ইউজার লগইন

অচিন দেশে যাত্রা( দ্বিতীয় পর্ব)

স্কুলে আসা যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে কিছু রিফিউজির বসবাস। এরা ৪৭ এ দেশ ভাগের পর ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। এরা দিন মুজুরী, বছর মারী, মাটি কাটা ইত্যাদি আর মেয়েরা বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালায়। রিফিউজি হবার সুবাদে, আমরা যারা স্থানীয় তাদের অনেক অত্যাচার সহ্য করতে দেখেছি। রিফিউজি পল্লীর পাশ দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় জোর কান্নার সোরগোল শোনা গেল। আমার মনে হল কেউ বুঝি মারা গেছে। অগত্যা সাইকেল থেকে নেমে ভিতরে ঢোকলাম। রাস্তার পাশে এলোপাথারি খড়ের বেড়া ও খড়ের চালের ঘর। দুই ঘরের মাঝে চিকন গলি। মাটির কুয়াতে রান্না বান্না ও পান করার পানির ব্যবস্থা। এক আধটা পায়খানা থাকলেও না থাকার মত। প্রাকৃতিক ক্রিয়া কর্ম চলে রাতের আধারে বা দিনের বেলায় ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে একে অপরকে আড়াল করে।
বাড়ির পিছনে কিছু ডাংগা জমি অত্র এলাকার এক জোদ্দারের। আবাদ বলতে কিছু হয় হতো না। তাও জোদ্দার মশাই এই ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে যারা উনার মন জয় করতে পেরেছেন তাদের আবাদ করতে দিয়েছেন। এই পরিশ্রমী লোকগুলোর হাতে জমিগুলো পড়ার পড় যেন জীয়ন কাঠির ছোয়া পেয়েছে। জমির ধারে এবং মাঝখানে কুয়া খুরে পানির ব্যবস্থা করে নানান রকমের সবজি চাষ করে পতিত বিরান ভুমি সুজলা সুফলা করে তুলেছে। সেই ভোর বেলা পুরুষ মহিলা মিলে আরম্ভ হয় জমিতে পরিচর্যা চলে রাত অবধি। কিন্তু এত পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসলের সিংহ ভাগই যায় জোদ্দার সাবের পকেট। তা ছাড়া আরও কিছু স্বার্থ জোদ্দার সাবের যে নেই তা কিন্তু নয়। জমিটা আবাদ করতে করতে, এই ছিন্নমূল মানুষদের রান্না বান্নার ছাই, টুক টাক গরু ছাগল পোষার ফলে তাঁর থেকে পাওয়া বিষ্টা জমিতে সবুজ সার হিসেবে জমিতে দিবে, আর তাতে এক সময় এই ডাংগা জমিগুলোই মহা মুল্যবান হয়ে উঠবে। তখন তাদেরকে উচ্ছেদ করে অন্য জায়গায় বসতি গড়তে বলবে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট অনাবাদি জমিকে আবাদী করার ভাগ্য নিয়ে যারা এ পৃথিবী নামক গ্রহে অবতরণ করেছেন তারা তো তাকে আবাদ যোগ্য করে তুলবেনই। এটাই তারা বিধাতার কাছ থেকে চেয়ে এনেছেন। দুনিয়া,এই দুনিয়াকে যারা শাসন করেন তারা শাসন করেই যাবেন। আর যারা শোষিত বঞ্চিত তারা শোষন ও বঞ্চনার ষোল আনা বয়ে বেড়াবেন। আজ দুনিয়াতে শাসিত ও শোষিত এই দুটি শ্রেণী কোথায় নেই। রাষ্ট্র,রাষ্ট্রে বিভাগে বিভাগে এমন কি পরিবারের ভিতরেও কি নেই?
বাড়িতে ঢুকতেই আমাদের বাড়ির অদুরে আর এক রিফিজি বস্তির মেয়ে যার বিয়ে হয়েছে এই বস্তিতে, তাকেও কান্নায় বিহ্বল অবস্থায় দেখতে পেলাম। আমাকে আবচ্ছা অন্ধকারেও চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরে কান্নার মাত্রা বাড়িয়ে দিল। সে আমার থেকে দুই কি তিন বছরের বড়। এক সাথে অনেক খেলেছি। কি হয়েছে, জামাইয়ের কিছু হইছে। ওকে আমি ছাড়িয়ে হাত ধরে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলাম। দেখলাম ওর বরও কাদছে। তখনই জানতে পারলাম ওদের তিনটা পোষা মোরগ ছিল। জন্তু জানুয়ার না মানুষ জাতীয় কেউ সেটাকে নিয়ে গেছে, তারই জন্য এই মরা কান্না। জামাইয়ের পাঁচ ছয় বছরের একটি বোন মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাদছে। কেউ কিছুতেই থামাতে পারছে না। আমার কাছে সেদিন বিষয়টা অতি নগণ্য মনে হয়েছিল। বলে ছিলাম খুঁজে দেখেন পিছনের জংগলে বা আশ পাশের কারো বাড়িতে,পেয়ে যাবেন হয়ত। নাই ভাই পামু না, এইডা শিয়ালেও নেয় নাই, বিজিও নেয় নাই। এইডা মাইনসে র কাম। হায়রে আমার কি সর্বনাশ করল। আমার কত দিনের সাধের পোষা মোরক। চাইছিলাম এইবার একটা মোরগ জিন্দাপীরের মেলার সময় পীরের নামে মানত দিব। আহরে, আমার কইলজাডা ফাইট্টা যাইতাছে। এই তুই আইজ কামে গেলি ক্যা? বলে ওর বউয়ের দিকে তেড়ে আসে। আমি আছি তাই অর্ধ পথেই ক্ষ্যান্ত দিয়ে ওর মার প্রতি চেঁচিয় উঠে। ওর মা এমনিতেই কাঁদতেছিল আরও জোরে কান্না জুরে দিল। আমারে তুই শাস্তি দে, আমি লোভে পইড়া আইজ কামে গেছিলাম। নাইলে এত বড় সর্বনাশ অইত না। কালাম্মিয়ারে, আমারে তুই শাস্তি দে। বইলাই মা পোলারে জড়াইয়া ধরে দুইজন আঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল। আমি খতেজা বেগমকে বললাম। আমি যাইরে, রাত হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা তুমি সাবধানে যাইও ভাই।
আমি সাইকেলে চড়ে ভাবছিলাম একটা মোরগের জন্য এত কান্না কাটি। কিন্তু যেদিন থেকে রোজগার করতে শিখেছি সেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি, অর্থ কি জিনিস,কত কষ্ট করে টাকা ইঙ্কাম করতে হয়। কষ্টার্জিত পয়সা খোয়া গেলে কেমন লাগে। আমার হয়ত দশ লাখে যে কষ্ট লাগবে, সেই সময়ের সেই সাত্তার মিয়ার হয়ত একটি মোরগ খোয়া যাওয়াতেই সেই পরিমাণ কষ্ট লেগেছিল। ( চলবে)
জানুয়ারী,২৭,২০১৪ খ্রীঃ

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আহসান হাবীব's picture


বাংলাদেশ

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


পড়ছি, Smile চলুক...

আহসান হাবীব's picture


ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।