অনুতপ্ত
তখন মগবাজার মোড় থেকে সূর্যসেন হল পর্যন্ত রিক্সা ভাড়া ছিল ২টাকা। মাসের শেষে খরচের টাকা আনতে বাসায় গেলাম। ্বন্ধুদের মধুর ক্যান্টিনে অপেক্ষা করতে বলে আমি বাসায় রওনা দিলাম। ২ টাকাই ছিল, তাই নিশ্চিন্তে ভাড়া জিজ্ঞেস না করেই রিক্সায় চেপে বাসার সামনে এসে ২ টাকা বের করে দিলাম। রিক্সাওয়ালা আরো ৫০ পয়সা চাইলো। এমনিতে পকেটে আর কোন ফুটা পয়সাও ছিল না তার উপর ভাড়া বেশি চাওয়াতে মাথা বিগড়ে গেলো। ঠাস করে একটা চড় দিয়ে আমি বাসায় ঢুকে গেলাম। একটু পর বাইরে হৈ চৈ শুনে বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি ২০/৩০ জন মানুষ, সবাই রিক্সাওয়ালা খুব চিৎকার করে আমাকে বের হতে বলতেসে।ঢাকা বিস্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের দল বেঁধে ঘুরা টগবগে ভয় ডরহীন যুবকের মনে বিশাল ভীতি জন্মালো এই ভেবে যে বাসা থেকে কেমন করে বের হব, বের হলেই তো পিটিয়ে ভর্তা বানিয়ে দিবে।
তখন মোবাইলের যুগ ছিল না, ছিল ল্যান্ড লাইন, তাও আবার বাবা'র ঘরে, কর্ডলেস নাই, মান্ধাতার আমলের সেই কালো টেলিফোন। অনেক ভয়ে ভয়ে বাবার পারমিশন নিয়ে এক বন্ধুকে ফোন করলাম লালবাগে, ওকে সংক্ষেপে আমার করুন অবস্থার কথা জানালাম, ওর ছিল মোপেড বাইক। ওটা নিয়ে সে ঝড়ের বেগে মধু'র ক্যান্টিনে পৌঁছে খবর দিল বাকি বন্ধুদের। কিছুক্ষনের মধ্যেই ১০/১৫ টা মটরসাইকেলে হাজির হল আমার বন্ধুরা, ওদের দেখে রিক্সাওয়ালারা আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো আর আমিও ওই যাত্রা গনপিটুনি'র হাত থেকে রুক্ষা পেলাম।
সেই ঘটনাটা আমি কোন্ দিন ভুলি নাই। আজ এত বছর পরেও ওই রিক্সাওয়ালাকে চড় মারার অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মাত্র ৫০ পয়সা বেশি ভাড়া চেয়েছিল, তার জন্য একটুও না চিন্তা করে গায়ে হাত তুলে ফেলেছিলাম।
এমন ঘটনা হয়ত আমাদের দেশে সচরাচর ঘটে আর মানুষ পর মুহুর্তেই সেটা ভুলে যায়। দেশে থাকলে আমিও হয়ত এটা আর মনে রাখতাম না , হয়ত আমাকে দিয়ে এমন ঘটনা আর ঘটতো।
দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবনে নিজের কাজ নিজে করার অভিজ্ঞতা আর সব ধরনের কাজের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ থেকেই হয়ত আমার মনে সেই অনেক পুরনো ছোট্ট ঘটনাটা এখনো দাগ কেটে আছে আর তার জন্য খুব অনুতপ্ত বোধ করি। 





দেশ এবং দেশের মানুষ যে কত প্রিয় তা শুধু দেশের বাইরে গেলেই সত্যিকার ভাবে অনুভব করা যায়।
আসোলেই
হুম
মন্তব্য করুন