বুয়েটের বাপ(পর্ব-৬)
অনেকদিন কেটে গেল, ছেলে আবার লিখেছে বাবাকে শহরে এসে কিছুদিনের জন্য বেরিয়ে যেতে। চাচা তো এটাই চেয়েছিল সেবার বেশী পাওয়ারের চশমা কিনে যে ঠকাটা ঠকেছে তার ব্যাথা আজও মনে হলে কলিজা ফানা ফানা হয়ে যায়। টাকার শোকের চেয়ে বড় শোক আর হয় না, চাচা এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
দিনক্ষণ ঠিক করে আবার চাচা শহরে গেলেন। এবার বুড়িকে সাথে নিতে চাইলেও বুড়ি বলল আপনেই যান, আমি দেখি পরের বার যামুনে।
এবার চাচা শহরটা পরিচিত হওয়াতে খুব মজা করে অনেক কিছু দেখল। শহরের মধ্যেও মাঝে মাঝে জঙ্গল দেইখ্যা চাচার প্রথম খটকা লাগলেও ভিতর ঢুইকা মন্দ লাগে নাই। কি চমৎকার চাচার যৌবন বয়সটার মত বয়সের পোলা মাইয়ারা এক সাথে বসে কি যে ফুসুর ফুসুর গুজুর গুজুর করে।আল্লাহ্ মিয়াই ভাল জানেন। কেউ কিছু বলেও না। তাদের নাকেও দেখা যায় চশমা না টসমা কি যে সৌন্দর্য লাগে। চাচা আবার মনে মনে ফন্দি আটল। এবারও একখান চশমা কিনবেন। তবে এবার আর বেশি পাওয়ার না কম পাওয়ারের চশমা কিনবেন। চাচার ছেলের বাসায় অনেকদিন হয়ে গেল তাই আবার যাবার সময় হয়ে এসেছে। যথারিতি বিদায় নিয়ে চাচা গেলেন চশমার দোকানে চশমা কিনতে। এবার দোকানে গিয়ে কোন ভনিতা না করে বললেন,এই মিয়া দাওতো একখানা কম পাওয়ারের চশমা। কত কম পাওয়ার। যত কম পাওয়ারের আছে। দোকানি তাই দিল।
বাড়ির থেকে কিছু দুরে থাকতেই চাচা চশমাখানা পুটলি থেকে বের করে চোখে দিল। বাড়ির পথে একটা ছোট্ট নদী পার হতে হয়। নদীর কাছাকাছি এসে চাচার মনটা খারাপ হয়ে গেল। কদিন হল শহর গেলাম। এরই মাঝে নদীটা ভরাট করে নালা বানায় ফেলল। শালার লোকগুলান কি বোকা, এইটুকুন নালা পার হতেও নৌকায় চড়ে পার হচ্ছে। মানুষ গুলানও কেমন জানি ছোট ছোট হয়ে গেছে। যাক আমার কি আমি এক লাফেই নালা পার হয়ে যাব। এমন চিন্তা করে চাচা একটু দুরে গিয়ে দৌড়ায় এসে যেই না লাফ দিল অমনি পড়ল গিয়া নদীর মাঝ খানে। চাচার আবার সাঁতার জানা ছিল না। তাই পানি খায়, ডুবে আর ভাসে, ডুবে আর ভাসে। লোকজন চিল্লা চিল্লি আরম্ভ করে দিল। আরে চাচায় ডুইবা গেল, চাচায় ডুইবা গেল। কেউ সাতরায় চাচাক ধরতে যায় অমনি দেয় ধমক এই টুকু পানিতে আমাকে ধরতে হবে না আমি নিজেই পারে উঠতে পারব। কিন্তু চাচার অবস্থা প্রায় কাহিল। পরিচিত লোকজন বাড়িতে খবর দিল। বুড়ি বুজতে পারছে এইবারও বুড়া কিছু একটা অকাম ঘটাইছে। তাড়াতাড়ি বুড়ি ছুটে এসে দেখে চশমা চোখে বুড়া পানি খাইতে খাইতে একেবারে কাহিল অবস্থা এবং ডুবে মরে আর কি! বুড়ি বুঝছে চশমার কেরামতিতেই এই কাণ্ড ঘটছে। তাই একখান লম্বা লাঠি নিয়া গোতা দিয়া চাচার চশমা খানা দিলেন নাকের ডগা থাইকা ফালায়া। অমনি চাচার ভীমরতি শেষ। দেখে মধ্য নদীতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন। কি আর করা, জান বাঁচান ফরজ। মান ইজ্জত পড়ে। কাইন্দা কাইন্দা ডাকতে লাগল, আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও। সবাই মিলে চাচাকে যখন তীরে তুলল চাচা ততক্ষণে পানি খায়া ঢোল হয়ে গেছেন। লোকজন পেটের মধ্যে চাপ মারে আর চাচার মুখ দিয়া তীর বেগে পানি বাইর হয়। আর বুড়ি ধমকায়, আরও চশমা পড়বা। না বউ এই কান ধরলাম জীবনে আর চশমা পড়ুম না।
প্রতিবেশী ছাড়া কেঊ যেমন চলতে পারে না তেমনি আমি রুয়েটে লেখাপড়া করলেও প্রতিবেশী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমার বা আমদের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই চলুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার একটু রিভাইজ করে নেই।
রাজশাহী- ঢাকা মহাসড়কের পাশে রাজশাহী শহর থেকে ৫ কি.মি. দুরে পদ্মা নদীর তীর ঘেঁসে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৩ সালের ৬ই জুলাই যার ছাত্র সংখ্যা ছিল তখন ১৬১ জন আর বর্তমানে যার সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার।
১৯৬১সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় বর্তমান মতিহারের নিজস্ব ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসটি গড়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায়,যার দক্ষিন দিক দিয়ে ছুটে চলেছে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক, উত্তরে রেললাইইনের মাঝে ছায়া ঢাকা সবুজ শ্যামলে ঘেরা এই ক্যাম্পাস, পশ্চিমে আরেক সবুজের সমারোহ রুয়েট।
প্রায় ৩০৪ হেক্টর জায়গা জুড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৫টি উচ্চতর গবেষনা ইন্সটিটিউট, ৯টি অনুষদের অধীনে ৪৭টি বিভাগে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম৷ ক্যাম্পাসের উত্তর পুর্ব দিক জুড়ে রয়েছে ১১টি ছাত্রহল৷ ক্যাম্পাসের পশ্চিম প্রান্তে ৫টি ছাত্রীহল অবস্থিত৷ পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে রয়েছে শিক্ষকদের জন্য আবাসিক এলাকা৷ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরীটি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ এছাড়া রয়েছে, মেডিকেল সেন্টার, কম্পিউটার সেন্টার, শহীদ মিনার, স্টেডিয়াম৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা এদেশের সর্বপ্রথম স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর । রয়েছে সাবাস বাংলাদেশ নামে একটি অপুর্ব শৈলির ভাষ্কর্য৷ আর রয়েছে গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার৷ প্রতিদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব স্থানে ঘুরতে আসেন সারা দেশ থেকে প্রচুর দর্শনার্থী। তাই আপনারা যারা কখনও রাজশাহী বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেখেন নি তাদের প্রতি অনুরুধ রইল, একবার বেড়িয়ে যান আমার বিশ্বাস আপনাদের আবারও মনে হবে, দেখা হয় নাই চক্ষূ মেলিয়া ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া।
আমরা যারা উত্তর বঙ্গের ছাত্র, যারা বিশ্ববিদ্যালয় বা রুয়েটে পড়তাম তারা রাজশাহী রেল ষ্টেশনে নেমে ক্যাম্পাসের ভিতর দিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে নিতে হলে ফিরতাম। এই বিশাল ক্যাম্পাসের বিশাল সৌন্দর্য প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীকে বিকেল বেলা চুম্বকের মত আকর্ষনে আজ এখানে কাল ওখানে ঘুড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। ক্যাম্পাসে মেয়েদের হল গুলো প্রাকৃতিক নিয়মে এবং বাস্তবতার নিরিখি সকল আকর্ষনের কেন্দ্র ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই হল গুলোতে কারও বোন কারও আত্নীয় কারও বান্ধবীরা থাকতো। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই মেয়েদের হলের সামনে প্রতিদিন বিকেল বেলা যেন বৈশাখী মেলা বসত যা আজও বসে যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন এ মেলা শেষ হবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না।
প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার পর সময়ের পরিক্রমায় বোন ও আত্নীয় গৌন হয়ে বান্ধবীর সম্পর্কই জোড়ালো হয়ে উঠত। তাই এক সময়ের কলেজ বা স্কুল জীবনের ঘনিষ্ট বান্ধবীকে কলের পর কল বা শ্লিপের পর স্লিপ দিয়েও আর পাওয়া যেত না। আবার তার উল্টাটাও হত। এক সময় সবাই সবার মত আপন আপন পাত্রে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিত। আর এটা যখন জানা হয়ে যেত তখন আর কেও কারও বাধা হয়ে উঠত না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম, দ্বিতীয় বৎসরে পড়ুয়া বয়সের একজন মানব মানবী যখন তার পছন্দ মত সাথী খুঁজে পেয়ে যায় তখন তাকে, কি বলব, হিমালয়ের বুকে মা ভগবতীর বিদ্ধ করা ত্রিশূল হতে খরস্রোতা স্রোতস্বিনী গঙ্গার ত্রিধারা যা জন্ম থেকে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মাইল এবং হাজার বা লক্ষ বাঁধা পেরিয়েও চলার শেষ করে না বরং স্থান কাল পাত্র ভেদে অবয়ব পরিবর্তন করে কিন্তু প্রেম প্রনয় গতি ছন্দের কম তো হয়ই না বরং রূপ রস গন্ধে তা হয়ে উঠে আরও ভরপুর প্রেমময়। যেমন হিমালয়ের গঙ্গা রাজশাহীতে প্রবেশ করল পদ্মা হয়ে। আর এ কে নিয়ে তৈরী হল হাজারও কাহিনী ও হাজারও গান। তাই আষাঢ়-শ্রাবনের উচ্ছল চঞ্চল যৌবন জোয়ারের মানব মানবী শুধু বিশ্ববিদ্যলয়ের ক্যাম্পাসে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবে তা কি করে হয়। তারাও পম্মার তীর ঘেসে বহুরুপী পদ্মার রুপের আস্বাদন এবং ওপারে দিগন্ত বিস্তৃত কাশফুল, পদ্মার দেউয়ের বুক চিরে চলমান যন্ত্রযান গুলোর সাথে তারাও তাদের উচ্ছলতা শেয়ার করতে, তাদের কে সাথী করে স্মৃতিময় করে রাখতে ক্লান্তিহীন ছুটে চলত। কখনও চলমান পদ্মার চলার পথ বরাবর বাধের উপর, কখন ও পদ্মার বুকে ভাসমান যন্ত্রটির উপর বা ওপারের অসীম কাশফুলের নির্জন প্রেম প্রিয়সি মানব মানবি একে অপরের অক্ষি বিনিময়ে কি গেয়ে উঠত না।
চোখের সাগর, চোখের নদী
আর কি বলবে তুমি
সাগর নদী যাই বলনা
ডুবে গেছি আমি
বন্ধু ডুবে গেছি আমি।।
সাঁতরে বেড়াই কুল যে না পাই
ডুব দিয়েছি তলাও তো নাই
আমার কাছে নৌকা কোথায়
তলা মাপার সনারও নাই
তোমার প্রেমের গহীন কত
জানেন অন্তর্যামী।
সাগর নদী যাই বলনা
বন্ধু ডুবে গেছি আমি।।
বিন্দু বিন্দু জল কনায় সাগর নদীর মেলা
সেই সাগরে ঝিনুক মুক্তো কত কিছুর খেলা।
তোমার অক্ষি সাগর নদী সে যে
সসীম অসীম মুল্য নেই যে
তবু এক পলকের মূল্য কত
জানিনা যে আমি
বল তুমি প্রানের সখা
তারই মূল্যখানি।
সাগর নদী যাই বলনা
বন্ধু ডুবে গেছি আমি।।
এটা তো দেখলাম সার্থক সুউচ্চ পাহাড়ের বুক হতে বাধা না মানা কলকল ছল ছল বেগে স্রোতময়ী ক্যাস্কেট বা ঝরনা ধারার মত বয়ে চলা প্রেমের সফল জুটির এক ঝলক। তাই বিপরীত দৃশ্য কি আমাদের দৃষ্টি সীমার বাইরে ছিল। না তা ছিল না। কেমন ছিল সে দৃশ্য----(চলবে)





এইটা ঠিক কইছেন।


চাচা মিয়ার কাহিনী অদ্ভুদ লাগল
ভাইয়া,
রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের মেয়েদের হল নিয়া একটা অনেক মজার বাস্তব কাহিনী আছে। কিন্তু লিখতে ভয় লাগে যদি আবার মাইর টাইর দেন। অভয় দিলে লিখব। তয় অন্য গল্পে। আজ ঢাকায় বৃষ্টি তারপর ছুটির দিন, অনেক মজার আবহাওয়া। তাই ভাবিকে ছালাম দিলাম। যেন আপনার জন্য খিচুরী রান্না করে। ভাল থাকবেন। সাবধানে থাকবেন।
মজার হয়েছে
ধন্যবাদ আপা।
মন্তব্য করুন