ইউজার লগইন

চ তুমি কত ভাগ্যবান(প্রথম পর্ব)

তখন ক্লাস সেভেন/এইটে পড়ি। রাত এগারটার আগে ঘুমুতে যাওয়া হতো খুব কমই। পড়াশুনার জন্য রাত জাগা তা বলা যাবে না, ফিফটি ফিফটি বলা যাবে। তখন বিনোদনের মাধ্যম রেডিও, প্রতিদিন রাত দশটায় কোন না কোন কেন্দ্র থেকে অনুরোধের আসর হতো। আমাদের ঠাকুর গাও থেকে আকাশবানী কলকাতা খুব সুন্দর শোনা যেত। বুধবারে আকাশবাণী থেকে হতো আধুনিক গানের অনুরোধের আসর।
ওগো বৃষ্টি তুমি চোখের পাতায় ছুয়ো না,
অথবা তোমার আকাশ দুটি চোখে আমি হয়ে গেছি তারা
এসব মিষ্টি মিষ্টি গান শুনার জন্য আমি কেন তখন কে না গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকত। রাত দশটা এগারটা বলে তো গ্রামে গভীর রাত। এই গভীর রাতে প্রায়ই শুনতাম শুক্কুরের মায় কাকে জানি বকাবকি করছে, আর বকার যা ভাষা তা লিখনিতে প্রকাশ করা তো দুরের কথা, ভাবতে গেলেও ওই মহিলা সম্পর্কে একটা অতি বাজে ধারনা আসতো। আমরা মনে করতাম ও লোকজন বলত মাথায় ছিট আছে। যখন মাথায় ছিট উঠে তখন এই সব বাক্য তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। কেউ বলত জ্বীন ভূতের আছর আছে। কেউ জিজ্ঞেস করলেও কখনও কাউকে কিছু বলতো না। এই শুক্কুরের মা কোথা থেকে এসে কিসমত সরকারের জংলা ভিটায় একখানা খুপড়ি ঘর তুইলা থাকে কোনদিন জানবার চেষ্টা করি নাই। কোন দিন ভাল চোখেও দেখি নাই।
তার সৌন্দর্য খানা,
পরানের বান্ধবরে বুড়ি হইলাম তোর কারনে।
গান খানি যিনি প্রথম গেয়েছিলেন অনেকটা তার মত। তবে রংটা তার সাথে আর এককোট বিটুমিন পেইন্ট মারলে বরাবর হইব।
কখনো মানুষের বাড়িতে ঝি এর কাজ, কখনো জমিতে ধান কাটা, ঘাস নিড়ানোসহ কত রকমের কাজ করতে দেখিছি। কি আর করা নিজের পেট ও বাচ্চার খাওয়া, সে তো আর কেউ এমনিতে দিবে না।
এই মহিলা, মহিলা বললে ভুল হবে ১৮-১৯ বছর বয়সের একটা মেয়ে একটা ছেলেকে সাথে নিয়ে জংলা এলাকায় একা একা থাকে গায়ের রং যাই হউক না নিশাচর চামড়া পিপাসুরা যুবতী অসহায় মেয়েটির চামড়ার ছোয়া পাবার মানষে যে গভীর রাতে এসে হানা দিত তখন তা বুজতে না পারলেও পরে বুঝতে কোন অসুবিধা হয় নি। আর আমার বা আমাদের তথাকথিত ভদ্র পুরুষ সমাজ বুঝতে না পারার ফলে এক সময় তাকে ঝগড়াতে শুক্কুরের মা হিসেবে পরিচিত হতে হল। কোথাও ঝগড়া হলে তাকে নাকি হায়ার করে নিয়ে যাওয়া হতো। তবে সরকার বাড়ি, শেখ বাড়ি, বেপারী বাড়ি বা অন্য কারও সাথে ঝগড়া হলে,সে সব সময় সরকার বাড়ির পক্ষ নিত। মনে হয় নুনের গুন আর কি?
এই কিসমত সরকার ভারত থেকে ৪৭ এ দেশ ভাগ হবার পর অনেকে বলে খালি হাতে এসে এখানে বসবাস শুরু করে, কিন্তু কি করে এত জমি জমা ও অর্থ বিত্তের মালিক হলেন কেউ তা জানেন না তাই উনাকে লোকে কিসমত সরকার বলে ডাকত। উনার পরিচয়ে অনেকে পরবর্তীতে ভারত থেকে এসে উনার আশ্রয়ে থাকত। আমরা ওদের রিফিউজি বলতাম। আর উনি উনার কোন জংলাতে বাড়ি বানাতে দিতেন। যারা থাকত তারা ঝাড় জঙ্গল সাফ করে নিত। দেখা যেত সরকার সাব কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ তাদেরকে ওখান থেকে উঠিয়ে দিয়ে অন্য আর এক জংগলে বাড়ি বানাতে বলতেন। অসহায় মানুষগুলো উপায় না থাকায় কি আর করবে কথা মত আবার নতুন বাড়ি বানাত। এভাবে সরকার সাব উনার অনেক অনাবাদী জমি আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করেছেন।
দিন কারও জন্য ঠেকে থাকে না। শুক্কুরের মারও দিন আর আগের মত নাই। শুক্কুর বড় হয়েছে। তাই রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত অত্যাচারের হাত থেকে এ অসহায় মেয়েটি রক্ষা পেয়েছে। হামার এরশাদ চাচা, হামার উত্তর বঙ্গের ছাওয়াক তোমরা স্বৈরাচার বলেন, আর যাই বলেন, ওই ছাওয়াল ডার জন্যই হামার দেশের রাস্তা ঘাট গুলান ফিকা জালের মতন গ্রাম থাকি গ্রামত য়ান্না ঘর তক চলি গেইছে। আগে হামরা গরুর বা মহিষের গাড়ী ছাড়া ধান, পাট বা কোন ফসল বেশী পরিমাণ হলে বাজারে নিতে পারতাম না। কিন্তু রাস্তা ঘাট পাকা হবার দরুন এখন ভ্যান, রিক্সায় যখন চাই যত পরিমাণ নিয়া যাও, কোন অসুবিধা নাই। আর হামার গেরামের মাইনষের যেমন বাবুগিরি খান বাইরছে তেমনি কত লোকের যে নতুন নতুন কামের সুযোগ হইছে তা মোর লেখবার দরকার আছে কি?

আমাদের শুক্কুর আলীও বড় হয়েছে,সে এখন রিক্সা চালায়। কেমন করে জানি শুক্কুর আলী মোটামোটি পয়সা ওয়ালা হয়ে যায়। আমি বাহরাইন থেকে দু বছর পর পর আসতাম। একবার এসে দেখি আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছেই সরকার সাবের যে জায়গায় শুক্কুরের মা থাকত সেখানে খুব সুন্দর চার পাঁচ খানা রুমের টিনের বাড়ি। আমার এক ভাতিজাকে জিজ্জেস করে জানতে পারি এটা শুক্কুরের বাড়ি। শুক্কুর এখন অনেক টাকা পয়সার মালিক। জায়গাটা সরকার সাবের এক ওয়ারিশের কাছ থেকে কিনে নিয়ে বাড়ি করেছে। শুনে বেশ খুশি হলাম, তবে পরক্ষনেই দুংখ পেলাম। শুক্কুর ওর মাকে দেখে না। অর্থাৎ আমাদের দেশী ভাষায় যাকে বলে ভাত দেয় না। তবে একটা ঘরে থাকতে দেয়।
আবার দু বছর পরে এসে শুনি শুক্কুর মারা গেছে। ও একটা ছেলে আর জোয়ান বউ রেখে চলে গেছে, বর্ণনা শুনে যা মনে হল হার্ট এটাক করেছিল। আমি এসেছি শুনে শুক্কুরের মা আমাকে নাতি কোলে নিয়া দেখতে এসেছে। এসেই পায়ের কাছে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি আর কি বলব। মা ওর নাতিকে কিছু খাবার দিল। আমি বললাম সবই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা, ধৈর্য ধরেন। সেদিনই প্রথম জানতে পারি শূক্কুরের বাপও এমনই হঠাৎ মারা যায়। সেদিন আরও একটা প্রমান পেলাম মা মাই তার কোন বিকল্প নেই। শুক্কর ওকে খেতে দিত না এটা কেউ বললে সে রাগ করে। আর বলে আমাকে খেতে দিত না তাতে কি তাও ও বাইচ্যা থাকত। শুক্কুরের পোলাডা নিয়া সারাদিন কাটায়। শুক্কুরের বউকে বলে মা আমি সারা জীবন কি কষ্টে কাটাইছি, আমি জানি, তুমি চইল্যা যাও। আমি যতদিন আছি, নাতিডারে নিয়া থাকব। আমি না থাকলে তুমি নিজেরে বাঁচায় থাকতে পারবানা। বৌয়ের বাপের বাড়ি থেকেও একই কথা কিন্তু বউটা রাজি হয় না। অনেক দিন থেকে আর খবর জানি না।
আমি এস এস সি পাশ করেই শহরে চলে আসি। হোষ্টেলে থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করেছি। তখন থেকেই গ্রামের সাথে একটা বিচ্ছন্নতা তৈরি হতে থাকে। অনেক আত্নীয় স্বজন আছে যাদের বাড়িতে সপ্তাহে একদিন যেতাম যেমন ছোট ফুপু, বড় ভাবির বাপের বাড়ি, তাদের বাড়িতেও কত বছর যাওয়া হয় না তা হিসেব করতে হলে খাতা কলম নিয়ে বসতে হবে। যাবই বা কিসের আকর্ষনে, যে তাওই সাব আমাকে ছোট ছেলের মত আদর করত, আমার বাবা অনেক আগে মারা গেলেও উনাকে দেখে অনেকটা বাবার তৃষ্ণা মিটাতাম, ছোট ফুপু এস,এস,সি পরীক্ষা দেবার সময়ও উনার বাড়িতে গেলে সাথে ঘুমাতে হত, তারা যে সবাই আমাকে ছেড়ে আপন নিবাসে আমার চেয়েও আপনজনের কাছে চলে গেছেন। তাই শুক্কুরের মা প্রতিবেশী হলেও তার বিষয়ে শহর মুখী হবার আগে তেমন কিছুই জানতাম না। সেদিন অনেক কিছু জানলাম, সাথে সাথে এও জানলাম, শুক্কুরের মা কারও সাথে কখনও ঝগড়া করে না। নিজের ইজ্জত বাঁচাতে, পাগলীর বেশ, ভুতের আছর, সাথে মহাস্ত্র অকথ্য গাল যা তাকে আমার কাছে ঘৃণিত করে তুলেছিল, সব কিছু জানার পর তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ জন্মে গেল। ১৮-১৯ বছরের এক বিধবা একটি ছেলেকে পিঠে বেঁধে উত্তাল জীবন সাগর পাড়ি দিল। সে ছেলেটিও আজ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কি পেল সে জীবনে।
শুক্কুরের মা ঝগড়া করা ছেড়ে দিয়েছে, কাজেই কারও সাথে যদি আমাকে কখনও ঝগড়া করতে হয় আমার পরিকল্পনা ছিল ওকে আমি হায়ার করে নিয়ে আসব। তাই একটু মনটা খারাপ হয়েছিল। কিন্তু না একটু হয়ত মুল্য বেশী দিতে হবে কিন্তু আমাদের এই ঢাকা শহরের এখন শুকুরের মার চেয়ে মর্ডাণ ঝগড়াটে পাওয়া যায়। (চলবে)

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ভাল লাগলো সেই সময়ের কথকথা, চলুক....

আহসান হাবীব's picture


ধন্যবাদ ভাইয়া

কুহেলিকা's picture


স স্মৃতিচারণ ভাল লাগল, নস্টালজিক হয়ে পড়েছি।

আহসান হাবীব's picture


অফিস থেকে এসে এত ক্লান্ত হয়ে যাই, ভাবি এসব ছাইপাশ লিখে কি হবে, আর লিখব না। যখন আবার আপনার মত কারও এত সুন্দর মন্তব্য পড়ি কোথা থেকে শক্তি পাই জানি না, তাই আবার লিখতে বসি। আপনার অনুভূতি প্রবন নিজের কথা অনেক ভাল লেগাছে। তাই কোড করলাম।

একজন মানুষ যে সবসময় মরীচিকার পেছনে ছুটছে। সে নিজেও জানে যে মরীচিকার পেছনে ছুটছে, মরীচিকা মরীচিকাই, কিন্তু এরপরও তার ছুটে চলা থামে না । কারণ মরীচিকাটি-ই তার জীবনে একমাত্র আশা হয়ে এসেছিল, একমাত্র আনন্দ হয়ে এসেছিল। এখনো এটি-ই তার জীবনের একমাত্র আশা, একমাত্র আনন্দ হয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই সে সারাজীবনই এ মরীচিকার পেছনে ছুটবে, তাকে পাক বা না পাক। একমাত্র মৃত্যুই তাকে থামাতে পারে, আর কেউ না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।