জামাইবাবু সিনড্রোম
১.
পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে পুরুষের জন্য শ্বশুরবাড়ীর ইমেজ কিরকম, বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব অথবা নিজের মুখচোরা স্বভাবের কারণে সেটা বলতে পারছিনা, তবে বাঙালী পুরুষের জন্য এ এক বিরাট মাহাত্ম্য বহন করে। মধুর হাড়ি, মানে শ্বশুরবাড়ীর কথাই বলছি, বাঙালী পুরুষের জন্য এক ভাগ্যগুণে পাওয়া এক বিরাট আশীর্বাদের মতো; স্ত্রীর মতে হাজার দোষে দুষ্ট অকালকুষ্মান্ড লোকটিও শ্বশুরবাড়ীতে গেলে মহারাজা বনে যায়, যদি না সেখানে তার অবস্থানটা কোনভাবে দীর্ঘায়িত হতে হতে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
শ্বশুরবাড়ীর এহেন মধুরহাড়ি প্রকৃতির আচরণের একটা বড়সড় মাত্রার অসুবিধাও আছে। হাড়ির মাধুর্য্যের আতিশয্য থেকে জামাইবাবুর মনে জন্ম নেয়া অতিরিক্ত আহ্লাদ আর আদিখ্যেতাই যার মূল কারণ। যেজন্য দেখা যায় যে, অন্যসব সময়ে শ্বাশুড়ী মহাশয়ার তৈরী নানাবিধ ঘ্রান আর স্বাদে সমৃদ্ধ মেন্যুগুলো গিলতে গিলতে জামাইবাবুর করুণদশা হয়ে গেলেও, শ্বশুরবাড়ীর উৎসবগুলোতে তাঁর কপালে কিছু জোটেনা; ব্যাপারটা আরেকটু ভেঙে বলি।
আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটা কথা বলে, "শ্বশুরবাড়ীর বিয়ের খাওন জামাইর কপালে নাই"। না, জামাইবাবুর নিজের বিয়ের খাবারের কথা না, সেটা সাধারণত তারা ভালোই সাবড়ান। এই না জোটা খাবরের ঘটনাটা ঘটে তার সম্মন্ধী-শ্যালক-শ্যালিকাকুলের বিয়ের সময়। দেখা যায়, পুরো বিয়ের আয়োজন জুড়েই জামাইবাবুর সরব এবং অতিউৎসাহী অংশগ্রহন, নিজের করিৎকর্মাগিরি দেখানোর এর চেয়ে ভালো সুযোগ তো তেমন পাওয়া যায়না তাই। হুমকি-ধামকি, হৈচৈ করে জামাইবাবু ফার্স্ট্ক্লাস পারফরম্যান্সে সবাইকে মুগ্ধ করে ফেলেন ঠিকই, কিন্তু শেষমেষ কি যেন একটা ঘটে যায়।
বিশেষ করে জামাইবাবুর আহারের সময় যত ঘনায়, এই "কি যেন একটা"র ঘটার সম্ভাবনাও তত বেড়ে যায়। দেখা যায়, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ জামাইবাবু গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সে ফোলানো এমনই ফোলানো যে হাজার লোকের নানান বন্দনা-প্রার্থনাতেও কাজ হয়না। কখনও কখনও সে বন্দনা-প্রার্থনাগুলো কাজ করার মতো অবস্থাতে চলে গেলেও তখন জামাইবাবুর অতিরিক্ত প্রেস্টিজবোধ সেখানে বাঁধ সাধে, খেতে বসলে কেউ যদি আবার মুখ ফসকে বলে ফেলে, "সেই যদি মল খসালি, ... "।
সূতরাং বিয়েবাড়ীর ম ম করা খাবারগুলো বাঙালী জামাইবাবুদের জন্য অযথাই সুঘ্রান ছড়ায়, সাধারণত এরকম উৎসবে বেচারাদের কপালে জোটে একবেলার উপোস। অবশ্য অনেক মায়াবতী শ্বাশুড়ীআম্মা পরে সেটা পুষিয়ে দেন, আবার নতুন করে জামাইবাবুর জন্য পোলাও কোরমা কালিয়া কোফতা রান্না করেন, মুফতে শালাশালীদের কপালেও জোটে সেসব। জামাই রাগ করলে শালাশালীদের তাই খুব একটা ক্ষতি হয়না, এজন্যই হয়তো আবহমান বাংলায় এই রীতি চলে আসছে। হয়তো দেখা যাবে, আরেকবেলা বেশী পোলাও-কোর্মা গেলার জন্য বদমাশ শালা-শালীরাই বিয়ের অনুষ্ঠানে জামাইবাবুকে খেপিয়ে তোলে -- তবে এই উপসিদ্ধান্তের যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব আপাততঃ সমাজবিজ্ঞান বা গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের গবেষকদের জন্যই তুলে রাখি।
এটা তো গেলো সাধারন জামাইদের কথা। অনেক জামাই আছে এতই কপালপোড়া যে নিজের বিয়ের খাবারটাও বেচারার কপালে জোটেনা। আমার এক মুরুব্বীগোছের আত্মীয়ার বিয়ের কাহিনী, ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, বলি।
তখন বিয়ের খাওয়া কনের বাসাতেই হতো, এখনও গ্রামদেশে সেটাই বেশী হয়। অতিথিদের খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ হবার পর জামাইবাবুকে এনে বসানো হলো, খাবারও দেয়া হলো। কিন্তু এর পরপরই দেখা গেলো জামাই নেই, উধাও! কোথায় গেলো, কোথায় গেলো? হৈ হৈ রৈ রৈ অবস্থা!
কিছুক্ষণ পর এক পিচ্চি আবিস্কার করলো যে পাগড়িপরা জামাইবাবু বাসার সামনে যে রাস্তা সেখানে সজোরে পা ফেলে রীতিমতো "ধপ্ ধপ্" শব্দ করে পায়চারী করছে। সম্ভবতঃ এমন শব্দ করে পায়চারী করার পরও একটা বাচ্চাকেই কেন তাকে আবিস্কার করতে হলো, সে নিয়ে তার রাগ আরো বেড়ে গিয়েছিলো। যেটাই হোক, তিনি কিছুতেই খাবেননা।
কি হলো? কি হলো? জামাইবাবুর এতো রাগ কেনো? অনেক গুঁতোগুঁতির পর জামাইয়ের কোন এক করিৎকর্মা বন্ধুর মাধ্যমে জানা গেলো যে মহান জামাইবাবুর পাতে গোটা মুরগীর রোস্ট না দেয়ার ফলশ্রুতিতেই এই রাগ! কি আর করা! গোটা মুরগী ধরে এনে জবাই করে রান্না করা তো আর সম্ভব না এই রাতের বেলায়! নিরূপায় হয়ে মুরগীর রোস্টের হাত-পা-মাথা-বুক-গিলা-কলিজা সব জোগাড় করে জোড়া দিয়ে গোটা মুরগী সাজিয়ে আবার নতুন করে জামাইর খাবার দেয়া হলো। কিন্তু ভাঙা হাড়ি জোড়া লাগা কি এতই সহজ! জামাই মশাই খেলেনই না।
অবশ্য জনশ্রুতি আছে যে পরে রাতের বেলায় খিদের চোটে মরতে বসা জামাইবাবু নাকি নববিবাহিতা স্ত্রীকে বলেছিলেন যে, "বিস্কুট-চানাচুর যা কিছু" থাকে, কিছু একটা জোগাড় করে এনে দিতে। গোটা মুরগীর লোভে বিয়ের রাতে বেচারা নিজেই নিজের বেড়ালটিকে মেরে ফেললো।
২.
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অফিসে আমি গিয়েছিলাম অনেক আগে; যতই ছিমছাম ভদ্রগোছের অফিস হোক না কেন, ওটাকে শ্বশুরবাড়ী বলে ভুল করবে এমন আহাম্মক দুনিয়ায় থাকার কথা না। তাছাড়া ক্রিকেট বোর্ডে রাজ্যের সুন্দরীরা এসে জড়োও হয়না যে সে জায়গাকে ভুলে কেউ শ্বশুরবাড়ীর সাথে গুলিয়ে ফেলে দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করতে পারে।
আর বাকী থাকে একটা সম্ভাবনা, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের সুন্দরী এবং বিবাহযোগ্যা কন্যাসন্তানের আধিক্য। তবে সে কারণেও কন্যার বাবাদের অফিসকে শ্বশুরবাড়ী ভেবে বসাটাকে আহাম্মকীই বলবো।
তারপরও মাশরাফি-রকিবুলদের মতো খেলোয়াড়রা ঠিক কি কারণে ক্রিকেটবোর্ডের সাথে শ্বশুরবাড়ীর জামাইসুলভ আচরণ করে, রাগ করে গাল ফুলিয়ে, মুখ বাঁকিয়ে, "খেলবোনা" বলে, ঈশ্বরই ভালো জানেন! নারীর মন না বুঝতে পারলেও, পুরুষের মনও যে তিনি বুঝতে পারেননা এমন কথা এখনও শোনা যায়নি।
মাশরাফি তো তাও এতদিন খেলে টেলে এখন ফর্ম পড়ার পর রাগ দেখিয়ে ভাত খেলোনা, রকিবুলের কপালে যে আমার সেই আত্মীয়ের মতো বিয়ের খাবারই জুটলোনা!
বাছারা, বলি কি, একজন তো বিয়ে করেছোই, আরেকজনও হয়তো খুব শীগগিরই করবা; তো জামাইবাবুগিরিটা শুধু নিজ নিজ শ্বশুরবাড়ীর জন্য তুলে রেখে খেলার মাঠে একটু পেশাদারী হবার চেষ্টা করো।
দিনশেষে তোমাদের পেছনে কিন্তু পাবলিকের ট্যাক্সের পয়সাই খরচ হয়!





কবে যে বিবাহ হবে
।
জামাইয়ের গল্প শেষে ক্রিকেটারদের বাঁশ দেওয়াটা ভাল্লাগছে।
এইবার একটা ফাউ ছড়া :-
বাইরের জামাই মধুসুদন
ঘরের জামাই মেধো
ভাত খাওসা মধুসুদন
ভাত খেসেরে মেধো
আরেকজন আছে বিবাহের চিন্তায়!
অবশ্য জনশ্রুতি আছে যে পরে রাতের বেলায় খিদের চোটে মরতে বসা জামাইবাবু
নাকি নববিবাহিতা স্ত্রীকে বলেছিলেন যে, "বিস্কুট-চানাচুর যা কিছু" থাকে,
কিছু একটা জোগাড় করে এনে দিতে। গোটা মুরগীর লোভে বিয়ের রাতে বেচারা নিজেই
নিজের বেড়ালটিকে মেরে ফেললো......
............জামাই আদর এর দর টা তো একটু বেশি হবেই ।
সেইটাই, তবে সবখানে কি আর দর এক থাকে!
এইটা একটা জাতীয় সমস্যায় পরিনত হচ্ছে
হ,
মাশরাফিরে জাতীয় বড় জামাই আর রকিবুলরে জাতীয় ছোট জামাই ঘোষনা করা যাইতে পারে
লাস্টের খোঁচাটা হেব্বে লাগসে!
ঐ খোঁচার জন্যই এত ইনাইয়া-বিনাইয়া জামাইর কথা পাড়লাম
সেইরাম হইছে
শুকরিয়া
যেইরকম ঘোরায়া নিয়া বাশটা দিলেন... কোন ক্রিকেটার বাশ খাওয়ার আগে পর্যন্ত টের ই পাইবনা... খাওয়ার পরে খালি ভাবব ''ইহা আমি কেন খাইলাম?
''
তবে বিসিবি নামের শ্বশুরকূলে কিছু কোয়ালিফায়েড শ্বশূর থাকলে ভালো হইত ... ঐখানে উপরের দিকের বেশীরভাগতো দেখি রাজনৈতিক চামার ...
নাহ, কোয়ালিফায়েড শ্বশুর থাকলে দেখা যাইবো এগারোজনই জামাই জামাই ভাব শুরু করছে ... তখন ওভারের মাঝখানে কইবো, "খেলবোনা!"
তয়, বিসিবির কর্তাগো যে জমিদারী সিনড্রোম আছে সেইটা ঠিক কইছেন
শ্বশুড়বাড়ি থেকে ব্যাপক মজাদার গরুর মাংস, চিংড়ি ভূনা আর মলা মাছের তরকারী খেয়ে এসে মন্তব্য করতে বসছি... তাই কিছু বললাম না
এইতো আসল জামাইবাবু চইলা আসছেন ...
pankha post!! bepok moja paisi....
off-topic:
vaizan ki summer e deshe jaben?
এখন পর্যন্ত বস্ সামারে দেশে যাওয়ার প্ল্যান নাই ... দেখা যাক ... আপনি যাবেন নাকি?
চমৎকার পোস্ট। সময়োপযোগী।
আমাদের যাবতীয় বোর্ডগুলার (শুধু ক্রিকেট না, খুঁজলে দেখা যাবে প্রায় সবগুলাতেই) মাথায় যারা একবার উঠে পড়েন, তারা বাপ-দাদার সম্পত্তি হিসাবে বোর্ডকে গণ্য করা শুরু করেন। তেনাদেরকে যে এইটা রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেইটা আর মাথায় থাকে না। ফলাফল - দলে কে খেলবে থেকে শুরু করে প্যাভিলিয়নে কে কখন টয়লেটে যাবে সেইটাতেও উনারা নাক গলাইতে চান।
তারপরও, বোর্ডের দোষ আছে ধরে নিয়েই বলছি, রকিবুলের আচরণ শিশুতোষ। টেস্ট দলে জায়গা নিয়া তারপর খেলুম না, এইটা কোন ধরণের ফাইজলামি? এইটা তো পাড়ার ক্রিকেট না, জাতীয় দল। "টেস্টে জায়গা পাইসি কি হইসে, টিটুয়েন্টিতে পাই নাই তাই খেলুম না" - টেস্ট বড় না টিটুয়েন্টি বড়? সত্যিই যদি এই অভিমান থেকে অবসর নেয় তাইলে কোন সহানুভূতি নাই। মজা হবে যদি কয়দিন পরে "আরেকবার সাধিলে খাইব" বলা শুরু করে।
"দলে কে খেলবে থেকে শুরু করে প্যাভিলিয়নে কে কখন টয়লেটে যাবে সেইটাতেও উনারা নাক গলাইতে চান"
হা হা হা, বেড়ে বলেছেন
তবে বাংলাদেশের তো আর ঐরকম গন্ডায় গন্ডায় খেলোয়াড় নাই, তাই এইসব জামাইদের অর্থনৈতিক শাস্তি দিয়া প্যাঁদানি দেয়াই ভালো
এত্ত ঘুড়াইয়া বাশ দিলেন
... টেরই পাইবোনা বস
... সোজা বাশেইতো আজকাল কিছু হয় না 
পোস্ট জট্টিলস
"সোজা বাশেইতো আজকাল কিছু হয় না" -- হা হা হা
জোস হইছে ব্যাম্বুটা!
ধন্যবাদ
হ! রকিবুইল্লা আবার ফিরা আইতে চায় ...
শালারে ২ডা চটকনা দিয়া বাইর কইরা দেওন উচিত
বেচারা নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারলো
বাংলাদেশ টীমে যেহেতু টেস্ট ব্যাটসম্যানের আকাল তাই ওরে আর্থিক জরিমানা করে সুযোগ দেয়া যায়
শশুর বাড়ী আর ক্রিকেট ............কি যে মনে করে আমাগ পুচকে খেলোযাড়গুলো......কি হবে ওদের দিয়ে?
হুমমম ... আজকে সেকেন্ড ইনিংসটা দেখে অবশ্য একটু ফুরফুরে অনুভূতি হচ্ছে
জট্টিল!
থ্যাংক্যু
পড়তে পড়তে শ্বশুর বাড়ী সংক্রান্ত উপাদেয় কিছু বলার চিন্তা ভাবনা করতাছিলাম। শেষে আইসা দেখা এই জামাই অন্য জামাই।
বাশটা ভাল হইছে।
"উপাদেয় কিছু" বলে ফেলেন বস্ ...
ফাটায় দিসেন। আপনার লেখায় পড়ে মনে হয় এক জামাই খাইতে বসতে রাজী হৈসে।
বাঁশ পচন্দ হইচে!
এই জন্যই আজকাল সিস্টেম চেঞ্জ করা হয়েছে , জামাইগুলাও টাইট খাইছে
মন্তব্য করুন