দেশ টিভিতে জনাব জয়ের চায়ের আড্ডা
যখন কোন ব্যক্তি ভুল পথে চলতে চলতে উদ্দেশ্য বা গন্তব্যে পৌছার কোন নিশানা বা আলোক বর্তিকা খুঁজে পায় না তখন সে পথ চলার ভুলটা বুঝতে পেরে সঠিক পথে চলতে চেষ্টা করে। আর সঠিক পথে চললে এক না এক সময় সে তাঁর গন্তব্যের আলোক বর্তিকা খুঁজে পাবেই।
এ উক্তিটি গতকাল রাতে (২/১/১৪) দেশ টিভিতে জনাব আসাদুজ্জামান নুরের চায়ের আড্ডায় জনাব সজিব ওয়াজেদ জয়ের, বর্তমান জামাত শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবেই এ কথা বলেছেন। উনার দর্শন মূলক এ উক্তির সাথে আমার বিশ্বাস শুধু উনার দল কেন বিরুধীদলের অনেকই এককত পোষন করবেন।
আর আমি উনার এ উক্তির মাঝে আমাদের দেশের নেতৃত্বহীনতার মাঝে তিমিরও বিদারী, আলোক নিহারী এক নেতৃত্বের সুগন্ধ, সুবাতাস পাচ্ছি।
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। নিয়মিত একটি বিহারী সেলুনে মাসে একবার চুল কাটাই। তেমনই একদিন চুল কাটানোর জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় বসে আছি, আম্র বৃক্ষের তক্তায় নির্মিত বিগত যৌবনা বেঞ্চের মাঝে। পাশ দিয়ে একটি পাগল চলে যেতে যেতে শুধু বলে যাচ্ছে। হায় বাবা, হায় বাবা। একজন পাগল যেমন শতচ্ছিন্ন নোংরা দুর্গন্ধময় স্বল্প বসনা হয়ে থাকে তারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আর সকল পাগল এক বলে কোন কৌতূহল হবার কথাও না। কিন্তু সেই যে, হায় বাবা ,হায় বাবা আমাকে তাঁর বিষয়ে জানার কৌতূহলে উদ্দীপ্ত করল। আমি সেলুনের মালিক চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা পাগলটা হায় বাবা, হায় বাবা করছে কেন?
সে আর বলিস না বাপ। ছেলেটা ভাল ঘরের কিন্তু যতটুকু জেনেছি, বঙ্গবন্ধু একবার ঠাকুর গাও এর ফুটবল মাঠে এসে জনসেবা করে ছিলেন। ও তখন মাঝারি সারির ছাত্রনেতা। প্রোগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু ওকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলেছিল, বেঁচে থাক বাবা, তোরা আমার দেশের সম্পদ। ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর ওর যে কি হল,প্রথমে ওর খাওয়া দাওয়া অনিমিত ও উলটা সোল্টা কথা বার্তা বলতে আরম্ভ করল। বাবা মা প্রথমে ডাক্তার, কবিরাজ এবং মৌলানা ডেকে জ্বীনের আছর হয়েছে বলে জ্বিন ছাড়ানোসহ কোন চিকিৎসাই বাদ দিল না। এক সময় ও হায় বাবা, হায় বাবা করতে ও নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করতে আরম্ভ করল। প্রথম প্রথম বাড়ী থেকে কোথায় পালিয়ে কোথায় যেত, কি খেত কেও জানে না,আবার ফিরে আসত। কিছুদিন ছিকলে বেঁধে রেখেছিল। তাতে ভীষণ চিৎকার করার পাশাপাশি নিজেকে চরম আঘাত করত। তাই আবার ছিকল খুলে দিল।
আমার কিশোর হৃদয়ে তখন এ ব্যাপারে কোন দাগ না কাটলেও যত বড় হয়েছি। বংগবন্ধু সম্পর্কে জেনেছি। ততই উনার প্রতি আমার মণ প্রাণ উজার করা শ্রদ্ধার পাশাপাশি ওই পাগল ছেলেটার কথা মনে পড়ত।
এখানে বঙ্গবীর জনাব কাদের ছিদ্দীকির একটি উক্তি আমার মনে পড়ে গেল। সম্ভবত সংসদের কোন এক অধিবেশনে প্রশ্নত্তোর পর্বে বংগবন্ধুর সপরিবারে নিহত হলে এত বড় বিশাল দলের এত নেতা ও কর্মি বাহিনি থাকতেও কেন তাদের দেখা যায়নি, জবাবে জনাব ছিদ্দীকী বলেছিলেন, বংগবন্ধু ছিলেন সুর্য, সুর্য সকল গ্রহ নক্ষত্র তারা ও নিহারিকার আলো ও তাপের উৎস। তাই সূর্য যখন অস্তমিত হয়ে গেল, বাকিরা আলোহীন হয়ে পড়েছিল। তাই আলোক বিহীন কাওকে তখন দেখা যায়নি। আজও উনার লেখায় আওয়ামী লীগ সম্পর্কে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা বললেও বংগবন্ধু এবং বঙ্গমাতা সম্পকে কোন কটু কথা বলা তো দুরের কথা উনাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসার বিন্দুমাত্র কমতি হয়েছে তা উনার কোন লেখা বা বক্তব্যে আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।
আজ আমি বুঝতে পারি বংগবন্ধু সেই ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়াতে যে আলো তাঁর ভিতর প্রবেশ করেছিল বঙ্গ বন্ধুর তিরোধানে সে আলোও তিরোহিত হওয়াতে সে আর কোন আলোর পথ খুঁজে পায়নি।
তাছাড়াও অনেককে বলতে শুনেছি, উনার সামনাসামনি যেই হয়েছেন উনার সৌম্য চেহেরা, সাগরসম হৃদয়, বিশাল ব্যক্তিত্ব তাকে এমনই মোহাবিষ্ট করত যে নিজেকে উনার মাঝেই বিলীন করে দিত।
উনাকে আমরা যেদিন হাড়িয়ে ফেলেছি সেদিনই আমরা নেতৃত্ব শুন্য হয়ে পড়েছি। তাই চাতক পাখির মত চেয়ে থাকি আমাদের ভবিষ্যত কান্ডারী হিসেবে উনার মত একজন নেতা ও মানুষের।
আমার কেন জানি জনাব জয়ের মাঝে সে রকম কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত পরিলক্ষিত হল। উনি বিরুধী দলের মাঝে অনেক ভালু মানষ যেমন দেখতে পাচ্ছেন তেমনই বিরুধীদল না থাকলে গণতন্ত্র হয় না সেটাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু যারা সত্যিকার ভাল মানুষ ও দেশের ভাল চান, দেশকে ভালবাসেন তারা পারিপার্শিকতাঁর শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
এবার আসি আমি যে বিষয় নিয়ে আরম্ভ করেছিলাম সে প্রসঙ্গে। আজ শিবিরের যে সব ছেলেরা জীবন বাজি রেখে বিভিন্ন নাশকতা করছে। তাদের মাঝে অনেক অনেক মেধাবী তরুণ আছে। যারা ৭১ সালের পর এই সুজলা সুফলা বাংলা মায়ের কোল আলো করে এসেছে। তারা এত মেধাশুন্য নয় যে তারা জন্মভুমি বাংলা মাকে ভাল না বেসে ৪৩ বৎসর আগে মরে পচে গলে যাওয়া ধবংসস্তুপ পাকিস্তানকে ভালবাসবে।
যে বিহারীরা শুধু ধর্মীয় কারনে ভারতের বিহার রাজ্য ছেড়ে মুসলমান দেশ পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিল, সেই পাকিস্তান হেড়ে চলে যাবার পর তাদের নিজ দেশ পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেয়া তো দূরের কথা, কখনো খোজ খবর করেছে বলেও আমার মনে হয় না। তাদের যখন এ অবস্থা তখন বাংলাদেশে বাংগালীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করা কাউকে ওরা জামাই আদরে রাখবে তা ভাবা আর আহাম্মকের স্বর্গরাজ্যে বাস করা সমান কথা। আর এত বড় আহাম্মক বর্তমান শিবির কর্মীরা নয় যে তারা পাকিস্তানের জন্য জীবন বিলিয়ে দেবে।
তবে তারা যা করছে তা জনাব জয়ের কথায় যেমন ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে সহিংসতার মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত পথে একটা কিছু অর্জন করতে চাচ্ছে। আর তা ক্ষয়ে পচে যাওয়া বিকৃত মস্তিস্ক প্রসূত যুদ্ধাপরাধীদের মস্তিস্ক হতেই উদ্ভূত। তাই যুদ্ধাপরাধীদের ছায়ামূর্তি যতদিন তাদের না ছাড়বে, ততদিন তারা এ পথ পরিহার করতে পারবে কি না তা সময়েই বলে দেবে।
অনেককেই বলতে শুনি জামাতে ইসলামী যে ইসলামের কথা বলে তা মওদুদীবাদ যা ইসলামের সাথে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য বজায় রাখে না। আমি যেহেতু ইসলামী পণ্ডিত বা ধর্মীয় জ্ঞানহীন তাই এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য করার দৃষ্টতা বা অধিকার রাখি না। তবে ছোটকাল থেকে শুনে এসেছি ইসলামের নাকি ৭২ টা দল হবে তাঁর একটা শুধু খাটি হবে, বাকীরা ভুল পথের অধিকারী। সেই একটি দল কারা হবেন সেটাই জানবো কার কাছে? আমাদের দেশে একজন আলেম বা পীর যখন আরেকজন পীরকে ধর্ম বিষয়ে গাল দেয়, তখন শঙ্কায় পরে যাই যে সঠিক পথ কারটা।
আমি আমার আগে যে বাসায় ভাড়া থাকতাম,তাঁর মালিক পীর। একথাটা আমি বাসা ভাড়া নেবার আগেই টু-লেট দেখে বাসা খুজতে গিয়ে বাসার কেয়ার টেকারের কাছে জানতে পারি। তিনি একজন সরকারি চাকুরিজীবিও বটে। শুনে মনটা আনন্দে ভরে উঠল। উনি আমার কড়া ইন্টারভিউ নিলেন টেলিফোনের মাধ্যমে। আমার সব জেনে উনি খুশি মনেই আমাকে বাসা ভাড়া দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। যথা সময়ে বাসায় উঠলাম। টুকটাক বিদ্যুত লাইনের সমস্যা থাকায় বাসার কেয়ার টেকার আমার বাসায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান নিয়ে এসে সব ঠিক করে দিল। আমার ড্রয়িং রুমে হারমোনিয়াম তবলা দেখে সে অনেকটা খুশি হয়ে প্রশ্ন করল, স্যার আপনি গান করেন না ছেলেমেয়ে। বললাম টুকটাক সবাই। সে বলল স্যার খুব খুশি হবেন।
আপনার স্যার খুশি হবেন মানে, পীর মানুষ আবার গান বাজনায় খুশি হবেন, তা কি করে হয়।
আমাদের মাহফিলে আমরা গান বাজনা করি এবং মাসে দু বার আমাদের মাফফিল হয় এবং স্যারের পক্ষ থেকে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মাহফিল সব সময় শুক্রবার রাতে হয়।মাহফিলের দিন সকল ভারাটেদেরকেও দাওয়াত করা হয়।
যাক, কৌতূহলে অপেক্ষায় থাকলাম মাহফিলের দিনের জন্য, তবে প্রথম মাহফিল আমি যোগ দিতে পারিনি ঢাকার বাইরে থাকার কারনে। পরের মাহফিলে সন্ধ্যা সাড়ে আটটার দিকে পাজামা পাঞ্জাবি পড়ে, আতর সুগন্ধি লাগিয়ে গেলাম। উনি আমাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসালেন। সবাইকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মাহফিলের মাঝখানে একখানা পর্দা যার এক পাশে পুরুষ ও অন্য পাশে মহিলারা বসেন। তবে উনার উচু আসন চকিতে বসে উনি দু দিকেই দেখতে পারেন।
যাক এক সময় মাহফিল আরম্ভ হল, উনার ভক্তরা আসছেন এবং যার যা খুশি উপহার দিচ্ছেন। উনি সৌজন্য বশত বলে যাচ্ছেন কি দরকার ছিল, বলেই বিশাল আলখাল্লার পকেটে ডুকাচ্ছেন। ঘন্টা খানেক বাদে একজন নতুন মুরিদকে অন্য একজন পুরাতন মুরিদ সাথে করে নিয়ে এসে বলল স্যার উনি আপনার কাছে বাইয়াত হতে চান। নাম ঠিকানা জিজ্ঞেসের পর পীর সাহেব বললেন জান তো মুরিদ মানে নিজের সব কিছু পীরের কাছে হাওলা করে দেয়া। হ্যাঁ সুচক জবাব দিয়ে উনার হাতে কিছু অর্থ প্রদান করে উনাকে পায়ে ধরে ছালাম ও পায়ে চুমু খেল। আমি যতদুর জানি একমাত্র বাবা মাকে ছাড়া কাওকে পায়ে ধরে ছালাম করা যায় না। আর পায়ে চুমু খাওয়া তা কাউকে করা যায় কি না আমার জানা নাই। তাই অস্বস্থিতে আমার মনটা ভরে গেল। কি করে উঠা যায় তাই ভাবছিলাম। ঘণ্টা খানেক পর অফিস যাবার অজুহাতে উঠার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলাম। যা মনে হল অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে যাবার অনুমতি দিলেন। (চলবে)
ডিসেম্বর,০৩,২০১৪ খ্রীঃ





মন্তব্য করুন