দুর্বিসহ ভ্রমন কান্ড (দুই)
চরম হতাশার মধ্যেও দুটো সুখবর পাওয়া গেল। এক. এই ট্রেনটা চট্টগ্রামেই যাচ্ছে। দুই. ট্রেনটা সামনের একটা স্টেশানে থামবে যেখানে নেমে গিয়ে সুবর্ন এক্সপ্রেসের জন্য অপেক্ষা করা যায়, যদিও সুবর্ন এক্সপ্রেস ওখানে থামবে না।
না থামলেও কি করে চলন্ত ট্রেনে উঠতে হবে সেটার প্রশিক্ষন ও পরামর্শের জন্য আমাদের চারপাশে মোটামুটি একটা ভীড় জমে গেল। বাংলাদেশে জ্ঞানী ও পরামর্শকের অভাব কোনকালেই ছিল না। সুতরাং চারপাশ থেকে উপদেশের বন্যা এমন প্লাবিত করতে থাকলো, আমরা দুজনই পরামর্শসাগরে নিমজ্জিত হয়ে বুদ্ধিশুদ্ধি হারিয়ে ফেলবার পথে। কিছুক্ষন হৈচৈএর পর উপদেষ্টা মন্ডলীর মধ্যেও দুটি দল হয়ে গেল।
এক দল বললো-
ক) এই ট্রেন থেকে নেমে সুবর্ন এক্সপ্রেস যে পাশ দিয়ে যাবে সেদিককার রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এবং হাত উঁচিয়ে টিকেট নাড়াতে থাকা যদি গার্ড বা ড্রাইভারের চোখে পড়ে যায়, তাহলে ঘ্যাচাং করে ব্রেক কষে দাঁড়াবে ট্রেন।
অন্য দল এই পরামর্শকে হেসে উড়িয়ে দিল, বললো সুবর্ন এক্সপ্রেস জীবনেও থামে নাই এখানে। তারচে বরং এরকম করা যাক-
খ) ট্রেনটা এখানে না থামলেও গতি কমায়। সেই গতিতে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়া সহজ। তারপর দরজার ফাঁক দিয়ে চীৎকার করলে লোকজন দরজা খুলে ঢুকিয়ে নেবে ভেতরে।
দুইটা পদ্ধতিই গায়ে কাঁটা দিল। এরা বোধহয় আমাদের জেমস বন্ড মনে করেছে পোষাক আষাক দেখে। দুই দলই উৎসাহ যোগাচ্ছে তাদের পছন্দের পদ্ধতি বেছে নিতে। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কারন ক-পদ্ধতিতে ট্রেন না থামলে এই বেজাগায় রাত কাটাবো কোথায় ভাবতে শিউরে উঠলাম। আবার খ-পদ্ধতিতে যদি ওরা দরোজা না খোলে, তাহলে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাতলে ঝুলে শীতে জমে মরার চেয়ে লাফ দিয়ে ট্রেনের নীচে পড়ে আত্মহত্যা করা বরং সহজ।
সুতরাং দুই দলকে নিরুৎসাহিত করে সীটের পাশে হেলান দিয়ে সাতঘন্টা কাটিয়ে দেবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম দুজনে।
ট্রেনটা পরের ষ্টেশানে থামলেও আমরা নামলাম না। খানিক পর ঝমঝম শব্দ করে সুবর্ন এক্সপ্রেস চলে গেল আমাদের কাঁচকলা দেখিয়ে। ট্রেনটা আমাদেরকে অতিক্রম করার সময় আমার পরামর্শক মন্ডলীর মধ্যে চিত্তচাঞ্চল্য দেখা গেল। "আহারে কি আফসোস......উহু কি করলেন ভাই ফাস্টক্লাস চলে যাচ্ছে রে...." ইত্যাদি নানা রকম সহমর্মীতা ও টিটকারী উভবিধ মন্তব্যে ভরে গেল বগি। ওটা যাবার পর আমাদের ট্রেনটা ছাড়লো।
পরামর্শক দল যার যার আসনে ফিরে গেছে। আমরা দাড়িয়ে আছি। কিছুক্ষন চুপচাপ সব। তারপর তৃতীয় এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটলো আমাদের সামনে। বগির কোনার দিকে আঙুলের ইশারা দিয়ে কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, "আপনাদেরকে ডাকতেছে"।
বিস্মিত হয়ে ওদিকে এগিয়ে গেলাম। মাঝবয়েসী স্বাস্থ্যবান একটা লোক। চেহারায় কেমন একটা কতৃত্বের ছাপ। সুবিধার লাগলো না প্রথম দৃষ্টিতেই। কিন্তু লোকজনের সমীহ দেখে মনে হলো ইনি এই ট্রেনের "বিশেষ কেউ"। রেলের মালিক সরকার, এই জিনিসটা জানা না থাকলে ওনাকেই ট্রেনের মালিক ভেবে বসতাম। আমাদের টিকেটটা হাতে নিয়ে পরখ করলো। তারপর আপাদমস্তক দেখলো। সহমর্মী হয়ে বললো, "বিপদে পড়েছেন। উপায় নাই। কিছুক্ষন অপেক্ষা করেন। ঘন্টাখানেক পরে সিট পাবেন।"
ওরেবাপস। এটা কে? ভীষন ক্ষমতাধর মানুষ মনে হচ্ছে। গডফাদার টাইপ সুর পেলাম যেন। থাক, উপায় তো নাই। ঘন্টাখানেক পরে কি যাদুতে সিট দেবে খোদা জানে। আমরা ফিরে গিয়ে ওপাশের একটা সীটে হেলান দিয়ে রইলাম। উদাস হয়ে জানালার বাইরে অন্ধকার দেখার চেষ্টা করছি। জানালা বন্ধ, তবু ছুটে চলা অন্ধকার আর ট্রেনের প্রবল ঝিক ঝিক শব্দের মধ্যে ছন্দ খুঁজে সময় কাটানোর চেষ্টা করছি।
খানিক পর অদ্ভুত একটা ব্যাপার নজরে এল। ট্রেনের যাত্রীরা সবাই ওনার কাছে যাচ্ছে আর ফিরে আসছে। সবার সাথে ঠাট্টার সুরে কথা বলছেন। সবার খুব পরিচিত মনে হলো ভদ্রলোককে। ফাস্ট ক্লাসের সব যাত্রী যেন ওনার নিয়ন্ত্রনে। অবাক হলাম ব্যাপার দেখে। কৌতুহল দমাতে না পেরে একজনকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ওনার কাছে কেন যাচ্ছে সবাই।
জবাব শুনে চোখ কপালে আমার। এই বগির টিকেটের দায়িত্ব নাকি ওনার। যেসব মানুষ বসে আছে তারা সবাই ওনার কাছে মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ফাস্টক্লাসের সীট পেয়েছে। যাত্রীদের প্রায় সবাই ব্রাম্মনবাড়িয়া নেমে যাবে ঘন্টাখানেক পর। এই ট্রেনের নিয়মিত ব্যাপার এটা। জিজ্ঞেস করলাম, "উনি কি রেলওয়ের কর্তা?" বললো, "না, উনি এই বগির কর্তা। রেলের লোক ওনাকে ঘাঁটায় না।" কেন ঘাটায় না জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না।
এতক্ষনে ওনার সীট পাইয়ে দেবার ক্ষমতার উৎস বুঝলাম। অক্ষম একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল ভেতর থেকে। ভাবলাম আমাদের কাছেও টাকা চাইবে না তো আবার? নাহ, আমাদের কাছে টাকা চেয়ে বিব্রত করেনি গডফাদার।
মজার ব্যাপার হলো ব্রাম্মনবাড়িয়া আসে। ট্রেনটা থামার আগেই সব ফার্স্টক্লাস প্যাসেঞ্জার গাট্টিবোচকা সহকারে দরোজায় ভীড় করলো। ট্রেন থামতে না থামতেই দরোজা খুলে হুড়মুড় করে পুরো বগি খালি করে নেমে গেল সবাই। গডফাদারকে দেখা গেল না ওই কোনায় আর।
তারপর আমাদের জনা সাতেক লোককে নিয়ে প্রায় খালি বগিটা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে হুইসেল বাজালো।
[আপাততঃ শেষ। অন্য কোন যাত্রাকালের ভ্রমন খন্ড পরে আসতে পারে]





আগের পরবটা মিস করলাম কেমনে?মাইনাস।
এরম ভ্রমণ ত মজার।এক্সাইটিং। ট্রেনে চড়তে মন্চাইতাছে।
এই দুর্বিসহ ভ্রমন মজার লাগলো???? দুনিয়া থেকে সহানুভুতি সহমর্মীতা উঠে গেছে
আজকেই প্রথমে আসলাম । এসেই আপনার পোষ্ট পড়লাম । ট্রেনের ভ্রমণ আমার কাছে অন্যরকম আবেদন সৃষ্টি করে তাই ট্রেণ চড়ি ট্রেনে যাই । ধন্যবাদ আপনাকে ।
ধন্যবাদ আপনাকে প্রথমে এসেই আমার পোষ্ট পড়েছেন বলে
শেষ!!!
এই যাত্রার শেষ, অন্য যাত্রার আছে
শেষ!?
আরো দুর্বিসহ ভ্রমন চাই???
জব্বর কাহিনী।
দেশে যখন লাল ট্রেন চলত তখন থাইকা ট্রেনে চড়ি। যদিও ছোড আছিলাম তখন। এই ট্রেনেরে আমরা কইতাম উলকা বাহার। তখন মনে হইতো হাওয়ার গতিতে চলে ঐ উলকা বাহার। মা বাবার সাথে ঢাকা যাইতাম চট্রগ্রাম থাইকা এই ট্রেনে চইড়া। তখন বগির ভেতর কম্পাটমেন্ট ছিল। ঐ কামরা গুলায় লম্বা লম্বা চাইরখান সিট থাকতো যার দুই খান বসার জন্য আর দুই খান মাথার উপরে বসেন বা শুইয়া যান আপনার ইচ্ছা। আমার টার্গেট থাকতো উপরের সীট। তখনকার দিনে মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মানুষ বাইরের খাবার তেমন পছন্দ করত না মনে লয়। কারন মা'রে দেখতাম একটা ব্যাগে কইরা পরটা, সিদ্ধ ডিম, কলা আরও কতকি হাবিজাবি খাবার ট্রেনে বাইর কইরা দিত। এমনকি বাবা'র জন্য থার্মোফ্লাক্সে চাও নিতে দেখা যাইত। আমি ট্রেনের জানালা দিয়া তাকায় থাকতাম কখন নদী আসব। বিশাল বিশাল নদীর উপর দিয়া ট্রেন যাওয়ার সময় দেখতাম পাল তুইলা নৌকা চলতেছে আর নদী টা আঁকা বাকা হইয়া অনেক দূরে কোন গ্রামের ভেতর হারাইয়া গেছে। ছোট নদীগুলার উপর দেখতাম বাঁশ দিয়ে মাচা করে বিশার জাল দিয়ে মাছ ধরার সিষ্টেম, সাথে ছোট্ট একটা ঘর বিশ্রাম নেয়া বা থাকার জন্য। তখন মনে মনে কইতাম বড় হইলে এমন নদীর ধারে কুড়ে ঘরের মধ্যে থাকুম। আহা! সেই শৈশব!। আরও কত্ত স্মৃতি। মামা বাড়ি বেড়াইয়া ফিরার সময় বড় মামারে সালাম করলে ৫০/১০০ টাকা দিয়া কইত, এইডা পান-বিড়ি খাওনের লাইগা। ছুডো বয়সে পান-বিড়ির পয়সা পাইয়া ফোকলা দাতে ফিক কইরা হাইসা দিতাম। ... নাহ্ ভাই.... একদম নষ্টালজিক কইরা দিলেন।
নদীর ধারের ওরকম বিশ্রাম টংঘরগুলোতে কটা দিন কাটাতে ইচ্ছে হতো খুব, এখনো হয়। কিন্তু হয়ে উঠলো না কখনো........
আপনি বেশি বেশি ভ্রমন করবেন তাহলে আম্রা বেশি বেশি উপাদেয় পোস্ট পড়তে পারবো।
হ, দুর্বিসহ ভ্রমনে সংখ্যা বাড়াতে হয় তাইলে.........
পোস্ট এবং বকলম ভাইয়ের কমন্টেস ... মারাত্মক!!! হৈছে
নানা থাকতেন সরিষাবাড়ি ... ট্রেনে যাইতাম ... আহা কত্ত মজার ছিল সেই দিন
আরামদায়ক ভ্রমনের কাহিনীও আসুক...........
নিরুপায় হয়ে চলন্ত ট্রেনে উঠতে হয়েছে একবার। ৯৩ বা ৯৪ সালের ঘটনা। প্রতিমাসে একবার নানীকে দেখতে বাসে চড়ে নোয়াখালী যেতাম একদিনের জন্য, কখনও মায়ের সঙ্গে কখনও একা। শুক্রবার গিয়ে শনিবার ফিরে আসতাম। এরকম এক শনিবার ছিলো ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের দিন। নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রাম ফেরার পথে ফেনী পর্যন্ত এসেছি, হঠাৎ করে বাস ড্রাইভার সিদ্ধান্ত নিলেন চট্টগ্রামে যাবেন না, ইজতেমার দিকে যাবেন। চট্টগ্রামের যাত্রীরা যেন নেমে যায়। এমনকি টিকেটের টাকাও ফেরত দিয়ে দিচ্ছেন! আশ্চর্যের ব্যাপার, ফেনী থেকে কোন বাস সেদিন চট্টগ্রামে যাচ্ছিলো না। তখন বুঝলাম নোয়াখালী থেকেও এতো কম বাস ছিলো কেন। যাই হোক, ঘন্টাখানেক ফেনীর রাস্তায় কাটিয়ে বুঝলাম ট্রেন ছাড়া গতি নেই। পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে মনে পড়ছিলো কাছাকাছি সময়ে একটা আন্তনগর ট্রেন আছে। স্টেশনে যেতে যেতেই দেখি ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। স্টেশনের একটু দূরেই একটা রেলগেট আছে সেখান দিয়ে দৌড়ে ঢুকে চলন্ত ট্রেনের শেষ বগির দরজা মিস করলাম। তারপর মুহূর্তের সিদ্ধান্তে লাফিয়ে উঠে জানালা ধরে ঝুলে ঢুকে গিয়েছিলাম। জানালার পাশের সিটে বৃদ্ধ ভদ্রলোক নাশতা খাচ্ছিলেন। সারা পথ উনার বিস্ময় কাটছিলো না, কারণ ট্রেন যথেষ্ট গতিতে ছিলো।
খাইছে আমারে ....... চলন্ত বাসে উঠতে শুনছি, তাই বইলা চলন্ত ট্রেন ????
আপনার ব্যাপারটা তো দারুন ভয়ংকর প্রানঘাতী!! রীতিমতো কমান্ডো জাম্পিং!!
বৃদ্ধ ভদ্রলোক মনে মনে হয়তো যা বলেছিলেন:
ওমা! হেতি দেকি বাইওনিক ওমেন !!!!
বৃদ্ধ ভদ্রলোক মনে মনে হয়তো যা বলেছিলেন:
ওমা! হেতি দেকি বাইওনিক ওমেন !!!!
হাঃহাঃহাঃ যাত্রায় ধান্ধাল দর্শন ছাড়া আর কিছু দর্শন হয় নাই


প্রতিটা ট্রেনেই মনে হয় এমন কিছু ধান্ধাল ঘুরে, এইটা তেমন কিছু না
ঢাকা নারায়নগঞ্জ টেনের টিটিকে আমরা মামা বানিয়ে ফেলেছিলাম। শেষের দিকে উনি আমাদের সাথে দুই কম্পার্টমেন্টের মাঝে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতেন। মাঝে মাঝে বেগুনী ধুমা
মন্তব্য করুন