ইউজার লগইন

কেন মেঘ আসে হৃদয়ও আকাশে( পর্ব-২)

ভাই সাপের খেলা, দেখবেন আসেন, আছে গোখড়া, পদ্মিনী, শঙ্খিনী, দারাজ, আরও অনেক অনেক সাপ। এই সব বিষধর, কাল নাগিনীর সাথে খেলা করবে আমার কাল নাগিনী, আমার সঙ্গিনী, আমার পিয়ারি, কমলা বেগম। তাই আসেন, সময় গেলে আর দেখতে পারবেন না। সুযোগ হেলায় হারাবেন না। সকাল ১০টা কি সাড়ে ১০টা, বাজারের বাঁশের হাট বসার ফাঁকা জায়গায় সাপের খেলা দেখানোর জন্য সাপুড়ে মিয়া/বিবির(বদি ও কমলা) দল সাপ খেলা দেখানোর জন্য হাক ডাক ছাড়ছে। ইতিমধ্যে লোকজনের ভীড় অনেক জমে উঠছে। কাজলের বোন ঢাকা থেকে এসেছে। সব বোন গুলো অপরূপ সুন্দরী এবং ভাল জায়গায় বিয়ে হয়ছে। বংশীয় পরিবার। এক ভাগ্নিকে সাথে করে মাছ, মাংসসহ অনেক বাজার করে মোটর সাইকেলে বাসায় ফিরছিল। কোলাহল ও গোলাকৃতির জটলা দেখে, কাজল ভোঁ ভোঁ করে চলা মোটর সাইকেল খানা গ্যাচ করে ব্রেক করে অকুস্থলে থামাল। যারা অকুস্থলে উপস্থিত তাদের সকলেরই প্রায় পরিচিত , তাই সন্মান বা ভয় যাই বলেন, অনেকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। মটর সাইকেলে বসেই দেখল,সাপুরে স্বভাব সুলভ বগর বগড় করে যাচ্ছে।
ও সাপের খেলা।
আচ্ছা আইতাছি।
আমিই আজ সাপের খেলা দেখামু। এ কথা বলেই আবার ভোঁ করে মোটর সাইকেল ষ্টার্ট দিয়ে চলে গেল। বাড়ি গিয়ে বাজারের ব্যাগ ও ভাগ্নিকে রেখে আবার মোটর সাইকেল ষ্টার্ট দিলে বউ কইল,
কই যাও, নাস্তা করে যাও।
আইতাছি, আইয়া নাস্তা করুম।
ভাগ্নি বলল, মামি বাজারে সাপ খেলা হচ্ছে, মামা মনে হয় সেখানে যাচ্ছে। পিছন থেকে বউ ডেকে বলল,
দেখ সাপ টাপ ধরবা না।
এর আগে বহুবার সাপুড়ে এলে কাজল সাপ নিয়ে এসে বাসায় বউ, ভাবি বা যাদের সাথে ঠাট্টা মস্করা করা যায় তাদের ভয় দেখাত। সাপ সম্পর্কে আমার তেমন কোন জ্ঞান নেই। তবে ধারনা বা লোক মুখে যা শুনেছি, সাপুড়েরা যে সাপ দিয়ে খেলা দেখায়, সে সব সাপের বিষ দাঁত ভেঙ্গে ফেলে, যাতে কাউকে ছোবল দিলেও বিষের কোন প্রতিক্রিয়া না হয়।
কাজল সাপের খেলা দেখানোর স্থানে এসে স্টাইল করে মটর সাইকেল দাড় করাল। মটর সাইকেল থেকে নামার সাথে সাথে কয়েকজন জায়গা করে দিল। কাজল সোজা সাপুড়ের ঝাঁপির কাছে গিয়ে ঝাঁপির ঢাকনা খোলার সাথে সাথে কয়েকটা সাপ বের হয়ে এল। এর মধ্যে যে সাপটা নাদুস নুদুস চেহেরার সেটাকে পাকড়াও করার সাথে সাথে সাপুড়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
ভাই সাপটার আবার নতুন করে দাঁত গজিয়েছে। আজ কাল করে করে ওর নতুন গজানো বিষ দাঁত গুলা ভাঙ্গা হয়নি। এই সাপটি আপনি ধরবেন না। ভাই আপনার দুইটা পা ধরি আপনে সাপটা ছাইড়া দেন।
কাজল উল্টা সাপুড়েকে ধমক দিয়ে বলল, আরে ধেৎ সড়। তুই আইজ থাক, আমি সাপের খেলা দেখাব। এর আগে কতবার কত সাপের আমি বারটা বাজাইছি, তুই জানুস?
ভাই ও গুলা ছিল, বিষহীন দাঁত ভাংগা সাপ। ভাই আপনার বাপ মার দোহাই আপনার পা দুইটা ধরি আজকে আপনি সাপ ধরবেন না। ধরলেও এই সাপটারে বাদ দিয়া অন্য সাপ ধরেন।
কখনও কখনও নাকি মানুষের ইগো বা অহংবোধ কাজ করে তখন আপনি যা বলবেন তার বিপরীত কাজ করে মানুষ মজা পায়। কাজলের ক্ষেত্রেও হয়েছিল তাই। আর মানুষ যখন কোন নেশা জাতীয় কিছু করে তার মধ্যে অহংবোধ আরও বেড়ে যায়। নিজকে নিজে রাজা প্রজা উজির নাজির ভাবতে থাকে। তাই সাপুড়ে যত ওকে মানা করছিল ততই সে সাপটির উপর অত্যাচার বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সাপটিকে সে কখনও লেজে ধরে ঘোরাচ্ছে, কখনও মেঝেতে ছেড়ে দিয়ে প্রকৃত উজার মত হাত নেড়ে নেড়ে নাচুনে ভঙ্গিতে সাপকে উত্তেজিত করছিল। এবার সে ভয়ংকর কাজটি আরম্ভ করল। সাপটিকে হাতে পেঁচিয়ে সাপের মুখে আঙ্গুল দিয়ে টোকা মেরে মেরে উপস্থিত লোকজনের কাছে বাহবা নিচ্ছিল।
বাহবার মাত্রাটা যখন সীমা অতিক্রম করল কাজলও তাঁর নিয়ন্ত্রণ হাড়িয়ে ফেলল। এই সুযোগে অত্যাচারে জর্জড়িত নিরীহ প্রানীটি তার অস্ত্রটি প্রয়োগ করল। ছোবল মারার সাথে সাথে দংশিত স্থান হতে একটু রক্তচিহ্ন মাত্র দেখা গেলেও কাজল তাতে পাত্তা দিবে কেন? সে যে রাতের নেশার সীমা তখনও ভাংতে পারেনি। কিন্তু উপস্থিত লোকজন এবার সবাই মিলে ওকে ধরে দংশিত স্থানের উপর কাপড় দিয়ে বাঁধন দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করল। হাসপাতালে নেবার জন্য চেষ্টা করেও উপস্থিত সকলে ব্যর্থ হল। তড়িৎ বাসায় খবর দিলে বাড়ির লোকজন এসে হাতে বাঁধন দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে পৌঁছার আগ মুহুর্তে আমার কিছু হবে না বলে নিজেই বাঁধন খুলে ফেলল।
এটি একটি থানা হাসপাতাল, থানা হাসপাতালে সাপে কামড় দেয়া রুগির চিকিৎসার জন্য যে সমস্ত সুবিধাদি থাকার দরকার তা নেই। আমি যতটুকু জানি। সাপে কাটা রুগিকে প্রথমে পরীক্ষা করে দেখতে হয় কেমন সাপ কামড়িয়েছে। সেটা কেমন বিষধর, সেই বিষটা কেমন। রক্তের যেমন গ্রুপ থাকে। সেটা নির্ণয় করার পরই তার প্রয়োজনীয় টিকা বা ভ্যাক্সিন দেয়া যায়। তাই হাসপাতালে পৌঁছালেও ডাক্তারগন তাকে কোন চিকিৎসা দিতে অপারগ হওয়াতে সাথে সাথে এম্বুলেন্সে করে জেলা হাসপাতালে রেফার্ড বা স্থানান্তর করা হয়। তখনও সে কোথাও যেতে রাজি হয় নি। কিন্তু তার ছেলে ও ভাইয়েরা জোর করে জয়পুর হাট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তড়িৎ যাবতীয় পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ভ্যাক্সিন দেয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে যে সব শেষ। তার নেশার ঘোর কেটে যাবার সাথে সাথে নিজের জীবনের সাথে, সকল আত্নীয় স্বজনের বন্ধনও কেটে গেছে।
যখন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল তখনই সে বুঝতে পারে তার কি হয়েছে। ব্যথায় জর্জরিত শরীর, বুক চেপে আসছিল, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, একমাত্র ছেলে, ভাই,ডাক্তার সবার কাছে করুন আকুতি আমাকে বাঁচান। তাই হয়তবা ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করার পরও তার ছেলে বাবা মারা গেছে মানতে পারছিল না। কার কাছ থেকে যেন শুনেছিল সাপে কাটা রুগি সহজে মরে না। আত্না লুকিয়ে থাকে দেহের মাঝে। সঠিক উজার চিকিৎসা পেলে, ভাল হয়ে যায়। বাবা বাবাই তার অন্য কোন পরিচয় নেই। তাই ছেলের শুরু হল বাবাকে বাঁচানোর অলীক দ্বিতীয় অভিযান। উজার বাড়িতে মৃত বাবাকে নিয়ে চিকিৎসা করানোর যাত্রা। (চলবে)

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


মন খারাপ হয়ে গেল, চলুক...

আহসান হাবীব's picture


জি, ভাইয়া, আমারও লিখতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।