দুই দশ ১
“মামণি, মামণি”।
মেয়ের আচামকা ডাকে দুপুরের কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে যাওয়ায় মেজাজ খারাপ করে সাথে সাথে জবাব দেন না সিগ্ধা। ‘ডাকুক গে, থাক। এমন অসময়ে কেউ ডাকে? কি এমন মরার দরকার, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দুনিয়া উজাগার করার?’ ভাবতে ভাবতে আবার একটু তন্দ্রামত লেগে আসে। সেই সাত সকালে নাস্তা বানানো, অফিসে নিয়ে যাবার জন্য স্বামীর লাঞ্চের প্যাক তৈরি, বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলে যাবার জন্য তাড়া দেওয়া, তার সাথে আবার ইদানীং যুক্ত হয়েছেন দেশ থেকে আসা শ্বশুড়ও।
প্রথম যখন এখানে সে আর তার স্বামী দু’জনে মিলে পড়ালেখার জন্য ঘাঁটি গাড়ল, তখন সবার সে কি মানা। ‘বিয়ে করেই বৌকে নিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছ!’ কিছু করার ছিল না। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, একই ব্যাচের হলেও শাওন- স্নিগ্ধা কেউ কারো পূর্বপরিচিত না। সমাবর্তনের দিন প্রথম দেখা, সেখানেই পরিচয়। হুট করে একদিন বাসায় বিয়ের প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবে সোজাসুজি মানা করে দিলেও মা’র উৎসাহেই ছেলেপক্ষের সামনে আসা। সেখানে হবু পাত্র হিসেবে শাওনকে দেখে একটু নিমরাজি ভাব, যেটা মা’র “বিয়ের সময় মেয়েদের লজ্জায় রাজি হয়েও নিমরাজি ভাব দেখানো” তত্ত্বে উড়ে যায়। তাই, দু’দিন ছেলে-মেয়েতে পরিচয়ের সুযোগ, ১ সপ্তাহের মাথায় কথা-বার্তা পাকা, আর ১ মাসে বিয়ে।
ঠিক মধ্যবিত্ত বলা যাবে না স্নিগ্ধার শ্বশুড়পক্ষকে। ফ্ল্যাট নেই, কিন্তু গাড়ি আছে; সেদ্ধ চালের ভাত খান না; মধ্যবিত্তের মত মাসের শেষে এসে হিসেবি অর্থব্যয় নেই, কিন্তু অনাবশ্যক খরচে আপত্তি; মধ্যবিত্তের নানাজনের সাথে মানিয়ে চলার যে ক্ষমতা সেটা আর যে ‘ইগো’ সেটাও আছে; গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত যাওয়া হয়না, কিন্তু, তাদের সাথে যোগাযোগ আছে। স্নিগ্ধার সবচেয়ে যেটা ভাল লাগে সেটা হল এদের একান্নবর্তী পরিবার। শ্বশুড়, শ্বাশুড়ি, বড়ভাই, ভাবি, এক ননদ, আর ভাই-ভাবির দুই পিচ্চি নিয়ে সংসার। আর, সবচেয়ে বিচিত্র যিনি, তিনি স্বয়ং শ্বশুড়, মো: মোজাফফর আহমদ। রাশভারি মানুষ, কিন্তু অনাবশ্যক ভাব-গাম্ভীর্য নেই; হাসিঠাট্টা করেন না, কিন্তু সবসময় হাসিমুখ; কিছু চাইলে না করেন না, সরকারি চাকরি করতেন, এখন অবসর। নাতিদের নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, পিচ্চিগুলোও তিনি অন্ত:প্রাণ; বাবা-মা অফিসে আছে, কী বাসায়, কিছু যায় আসে না, তিনি থাকলেই হল। এবং কেন যেন বাসার সবাই; এমনকি ভাবিও তার অন্ধভক্ত। কিছু হলেই সবাই বাবা-বাবা। এত বড় হয়েছে, নিজেও এখন বাবা, তাও বড় ভাই এখনো কিছু করতে যাবার আগে ২ বার মোজাফফর সাহেবের সাথে আলোচনা করেন।
বিয়ের পরপরই শাওনের ছুটোছুটি শুরু। অস্ট্রেলিয়ায় ভর্তির জন্য চেষ্টা করছিল, পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জবাব এসেছে, তাই ভিসা, পাসপোর্ট নিয়ে ছুটোছুটি। কি এক কথাপ্রসঙ্গে শাওনের মাথায় স্নিগ্ধাকেও সাথে করে নিয়ে যাবার পোকা ঢোকা, রেজাল্ট ভালো থাকায় ভাগ্যক্রমে এক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তির সুযোগ হয়ে যাওয়া, নিজের জন্য আগে একবার দৌড়াদৌড়ির অভিজ্ঞতা থাকায় খুব কম সময়ের মাঝেই শাওনের কল্যাণে একই ফ্লাইটে দেশছাড়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন।
এমন সময় হুট করে বেঁকে বসেন শাওনের বাবা। দেশের বাইরে যাবার জন্য অতগুলো টাকার খরচ, ওখানে গিয়েও প্রথম কয়েকমাস চলার খরচ, সব মিলিয়ে একটা বেশ বড় অংক। অত অল্প সময়ে সব টাকার জোগাড় করা মোটামুটি অসম্ভব। এরমাঝে একবার স্নিগ্ধা তার বাবা-মা’র কাছ থেকে টাকা আনার কথা তোলায় একটা বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মোজাফফর সাহেব হঠাৎ করেই তেলে-বেগুনে রেগে উঠেন একথা শুনে। তার পুত্রবধূর পড়ার খরচ তিনি জোগাড় করতে পারছেন না, এটাই যেন তার মনোকষ্টের কারণ। যত যাই হোক, শাওনের শ্বশুড়বাড়ি থেকে কোন অর্থসাহায্য নেবেন না, এ ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার এই হামবড়া ভাব দেখে স্নিগ্ধারও জেদ চেপে যায়। সে যাবেই যাবে। শুরু হয় শ্বশুড়- পুত্রবধূর চাপান-উতর। একদিন হঠাৎ শাওন একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে ফেলে স্নিগ্ধার জন্যে।
যথাসময়ে ফ্লাইট, তারপর তো অস্ট্রেলিয়া। অনেক কিছু ছেড়ে আসা লাগল, সাথে করে এক নতুন ধরনের অনুভূতি সঙ্গী করে আনা “ঘৃণা”। শাওনের বাবার প্রতি ঘৃণা।
‘পত্র পল্লবী’র জন্ম এখানেই। এখানেই বেড়ে ওঠা। পড়াশুনার পর শাওনের চাকরিসূত্রে এখানেই থেকে যাওয়া। আস্তে আস্তে এখানেই থিতু হওয়া। বছর বছর দেশে ঘুরে আসা। গত কয়েকবছর ধরে পল্লবীর স্কুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। তাই, তার দাদা-নানা দু’পক্ষের কারো সাথেই তেমন পরিচিতি নেই। চারিদিকের পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে পল্লবীও চমৎকার ইংরেজি বলে, বাসায় বাংলাটা চালু থাকলেও পল্লবীর এখনো সেটা তেমন একটা রপ্ত হয়নি। তাই, এখনো ‘মা-বাবা’ না বলে ‘মাম্মা/ পাপ্পা’তেই বেশি অভ্যস্ত। এ নিয়ে শাওনের মনে আক্ষেপ থাকলেও তেমন একটা গা করে না। এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন মোজাফফর সাহেবের আগমন। আর এসেই যথারীতি প্রথম দিনেই পল্লবীর মন জয় করে নেওয়া। স্নিগ্ধা খুঁজেই পায় না, কি যাদু আছে উনার মধ্যে? চেনা নেই, জানা নেই, প্রথম দিনেই যে মেয়ে মা’কে ছাড়া একমুহূর্ত থাকতে পারে না, সেই আজ রাতে দাদা’র কাছে গল্প শুনবে বলে তাকে বিদায় করে দিলো? ইতিমধ্যে অনেক দিন হয়েছে, আগের সেই রাগ নেই, অনেকখানি থিতিয়ে এসেছে। তাই কিছু না বলে আগামীকালের স্কুলের কথা মনে করিযে বেরিয়ে আসে।
গত কিছুদিন থেকেই লক্ষ্য করেছে, মোজাফফর সাহেবের সাথে পল্লবী কি নিয়ে যেন ফিস ফিস করছে। জিজ্ঞেস করলেও বলে না। খাতায়ও কি যেন লেখালেখি করছে। সেদিন পল্লবীর স্কুল বন্ধ। তাকে বাসায় রেখে কেনাকাটা করে বাসায় ফিরে দেখে আশেপাশের আরো ১০/১২ জন বাচ্চা ঘিরে রেখেছে মোজাফফর সাহেবকে, আর তার কোলে বসে পল্লবী কি যেন আঁকছে। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ, কেউ আঁকছে, কেউ কাগজ কাটছে, কেউ আঠা লাগাচ্ছে, পুরো ড্রইংরুম যেন একটা স্টুডিও, সব এলোমেলো। তার হঠাৎ প্রবেশ যেন অনাহুত, তাল কেটে যায় সবার, সবাই হা করে সব কাজ বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ, বাচ্চাদের হাঁফ ছাড়ার সুযোগ করে দিয়ে তাড়াতাড়ি অন্য রুমে চলে যায় সে।
হঠাৎ করে কিছু একটা মনে পড়ায় ধরফর করে উঠে বসে সে। এটা পল্লবীর কন্ঠ না? আবার ভাল করে শুনতে থাকে। হ্যাঁ, তাই তো, যে মেয়ে ঠিকমতো মা বলতে পারে না, সেই আজ “মামণি” বলছে। ছুটে বিছানা থেকে নেমে মেয়েকে খুঁজতে থাকে। আওয়াজ লক্ষ্য করে পেছনের উঠানে এসে একেবারে থ হয়ে যায় সে। শোলা আর কাঠ দিয়ে একটা অবকাঠামো তৈরি করেছে সব বাচ্চারা মিলে, তাদের নেতৃত্বে আছে পত্র আর তার নানা। একটু ভাল করে তাকাতেই অবকাঠামোটার একটা পরিষ্কার অবয়ব ফুটে ওঠে তার চোখের সামনে। যে অবকাঠামোর সাথে তার ছোটবেলা থেকে পরিচয়, আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিত্য সখ্যতা, যার জন্য তার মাতৃভূমির নাম পৃথিবীর বুকে অঙ্কিত সেই ভাষার দাবির প্রতি সম্মান রেখে বানানো শহীদ মিনার তৈরি করেছে বাচ্চারা। এই প্রথমবারের মত শ্বশুড়ের প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে তার মাথা। আরেকটু কাছে যেতেই দেখে সবার গালে অ, আ, ক, খ, ১, ২ বিভিন্ন বর্ণমালা আঁকা। দূরে থেকে বাচ্চাদের এই উৎসাহ দেখতে থাকে সে হাসিমুখে।
হঠাৎ করেই সবার মাঝে কিসের যেন সাড়া পরে যায়, সবাই একসাথে লাইন ধরে গাইতে থাকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় সেই গানটি গাইতে থাকে, যে গানটি শুনলে এখনো একই সাথে বেদনা, আর তীব্র সুখানুভূতির একটা মিশ্র অনুভূতির জন্ম হয়। বাচ্চাগুলোর সুরটা ঠিক থাকে, কিন্তু উচ্চারণ বেশ জড়ানো, তারপরও শুনতে ভাল লাগছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের কাতারে গিয়ে নিজেও গলা মেলায়। একহাতে ধরে রাখে পত্র’কে, আরেক হাত রাখা মোজাফফর সাহেবের হাতে। দুই প্রজন্মের মাঝে এক সেতুবন্ধন।





এইটা কি দিলি?? তারকা??

ধইন্যাপাতা।
... দেখা হয়েই গেলো তবে আবার। ...
আরে আরে.. ক্যামন আছেন?
প্রসূনদা সুহানরে এত ইজ্জত দিতাসেন দেইখা ভালা লাগল!
হা হা হা!!
এ কী '০৬ নাকি??
ওই মিয়া ,এরে আপ্নে আপ্নে করেন ক্যান
০
অ এবং অ-আ , মানহানির মামলা দিলে বিপদে পর্বা কিন্তু। লুকজঙ্কে সম্মান দেতে শেখো। বড়দের কাছ থেকে দেখে শেখো...
হ্যাঁ, আমি ০৬ বড়ভাই। ভালো থাকবেন।
এহহহ ! ,যত বড় কীবোর্ড নয় তত বড় কথা
যত বড় কীবোর্ড নয় তত বড় কথা - কথা হবে না, কমেন্ট হবে
গল্প ভালো লাগলো...
ধইন্যাপাতা।
ভালো লাগলো
এত কিপ্টা হইলেন ক্যান?
ধন্যবাদ।
নামটা আকর্ষণীয়, সহজসরল গল্পটাও ভালো লাগলো।
দ্রষ্টব্য: শ্বশুড়->শ্বশুর, সখ্যতা->সখ্য, ধরফর->ধড়ফড়, সাড়া পরে যায়-> সাড়া পড়ে যায়
এত বাঘ-ভাল্লুক থাকলে ক্যামনে হইবে বলেন তো??
আপনের মন্তব্যের উত্তর সেই কবে দিছি, এখন দেখি হাওয়া!!
থ্যাংকু।

শ্বশুর-শ্বাশুড়ি হয় নাই তো এখনো, তাই বানান ভুল।
মুক্ত, ভালো লাগলো গল্পটা। সিম্পল কিন্ত গোছানো লেখা।
ধইন্যাপাতা ভাইয়া।
গল্পটা ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ। নিয়মিত লেখার অনুরোধ জানিয়ে গেলাম
ধইন্যাপাতা।

নিয়মিত লেখার চেষ্টা করি, কিন্তু, আপনার সাথে দেখা হয় না।
হাই মুক্ত!
হাই আপা??
...হুমম, ইমোশন টা টাচ করলো....
এই গল্প কোনোদিন বিখ্যাত হৈলে, রয়ালটি'র সিকি পারছেন্ট তো আমার, না?
এহ!! আপনে যে এত রিকু করলেন, আপনের নামে যেন একটা গল্প লিখি। সেইটা কইছি??
আপনের আবদার রাখছি, আবার রয়্যালটিও চায়!!
খাইতে দিলে বইতে চায়, জান্তাম। এখন দেখি ঘুমানির লিগ্গা নরম বালিশও চায়!!!
ভালো হইছে লেখাটা...
আমার একখালার কথা মনে পড়ল, কানাডাউ জন্মানো, ৭/৮ বছরের না দেখা নাতির সাথে ফোনে কথা বলার জন্যে অজগ্রামের খালার টুকটাক ইংরেজী শেখার কি প্রানান্ত চেষ্টা... যে কিনা দাদু কিচ্ছু বুঝে না বলে ফোন ধরতে চাইত না...
ধইন্যাপাতা।


আমারও বয়স বার্তাছে। 
ঐ বুড়া-বুড়িদের ইমোশানেই খেলো!! কই যে যাই..
আপনে দেখি আমারেও ইমোশনাল কইরা দিলেন।
ভালো হইছে... অনেক....
আপনার একটা মন্তব্য আমার সবসময় মনে থাকে, "মনের এই নরম অংশটা কখনো যেন মরে না যায় কখনো।"
ধইন্যাপাতা।
চমৎকার
আপনের আর কোন কথা নাই??
সবসময় খালি "চমৎকার"
ভালো লাগলো লেখাটা। ধন্যবাদ
আপনার মন্তব্য পেয়ে ভাল লাগলো ভাইয়া।

ধন্যবাদ।
প্রকাশকের সাথে যোগাযোগই করতে পারছি না। ফোন করলে মেলার হৈচৈয়ে কিচ্ছু শোনা যায় না। আমি দেশে গিয়ে তোমার পাওনা দিবো নে ভাইয়া।
হুপ্পিইইইইইইইইইইইইইইইই...

কি মজা।
আগাম ধইন্যাপাতা।
জুশ হইচে ...
পানি দিয়া গুইল্লা খায়ালান!!
এ সবই আমাদের কথা ঘুরে ফিরে । লেখা ভালো লেগেছে
সবাই তো সেই ঘুরে ফিরে পরিবারই.. তাই গল্পগুলোও একই..
মন্তব্য করুন