বিজ্ঞান তোমাকে ছালাম(প্রথম পর্ব)
আগুন আগুন চিৎকার শুনে বাম দিকে তাকাতেই দেখি সহকর্মী রাজিব অ্যাকাউন্ট্স এর জি, এম, শ্রী শঙ্কর বাবুর রুমের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। এ সময় অফিসে আমাদের এ জোনে আর কেউ ছিল না। আমাদের এক প্রাক্তন সাইট ফোরম্যান আমাদের কোম্পানির সাথে এখন ছোট খাট ব্যবসা করেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়াতে এম ডি স্যার, ম্যাডামসহ সবাই তার সুচিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবে কিনা এ বিষয়ে ছোট কনফারেন্স রুমে আলোচনায় রত।অ্যাকাউন্ট্স এর জি, এম সাবও কোন এক মিটিংয়ে অফিসের বাইরে ছিলেন। আমি রাজিব সাহেবকে অনুসরন করে রুমে ঢুকেই দেখি স্প্লিট এসির ভিতরের ইউনিট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ও এক পাশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
কয়েকদিন থেকে মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মত ডাইরেক্টার শ্রী এন জি, সাহা বাবু আমার উপর এক দায়িত্ব চাপিয়েছেন, বেড়ামারা সাব ষ্টেশনের অগ্নিনির্বাপক কাজের প্রাক্কলন তৈরী করতঃ ঠিকাদার নিয়োগ করতে হবে। আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আর কাজটি হল সম্পূর্ণ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের। কিন্তু শ্রী এন জি, সাহা বাবু শুধু ডাইরেক্টারই নন পিতৃবৎ স্নেহ দিয়ে এমন ভাবে প্রায় সবাইকে জয় করেছেন যে কেউ উনার কোন কথা বা হুকুম না করতে পারেন না। এটাও হয়তবা উনার সহকর্মীদের দ্বারা কার্য উদ্ধারের কৌশল। যা হউক আমি বাহরাইনে কাজ করার সময় ভিতর এবং বাহিরের অগ্নিনির্বাপক কাজের কিছুটা অভিজ্জতা লাভ করি, যেমন মেকানিক্যাল সাবকন্ট্রাক্টর তাদের দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ফোরম্যান ও কর্মী দ্বারা কাজটি করিয়েছেন আমি মেইন কন্টাক্টর/ওনারের পক্ষে কাজটি বুঝে নিতে যা যা দেখা দরকার দেখে নিয়ে ইন্সপেকশন পেপারে সই করতাম। আমার সাথে আমাদের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার থাকতেন। তাই আমাকে এ ব্যাপারে অত ভাবতে হতো না। কিন্তু ওই টুকু জানা দিয়ে তো আর প্রাক্কলন করা সম্ভব নয়। তাই ১৭ পৃষ্টার বিশাল ড্রইং পড়ে যতটুকু উদ্ধার করলাম তার পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য আমাদের বিল্ডিংয়ের যে অগ্নিনির্বাপক সিস্টেম আছে তা দেখে নেয়া প্রয়োজন মনে হল। তাই কদিন আগে ১৮তলা বিল্ডিংয়ের সার্বক্ষনিক তদারককারী তাজুর কাছ থেকে এর পানির উৎস, পানির পাইপ লাইন কোন দিক দিয়ে কিভাবে গিয়েছে মোটামুটি জেনে নিলাম। বহনযোগ্য অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রগুলো কোথায় কোথায় আছে তাও জানলাম। সেদিন অফিসে ডুকে আমাদের ফ্লোরের অগ্নি নির্বাপক পানির পাইপ রাখার যে বক্স থাকে তাও খুলে দেখলাম ঠিক আছে কি না। প্রতিটি বক্সে একটি বহনযোগ্য অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থাকার কথা দেখলাম তাও আছে। এখানে একটু বলে রাখি বনানী কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে ১৮ তলা এ বিল্ডিংটি আমাদের কোম্পানির নিজস্ব। এখানে একটি বিদেশি কন্সুলেট অফিসসহ বহু নামি দামি কোম্পানির অফিস আছে।
বিল্ডিংয়ের দুটি ফ্লোর বাদে পুরা বিল্ডিঙটাই ভাড়া দেয়া। তাই অফিস টাইমে ৬০০-৭০০ জন লোক অফিস স্টাফ ও অতিথি সহ মোটামুটি হাজার খানেক লোক থাকে।
আগুন দেখে আমি ঠাণ্ডা মাথায় ছুটে গেলাম দুদিন আগে দেখা অগ্নি নির্বাপক পানির পাইপ রাখার বক্সের কাছে। যাবার সময় দেখলাম ডাইরেক্টার এস, এন সাহাসহ অনেকে চলে এসেছেন। আমাদের অনেক কজন ডাইরেক্টরের মাঝে দুজন সাহা ডাইরেক্টার। একজন এন,জি সাহা অন্যজন এস এন সাহা। কানে এল, কেউ একজন বলছেন পানি আন। আমি চলন্ত অবস্থায় চিৎকার করলাম খবরদার কেউ পানি দিবে না। বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি নিয়ে চোখের পলকে প্রেসার গেজ দেখে নিলাম প্রেসার ঠিক আছে কিনা। সেদিন এটা দেখা হয়নি। রুমে ফিরে দেখি আগুনের পরিমাণ বেড়ে গেছে কিন্তু ফলস্ সেলিং অতিক্রম করে নাই। সবাইকে রুম হতে বের হয়ে দরজা বন্ধ করতে বললাম। সবাই গেলেও শাহাবুদ্দিন নামের এক কলিগ বলল স্যার আপনাকে রেখে, আমি বললাম তুমি যাও। ও বের হয়ে দরজা বন্ধ করতেই আমি পিন খুলে আগুনের উৎসের গুড়ায় স্প্রে করলাম। ক্ষনিকেই আগুন নিভে গেল। আমি কিছু মুহুর্ত অপেক্ষা করে রুম হতে বের হলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিশ্চিত হবার জন্য আবার দরজা খুলে রুমে ঢুকে দেখলাম। আগুন নিভে গেছে ঠিকই কিন্তু সংকুচিত ড্রাই পাউডারের ক্রিয়ায় পুরো রুম অন্ধকার ও দাঁড়ানোর অযোগ্য। জানালা খুলে, দরজা বন্ধ রাখতে বলে, আমি ওয়াস রুমে চলে গেলাম।
ওয়াস রুমে যেতে যেতে ভাবছিলাম ১০-১১ বছর আগে ISO এবং FIRE WARDEN TRAINING নেবার সময় কখনও ভাবিনি ছোট্ট একটা ট্রেনিং এত বড় কাজে লাগবে। যখন ট্রেনিং নেই তখন অল্প পরিমাণ আগুন ধরিয়ে তা নিবাতাম। তাই খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। আজ যখন দাউ দাউ করা আগুন আমাদের নিবানোর সাধ্যের বাইরে ছিল তা ৫ পাউন্ড ওজনের একটি ছোট্ট যন্ত্রের দ্বারা মুহুর্তে নিভে গেল তখন মহান আল্লাহ্র কাছে কৃতজ্জতা জানানোর পাশাপাশি এ যন্ত্র, যে এ যন্ত্রটি আবিস্কার করেছে, তাঁকেও জানালাম অসীম শ্রদ্ধা।
আমার বন্ধু প্রকৌশলী লতিফুল কবির লিটন (কানাডা প্রবাসী) কদিন আগে আমাকে লিখেছিল দোস্ত REOSA ও BITRAJ যে লেখা গুলো দিবি তার বেশীর ভাগ প্রকৌশল বিষয়ে লেখা দিবি।কারন এখানে সবাই পেকৌশলী। আমি জবাবে লিখেছিলাম আমাদের দুটি সংস্থায় হাজারের উপর সদস্য থাকলেও আমি যে বিষয়েই লিখি না কেন প্রকৌশলীরা খুব কমই তা পড়ে। আমার ব্লগের বন্ধুরা যে কোন বিষয়েই লিখি তারা মন দিয়ে পড়ে ভাল মন্দ মন্তব্য করে।
বন্ধু সময় কথা বলে, আজ আমার বুয়েটের বাপ ৫ম পর্ব লেখার প্লান ছিল। কিন্তু লিখতে হল আগুন লাগার বাস্তব কাহিনি। তাই এখন এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখতেই হবে। কারন আমি জানি বহন যোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার জানে আমাদের দেশে তার পরিমাণ ০.৫% হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। যেমন আমার অফিসেই আমি ছাড়া আর কারও এর ব্যবহার জানা নেই। তাই তো কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার ও ডাইরেক্টর জনাব সাফখাত রহমান রিপন ঘটনার পর পরই এসে আমাকে বললেন ওয়েল ডান। (চলবে)
৩১/০৫/২০১৩ইং





খুব ভাল কাজ করেছেন। কিন্তু "মহান আল্লাহ্র কাছে কৃতজ্জতা জানানোর পাশাপাশি এ যন্ত্র, যে এ যন্ত্রটি আবিস্কার করেছে, তাঁকেও জানালাম অসীম শ্রদ্ধা"- এই অংশটুকু পরস্পরবিরোধী।
হা সবই সঠিক
ভাল লাগলো । শুধু অফিস বিল্ডিং এ নয়, সব বাসা বাড়িতেও সবার পোর্টেবল ফায়ার এক্সটিঙ্গুইসার রাখা উচিত আর তার ব্যবহার বাড়ির সবার জেনে রাখা ভাল।
ভাইয়া পরবর্তী পর্বে এ বিষয়ে কিছু লিখব ইনশাল্লাহ।
চলুক...
চলবে
চলুক
চলবে
মন্তব্য করুন