ডিজিটাল পোলাপাইন

ফুল সে যার বাগানেই ফুটুক না কেন,সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল ভাল লাগার,এর প্রতি ভালবাসা আমার মনে হয় সৃষ্টি কর্তার থেকেই ঐশী দান হিসেবে প্রদত্ত। কি ফুল নাম জানি বা না জানি সেটা বড় কথা না। তার রুপ ও গন্ধ চক্ষুস্মান তো বটেই একজন অন্ধকেও আকর্ষন করে।
আমার পাশের ফ্লাটের ভাড়াটে। দিন দশেক হল উঠেছেন। ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা আর দুটি ছোট্ট ফুটফুটে ছেলেসহ এই হিন্দু পরিবারটি এসেছেন চিটাগাং থেকে। ভদ্রমহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ভদ্রলোক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী।
আমি গত তিন বছর এই ফ্লাটে আছি কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের কোন ফ্লাটের কারো সাথে পরিচয় হয় নি।তবে আমার বউ বাচ্চাদের সবাই চেনে।শুধু চেনেই না। খাবার দাবার ও প্রয়োজনে নিত্য ব্যবহার্য অনেক কিছুই রিতিমত আদান প্রদান হয়।
কারন ঐ একটাই।কোন ভাবি বা বাচ্চার অসুখ বিসুখ কিছু এক্টা হলে আমার গিন্নির কাছে ছুটে আসে। এভাবেই তাদের মাঝে এক্টা সম্পর্ক গড়ে উঠে। যেন তোমায় চিনি সেতো হাজার বছর।
আরম্ভ করেছিলাম পাশের ফ্লাটের নতুন ভাড়াটিয়া অতিথিদের নিয়ে। টিভিতে আই পি এল ফাইনাল ২০১৫ এবং জিম্বাবুয়ে ভার্সেস পাকিস্তানের T20 খেলা দেখায় ব্যস্ত। গিন্নি বলল আমরা (সাথে মৌ) এক্টু পাশের ফ্লাট থেকে আসি। যাও এ আবার তেমন কি? মিনিট পাচেক পরেই কমান্ডো স্টাইলে একটা পৌনে দুই অন্যটা দুই ফুট উচ্চতার দুই কমান্ডো দড়জা ঠেলে ঘরে ঢুকেই যে যেটা সামনে পাচ্ছে তুলে নিচ্ছে।আবার যথাস্থানে রেখে আরেকটা ধরছে। আমি ডাকলাম, দুজনেই একসাথে এল। নিঃসংকোচে নাম বলল।
আবার নতুন উন্মাধনায় মেতে উঠল। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় ভংগুর ঠুনকো অনেক খেলনা থাকলেও কোনটাই ওই ভাংগা ভাংগির সীমার ধারে কাছেও গেল না। কিছু একটা খোয়ানোর যে ভয় ছিল এখন সে ভয়টা তিরোহিত হল।
যাক এতক্ষনে মৌ ও গিন্নী চলে এসেছেন আমিও বুঝতে পারলাম ফুলের মত ফুটফুটে এই কচি বাচ্চা দুটির প্রতি ওদের ভালবাসার সহজাত আকর্ষনই ওদের আকৃষ্ট করেছে।
জুনায়েদের পরের দিন থেকে পরীক্ষা। সেও পড়ার ঘর থেকে বের হয়ে এসে অল্প সময়ের জন্য ওদের সাথে শিশু কিশোর কেলিতে মেতে উঠল।
আমি বেডে শুয়ে খেলা দেখছিলাম। দেড়ফুটি ছোটটাকে একবার দুই পা দিয়ে চেপে ধরলাম। অন্য বাচ্চা হলে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিত। না তেমন কিছু নয়, হা হা করে হেসে,একটু জোড় খাটাল মাত্র। আমিও আচমকা ছেড়ে দিয়ে, বললাম হায় হায় রে ছুটে গেল যে, দেড় ফুটি নিজের কৃতিত্ব মনে করে আবার সেকি হাসি আর ছুটাছুটি।
সঙ্গীত চর্চা কে না করে। সবাই বাথ রুম সিংগার জীবনে একবার হলেও হয়েছে। স্কুল কলেজে স্যারদের ক্লাসে আসার ফাঁকে অথবা টিফিন পিরিয়ডে টেবিল চেয়ার চাপড়িয়ে গাওয়া কত গান কত সুর যে তাদের তাদের তিরস্কিত হবার ব্যাথায় ব্যথিত হয়ে আকাশে বাতাসে কেঁদে মরছে।, আবার যাদের সামর্থ্য নেই তারা মাটি, সিলভার বা কাসার কলসিকে তবলা করে কত সঙ্গীত চর্চা করেছে। বাসে চলতে সামনের সিটে এমন কি এক হাতকে তবলা বানিয়ে মনে মনে সঙ্গীত চর্চার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করেছি।
সৃষ্টিকর্তার দান আমার এই শরীর খানা বহু দিন থেকেই মাঝের অংশ সামনের দিকে কেন্টিলিভার বারান্দার মত বেড়েই চলেছে। এত মানা করি, এই ডর ভয় দেখাই, কিন্তু কে শুনে কার কথা। কিছুদিন রিতিমত হাটাহাটি করলেও, এখনও যা অবস্থা তাতে প্লাম্ব বব বা উলন দিয়ে চেক করতে গেলে চার পাচ ইঞ্চি ফাউল তো করবেই। তা হলেই বুঝেন ঠেলা।
আমার এই বেসাইজ কেন্টলিভার বারান্দা আমার কাছে বিরক্তিকর হলেও দেড় ও দুই ফুটির মনে হয় অনেক মনে ধরেছে। আজ অফিস থেকে এসেই দেখি তাদের অতি প্রিয় আমার মেয়ে মৌ এর সাথে খেলায় মত্ত। আমায় দেখেই দেড় ফুটি এগিয়ে এসে কথা বার্তা নাই, আমার পেট নামক কেন্টলিভার বাদান্দাকে তবলা মনে করে বাজাতে আরম্ভ করল। ক্ষনিকে দুই ফুটিও যোগ দিল। আমি কি ভাবব আর কি বলব, বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে নিজেই নিজেকে বললাম,
এরাই ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল পোলা।
মোঃ আবুল হোসেন
মে ২৭, ২০১৫খ্রীঃ
উত্তরা ঢাকা।





বাচ্চাদের কীর্তিকলাপ সবসময়ই আনন্দদায়ক।
ঠিক তাই। কেমন আছেন মীর ভাই
মন্তব্য করুন