বিমান মাটির কতটা ওপর দিয়ে যাচ্ছে, ব্যাঙ্কক পৌঁছাতে পনের মিনিট বাকী। সোমা বলল,'আমাদের যাত্রা হলো শেষ!'
-যাত্রা আমরা শুরুও তো করতে পারি, পারি না?
যাত্রা শুরু, করা যায় আবার করা যায় না। স্বপ্ন তৈরী করতে কখনো কখনো খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। একটা বয়সে সেই বাস্তবতার খেয়াল থাকে না। সোমার সেই বয়স নয়। এই বয়সে ভাললাগাটুকুকে পুঁজি করে রাখাতেই সায় দেয় মন। এই যে একজন তাকে বলছে যাত্রা শুরু করার কথা- সুন্দর, না?
-আমি খুব শীগগীরই একবার কোলকাতায় আসবো। আপনি থাকবেন না?
-আমি ঠিক জানিনা। কবে আসবো, আদৌ আসা হবে কি-না।
সে একটু নড়েচড়ে বসল এবার,' আপনাকে খুঁজেছি, জানেন? ভেবেছিলাম আবার দেখা হবে। ঠিকানা না থাকলে যে দেখা হয় সেরকম হঠাৎ দেখা নয়। সময় নিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকানায় দেখা!'
-অল্পচেনা কারো জন্যে এরকম হওয়া বোধকরি ঠিক হবে না আপনার।
-অল্পচেনা মানুষই তো একদিন খুব চেনা হয়, তাই না সোমা?
-সবক্ষেত্রে কি তা হয়?
বিমান থেমে গেছে। সোমা ব্যাগ নামাতে উঠল। সে নিজের হাত ব্যাগ সোমাকে ধরিয়ে দিয়ে সোমার দুই ব্যাগ তুলে নিল কাঁধে। খুব অল্প সময়ে বিনাবাক্যে সেই পথটিও শেষ হয়ে গেল। যেখানে এসে ট্রাঞ্জিট প্যাসেঞ্জারদের পথ শুরু সেখানে থেমে বলল,' যাই, আবার দেখা হবে!'
আর বেশীক্ষণ দেখা গেলো না তাকে। তার পথ ভিন্ন। অদৃশ্য হয়ে যাবার পর প্রথম সোমার বুকের মধ্যে ব্যথার মত করে মনে পড়ল,' তার নামটা জানা হয়নি!' কি করে সম্ভব হলো! একবারও নাম জানতে চাওয়া বা বলার কথা কারো মনে এলো না! এত কথা বলার ছিল যে নামের মত মূল্যহীন বিষয় মনে আসেনি! সত্যি!
'ভালোই হয়েছে!' সোমা ভাবলো,' এবার ভেবেচিন্তে তার একটা সুন্দর নাম দিয়ে নেবে!'





কিছু বানান ভুল রয়ে গেল। সম্পাদনা করার অপশান খুঁজে পেলাম না।
পোস্টের উপর এডিট বাটন
সম্পর্ক অমীমাংসিত থাকাই ভাল
সম্পর্কের কি আসলে কোনো মীমাংসা হয় কোনোদিন! সব সম্পর্কের মধ্যেই কি একটা কুয়াশা থেকে যায় না?
দেখছি। ধন্যবাদ!
সুন্দর ঝরঝরে গল্প।
ধন্যবাদ, তায়েফ!
পড়ে মনে হলো লেখার পুরনো লেখিয়ে।
ব্যচেলর লাইফে প্রেম ভালবাসার নাম শুনে বুকের মধ্যে একটু কাঁপন যে লাগতো না তা নয়। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় সেই প্রেম ভালবাসা সোনার হরিণের মতো অদেখা অজানা এক কল্পনাই রয়ে গেল। সংসারী জীবনের হিসেব মেলাতে হয়তো বাকী সময়টাও একদিন শেষ হয়ে যাবে। মনের মধ্যে এখন স্ত্রী'র জন্যই প্রেম ভালবাসা তৈরির কৌশলগুলো বোঝার চেষ্টায় আছি।
হুম! প্রেম ভালোবাসা কি তৈরি করা যায়? কি-জানি! পড়ার জন্যে ধন্যবাদ!
স্বাগতম মণিকা রশিদ। উপভোগ করলাম গল্প। আরও চাই
ধন্যবাদ!
ভাল লেগেছে।
ধন্যবাদ!
অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও শুধু তোমায় দেখে লগ ইন করলাম। স্বাগতম মনি। আশাকরি আমাদের ভ্রমন একসাথে ও আনন্দময় হবে।
লেখা পরে পড়বো
ধন্যবাদও পরে দেব তাইলে!( তোমায় কি ধন্যবাদ দিতেই হবে?)
সম্পর্ক অমীমাংসিত থাকাই ভাল
হ!
প্রথম বলেই ছক্কা মণিকা। গল্প দারুণ হয়েছে!
বাঁচলাম, রান-আউট হইনি!
ধন্যবাদ!
ওয়াও। খুবই সুপাঠ্য। এবং সুন্দর সমাপ্তি। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম শেষটানা গতঁবাধা হয়ে যায়। কিন্তু তা হয়নি। ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ!
ভালো লাগলো আপু।
তুমি পড়েছো জেনে আমারও ভাল্লাগছে, সোহাগ!
স্বাগতম

আশা করছি মামুন ভাইয়ের সাথে পাল্লা দেয়া কিছু লেখা পাবো
হুম! পাল্লা দিতে গেলেই হেরে যাই! ভাইয়ার লেখা আমারও খুব পছন্দের!
আহা!!

এইরকম যদি শপিং মলে দাঁড়ায়ে কাউরে হাত নাড়ি, তাইলে পরদিন আমারে নির্ঘাত হাসপাতালে পাইবে!!!
লেখা উমদা।
ডিপেন্ডস্, কেম্নে নাড়াইতেছেন!
"হাই" জানানো টাইপস দিলেও মনে হয় রক্ষা হবে না!!
স্বাগতম!
ধন্যবাদ, আশরাফ!
....স্বাগতম মনিকা রশিদ....লেখাটা অনেক সাবলীল...ভালো লাগলো...
ধন্যবাদ, শাওন।
ধন্যবাদ, পড়ার জন্যে।
ভালোই হয়েছে!' সোমা ভাবলো,' এবার ভেবেচিন্তে তার একটা সুন্দর নাম দিয়ে
নেবে!'
ঠিক তাই!
মন্তব্য করুন