ঢাকা আমার প্রেম
দুই যুগ ধরে প্রবাসে কাটাচ্ছি। ঘুরে দেখেছি পৃথিবীর অনেক বড় আর বিখ্যাত শহর আর শহরতলী। দেখেছি অনেক সুন্দর প্ল্যান করে বানানো দালান কোঠা আর রাস্তা ঘাট। সব কিছুই ঠিক যেন সিনেমার পর্দার মত। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না আমার প্রানপ্রিয় ঢাকা শহরের তুলনা।
আমার কাছে ঢাকা যেন কিশোর বালকের প্রথম প্রেমের উপলব্দি যা কোন দিন ভোলা যায় না জীবনে। যার সাথে পৃথিবীর আর কোন সুন্দরী নারীর তুলনা হয়না। ঐযে কথায় বলে যার যেথা ঘর। ঢাকা আমার কাছে প্রেম, ভালবাসা, ঘর, মোহ, আবেগ, বেড়ে উঠার সব মধুর স্মৃতি বিজড়িত এক মহা তীর্থস্থান।
কিশোর বালকের বেড়ে উঠার সময়ের মধুর স্মৃতি চিঽ হয়ত আর খুজে পাওয়া যায়না আগের মত। পুরনো শহর আর তার সেই ছোট খাট পুরনো দালান আর তেমন অবশিষ্ট নাই কিন্তু তবুও খুজে পাই সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি যেন ঢাকায় গেলেই বাতাস সেটা উড়ে উড়ে মনে করিয়ে দেয়।
আমার সময়ের ঢাকায় এত মানুষ , গাড়িঘোড়া আর উঁচু দালান কোঠা ছিল না। মানুষ হয়ত এত কৃতিম ছিল না। দেশের রাজনীতি এত বিষাক্ত ছিল না। খাবার জিনিসে এত ভেজাল ছিল না । মানুষও এত পরিমানে ভন্ড আর মিথ্যাচার করতো না।
সেই ছোটবেলা থেকে কত যায়গায় না থেকেছি আমরা ঢাকা শহরে। মতিঝিল কলোনীর ডি টাইপ কোয়াটার, ( কমলাপুরের পাশে যেই বিল্ডিংগুলির পিছন্ দিকে পেচানো সিঁড়ি ছিল )।অনেক পিচ্চি ছিলাম তখন। মা কিছুর জন্য দেয়ালের পাশের দোকানে পাঠিয়ে নিজে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতো আমি ঠিক মত ফিরে আসছি কিনা। প্রায় পাঠাতো দোকানের ফ্রিজে রাখা অনেক ঠান্ডা ফান্টা কিনে আনতে। এত মজার কমলার গন্ধের ফান্টা’র স্বাদ এখনো অনুভব করতে পারি। খেয়ে ফেলার অনেক পরেও যে ঢেকুর উঠতো তার অনুভুতিও চমৎকার ছিল। কমলাপুর স্টেশনের পাশে মেলা বসতো। সেই মেলায় যেতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যেতো। বড়দের হাত শক্ত করে ধরে মেলায় ঘুরতাম। আর অবাক চোখে তাকিয়ে দেখতাম মাটির তৈরি সব হাতি গরু, পাখি থেকে কাঠের ঘোড়া। একটা কিছু কিনে দিলে কত যে খুশি হতাম। মা হাতে ভাংতি পয়সা দিত । মুরালি কিনে খেতাম । পিতলের চার কোনা পাঁচ পয়সা আর ঢেউ তোলা গোল দশ পয়সার কথা এখনো মনে আছে।
মতিঝিল কলোনী থেকে চলে এলাম আমরা বনানিতে। বনানিতে তখন আক্ষরিক অর্থেই ছিল বন আর জঙ্গলে ভর্তি। খুব কম বাড়িঘর ছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল মাওলানা মান্নানের বাড়ি। ঐ বাড়ির ছেলে বাহাউদ্দিন, মনির উদ্দিন আমাদের খেলার সাথী ছিল।ধুতুরা আর লজ্জাবতি লতার গাছে ভর্তি ছিল আশ পাশ। আমরা খেলতাম ধুতুরার ফুল ফুটানো আর লজ্জাবতি লতায় আঙ্গুল দিলেই পাতা বন্ধ করার প্রতিযোগিতা করে। অনেকদুর হেটে গিয়ে গুলশান-১ এর ডি,আই,টি মার্কেটের ইকবাল জেনারেল স্টোরে যেতাম ভাই বোনেরা মিলে ইগলু আইস্ক্রিম খেতে । বনানি বাড়িতে যাবার কিছুদিন পর বড়বোনের বিয়ের পান চিনির দিন মা মারা যান ।আমি অনেক সাত বছরের ছিলাম তখন, কিন্তু কেমন করে যেন আমার সব কথাই মনে আছে। মা’কে বরফ আর চা পাতা দিয়ে ঢেকে রেখে পান চিনির অনুষ্ঠান হয়েছিল। মোনায়েম খান তখন ঢাকার গভর্নর। সেও আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিতর ছিল। তাই মা মরে যাওয়া সত্ত্বেও অনুষ্ঠান বন্ধ হয় নাই। আমরা ছোট ভাই বোনেরা মা’র জন্য খুব কাঁদছিলাম। তাই আমাদের কে বাড়ির পিছনে কাজের মানুষদের ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল যাতে কেউ মা’র মৃত্যুর খবর জানতে না পারে।
বনানি সাত নাম্বার রোড থেকে আমরা অনেক খালি আর উঁচা নিচূ যায়গা ( যেখানে গুলশান -২, ওয়ারলেস গেট) পার হয়ে মহাখালি যেতাম, ওখানে ছিল আমাদের স্কুল “ আদর্শ বিদ্যালয় “। জানিনা এখন আছে কিনা। গরমকালে খালি যায়গা দিয়ে হেটে যেতাম যা কিনা বর্ষা কালে ডুবে গিয়ে টই টম্বুর হয়ে যেতো। তখন আমাদের যেতে হোতো মেইনরোড ধরে হেঁটে।
বনানির এই বাড়িতেই আমার মায়ের কবর। অনেক পরে হাউস বিল্ডিঙ্ এর লোন শোধ করার জন্য এই বাড়িটা মায়ের কবর সহই বিক্রি করে দেয়া হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হল যেই বনানিতে আমি বড় হইসি, সব কিছু নখদর্পনে ছিল। এখন সেখানে গেলে আমি আর কিছু চিনতে পারি না। যারা আমাদের বাড়িটা কিনে ছিল অনেক হাত বদল হয়ে বাড়িটা এখন আগের মতই আছে। সেখানে বাচ্চাদের একটা স্কুল চলে। পাশে প্লে গ্রাউন্ড। মা’র কবরের উপর অনেক বড় কাঠাল গাছ।আমি দেশে গেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মায়ের কবর যেয়ারত করে আসি।
বনানি বাজার এখন যেটা মিউনিসিপ্যাল মার্কেট ওখান থেকে ৬ নাম্বার সুপেরিওর কোচ সার্ভিসে আমি ৫০ পয়সা ভাড়ায় মতিঝিলের পিরজঙ্গী মাজারে আসতাম । অনেকদুর হয়ে যায় হাইস্কুলে আসার জন্য তাই শাহজাহানপুর খিলখাও বাগিচাতে চলে আসলাম বড় ভাইয়ের বাসায়। ওখান থেকে হেঁটে মোড়ে মতিঝিল গভ হাইস্কুলে যেতাম। শাহজাহানপুরের মোড়ে একটা ছাপড়া হোটেল ছিল। যেখানে আজকের একজন অনেক বড়লোক ব্যবসায়ী আর রাজনিতিবিদের বাবা গরম তেল এ পিঠা ভাজতো আর টাকায় চারটা করে বিক্রি করতো। আমরা কিনে খেতাম।
পিরজংগী মাজারের মতিঝিল কনফেকশনরিতে পাওয়া যেত দারুন মজার বাটার বনরুটি। ওই বাটার বন খেয়ে বন্ধুত্ব হল কলোনির ছেলে ইলিয়াসের সাথে। বন্ধুত্ব এতই গভীর ছিল যে আমরা একে অপরকে চিঠি লিখতাম। এখন ওসব মনে পড়লে নিজের মনেই হাসি। ওখানে মনসুর হোটেলে বসে আড্ডা দিতাম আমরা। কিমা পুরি গরুর ঝোল দিয়ে খেতাম । আহ কি যে মজা লাগতো।
এস এস সি পরিক্ষার সময় চলে যেতে হোলো মুগদা পাড়ায় বোনের বাসায়। কমলাপুর রেল স্টেশনের ভিতর দিয়ে মালের বগির ফাঁক দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হতাম। অনেক সময় মুগদা পাড়ার বন্ধু মোশারফের সাথে বাজি লেগে চলন্ত ট্রেনের একেবারে সামনে দিয়ে শেষ মুহুর্তে দৌড় দিয়ে পার হতাম। থেমে থাকা বগির আশে পাশে প্রায় দেখা যেতো ছিন্নমুল মানুষ নিজেদের সংসার পেতে বসতে। খড় কুটো যোগাড় করে রান্না চড়াতো। সব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম।
তখন বেশির ভাগ সময় অনেক দুরের পথ বন্ধুরা মিলে গল্প করতে করতে হেটেই চলে যেতাম। বৃষ্টির ভিতর কাদা পানি জমে থাকা মতিঝিল কলোনীর মাঠে শার্ট প্যান্ট পরেই ফুটবল খেলতে নেমে যেতাম বন্ধুদের সাথে। সারাদিন বাইরে ঘুরে কাদা মাটি মাখা চেহারা নিয়ে বাসায় ফিরে বোনের হাতে বকা খেতাম।
বোনরা হটাত মুগদা পাড়া থেকে বাসা বদলিয়ে বাসাবো চলে এলো, সাথে আমিও। বাসাবো মাঠের পাশেই ছিল বাসা। ফুটবল খেলার জন্য আর দূরে যেতে হোতো না। ঐ মাঠেই খেলতো বাসাবো তরুন সঙ্ঘ। ক্রিকেট তখন অত জনপ্রিয় খেলা ছিল না, ছিল ফুটবল। সব পাড়ার ভিতর প্রতিযোগিতা হত। সেকি বিশাল আয়োজন হত ঐসব খেলার জন্য। বিশাল বড় শীল্ড দেয়া হত বিজয়ী দলকে।
বর্ষাকালে বাসাবো’র আশে পাশে সব ঝিল বিল গুলি পানিতে ভরে টই টুম্বুর হয়ে যেতো। নৌকা চলতো ঐসব পানি ভর্তি বিল দিয়ে । কখনো কোথাও যেতে আসতে ভয় লাগতো না। রাত দিন কোন ব্যাপার ছিল না। হটাত বাসায় কারেন্ট চলে গেলে আমাদের সে কি উল্লাস। আহ, আজ আর পড়তে হবে না।
কলেজে পড়তে গিয়ে একটু বড় বড় ভাব এলো। তখন দল বেধে ঢাকা স্টেডিয়ামে যেতাম ফুটবল খেলা দেখতে। বন্ধুদের ভিতর আবাহনী আর মোহামেডান ক্লাবের সমর্থক ছিল বেশি।এই দুটাই ছিল সবচেয়ে ভাল দল তখনকার সময়ে। কিন্তু উয়ারী মাঝে মাঝে এই দল দুইটাকে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হারিয়ে দিতো। আর তাই দুই প্রধান দলের খেলায় “ ওই উয়ারী আইলো “ এই স্লোগান দিয়ে খেপানো হোতো।ঢাকা স্টেডিয়ামে খোলা আকাশের নীচে বন্ধু বান্ধব নিয়ে দল বেঁধে খেলা দেখতে যাওয়া, ওখানে বসে, ঘুগ্নিওয়ালার বিদ্ঘুটে উচ্চারনে “ ভাসাকে লেম্বু” জাতীয় চিতকার এখনো কানে বাজে। খেলার মাঠে হার জিত নিয়ে সমর্থকদের ভিতর মারা মারির ভিতর পড়ে মাথা ফেটে যাওয়ার ঘটনাও আছে।
তখন ওই এলাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, রমনা ভবন , গুলিস্তান , প্রেস ক্লাব, এসব এলাকায় হেটে বেড়াতেও অনেক ভাল লাগতো। বংগবন্ধু এভিনিউতে পুর্নিমা স্ন্যাকবার নামে একটা ফাস্ট ফুড খাবারের দোকান ছিলো। ওখানে বনরুটির ভিতর ফ্রাইড চিকেনের টুকরাকে কাঠি দিয়ে আটকিয়ে তেতুলের সস দিয়ে বিক্রি করতো। ঐটাই ছিল আমাদের জীবনের প্রথম বার্গার টাইপের কিছু খাওয়া। আর যদি সাথে একটা বরফ ঠান্ডা কাঁচের বোতলের কোক খেতে পারতাম জীবন ধন্য হয়ে যেতো।
কটকটি খাবার জন্য খাতা বই , খবরের কাগজ জমিয়ে রাখতাম। বাদাম দেয়া কটকটি হাতুড়ি বাটাল দিয়ে কেটে কেটে বিক্রি করতো। এখন আর এই খাবার পাওয়া যায় কিনা জানিনা। রমনা ভবনের উলটা দিকে ছিল বেবি আইস্ক্রিমের দোকান। পেস্তা বাদাম আর দুধ দিয়ে বানানো আইস্ক্রিম খেতে অনেক মজা ছিল। এখন গুলিস্তান এলাকা মৃতপ্রায়। তখন গুলিস্থান ছিল সবচেয়ে জমজমাট যায়গা। রাস্তার দুই পাশে হরেক রকম খাবারের দোকান বসতো। তাজা ফলের রসের উপর মাছি ভন ভন করতো। অবলীলায় খেয়ে ফেলতাম মাছি সরিয়ে। রাস্তার উপর ইটে বসে ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির গিলা কলিজা রান্না খেতাম। ওই হোটেল গুলিকে বলা হোতো “ ইটালিয়ান হোটেল”।
গুলিস্তানে পাসপোর্ট সাইজ ইন্সট্যান্ট ছবি তুলতে যেতাম। কাপড় দিয়ে ঘেরা বাক্সের ভিতর মাথা ঢুকিয়ে দিতে হত। কিছুক্ষন পর ছবি পানিতে ধুয়ে বের করে এনে দিতো। ছবির কোয়ালিটি এমনি হইতো যে নিজের চেহারা নিজেই চিনতে পারতাম না।
মগবাজারের ক্যাফে ডি তাজ হোটেলের চিকেন বিরানির সাথে একটা সিদ্ধ ডিম ,এক্সট্রা সাদা পোলাও আর ঝোল কত মজা করে খেতাম। মৌচাক মার্কেটের পাশে চাংপাই চাইনিজ রেস্তরা তখন ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত রেস্তোরা। খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল ইন্টেরিওর। তারপর হইসিলো এলিফ্যান্ট রোডের টুং কিং, পরে ধানমন্ডি পাঁচ নম্বরে ম্যাকডোনাল্ড চাইনিজ রেস্তোরা।
দল বেঁধে কালিমন্দিরের পাশে স্টার এ খেতে গেলাম একদিন। অভিজাত , দামি আর মজার খাবার।
হিসাব করে অর্ডার দিয়ে খাওয়া শেষ করে বিল চাইলে বেয়ারা যখন বিল নিচ্ছিল না, খুব আশ্চর্য হচ্ছিলাম। অনেক পিড়াপিড়িতে জানতে পারলাম মালিক বিল নিতে নিষেধ করেছে। মালিক কে খাস কামরায় গিয়ে দেখি আমাদের দেখে মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে আমাদের ই বন্ধু দুলাল। রেস্টুরেন্ট মালিকের ছেলে পরিচয় দিয়ে লজ্জা পাচ্ছিল। এই দুলাল তখন অনেক দামি গাড়ি নিয়ে ভার্সিটিয়ে আসত। কিন্তু কেউ দেখার আগেই বাংলা একাডেমির সামনে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে রিক্সায় করে ক্যাম্পাসে আসত ।
চানখার পুলের নিরব হোটেল ছিল হলে থাকার সময়ে আমাদের সবচেয়ে উন্নত্ মানের খাবারের দোকান। সামান্য একটু গরুর মগজ ভুনা, একটু কলিজা, একটু ঝাল গরুর মাংশ দিয়ে কত প্লেট ভাত খেয়ে ফেলতাম হিসাব নাই। খেয়ে দেয়ে সিগারেট ধরিয়ে রিক্সায় তিন জন করে বসে হলে ফিরে আসা।
হোটেল সোনারগাঁও এর উলটা দিকের যায়গাটা ছিল তখন খালি আর অনেক ঢালু। ওখানে ছিল দারুল কাবাব। ছোট্ট কাবাবের দোকান। কিন্তু খোলা আকাশের নীচে ঢালের এখানে সেখানে চেয়ার টেবিল পাতা থাকতো।ওটাই ছিল পুরা ঢাকা শহরের সেরা কাবারের দোকান। সন্ধার পর প্রচুর দামি গাড়ির ভীড় লেগে যেতো। রাত গভীর হলে মানুষ নিজের নিয়ে আসা রঙ্গিন পানির বোতল খুলে বসতো।কাছেই ছিল “ শ্যালে বার”। ওখান থেকে আনিয়ে নেয়া যেতো বিয়ারের ক্যান।
মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পের পাশেই ছিল ছাপড়ার ভিতর কাবাবের দোকান। বিফ টিক্কা ধনিয়ার চাটনি দিয়ে খেতে প্রান জুড়িয়ে যেতো। পাঁচ টাকা হলেই একজনের পেট ভরে খাওয়া হয়ে যেতো।
টি এস সি র সামনে বেঞ্চে বসে পিয়াজু বুট , তোবড়ানো দস্তার গ্লাসে পানি আর হাতল ভাঙ্গা সাদা কাপে চা ছিল আমাদের প্রতিদিনের বিকেলের খাবার। সকাল বেলায় নিলখেতের রেস্তোরা থেকে ভাজি, হলুদ রঙের সুজির হালুয়া, ঝুরি পরোটা আর কেরু’র বোতলে করে আনা চা দিয়ে নাস্তা হোতো।
কোন দিন কোন কারনে একা ফিল করতাম না। ভয় পেতাম না। মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতাম আমার প্রিয় ঢাকা শহরের অলি গলিতে। মুখস্ত ছিল কোন এলাকার রাস্তার কোন যায়গায় স্পীড ব্রেকার কিংবা গর্ত আছে। ওখানে পৌছালেই রিক্সার উপর উঠে দাঁড়িয়ে ঝাকি খাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতাম।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবার পর আড্ডা দিতাম শাহবাগের পি জি হসপিটালের পিছনে। সব বন্ধুরা এসে জড়ো হত ওখানে । অনেকেই নেশা পানি করতো ওখানে বসেই। তারপর এসে বসতাম কখনো কোহিনুর, কখনো সিনোরিটায়। কোহিনুরের কলিজার সিঙ্গারা, আর সিনোরিটার গরু ভুনা , পরোটা দিয়ে খেয়ে ঠান্ডা স্প্রাইটে লবন দিয়ে খেতাম। কেন লবন দিতাম জানিনা, কিন্তু মজা লাগত খেতে। কোহিনুর এর মালিক ছিল হাশেম ( এখনো আছে)। ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলত। পয়সা না থাকলে বাকির খাতায় লিখা হত, নো চিন্তা।মাস শেষে শোধ হয়ে যেতো।
তখন নিউমার্কেটের ইব্রাহিম টেইলর প্রথম স্টিচ আর লিভাইস স্টাইলের জিন্স সেলাইএর আধুনিক মেসিন আনলো। ওখানে জিন্স বানানো একটা বিরাট ভাবের ব্যাপার ছিল। ইব্রাহিম্ থেকে বের হয়ে ওখানকার কারিগর ফেরদৌস নিজের টেইলর খুলে বসলো। ফেরদৌস ভাই ছিল খুব মিস্টভাসী মানুষ। সুন্দর ব্যবহার দিয়ে আমাদের সবাইকে জয় করে নিলো। সেই সম্পর্ক আজো অটুট। আজ ফেরদৌস ভাই বিশাল বড় ব্যবসায়ী, স্টান্ডার্ড ব্যাঙ্কের একজন খুব প্রভাবশালী মালিক।
সেই সময়েই আমার ছবি তোলার প্রচন্ড নেশা ছিল। বড় ভাই রাশিয়া থেকে এনে দিয়েছিল জেনিথ এস এল আর। এফ ডি সি থেকে চুরি করে বাইরে বিক্রি হোত রিফিল টাইপের ফিল্ম। সস্তায় কেনা যেতো। ফুজি বা কোডাক অনেক দামি ছিল। ছবি প্রিন্ট করতে গিয়ে পরিচয় হোলো এলিফ্যান্ট রোডের অভিজাত স্টুডিও’র মালিক বারি ভাই আর করিম ভাই;র সাথে। চিটাগাং এর মানুষ দুইজন এতই ভাল আর আন্তরিক ছিলেন যে আপন বড় ভাইএর মত সম্পর্ক হয়ে গেল। এখনো যোগাযোগ আছে করিম ভাইয়ে সাথে। বারি ভাই মারা গেছেন ক্যান্সারে। মারা যাবার বেশ আগে থেকে প্রায় আসতেন আমেরিকার অরল্যান্ডোতে ওনার মেয়ের কাছে বেড়াতে। আমাকে ফোন করে বলতেন “ ভাই এই দেশের মাটি আর বাতাস খুব ভাল। নিশ্বাস নিতে খুব আরাম”। খুব আদর করতেন আমাদের।
আমি কোন গল্প লিখার মানুষ নই। ডাইরির মত অগোছালো করে যখন যা মনে আসে লিখে ফেলি। তাই ঠিকমত গল্পের ধারাবাহিকতা থাকেনা। আমার প্রিয় ঢাকার গল্প লিখতে গেলে হয়ত পাতার সংখ্যা শ’এর ঘর ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু অত লেখার ধৈর্য আমার নাই।
সেই কবে দেশ ছেড়েছি, কিন্তু যখন থেকে দেশে যাবার মত অবস্থা হয়েছে কখনো পয়সার জন্য পিছপা হই নাই। কোন অনুশঠানের জন্য নয়, কোন সম্পত্তি কেনার জন্য নয়, আমি বিনা কারনেই আমার প্রিয় ঢাকা শহরের আকর্ষনে প্রতি বছর ছুটে যাই। সুযোগ পেলে দু’বারও চলে যাই। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দেশে যেতে সব মিলিয়ে ১৭/১৮ ঘন্টা উড়তে হয়। প্লেনের ছোট্ট সিটে আমার বিশাল লম্বা হাত পা নিয়ে অনেক কস্ট করে চোখ কান বুজে চলে যাই ঢাকায় দুর্বার আকর্ষন নিয়ে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই দেখি এয়ারপোর্ট এর মানুষ গুলির শকুনের মত চাহনি। উপেক্ষা করি আমি। টয়লেটে গেলে পেশাব আর ফিনাইলের কটকটে গন্ধ তার পাশা পাশি ঢাউস সাইজের মশা এখানে সেখানে কামড় বসিয়ে দিয়ে যেন সাদর অভর্থনা জানায় আমাকে। কোন কিছুই দেশের প্রতি বিরুপ মনোভাবের করে না আমাকে। আমি যাই , বার বার যাই , এবং যাবো আমার প্রিয় ঢাকায়। ঠিক যেমন শাওনাজ রহমতুলাহ গেয়েছেন “ একবার যেতে দে মা আমার ছোট্ট সোনার গাঁ য়”।





খুব প্রেমময় পোস্ট!
ভাল্লাগছে!
চমৎকার পোষ্ট!
যদিও এতটা আগের ঢাকাকে আমি পাইনি তবুও দারুণ লাগলো আপনার স্মৃতিচারণ! ঢাকাকে ভালবাসি, অনেক!
ধন্যবাদ ভাই!
আন্নে অনেক পেটুক ছিলাইন।
আর ফেরদোস আর চাচা লাগতুইন। এবার দেশত আইলে কইবাইন। আর সেল নম্বর আর আসল নামটা আপনাক কমুনে। নয়ত চাচায় আবার চিনতে পারতাইন না। বুইজলেন তো আনহের মতন আমার নামটাও ব্লগের লাইগ্যা বাবানো। বালা থাকবেন হজ্ঞলে মিইল্যা।
আ হা ভাই, ঢাকায় এলে অবশ্যই যোগাযোগ করবো।
আমার মোনের কটায় বলেছেন মুরাড ভায়। সাসা লেকহাটা পছোনডো কোরেছে। ভালো লেগেছে
মোনের কঠাটায় পেলাম । আহা..
খুব ভালো...।কি যে বলি বূঝে না পায় রে ভায়
লেখা পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আনোয়ার ভাই।
মন্তব্য করুন