হেমন্তের সন্ধ্যায় আগুন ও আমার স্কুলে প্রত্যাবর্তন !
আমার যখন বছর চার, তখন আমার বাবা জীবিকার তাগিদে প্রবাসে চলে যান । বড় আপু,আমি আর আমাদের সবার ছোটো আনু । মা সংসারের নানান ঝামেলায় সারাদিন ব্যস্ত । বড় আপু তখন ক্লাস টু'তে পড়ে । কিন্তু স্কুলে যেতে যতো অনীহা । তখন আমিও আপুর সাথে বই খাতাবিহীন স্কুলে যেতাম । আমি তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি । দেখতাম আপু স্কুলের কাছাকাছি আসলেই কেমন জানি ভয়ে গুটিয়ে যেতো । এটা ক্যানো করতো আমি বুঝতাম না।
আমার স্কুলে যেতে ভালোই লাগতো । কারণ, স্কুলের পাশেই ছিলো বাজার । আপুর ক্লাশ ছিল ১০টা থেকে ১২টা । স্কুল ছুটি হলেই 'মনা মামার দোকান' থেকেই ২ টাকার তেঁতুল লবণ ফ্রি! ২ টাকার 'RB চকোলেট' (RB চকোলেট টক ঝাল মিষ্টি ছিলো । তখন ২ টাকায় ৮ টা পাওয়া যেতো,এখন প্রাণ কোম্পানি দেখছি এই রকম চকোলেট বের করেছে) আর ১ টাকার মার্বেল কিনে বাড়ি আসতাম । তখন ১ টাকায় মার্বেল দিতো ১৫টা । মুলত , এই খাওয়ার লোভে-ই স্কুলে যেতাম । 'মনা মামার' দোকানে আমরা বাকিতে ই সব কিছু খেতাম । মাস শেষে মনা মামাকে হিসেব করে টাকা দেয়া হতো । তবে আমাদের জন্যে প্রতিদিন বরাদ্দ ছিল ৫ / ৬ টাকা ।
খেয়ে খেয়ে হাঁটছি হঠাৎ পা থমকে গেল । কী ! সামনে যে কবরস্থান । ভয়ে আমাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে । কারণ জোহরের আজানের আগ পর্যন্ত নাকি কবরস্থানের আশপাশ দিয়া যেতে নেই । এইসময় নাকি 'তেনারা' মানুষকে ধরে । আপু আমি আমাদের মামাতো ভাইয়েরা সবাই সবার দিকে ভয়ে হতভম্ব হয়ে একে অন্যের দিকে চেয়ে আছি । হয়তো এমন সময় কেউ এলো । তার পিছুপিছু দৌড়ে দৌড়ে এলাম । নয়তো সুরা টুরা পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে সবাই একসাথে ভোঁ দৌড়ে পগারপার ।
তারপর পিছন দিকে না চেয়ে সোজাপথে হাঁটা । এই কবরস্থান গোলাকার ছিল । আয়তনে বিশাল ছিল , এখন কিছুটা সংকোচিত হয়ে গেছে । স্কুল,মসজিদে,বাজারে কিংবা থানা সদরে যেতে হলেও এই কবরস্থানকে ডিঙিয়ে যেতে হতো । এখন অবশ্য বিকল্প রাস্তা হয়েছে ।
একদিন মা'র কানে গেলো আপু স্কুলে যায় ঠিক ই তবে পড়াশোনায় গোল্লা । মা আমাদের ব্যাপারে একটু সচেতন হয়ে উঠলেন । আমার অবশ্য তেমন ভয় ছিলোনা , আমি তো তখন স্কুলে ই ভর্তি হইনি । আপুর উপর দিয়ে ই যাচ্ছে সব । তবে সে সুখ বছর দেড়েকের বেশি স্থায়ী ছিল না । একদিন আমিও স্কুলে ভর্তি হলাম । ক্লাস ওয়ান থেকে টু'তে উঠলাম ।
মা'র কী জানি হল । কী মনে হল আমাকে স্কুল থেকে ভর্তি করে দিলেন মাদ্রাসায় ! কারন, আমার মায়ের একজন চাচা আমাকে খুব আদর করতেন । উনি নাকি মা'কে বলেছিলেন আমাকে মাদ্রাসায় পড়াতে । তাই এই হুটহাট সিদ্ধান্ত । মাদ্রাসাটাও থানা সদরের কাছে । বড় মামার শ্বশুর বাড়িতে । ওখান থেকে মাদ্রাসায় যেতাম । অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম না আসার জন্যে,লাভ হয়নি । হাকিমের হুকুম নড়েনা ! চোখের জল নাকের জল একসা করে বিদেশ বিভূঁইয়ে এলাম ! তাও মাদ্রাসায় পড়তে ।
ভাগ্য ভালো বলতে হবে । একদিন সন্ধ্যেবেলা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বালাতে গিয়ে আগুন ধরিয়ে ফেললেম । মানে হেমন্তের খড়-বিচালি দিয়ে রান্নাঘরের উঠানে অস্থায়ী রান্নার জন্যে কাঁদা মাটি দিয়ে চুলা বানানো হতো। খড় বিছালি শ্যাষ তো চুলাও শ্যাষ । তো পাশেই খড়ের স্থুপ । খড় চুলার ভিতর ঢুকিয়ে আগুন এনে ল্যাম্প ধরিয়ে ফিরে এসেছি । আসতে না আসতেই সারা উঠান আগুনের লাল শিখায় সন্ধ্যার আকাশ উজ্জ্বল । হৈ চৈ লেগে গেলো । বড় ধরণের কোনো ক্ষতি হয়নি তার আগেই পাড়া প্রতিবেশীরা আগুন নিভিয়ে ফেলে ।
শুধু রান্নাঘরের সামান্য ক্ষতি হয়েছিলো আর তিনটা আম গাছ কিছু ফুল গাছ আর দুইটা কাঁঠাল গাছ পুড়ে গিয়েছিলো । মাদ্রাসার চার মাসের পাঠ চিরতরে চুকে গেলো । আবার সেই আমার চিরচেনা স্কুল। হিজল-জারুল, অশ্বথ, করচ গাছের ছায়া ঘেরা স্কুল । সেই মেঠোপথ,ভাঙ্গা ব্রিজ,ভাঙ্গা সেতু আর ভয় শিহরণ জাগানিয়া কবরস্থান । তারপর আর স্কুল বদলাতে হয়নি । তখন থেকেই দুষ্টুমির ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনায়ও মনোযোগী হয়ে উঠলাম । এখন সেদিনের সেই আগুন লাগানোর কথা মনে পড়লে ভেতর থেকে আপন মনে ই বেড়িয়ে আসে . . .
আহা ! আগুনও মাঝে মাঝে জীবনকে সুন্দর করে তোলে ...
( আরো লিখতেও পারি ...)





আগুনও মাঝে মাঝে জীবনকে সুন্দর করে তোলে ...
লিখেন.......
আগুন কিন্তু জ্বালায়ও বেশি ! তবে আমারে কম জ্বালাইছে
চমৎকার....
সাথে আছি... লিখতে থাকুন
ধন্যবাদ টুটুল ভাই !
মাঝে মাঝে খারাপ কিছু আসলে জীবনে ভালো কিছুই নিয়ে আসে
এখন তো তাই-ই মনে হয় ! কিন্তু বাড়ি ফেরার পর মায়ের হাতে যে মার খাইছি তা জীবনেও ভুলুম না
অবশ্যই
হ ! ঘর দুয়ার পুড়নের পর নতুন ঘর উঠার পর মনে হয় . . . ইশ ! আগুন না লাগলে কী এমুন সুন্দর ঘর বানাইতাম ? এমুনও হয় ! আমার মামার বেলায় হইছিল
লিখেন। হাত পা মন খুলে লিখতে থাকেন।
আগুনটা লাগছিলো বলে হুজুর হওয়া থেকে আল্লায় আপনারে বাঁচাইছে।
তাইতো
আপনার স্মৃতি কথা লেখার ধরণটা ভালো...
ধইন্যা!
মন্তব্য করুন