ইউজার লগইন

আপনারা বলবেন কি?

ঈদের ছুটিতে খুলনা থেকে দিনাজপুর যাব। বি, আই, ডব্লিউ, টি, এ ঘাটের ইজারাদার, সিলেট থেকে জাহাজে করে আসা মোটা বালি আনলোড এবং কেরিং করে আমার নির্মাণ সাইটে পৌছানোর ঠিকাদার, আওয়ামীলীগ নেতা বাবুল সাহেবকে টিকিট সংগ্রহের জন্য বললাম। উনার বাবা রেলের একজন অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা, তাই উনার জন্য রেলের টিকিট সংগ্রহ করা দুধ ভাত খাবার মতই সহজ ব্যাপার।আগে ভাগে দিন তারিখ জানিয়ে দিলাম যেন উনার জন্য টিকিট পেতে সহজ হয়।
একদিন শুভক্ষন বা কুক্ষন যাই বলি না কেন, ফোন দিয়ে জানালেন স্যার, ঐ দিনের কোন টিকিট নেই।প্রথম শ্রেণী, বাথ, বাথ বাদ দেন শোভন শ্রেণী হলেও সমস্যা নেই।উনি জানালেন আমি মাস্টার সাবের সাথে উনার অফিসে বসে আছি,উনি যেহেতু দিতে পারছেন না, অন্য কোথাও টিকিট পাবার সম্ভাবনাও নেই।
ভাবনায় পড়লেও কাজের চাপে ভাববার সময় টূকুও ছিল না। কি হবে দেখা যাবে এমন একটা ভাব বা অল্প সুকে কাতর অধিক সুকে পাথর যাই বলুন বলতে পারেন।
অফিস থেকে আসার পথে ড্রাইভার মোসলেম মিয়াকে বললাম, তোমাকে হয়ত আমার সাথে দিনাজপুর যেতে হবে। আমরা গাড়ী করে যাব, তুমি ট্রেনে ফিরে আসবে। আমি আসার একদিন আগে জানাব, তুমি চলে দিনাজপুর (হিলি) আসবে,আবার আমরা গাড়ি করে ফিরে আসব।
স্যার আপনি অনুমতি দিলে, আমি আগামী কাল একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। ও পরদিন সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমাকে ফোন করে জানাল স্যার টিকিট পাওয়া গেছে। তবে কিছু টাকা বেশী দিতে হবে। কোন সমষ্যা নেই নিয়ে এসো। বলা বাহুল্য সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে কোন এসি বাথ নেই।
নির্ধারিত দিনে আমার সাথে আমাদের কোম্পানির সবচেয়ে সিনিয়র প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার জনাব রুহুল আমিন আমার সাথে স্টেশনে এলেন। ড্রাইভার মোসলেম ও জনাব রুহুল আমিন আমাকে ট্রেণ না ছাড়া পর্যন্ত সঙ্গ দিলেন। যাত্রা পথে নিঃসঙ্গতা কাটাতে এই রকম সঙ্গীর সঙ্গ তুলনা হয় না। কিন্তু সে দিন আমার ভাগ্য অতীব সুপ্রসন্ন বলতে হবে। স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি,দেখি ব্যাচিং প্লান্ট অপারেটর মেহেদীসহ প্রায় জনা পঞ্চাশেক শ্রমিক একই ট্রেণে যাবার জন্য অপেক্ষা করছে।ট্রেনেও ওরা প্রায় সকলে আমার পাশের বগিতেই উঠল। কারও সিট ছিল কারও টিকিট ছিল, সিট ছিল না। তবে সংখ্যায় অনেক হওয়াতে ওদের সমষ্যা হয়নি।
বিভিধ অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ ড্রাইভার মোসলেম মিয়া আমাকে সালা দিলেন, স্যার গরম তো অনেক, প্যান্ট সার্ট খুলে থ্রি কোয়ার্টার আর পাতলা একখানা গেঞ্জি পড়ে শুয়ে পড়েন। আরামে যেতে পারবেন। আমার পরামর্শটা মন্দ লাগল না।
ট্রেণ ছাড়ার সময় হলে জনাব রুহুল আমিন ও মোসলেম মিয়া অগ্রিম ঈদ মোবারক জানিয়ে প্রস্থান করলেন। আমি আমার সহযাত্রী কখন আসবে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
আধ ঘণ্টা পর টিকিট চেকার এক ভদ্রলোককে সাথে করে এলেন, চেকার সাহেব আমার টিকিট চেক করে দেখলেন ঠিক আছে। ভদ্রলোক বললেন, উনাদের পাশের রুমে একটা বাথ আছে আমি যদি ওই বাথটাতে যাই তবে উনারা পারিবারের সবাই মিলে একসাথে যেতে পারবেন। আমি কোন দ্বিধা না করে রাজি হয়ে গেলাম। অগত্যা আমার ছেলেদের ডেকে আমার জিনিস পত্র আবার পাশের রুমের বাথে নিতে হল।
ট্রেণ চলছে, ব্রড গেজ লাইনে ট্রেন একটু জোরেই চলে। আমার বাথটি ট্রেন চলার গতির উলটা দিকে তাই প্রাকৃতিক বায়ু সাথে কৃত্রিম বায়ুর গতি মিলে গতি বাড়িয়ে আমার শরীরে আছড়ে পড়তে লাগল। আমিও বেশ আরাম বোধ করতে লাগলাম। অন্ধকার রাতে চলন্ত ট্রেনের গতিময় আলোর বিচ্ছুরণ, সাথে অনবরত নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ট্রেনের চাকার সাথে লাইনের ঘর্ষন হেতু ডাকাস ডাকাস শব্ধ মন্দ লাগছিল না।তবে আমার মতে ভাল লাগা মন্দ লাগা একজন মানুষের তার সেই সময় কার মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। মানসিক অবস্থা ভাল হলে যে কোন পরিবেশটাই মধুময় হয়ে উঠে। যা শুনা বা দেখা যায় তাই ভাল লাগে।
আমি নয় কি দশ মাস পর মুক্তি পেলাম। হ্যাঁ মুক্তিই বলব, কোরবানীর ঈদের পর এসে সেই যে কাজ ও দায়িত্ব নামক জেলখানায় প্রবেশ করেছি, আজ যেন ৭৫ ভাগ মুক্তি পেলাম। ৭৫ ভাগ মুক্তি ক্যামনে বুঝলেন না।
আরে ভাই কর্মস্থল থেকে শরীরটা রেহাই পেলেও সেল ফোনের মাধ্যমে যে অফিসিয়াল কাজ তার থেকে কখনও কি মুক্তি পাওয়া যায়। যাই হউক, এটাই বা কম কিসে? এই ৭৫ ভাগ মুক্তিই আমার কাছে সব কিছুকে মোহনীয়, সুর ও সংগীতময় করে তুলেছে।কত শত গানের সুরেলা স্থায়ী ও অন্তরা যে আমার মস্তিস্ক ও ঠোট ছুয়ে যাচ্ছে বলতে পারব না। তবে কেন জানি একটাও ধরা দিচ্ছে না। চলন্ত ট্রেনের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে একটার পর একটা বৃক্ষ হারিয়ে যাচ্ছে, আর আমি বৃক্ষ রাজির ফাঁকে ফাঁকে নিকষ কালো অন্ধকারে আমার মন ও মস্তিস্কে ছুয়ে যাওয়া সুর লহড়ি থেকে তার মর্মার্থ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। পারছি কি? না পারছি না,
আমার মন কেমন করে
কে জানে,
কে জানে,
কে জানে,
কাহার তরে।।
আমার মন কেমন করে (রবি ঠাকুর)
আমি সময়ে অনেক দুর্বল মানসিকতার এক ব্যক্তি, কেন জানি কিসের তরে এই সময় মনটা নিজের কাছে আরও দুর্বল হয়ে ধরা দিল। এমন সময় নাকি কবি সাহিত্যিকরা অসাধারণ কিছু একটা লিখে ফেলে। কিন্তু আমি তো আর কবি সাহিত্যিক নই তাই লেখার মত কিছুই মনে আসছে না।
সজোর ধাক্কায় দরজা খুলে ২৭-২৮ বছরের এক ব্যক্তি আমার কক্ষে প্রবেশ করলেন। সুডাম দেহ, মধ্যম উচ্চতার, স্বচ্ছলতার কিছুটা ছাপ অবয়বে বিদ্যমান। আমার বাথ নিচে উনার বাথ উপরে। তবে যেহেতু পাশের নিচের বাথের যাত্রী এখনও আসেন নি তাই যশোর পর্যন্ত আসার সম্ভাবনা আর নেই, তাই নিচের বাথেই উনার হালকা গাট্টি বোচকা রেখে বসে পড়লেন। একটু সুস্থির হবার পর আগে কথা বললে ছোট বা বড় হবার তোয়াক্কা না করে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
কোথায় যাবেন?
সৈয়দপুর।
সৈয়দপুর কোথায় বাড়ি?
না বাড়ি ঠাকুর গাও এ।
ঠাকুরগাও কোথায়?
আশ্রম পাড়া।
খুজতে খুজতে আমরা কোন আত্বীয়তার সম্পর্ক খুজে না পেলেও আমার অনেক পরিচিত আত্বীয়কে উনি যে যেমন চেনে, আমিও তার অনেক আত্বীয়কে চিনলাম।
বুফে ওয়েটার এলে উনি চায়ের ওর্ডার দিয়ে দিলেন। যেন অনেক দিনের পরিচিত, কিছু জিজ্ঞেস করার ও প্রয়োজন নেই।
যশোর পার হলাম, আর কোন সহযাত্রী এলেন না। এক সময় ঈর্শরদী নাটোর সান্তাহার আরও কিছু স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিয়ে জয়পুরহাট এসে ট্রেন থামল।কিন্তু এখনও ঐ বাথ দুটোর যাত্রী এলেন না।
ততক্ষনে রাতের আঁধার হাড়িয়ে দিনের আগমন ঘটেছে। আমি জয়পুরহাট নামব কি নামব না ভাবছিলাম। কারন সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের হিলিতে স্টপেজ নেই। কিন্তু সকালে বাস পেতে কষ্ট হবে তাই হিলি পার হয়ে বিরামপুরে নামব স্থির করলাম।
ট্রেন জয়পুর ছেড়েছে। ছুটে চলেছে তার আপন গতিতে। পরবর্তী স্টেশন পাঁচবিবি। থামল না। হিলির কাছাকাছি আটাপাড়া পার হয়ে কিছুদুর আসার পর ট্রেনের বাঁশি বাঁচতে লাগল। সকালের নিরব নিস্তব্ধ পরিবেশকে বিদুরিত করে বিশাল ট্রেন তার বিশাল গলা ছেড়ে যেন চিৎকার করে কান্না করছে। কাওকে নির্দয় ভাবে পেটালে যেমন চিৎকার করে কাঁদে, ঠিক তেমনি। আমার মনে হচ্ছিল সে যেন বলছে। আমাকে ছেড়ে দাও আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মরে যাচ্ছি। বুঝতে পারলাম ব্যাকুম খুলে ফেলেছে। তাই ট্রেন যেতে পারছে না। অংগ হানির ব্যাথায় তাই ট্রেন বাবাজি কাঁদছে।
হিলি স্টেশনের আউটার সিগনালে এসে ট্রেন থেমে গেল। আমি অপ্রত্যাশিত সুযোগ পেয়ে তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। রেল লাইনের পশ্চিম পাড়ে ভারত, পূর্ব পাশে বাংলাদেশ। বি এস এফ,বি জি বির সশস্ত্র টহল বিদ্যমান, বাকি আলোচনা নিস্প্রয়োজন।
আমি দু কাঁধে দু ব্যাগ ঝুলিয়ে চলছি। কতদিন এদিকে আসা হয় না। একটি রিক্সার আশায় স্টেশন পর্যন্ত হাটলাম।হাটতে হাটতে ভাবছিলাম, যেখানে ট্রেনের সাধারন বগিগুলোতে তিল ধারনের ঠাই নেই। মানুষ একপায়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘপথ এসেছে। স্টেশন মাস্টার যেহেতু নিজেই ট্রেনের কোন টিকিট দিতে অপারগ সেখানে দুটি বাথ পেসেঞ্জার ছাড়া থাকে কি করে।
আমি সেদিন থেকে অনেক ভেবেছি আজও ভাবছি, কিন্তু কোন উত্তর পাইনি। রেল কতৃপক্ষ বা আপনাদের কারও জানা থাকলে জানাবেন কি?
খুলনা
আগষ্ট,০৪,২০১৪ খ্রীঃ

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।