বুয়েটের বাপ
কদিন থেকে মনটা অনেক খারাপ। খারাপ হবার পিছনে কি কারন তাও খোঁজে বের করতে পারি না। আর খোঁজলে যতগুলো কারন পাওয়া যাবে তা লিষ্ট করতে হবে। সাভার ট্রাজেডি, হেফাজতী তাণ্ডব, বাংলাদেশের ক্রিকেটে হার ইত্যাদি। ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এমণ আহামরি কিছু না হলেও খেলায় বাংলাদেশ হেরে গেলে আমার সব কিছু কেমন জানি এলোমেলো হয়ে যায়। বিশেষ করে জিম্বাবুয়ের মত দলের কাছে হারলে। এ সবে আমার চাকরি, উপার্জন, কোনটারও ক্ষতির কারন না হলেও আমিত এর থেকে বাইরে না। হেফাজত শপলা চত্তরের যে হেফাজত করে গেছেন, তা ছাড়া রাস্তার পাশের বা ফুটপাতের দোকানে অগ্নি সংযোগ, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিন গেটে আগুন দিয়ে কোরআন শরীফ, হাদীস পোড়ানো ও অন্যান্য যে সমস্ত তান্ডব চালিয়েছেন, তা নিয়ে পত্র পত্রিকা, টিভি চেনেলে রথি ও মহারথিরা যত কথা বা মন্তব্য করেছেন, সেখানে আমি কিছু বলতে যাওয়া একান্তই মুর্খতা মনে করি। টিভি ক্যামেরার সামনে বক্তাদের গাল গর্ব বক্তব্যের সার মর্মটা যেন, কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমান সমান। যে যাই গাল গল্প ছাড়েন, সাজানো গোছানো শাপলা ফুলের মত শাপলা চত্তর যে ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছে, তা তো কেঊ অস্বীকার করতে পারবেন না।
শাপলা চত্তরের ডিভাইডার আইল্যান্ড সহ নানা স্থাপনা ভেংগে যে ক্ষতি করেছে তা হয়ত আমারা কদিনেই পর্বা বস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারব। কিন্তু যে গাছ গুলোর হেফাজত তারা করেছে তার পুনস্থাপন করতে কতদিন লাগবে আল্লাহ মাবুদই তা জানেন। আর আমার কষ্টটা এখানেই। বন্ধুরা আমার এ কথায় তোমরা হয়ত আমাকে পাগল বলবে। যেখানে এত এত টাকার সম্পদ, এত মানুষের জান গেল সেখানে গাছের জন্য কষ্ট পাওয়া মাছের মায়ের পুত্র সুখ বই অন্য কিছু কি?
প্রবাস থেকে এসে, দেশে কোন কর্মে যোগদান করার আগে উপজেলা সদরে যে পতিত জমি ছিল, এ জমিতে আমি বৃক্ষ রোপণ করার পরিকল্পনা করি। সে মোতাবেক আকাশমণি, লম্বু, মেহগনি, কদম, সহ অনেক প্রকার গাছ লাগাই। ফলের গাছ কম হলেও বেশীর ভাগ গাছ ছিল কাঠের অর্থাৎ বনজ। প্রতিটি গাছ আমি নিজের হাতে রোপণ করি। আমার লোকজন আধিয়ার (বর্গা চাষী) আমাকে সাহায্য করে। গাছ গুলো দিন দিন বড় হতে লাগল। গাছগুলো যতই বড় হছে তাদের প্রতি আমার আকর্ষন দিনকে দিন বাড়তে লাগল। আগে ঢাকা থেকে দিনাজপুর গেলে দিনের বেলায় শুয়ে বসে অথবা বন্ধুদের অফিসে আড্ডা মেরে কাটাতাম। আর এখন সারাদিন বাগানে সময় কাটাই। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য গাছের ডালপালা কেটে দিতে হয়। আমি বা আমার আধিয়ার গাছের ডাল কাটার জন্য দা দিয়ে কোপ দিলে মনে হয় যেন নিজের বা আমার ছেলের গায়ে আঘাত করছে। গাছগুলো অতি বর্ধনশীল হওয়াতে ইতিমধ্যে ৪০-৫০ ফুট লম্বা হয়ে গেছে।
বলা বাহুল্য এ বাগানে আমার ছোট্ট পরিবার নিয়ে থাকার মত এক খানা বাড়িও বানিয়েছি। তাই আমি এটাকে নাম দিয়েছি বাগান বাড়ী। গাছ গুলো লাগানোর সময় একটু ঘন করে লাগিয়ে ছিলাম যেন কোন গাছ মারা গেলে তাতে বাগানের কোন ক্ষতি না হয়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোন গাছ মরে নাই। তাই উপজেলা কৃষি অফিসার যখন পরামর্শ দিলেন কিছু গাছ কেটে ফেলতে হবে এবং ব্লক সুপারভাইজার সাব চক দ্বারা চিহ্নিত করে দিলেন কোন কোন গাছ কাটতে হবে, সে দিন রাতে আমি না খেয়ে শুয়ে ছিলাম। পর দিন আমি কিছু গাছ কমিয়ে নিখিলকে ( আধিয়ার) কাটার অনুমতি দিয়ে ঢাকা চলে আসি। যে গাছ আমি নিজ হাতে লাগিয়ে পরিচর্যা করে এত বড় করেছি, যে গাছ আমার সাথে কত কথা বলেছে, গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে কত সুখ পেয়েছি সে গাছ আমার চোখের সামনে কাটবে তা আমি সহ্য করতে পারব না। অথচ ছোট বেলায়, তাই বা কেন বলি, গাছ লাগানোর আগে এর প্রতি আমার কোন দরদ অনুভূত হয়েছে মনে করতে পারি না। তাই যখন ইচ্ছা তখন গাছ বা গাছের ডাল পালা কেটেছি। হেফাজতি বন্ধুরা আপনাদের একটি অনুরুধ করব। একটা গাছ লাগান, তারপর বুঝবেন তার দরদ কত!
আমারা রুয়েটের ৮৫ সিরিজের বন্ধু যারা ঢাকা বা তার আশা পাশের থানা বা পৌরসভায় আছি তারা প্রতি মাসে ঢাকার কোন না কোন হোটেলে গেট টূগেদার করি। আর কমন ই-মেইল, ফেসবুক ও ব্লগের কল্যাণে প্রতিদিনই সাড়া পৃথিবীতে যত বন্ধু আছে, সবার খবর রাখা হয়। বেশীর ভাগ সময় আমরা বন্ধু বান্ধবীরা অংশ গ্রহণ করি। তবে বাচ্চাদের পরীক্ষা বা অন্য সকল দিক অনুকুলে থাকলে পরিবারসহও পার্টির আয়োজন করা হয়। মে মাসের গেট টুগেদারের তারিখ ছিল আগামী ১৬ই মে বৃহস্পতিবার। এবার হোস্টের টার্ণ ছিল আমার। হঠাৎ করে ৮মে বুধবার মাহবুবের মেইল, কানাডা প্রবাসী বেনজীর ভাবি ঢাকা অবস্থান করছেন এবং ১৬ মে তারিখের পূর্বে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন। তাই এবারের গেট টুগেদার ১৬মে পরিবর্তে ১০মে শুক্রবার ফ্যামিলি গেট টুগেদার হবে এবং ভেনু হবে ধানমন্ডিতে সাম্মির বাসার ছাদে।
প্রবাসী কোন বন্ধু দেশে এলে আমরা এবং তারাও সব সময় দেখা করার জন্য ব্যকুল হয়ে থাকি। ফোনালাপ তো চলেই। তাই ১০মে সাম্মির বাসাতেই ভেনু ঠিক হল।
দীর্ঘ ৫ বছর একসাথে পড়েছি তারপর দীর্ঘ কর্ম জীবনে সাম্মির বাসায় কখনও যাওয়া হয়নি। অথচ খেলার মাঠ ও পাশাপাশি রুমে থাকার সুবাদে ওর সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনটা অনেক মজবুত ছিল বলা যায়। ওর কিছু মন্তব্যের জন্য ওকে নিয়ে দুটা কবিতাও লিখেছিলাম। তবে আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের জন্য ওর বাসায় যাওয়া হয়ে উঠেনি বলতে পারি।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটানোতে সময় মেনে চলা আমার মোটামুটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আমি ৭.৩০ মিনিটের কিছু আগেই ওর বাসার সামনে চলে আসি এবং বাসার নম্বর ও নাম দেখে চিনতে পারি। ছাত্রজীবন থেকে জানি সাম্মির বাবা ব্যাবসায়ী ও অনেক সম্পদের অধিকারী কিন্তু এত বেশী সম্পদের অধিকারি ধারনা ছিল না। আমার এ বন্ধুটি তার আচার ব্যবহার চাল চলনে কখন তা প্রকাশ করেনি। সাম্মিকে ফোন করি। ও বলল দোস্ত তুমি বাম পাশের লিফটে সোজা ছাদে চলে আস। ফোন কেটে দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি এক দাড়োয়ান এসে বলল চলেন স্যার আপনাকে রাস্তা দেখিয়ে দেই। দাড়োয়ান লিফট পর্যন্ত আসলে আমি ওকে চলে যেতে বলি। ছাদে গিয়ে দেখি আজমল ও মাহবুব ক্যারাম খেলায় ব্যস্ত। আজমলকে(নিপ্পন) ফোন না ধরার জন্য ঝাড়ি দিলাম। ও দোস্ত আমরা খেলায় মেতে ছিলাম তাই শুনতে পাই নি। এমন সময় সাম্মি এল মনে হয় জগিং করে এসেছে। ও সব সময় ব্যায়াম করে, কিন্তু আজ তা নয়, তার অনেক বন্ধুরা ফ্যামিলি ও ছেলেমেয়ে সহ আসবে তাদের আপ্যায়নের যেন কোন ত্রুটি না হয় সেই তদারকিতে ব্যাস্ত। আমাকে নিয়ে চলল বিশাল ছাদের মিনি পার্কটি দেখাতে। জালালাবাদের রংগিন টিন, খড় , হোগলা পাতা ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত ছোট ছোট ছাঊনি, তার নিচে বসার ব্যবস্থা, টেবিল টেনিস(কংক্রিটে নির্মিত) প্যারাপেডের চতুর্দিকে বক্সনির্মিত টবে বিভিন্ন জাতের সবজি, লাউ, শিমের জন্য জাংলা, মাঝে মাঝে অল্প গভীরে যাওয়া শিকরের গাছ, তদুপরি ২০০ লোকের আয়োজন করার মত অডিটরিয়াম যার মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার মত সাউন্ড সিস্টেম বিদ্যমান। আমরা ঘুরে এলাম আজমল ও মাহবুবের কাছে। ধুম্র শলাকায় অগ্নি সংযোগ চলল, আমি প্রথমে না করলেও ওদের দেখে নীল শিয়ালের মত হক্কা হুয়া করে উঠলাম।
সাম্মি কাজে চলে গেল, নিপ্পন হঠাৎ , বলে ঊঠল মাহবুব বাচ্চা কাঁদে নাকি? আমি ত থ। বাচ্চা কাদুক তো তোদের কি, নিপ্পন আমাকে বিষয়টা পরিষ্কার করল। ওদের বাসা কাছা কাছি হওয়াতে ওরা প্রায় প্রতিদিন সাম্মির এখানে এসে গ্যাজায় আর ভাবির হাতের মজার মজার খাবার খায়। আর বাচ্চা কেঁদে উঠলে কে আগে নিবে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। এখানে বলে রাখি বন্ধু সাম্মির ৭-৮মাসের বাচ্চাটি দ্বিতীয়। আমি খাবার লোভ সামলাতে পারলেও ওদের মত হাই প্রফাইলের ------ হওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ায় নিজের আফসোস নিজের মধ্যেই চেপে রাখলাম। নিপ্পন বলল, দোস্ত তুই মোহাম্মদপুর তোর বাসা বদল কর। মনে মনে বললাম তা যদি পারতাম।
এরই মাঝে মোক্তাদির, ডঃ রেনি দুজনেই আমাদের ক্লাস মেট, ওরা আবার জীবন সঙ্গিনীও, ছেলেমেয়ে নিয়ে হাজির। খানিক বাদে কলি ও তার স্বামী বিমান বাহিনীর অফিসার দুমেয়ে সহ ( আমি কারও পদবী উল্লেখ করতে চাই না) হাজির। প্রথম আসা পরিবার দুটির ছবি নিলাম আলাদা ও এক সংগে। এর মধ্যে আরও অনেকে এসে উপস্থিত হলেও, হারিছ এসেই আমাকে আক্রমণ করল। তুই গল্প লিখিস এমন যায়গায় ছাড়িস চলবে বলে যে আর চালাইস না। হয় তুই লেখা শেষ করবি নয়ত ছড়ি বলবি। আইয়ুব আলি বলল তোমার কবিতা গল্প আমি প্রিন্ট করে পড়ি আর তুমি এমন কর তা ঠিক না। দোস্তরা আমি আসলেই তোদের দুঃখ দেই। কি করব বল। রুটি রুজির তাগিদে সারাদিন অফিস করি। বাসায় এসে লিখতে ভাল লাগে তাই লিখি। তোমাদের ভাল লাগে তাই তোমাদেরকে দেই। তোমরা উৎসাহ দেও তাই আবার অনুপেরনা পেয়ে লিখি। কিন্তু তোমরাই বল আমার লেখার উপকরণ গুলো তো তোমরাই দেও,বুঝতে পারি না কোন টা আগে লিখি। এই যেমন সাপ্তাহিকের সাংগাতিক সাংবাদিক মুহিত কাকুর ভাতিজা, শুভ কিবরিয়া বুয়েটের বাপের কথা মনে করিয়ে দিল। আমি কি না লিখে পারি।( চলবে)
১২/০৫/১৩





চলুক...
চলুক...
চলুক
বাহ, চলুক
চলুক...
মন্তব্য করুন