মিষ্টি মধুর আলোর সূর্যের উদয় ঘটাবেই
বাড়ন্ত শরীরের কিশোর বা যুবক সন্তানের চলন্ত পথে তাকিয়ে বাবা মা বার বার থুতু ছিটান যেন বাবা মায়ের নজরও সন্তানের উপর না পড়ে বরং বার বার মনের অজান্তে অন্তর থেকেই দোয়া হতে থাকে হে সৃষ্টি কর্তা আমার সন্তানকে তুমি সকল বালা মশিবত থেকে রক্ষা কর। এই সন্তানের প্রতি কি যে ঐশ্বরিক মায়া,বিন্দু মাত্র কষ্ট পেলে, একটু হোচট খেলে সেটা সন্তান নয় যেন নিজের গায়ে বালকে নিজের অন্তরে লাগে। সন্তান তেমন লাগেনি বলে সান্তনা দিতে চাইলেও, বাবা মায়ের মন মানে না, তুমি এটা করতে গেলে কেন? নইলে তো তুমি এই ব্যথাটা পেতে না, হতো না। সন্তান কিছু হয়নি বললেও বাবা মায়ের মন কিছুতেই মানতে চায় না। আর যতই চেষ্টা করি আমার কি সাধ্য এ অনুভূতি লেখায় প্রকাশ করি। এ অনুভূতির ভাষা শুধু অনুভূতিতেই প্রকাশ করা যায়।
ছেলের কদিন থেকে কী যে হয়েছে যখন তখন ছাদে যায়। একটু সন্দেহ হলে মার বুঝতে অসুবিধা হয় না, ছেলে আমার সিগারেট টানতে শিখেছে। না শিখেনি, সময় ওকে শিখিয়েছে। অন্য সময় হলে মা বকাবকি বা চিল্লা চিল্লি করে সিগারেট খাবার ক্ষতির প্রতিশোধ নিত। কিন্তু না মা একটি বাক্য, একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। ছেলে যে একটু ক্ষতি করে হলেও মার, মায়ের ইজ্জত সম্ভ্রম ও সত্ত্বার লড়াইয়ে এ ক্ষুদ্র ক্ষতিটি করছে। তাই এবার আর মা ছেলেকে ছাদে যেতে দিলেন না। বললেন, যা বাবা ঘরে বসেই খা। ছেলে কিছুটা লজ্জা পেল, মা শেষ পর্যন্ত জেনেই ফেলেছে।
বন্ধুরা তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ, আমি আমাদের সকলের মা জাহানারা ইমাম ও ভাই রুমির কথা বলছি। সেই সে রুমি যার লন্ডনে পড়তে যাবার কথা ছিল, সেই সে রুমি যে যুদ্ধের প্রশিক্ষন নিতে গিয়ে পোকা ধরা আটার রুটি খেয়েছিল। যে ডাল গরুও খায় না সেই সে ডাল খেয়েছিল। কিন্তু মাকে বলেনি বাবাকে বলেনি, ছোট ভাইকে বলেনি, তারা যে সহ্য করতে পারবে না। সে সয়েছিল। সব সব সয়েছিল। মায়ের মাকে কেউ কেড়ে নেবে, তার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে তার পরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে এ লজ্জার হাত থেকে মুক্তি দিতে সে সব সয়েছিল।
আজ জুলাই ১৭,২০১৩ খ্রীঃ, ২ শ্রাবন ১৪২০ বাংলা তারিখে, এই সে জল্লাদ, এই সে নরপশু মুজাহিদ যার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রাখতে রায় দেয়া হয়েছে। তার নির্দেশ ও সহযোগিতায় আমাদের এই ভাইটি এবং আজাদ,বদি, বুদ্ধিজীবি, মুক্তিযোদ্ধা সহ কত নাম না জানা হাজারও ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ ফিরে এলেও সিংহভাগই ফিরে আসে নি। কারা ফিরে আসতে পেরেছে যারা আমাদের রুমি ভাইয়ের মত নিজের ঘাড়ে সকল দোষ নিয়ে বাবা বা ভাইয়ের মুক্তির ব্যবস্থা করেছে।
যারা ফিরে এসেছে তারাও পানি থেরাপি, বোতল থেরাপি আরও কত রকম থেরাপির কারসাজিতে অবয়ব টা নিয়ে ফিরে এলেও ভিতরটা যে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তাই তো জনাব শরীফ ইমাম, রুমির বাবা ফিরে এলেও পুত্র শোকে ক্ষত বিক্ষত মন ও শরীরে এ পৃথিবী তার কাছে নোংরা ও মূল্যহীন হয়ে উঠল। ঘরে সুন্দর স্ত্রী ও আর এক সন্তানের মায়াও তাকে ধরে রাখতে পারল না, এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে একেবারেই নিঃশব্দে আপন ঠিকানায় চলে গেলেন।
মাগো সৃষ্টিকর্তা কোন ধাতুতে তোমাকে গড়েছিল। যাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালবাসতে সেই স্বামী নিঃশব্দ চলে গেল, তুমি একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ও ফেললে না। মাগো তোমার একটি সন্তান চলে গেল, আর একটিকে তুমি দেশ মাতার সেবা করার জন্য আর্মিদের হাতে তুলে দিল কেন? হাজার হাজার লাখ কোটি সন্তানের মাথার কালিমা মুছতে স্বামী সন্তানকে তুমি কোরবানি দিলে!
মাগো তোমার স্বপ্ন আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও ধীরে ধীরে হচ্ছে, আজ তার পথে আরও একধাপ আমরা এগিয়ে গেলাম। মাগো, তুমি কি শুনতে পেয়েছ, জল্লাদের ফাঁসির রায়। তোমার সন্তান ঘাতকের ফাঁসির রায়। তোমার বুদ্ধিজীবি ভাইদের হত্যাকারির ফাঁসির রায়। মাগো আমরা তোমাকে কথা দিলাম, তোমার স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়িত করবই, যেটুকু বাকি থাকবে, ঐ শোন তরুণ প্রজন্মের গগন বিদারী স্লোগান। ঐ স্লোগানই একদিন সকল কলুষতা দূর করে ভোরের নির্মল সমীরণে মিষ্টি মধুর আলোর সূর্যের উদয় ঘটাবেই।





মন্তব্য করুন