পচাশি বছরের যুবক যাবেদ আলী (প্রথম পর্ব)
আশি বা পচাশি বছরের যুবক। নাম যাবেদ আলী। আমার ড্রেইনেজ কন্ট্রাকটর। প্রথম যে দিন আমি তাকে দেখি রিতিমত আবাক হয়েছিলাম। লম্বায় প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি, কাশ ফুলের মত দাড়ি গোফ ও মাথার চুল শরীরের রংগের সাথে মিলেমিশে একাকার। তদুপরি সাদা পাঞ্জাবি আরব্য উপন্যাসের জ্বিনের বাদশাহদের কথা মনে করিয়ে দেয়। পচাশি বছরের জাবেদ আলীকে ক্ষনিকে আমি ১৫ থেকে বিশ বছর বয়সের এক যুবকের প্রতিচ্ছবিতে দেখতে লাগলাম। আল্লাহ্ তায়ালা সকল মানুষকে সুন্দর অবয়বে তৈরী করেছেন। তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এই জাবেদ আলীর যৌবনের দ্যুতি চলন্ত পথের সাথিদের বা অন্দর বাহির বা কোন আড়াল থেকে দেখা দৃষ্টিকে কি এলো মেলো করে দিত না। কেউ কি মহান সৃষ্টি কর্তার এই মহান সৃষ্টি দেখে বলত না
“তোমার সৃষ্টি পানে যদি চাওয়া হয় চোখ সুন্দর হয়।
তোমার নামে যদি গান গাওয়া হয় গান সুন্দর হয়।“
পরিচয় পর্ব শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে বলে দিলাম,আপনি সকল বিষয়ে উনার সাথেই কথা বলবেন। সেদিন আর জিজ্ঞেস করা হয় নাই, এই বয়সে আপনি কেন কাজ করেন?
শুধু কি কাজ করা…...! আমার অন্য কোন কন্ট্রাকটরকে কখনো নিজের হাতে কাজ করতে দেখিনি।
আমার প্রজেক্টের আউটলেটের সর্বশেষ ম্যানহোলের গভীরতা প্রায় ১৫ফুট। ৮" থেকে ৫ ফুট ব্যাসের আর সি সি পাইপের ড্রেইনেজ লাইনের কাজ সম্পর্কে যাদের ধারনা আছে উনারা তো বুঝতেই পারছেন আর যাদের এই বিষয়ে ধারনা নেই তাদেরকে সবিনয়ে জানাচ্ছি যে কাজটা অনেক কঠিন। তাছাড়া পাওয়ার প্লান্টের কাজের উপর সরকারের সময় বিষয়ে বিশেষ নজরদারী থাকার কারনে তা মরার উপর খারার ঘা হয়েছে।
এক্সাভেটরে মাটি কাটা আরম্ভ হ য়েছে। এক্টা এক্সকেভেটর সারাদিন এবং অর্ধ রাত অব্দি মাটি কাটছে, আর সংস্লিষ্ট প্রকৌশলীকে সিডিউল মোতাবেক পাইপ বিছানো, ম্যানহোল,গালিপিট তৈরী করণ, তাদের কভার লাগানোর জন্য অজুহাতের কোন সুযোগ নাই জানিয়ে জোর তাগিত দেয়া হল।
পৃথিবীর কোথায় সিডিউল করে বা বলে দিলেই কাজ হয়ে যায় তা আমার মনে হয় না। তত্বাবধান পাল্টা তত্বাধান ছাড়া এ রকম চেলিংজিং কাজ হওয়া সম্ভব না। তারই অংশ হিসেবে আমি দিনে বার দুয়েক যে কোন সময় প্রজেক্টে যাই।
প্রথম দুই তিন দিন লক্ষ্য করলাম,ক্রেনের সাহায্যে পাইপ নিচে নামানো হচ্ছে তো শ্রমিকদের সাথে জাবেদ মিয়া নিজে থেকে সব কাজে হাত লাগাচ্ছে। কি পাইপ জোড়া দেয়া, লাইন ঠিক করা, স্লোভ বরাবর করা, কম্পেকশন ঠিকমত হয়েছে কিনা কিউ সিকে দিয়ে চেক করিয়ে নেয়াসহ যাবতায় কাজ নিজে করত এবং শ্রমিকদের দ্বারা করিছে নিত।
সয়দাবাদ রেল ষ্টেশন। পাওয়ার প্লান্টের জন্য ফুয়েল রেলওয়ে ওয়াগন থেকে আনলোড হয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পাওয়ার প্লান্টে আসবে। মাটির নীচে রেল লাইনের ধারে কৃত্রিম তেলের আধার এবং পাম্পিং করে প্লান্টে পাঠানোর কম্পিউটারাইজড পাম্প স্টেশনসহ যাবতীয় কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। পাম্প ষ্টেশনের বাহিরে নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতর সবুজায়নের লক্ষে কিছু ঘাস লাগানোর জন্য ডাইরেক্টর আশরাফ সাব বলে গিয়েছিলেন। রেজাউল করিম (হাজি সাহেব) লজিস্টিক ম্যানেজারকে সাথে নিয়ে ল্যান্ড স্ক্যাপিং করার জন্য কি পরিমান মাটি ও ঘাস লাগবে তার একটা খসরা করে নিজেই পিকআপ চালিয়ে ফিরছিলাম। দেখি পেলোডার দিয়ে আর সি সি পাইপ গুলো নিয়ে যাচ্ছে সাইটে, আর ৮৫ বছরের যুবক জাবেদ আলী বাসের হেল্পারের মত পাটাতনে দাড়িয়ে আছে। তার অংগ বংগি দেখে মনে হচ্ছিল যে, সে এত আনন্দ পাচ্ছে যেমন আনন্দ কোন রেস জেতার পর অংশ গ্রহন কারী পেয়ে থাকে। মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি তার সম্পর্কে জানার তীব্র আকাংখা আমায় পেয়ে বসল। পিকআপ পার্ক করে প্রায় সব জান্তা হাজী সাবকে নিয়ে আমার অফিস কক্ষে প্রবেশ করলাম।
হাজী সাবকে প্রশ্ন করলাম জাবেদ আলী সম্পর্কে কিছু বলুন। কেন এই বয়সে এত কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন। তার কি কেউ নাই। জাবেদ আলী এই প্রথম না আরও অনেক প্রজেক্টে কাজ করেছে।হাজী সাবও প্রায় দুই দশক এই কোম্পানিতে তাই সহজে উনার কাছে অনেক উত্তর পাওয়া যায়।
জাবেদ আলীর বর্তমান বাস ঢাকার মাদারটেকে।সেখানে তার নিজস্ব বাড়ি। দুই ছেলে বিভিন্ন পেশায় জড়িত।তিন মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন শেষ করে সংসার ধর্ম পালন করছে । স্ত্রী আছেন কি না হাজী সাব বলতে পারেন নি, পরে জেনেছি স্ত্রী আছেন। ছেলেমেয়েরা কেউ তাকে কাজ করতে দিতে রাজি না। কিন্তু জাবেদ আলী কাজ ছাড়া থাকতে পারে না।
আমি তখন ঢাকায়। উনার ছোট মেয়ে ও ছেলে এসেছিল নিয়ে যেতে,কাজ করতে হবে না। উনি যাননি। উনি ওদের বলেছেন বাবারে আমি বাড়ীতে বসে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়ব। তোমারা যাও এই কাজটা শেষ হলে আমি আর কাজ করব না।
এই খবরটি আমি কথা প্রসংগে কার কাছে শুনেছিলাম মনে নেই তবে শুনার পর উনার উপর আমার শ্রদ্ধা বাড়ার পাশাপাশি কেমন জানি একটা প্রচ্ছন্ন মায়া পড়ে গেল। সাইটে বা কোথাও দেখা হলেই কথা বলতাম। মাঝে মাঝে আমাদের অফিসের টি ঘরের পাশে একাটি বেঞ্চ রাখা আছে ড্রাইভার ওপারেটাররা বসে চা নাস্তা খায়, ওখানে বসতে দেখতাম।
দিন তারিখ মনে নেই।ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য বের হয়েছি,তার আগে ফ্রেশ হবার জন্য গাড়ী নিয়ে কোথাও একটু ঘুরে আসব। একাউন্টস অফিসের সামনে বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। ছালাম দিয়ে বলল স্যার কিছু টেকা লাঘবো,ঢাকা যামু। দুপুরের দিকে গলা দিয়ে একটু রক্ত আইছিল। ডাক্তার দেখাইয়া পরশু চইলা আমু কামের কোন ক্ষতি অইব না।
আমি কোন কন্ট্রাকটরকে I.O.U বা এডভান্স দিতে চাইলে সংস্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে কিছু নিয়মাবলীর মাধ্যমে দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে আমি একাউন্টসে ডুকে জাবেদ আলীর চাহিদামত টাকাটা দিতে বলে I.O.U ফরম এ সই করে বেড় হয়ে যাচ্ছিলাম। কি জানি মনে হল,ঘুড়ে এসে জাবেদ আলীকে বললাম। আপনার যতদিন লাগে আপনি চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে তারপর আসুন।আপনাকে কাজ নিয়ে ভাবতে হবে না। আমরা দেখে নেব। আমার আবেগ বেশী কম জানি না।বাবাকে হাড়ানোর পর বৃদ্ধ কাউকে দেখলে আমার মাঝে কি হয় জানিনা, জাবেদ আলীকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম অনেকক্ষন। নাস্তা ও চা পানরত সবাই দেখছিল,আমার এ কান্ড। জানিনা ওরা কি ভেবেছে!!(চলবে)
এপ্রিল১০,২০১৪
সিরাজগঞ্জ,





মন্তব্য করুন