শাশ্বত স্বপন ভাই ও অনামিকা
স্বপন ভাইয়া, এটাই মনে হয়, আপনার লেখা প্রথম কোন পোষ্ট পড়ছি। প্রথম দিনেই এত কষ্টে ভরা পোষ্ট উপহার দিলেন! কিন্তু আমি তো একটু পরেই ভুলে যাব, যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়ে পাশের বাসা থেকে এসে আব্বু বলে ডেকে বলবে আব্বু ভাত খেতে এস। আমি বাধ্য ছেলের মত খেতে বসব। পাশের বাসা বলতে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া আন্টির বাসা। বয়সের পার্থক্যে ওরা মা মেয়ের মত, কিন্তু পাশের বাসার ভাবির কোন মেয়ে নেই দুটিই ছেলে তাই উনি আমার মেয়েকে নিজের মেয়ে বানিয়ে নিয়েছে। আন্টি না বন্ধবী বুঝতে পারি না, তাই আমি মাঝে মাঝে অফিস থেকে এসে দুজনকে একসাথে পেলে বলে উঠি, দুই বান্ধবীতে কি গল্প হচ্ছে। ওরা হেসে কুটি কুটি হয় আমিও অনেক মজা পাই। এই ভদ্র মহিলা এ হেন খাবার নেই যা আমার ছেলে মেয়েকে না দিয়ে খায়। ব্লগের বন্ধুরা আমার ছেলে জুনাঈদকে ইতিমধ্যে চিনে ফেলেছেন আশা করি। ওর দুটি কবিতা আপনারা অতি দ্রুত যতজন পড়েছেন আমার কোন লেখাও এত অল্প সময়ে এত জন পড়েননি। তাই ও খুব উৎসাহ পাচ্ছে। কিন্তু আমি লেখালেখির পোকাটা এখনই ওর মাথায় বেশী ঢুকাতে চাই না। এর যে কি যন্ত্রনা কম বেশী আমরা সকলেই তার ভুক্তভুগী। কি জানি একটা গান আছে না।
গোলে মালে গোলে মালে পিরিত কইরো না
পিরিতি কাঠালের আঠা ও আঠা লাগলে পড়ে ছাড়ে না।
গোলে মালে গোলে মালে পিরিত কইরো না
লেখা লেখির নেশাও কি তাই নয়? কি পেলাম না পেলাম সেটা বড় কথা না। কিছু লিখতে হবে তা ভাল বা মন্দ আমরা কেউ কি কখনও ভাবি ?
যাক জুনাঈদের বড় বোন আমার মেয়ে মৌ এবার আর্কিটেকচারে ৫ম সেমিষ্টারে। আমার মেয়ে ৭ম-৮ম শ্রেনীতে উঠার পর থেকে আমাদের জ্বালা না আনন্দ কোনটা বলব। আপনারাই বলুন। আমরা অনেক ভাই বোন হওয়াতে কোনদিন আমার জন্মদিন তো হয়নিই, এমন কি কবে এসেছে গিয়েছে তাও কখনও মনে হত না। এমনকি আজও হয়না। কিন্তু আমার মেয়ে বাবা মায়ের জন্মদিন, বিয়ের দিন কেমনে মনে রাখে, আমার মাথায় ঢোকে না। এখন তো ওর সাথে যোগ হয়েছে জুনাঈদ। সবচেয়ে মজা লাগে বিবাহ বার্ষিকীতে সব যোগার করে ভাই বোন পিক পিক করে হাসবে আর আশপাশে ঘোর ঘোর করবে। মাঝে মাঝে ওদের মাও ওদের সাথে যোগ দেয়। আমি কিছু না বললে ওরাই বলবে আজ কি দিন বলতো আব্বু। বিবাহ বার্ষিকী মনে হলেও বলি না। এক সময় ওরাই বলবে আব্বু তোমার কিছুই মনে থাকে না। আজ ১৭ই নভেম্বর না। ও আচ্ছা।
বাবা মায়ের জন্ম দিনে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে গিফট কিনবে এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে। আমি একবার আমার মেয়ের জন্মদিন ভুলে গিয়েছিলাম, সকালে উয়িশ না করে অফিসে চলে গিয়েছি, ওর মা যখন ফোন করে তখন আমি একটা মিটিং এ ছিলাম। সাথে সাথে ফোন করি, কিন্তু মেয়ের কান্না আর থামে না। বাবা তুমি কাজ নিয়ে এতই ডুবে গেছ, তোমার মেয়ের জন্মদিন মনে থাকে না। আমাকে অনেক অনেক সরি বলে মেয়ের কান্না থামালেও ও যে অনেক কষ্ট পেয়েছে বুঝতে পেরেছিলাম। তাই এখন ওর মার প্রতি কড়া হুকুম আর যেন কোন দিন এমনটা না হয়, তুমি মনে করিয়ে দিব, নইলে তোমার খবর আছে।
আজ বাবা দিবস। সকালে অফিসে কাজ করছিলাম। মেয়ে ফোন দিয়ে বলল আব্বু আজ বাবা দিবস তোমাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা। মনটা খুশিতে ভরে গেল।
কিন্তু জুনাঈদ তো জানে না। সত্যি কথা হল, ভাই বোন দুজনেরই পরীক্ষা চলছে। তাই ওরা পড়াশুনায় ব্যস্ত। টিভি দেখা হয় না। তাই কেউ হয়ত আগে থেকে জানে না। মৌ বাসায় গিয়ে এটা নিয়ে জুনাঈদকে বলবে, আমি আব্বুকে উয়িশ্ করেছি তুই করিস নি। তাই আমি জুনাঈদ পরীক্ষা দিয়ে আসার পর ফোন দিয়ে বললাম, আজ বাবা দিবস, মৌ উয়িশ্ করেছে, তোমাকে খেপাবে।
ওরা দু ভাইবোন সারক্ষন এটা ওটা নিয়ে একে অপরের পিছনে লেগে থাকবে। আজ আমি অফিস থেকে আসার পর মৌ জুনাঈদকে ঠিকই বলল আজ বাবা দিবস আমি আব্বুকে উয়িশ্ করেছি। জুনাঈদও বলল আমিও উয়িশ্ করেছি। মৌ আমাকে জিজ্ঞেস করল, আব্বু তাই, আমি শুধু চুপ করে থাকলাম। লেখাটা লেখার পর দু ভাইবোনকে ডেকে আসল ঘটনাটা বলে দিলাম। আমি চাইনা বাবার কাছ থেকে ছেলে মিথ্যা বলা শিখুক। ওরা সারাদিন খুনসুটিতে মেতে থাকলেও এক মুহুর্ত একজন আর একজনকে ছাড়া থাকতে পারে না। একবার এ ডাকবে আব্বু দেখতো আপু আমাকে গাল টিপে দিল কত জোরে বা কত জোরে চুল টানলো, আবার মৌ বলবে, আব্বু তুমি কি কিছু বলবে জুনাঈদকে। আমি হু , হ্যাঁ এর মধ্যেই থাকি, কারন আমার ভালই লাগে। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে বাসায় এসে ওদের এসব দেখে বা ওদের দেখে সব কিছু কোথায় যে চলে যায়, জানি না। আমার নয়ন রশ্মি ওদের দেখে কি এমন শক্তি সঞ্চয় করে আমার দেহে প্রবেশ করায় যা আমার চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলা শরীরটাকে তড়িতশক্তিতে রূপান্তরিত করে।
শাশ্বত স্বপন ভাই অনামিকা না ফেরার দেশে চলে গিয়ে আপনার নামের বিপরীতে যে নিঃসঙ্গতা আপনাকে দিয়ে গেছে তা আমরা পৃথিবীর কেউ পূর্ণ করতে পারব না। বরং আমরা তা পূর্ণ করতে গেলে বমেরাং হয়ে আরও বেশী আপনাকে কষ্ট দিবে। তাই আমরা দোয়া করি আল্লাহ্ আপনাকে এ নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠার শক্তি দান করুন। আর আপনার মেয়ে অনামিকার দেহখানি আপনি মানুষের কল্যাণে দান করেছেন, আল্লাহও নিশ্চয়ই তার কল্যাণ করবেন।
০২ আষাঢ়১৪২০
১৬/৬/২০১৩





আমারও অনেক ভাই-বোন, কার কবে জন্ম বা কার কি নাম মায়ের বলতেও ভুল হয। যাই হোক, হাবিব ভাই, সংসার আর ব্যস্ততা নিয়ে সুখেই আছেন।
লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার লেখাটা অনেক স্পর্শকাতর। আমার লেখা পড়ার জন্য আবারও ধন্যবাদ।
আপনার ছোট্ট সুখের সংসারের গল্প ভালো লাগলো বেশ। ভালো থাকুন।
লেখালেখির কোন বয়স হয় না..
আপনার সাথে শতভাগ একমত। মেধা ছাই চাপা আগুনের মত। একবার বিচ্ছুরিত হতে শুরু করলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। ধন্যবাদ ভাইয়া।
মাবরুখ
অনেক সুন্দর একটা লেখা। মেয়েরা মনে হয় বাবার প্রতি বেশি দুর্বল থাকে ছেলেদের তুলনায়। কে যেন লিখেছিল " একটা মেয়ের জীবনের প্রথম হিরো হয় তার বাবা" আর সেটা আজীবন অপরিবর্তিত থাকে। বাবার ইমেজ মেয়ের কাছে আমৃত্যু একরকম থাকে, তাই শুনেছি। আমার কোন মেয়ে নাই তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা নাই।
আপনার সুন্দর জীবনের শুভ কামনায় !
ভাইয়া, আমি আমার মেয়েকে আপনার মন্তব্যটা দেখালাম। আমার মেয়ে আপনার সাথে একমত। আমার ছেলেময়ের কাছে আমি নাকি সবচেয়ে ভাল শিক্ষক। ওরা যেটা ওদের টিচারদের কাছে বুঝতে পারে না। আমি বুঝালে সহজেই নাকি বুঝতে পারে। অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। আমি দোয়া করছি আল্লাহ্ আপনার মেয়ের সাধ পূর্ণ করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন