আমার বাবা ...
ছোট বেলা থেকেই বাবাকে অনেক ভয় পেতাম। বিভিন্ন কারনে। সেই তুলনায় মাকে একটুও ভয় পেতাম না। বাবা বাসায় ফিরে যদি দেখত আমরা তিন ভাইয়ের কেউ পড়ার টেবিলে নেই, তাহলেই তার গর্জন শুরু হয়ে যেত। আমি তখন কতই আর বড়? ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। তখন ভয় পেতাম আর ভাবতাম আমার বাবা কেন অন্য সবার বাবার মত না, কেন সবসময় এরকম করে। খুব কষ্ট পেতাম, এটুকু মনে আছে, আর মনে মনে প্রার্থনা করতাম, বাবা যেন দেরী করে বাসায় ফিরে। আর যেদিন রাতে আমাকে পড়াতে বসত, সেদিন তো কোন কথাই নেই, ইংলিশ এমনিতেই কম পারতাম, যেটুকুও পারতাম সেটুকুও ভুলে যেতাম বাবার ভয়ে। হয়ত এরকম কোন একদিন হয়েছে, বাবা প্রচন্ড চিল্লাপাল্লা করছে, বাবার সাথে তাল মিলিয়ে মা’ও বকাঝকা করছে। তখন আবার বাবা রিভার্স হয়ে যেত। তার কথা ছিল, ছেলেমেয়েকে বাবা মা দুইজন মিলে বকা যাবে না, একজন অন্তত আদর করতে হবে। সেই ঝড়ের মধ্যেও কেন জানি বাবার এই সাপোর্ট টুকু খুব আনন্দ দিত। আরেকটা ব্যাপার খুব ভালো লাগত, পরীক্ষার পরে পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে বাবা কখনই কিছু বলত না। ক্লাস ফাইভে মাত্র ২ নম্বরের জন্যে বৃত্তি না পাওয়ায় বাবা বকা দেয়নি, ক্লাস এইটে বৃত্তি না পাওয়ায় বকা দেয়নি। বুয়েটের রেজাল্ট যেদিন দেয়, আশানুরুপ সাবজেক্ট না পাওয়াতে আমি অনেক কেদেঁছিলাম, সবাইকে লুকিয়ে, বাবা ঠিক ই কিভাবে যেন বুঝতে পেরেছিল, মাথায় এসে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল হঠাত করেই।
যাই হোক, বাবার এই অত্যাচার খুব বেশীদিন চলেনি। আমি এস এস সি পরীক্ষা দেবার পরে বাবা আর আমাকে কোনদিন পড়তে বসতে বলেনি। এমনকি আমি যদি কোন একদিন সারাদিন নাও পড়তাম তবুও কিছু বলত না, কেন জানি না, মনে হয় আমার উপর একটু একটু ভরসা করতে শুরু করেছিল। আমার মনে আছে, যেদিন এইচ এস সি’র টেষ্ট পরীক্ষার খারাপ রেজাল্ট শিটটা বাবাকে দেখিয়েছিলাম, সেদিন বাবা শুধু আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘনিশ্বাঃস ফেলেছিল। আর কিছুই বলেনি। সেদিনের সেই চাহনীতে যে কষ্ট ছিল সেটা দেখে আমি আতঙ্কে অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। জীবনে প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, অন্তত বাবার জন্যে হলেও কিছু একটা করতে হবে। খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তবু আমি এইচ এস সি তে ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে তৃতীয় সবোর্চ্চ নম্বর পেয়ে প্রায় ষ্ট্যান্ড করার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আমার সেদিনকার আনন্দের সাথে কোন কিছুর ই তুলনা খুঁজে পাই না। খুব বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম ঐদিন। বাবা মনে হয় এতটা আশা করেনি কখনও। যথারীতি বাসায় ফেরার পর আমি বাবাকে প্রনাম করে বলতেই বাবার সেকি বিষ্ময় ভরা দৃষ্টি। আমি জীবনেও ভুলব না। সেকি গর্ব বাবার চোখে।
বাবার ইচ্ছে ছিল আমাকে মেডিকেল এ পড়াবে, মেডিকেল কলেজ বাসার পাশে হওয়ার ভাবলাম, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনেক মেয়ে আসে, পরীক্ষা দেবার ছলে দেখে আসি। কিভাবে কিভাবে যেন বাসার পাশের মেডিকেল এ চান্স ও পেয়ে গেলাম। এবার শুরু হল আমার আর বাবার মধ্যে টাগ অফ ওয়ার। আমি সি এস ই তেই পড়ব আর বাবার ইচ্ছে আমাকে মেডিকেলে পড়াবে। কখনও সরাসরি বলত না, কিন্তু একে ওকে বলত আমাকে যেন একটু বোঝায়। পরে অবশ্য আর কিছু বলেনি, কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, শেষ পর্যন্তও বাবার মনে একটা আফসোস ছিলই।
আমি যখন ৪র্থ ইয়ারে পড়ি তখন বাবা খুব অসুস্থ হয়ে একবার ১০ দিনের জন্যে হস্পিটালে ছিল, আমার মনে হয় তখন পরীক্ষা চলছিল। আমার পরীক্ষা খারাপ হবে বলে বাবা মাকে কঠিনভাবে নিষেধ করে দিয়েছিল আমাকে যেন এসব কিছুই না জানানো হয়, পাছে আমি টেনশন করি। সেবার বাসায় এসে আমি বাবাকে অনেক বকা দিয়েছিলাম, বাবা কিচ্ছু বলেনি, শুধু হেসেছিল। সেসময় ই একদিন কি জানি করতে যেয়ে বাবা চেয়ার থেকে পড়ে যায়। থর থর করে কাঁপছিল বাবা, আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিলাম, আর বলছিলাম, কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। কি যে অসহায় লাগছিল বাবাকে। সারাজীবনের শক্ত পোক্ত একটা মানুষকে অসহায় দেখা যে কি কষ্টের ব্যাপার...
যথারীতি আমি পাশ করলাম, পছন্দের চাকরীর জন্যে অনেক চেষ্টা করলাম, হল না, বাবাকে বললাম, বাবা বলল, অস্থির হবার কিছু নেই, আমি যেন হতাশ না হই। তখন বাবার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগত। সেজন্যে চাইতাম না। বাবা ঠিকই মনে করে আমি যেদিন ঢাকা আসব সেদিন মার কাছে টাকা দিয়ে আসত। আর বড়দা কে ফোন করে বলে দিত, অমিতের যা যা লাগবে সব যেন দেয়। একদিনের কথা মনে আছে। আমি ময়মনসিংহ এসেছি, বাবাকে নিয়ে বাজারে গেলাম। রাস্তায় আমার এক চাচার সাথে দেখা। চাচা বাবাকে জিজ্ঞেস করল, অমিত কি বাসার বাজার করে দিচ্ছে কিনা। বাবা হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিল, এখনি কি দিবে, এখন তো আমিই আছি, যখন আমি থাকব না তখন দিবে। সেদিন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। আমি আজকে ময়মনসিংহ এসেছি, বাস থেকে নেমে অনেককিছু বাজার করে নিয়ে এসেছি। তুমি কি দেখছ বাবা?
এর মাঝে বাবা অনেক অসুস্থ হয়ে গেল। অনেক সমস্যা একসাথে। তার মধ্যে একটা ছিল ডায়বেটিকস। ইনসুলিন নেয়া লাগত। আমি যখন থাকতাম না তখন নিজে নিজেই নিত। কিন্তু আমি বাসায় থাকলে কেন জানি নিজে নিজে আর নিত না, যতক্ষন আমি না দিতাম ততক্ষন নিত না, মুখ ফুটে বলত ও না কিছু। এরকম ও হয়েছে, আমার আসতে আসতে আসতে রাত ১০ টা বেজে গেছে, বাবা ইনসুলিন না নিয়ে, না খেয়ে বসে আছে, আমি কখন এসে ইনসুলিন পুশ করব সেই আশায়।
এসবের মাঝেই একদিন আমি সত্যিকারের চাকরীতে ঢুকলাম। কনফার্ম হবার সাথে সাথেই বাবাকে ফোন দিলাম, ডাক্তার বেশী কথা বলতে না করেছিল, তবু আমার সাথে বেশ কিছুক্ষন চাকরীর ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আলাপ করল। এটা ওটা, কি লাগবে না লাগবে। কবে বাসায় আসব এসব।
১৫ ই মার্চ, ২০০৮, আমি চাকরীতে জয়েন করলাম। সারাদিন অফিসে থেকে রাতে বাসায় যেয়ে শুনি বাবা হসপিটালে, আমি যেন পারলে এখনি রওনা হয়ে যাই। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। কোন মতে একটা গাড়ি ম্যানেজ করে মেজদা কে নিয়ে রওনা দিলাম। ২.৩০ ঘন্টার রাস্তা, আমার কাছে মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। সারাটা পথ আবোল তাবোল ভাবছিলাম। যাই হোক, রাত ২ টার দিকে ময়মনসিংহ পৌছলাম। বাবা হসপিটাল এর ফ্লোরে শুয়ে আছে, স্যালাইন লাগানো। যেতেই মা বলল, বাবার মুখে যেন একটু জল দেই। আমি শুনে চিতকার করে মাকে বলেছিলাম, তোমরা কি শুরু করেছ, কিচ্ছু হবে না, দেখো। একটু স্পর্শ করলাম বাবাকে। বাবা কি আমার সে স্পর্শ টের পেয়েছিল? কি এক অদ্ভুত অনুভূতি আমি বলে বুঝাতে পারব না। মনে হচ্ছিল, মাথার উপর থেকে খুব বড় একটা ছায়া সরে যাচ্ছে। মাথায় একটা কথাই শুধু ঘুরছিল, আমি তো বাবাকে কিছুই দিতে পারলাম না। সেদিনের রাতের কথা আর কিছুই মনে নেই আমার। শুধু মনে আছে, সারারাত বাবার ঠান্ডা হাত ধরে পাশে বসে ছিলাম, ভোর পর্যন্ত। মাঝে মাঝে রাতগুলো এত দীর্ঘ হয়...
মানুষের এক জীবনের সব স্বপ্ন পুরন হয় না, এটা আমি বাবাকে দেখেই শিখেছি। বাবার খুব আশা ছিল, তার তিন ছেলে শিক্ষিত হয়ে চাকরী বাকরী করবে, তিন ছেলে একসাথে কোন ছুটিতে বাসায় আসবে, বড় ছেলেকে বিয়ে করাবে, সেই বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের বাড়ি এক্সটেন্ড করার কাজও শুরু করেছিল। শুরুই করতে পারল, শেষ আর করতে পারল না। এখন তার তিন ছেলে চাকরী করে, বড় ছেলে বিয়ে করেছে, তার শুরু করা বাড়িতেই বিয়ে হয়েছে, আমি এখন সেই বাড়ির বর্ধিত অংশে বসেই লিখছি। আজ বাসায় তার তিন ছেলে একসাথেই এসেছে, সাথে বড় ছেলের বউ, উপলক্ষ? যিনি এতসব স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তার মৃত্যবার্ষিকী। আমরা সবাই মিলে অনেক সুখী, আমি জানি কোথাও না কোথাও থেকে বাবা সেটা দেখতে পারছেন, এটাও জানি তিনিও আমাদের জন্যে গর্বিত, সুখী। কিন্তু তার হাসি হাসি, সুখী মুখটা আমরা দেখতে পারছি না। বাবা, খুব মনে হচ্ছে তোমার কথা, খুব ...ভালো থেকো বাবা ...
১৬ মার্চ, ২০১০





আপনার বাবার জন্য দোয়া রইলো।
আমার মা মারা যান ৮৭ তে। বড় বোনের এস এস সি পরীক্ষা দেবার ঠিক ৫ দিন আগে। মা কত শখ করেছিলেন, মেয়ের পরীক্ষা দেখবেন। মারা যাবার আগে শুধু একটাই চিন্তা তাঁর মাথায় - মেয়ের পরীক্ষা। অথচ তাঁকে আর কয়টা দিন সময় দেয়া হোলনা।
মাঝে মাঝে সময়গুলো কেমন যেন হয়ে যায় .।
কেমন যেন ।
আপনার বাসায় আড্ডায় যাবার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ময়মনসিংহ ছিলাম বলে যেতে পারিনি , পরেরবার অবশ্যিই যাব।
অসাধারণ ।
প্রিয়তে নিলাম ।
আপনে নিয়মিত লেখেন না ক্যান?
বাবারা তো এমন ই হয় ।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন
এই লেখাটা একধরনের দায়বদ্ধতা থেকে লিখেছি .।
এমনিতে কিছু লিখতে খুব আলস্য লাগে .।
বুঝছি না কি লেখা উচিত ।
কিছু লিখতে হবে না , অনুভুতি গুলোও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে ।
একটানে পড়ে গেলাম, আপনাদের পুরনো দিনগুলো একটু ছুঁয়েও দেখলাম কি? কি জানি!
আপনার বাবা স্বর্গবাসী হোন, করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা।
লীনা আপু, ইদানিং পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়লে কেমন জানি অবাক লাগে .।
একটা মানুষ ছিল, এখন আর নেই, ব্যাপারটা স্বাভাবিক কিন্তু এখনো কেমন জানি লাগে ।
একজন বলেছিল, বিধাতা নাকী মানুষের মঙ্গল চান তাহলে পিতৃহীন হওয়া বিধাতার কোন মাঙ্গলিক ইঙ্গিত!
এর কী কোন উত্তর আছে? নেই।
শুধু মনে রেখেন চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, চলে গেলেও প্রিয়জনদের কাছে তিনি স্থির অবিচল দীপ্যমান। তিনি আপনাদের ভেতরেই অবস্থান করছেন। আপনারা মনের চোখ দিয়ে তাঁকে দেখবেন, ভালবাসা দিয়ে তাঁকে অনুভব করবেন।
কি জানি, সব কাজ মাঙ্গলিক, এটা বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে হয় না ।
আসলেই কি আছেন কেউ?
কেউ নেই কি আছেন এইটা যুক্তির কাছে বিবেচনা না করে বায়বীয়ভাবে বিবেচনা করি এখন। হয়তো আছেন হয়তো নেই।
অনুভুতিকে আসলে লেখা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না... যেমন আমি পারছিনা...
ঠিক বলেছেন মনে হয়, আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তার কিছুই হয়নি এই লেখাটা।
কিন্তু এর চেয়ে ভালো করে লেখার ক্ষমতা নেই আমার ।
ভালো থাকবেন
ভালোই আছি...খারাপ থেকে কি লাভ?
বাবাকে নিয়ে আপনার লেখাগুলো বরাবরই চোখে পানি এনে দেয়। সামুতে যেগুলো পড়েছিলাম সেগুলোও এমনই ছিলো।
পরম করুণাময় তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন।
ভেবে ভেবে বলিকে যে কি বলি ভেবে পাচ্ছিনা...
ভালো থাকবেন ।
একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে গেল।....
ভালো থাকবেন, সবসময় ...
সাঁঝু রে...........................
এমন লেখা পড়ে চুপ করে বসে থাকতে হয় দীর্ঘক্ষণ, তাই সকালে পড়িনি
মাকে সময় দিও ভাই, বাবা খুশী হবেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
মন খারাপ করানোর জন্যে লেখিনি আপু ...
মাকে সময় দিতে চাই, কিন্তু মানুষ মাত্রই স্বার্থপর ...জানেন তো ...?
ভালো থাকবেন আপু ...
শুরুটা যদি আমি কপি পেস্ট করে দিয়ে দেই তাহলে সেটাও হবে আমার বাবার কথা। আমাদের বাবারা এরকমই ছিলেন, ভয়ের। সেই বাবাও কত পালটে যায়, যখন আমরা বড় হই।
ভাল থাকেন।
মনটা খারাপ হয়েছে, আমার বাবার জন্যও।
অনেক বড়মাপের একটা লেখারে ভাইডি....মনটা কেমন লাগলো.....
ভালো থাকো সাঁঝু.........
ধুরু, সবাই মন খারাপ করলে কেমনে হইব ...?
কেমন আছেন শাওন ভাই?
কিছু কিছু কষ্টের কোন সান্ত্বনা হয় না। ভালো থাকবেন
লেখাটা আগে কেন দেখিনি?
পড়তে পড়তে চোখ ভরে গেলো, বুকের ভিতরে জমাট বাধলো। সৃষ্টিকর্তা কেন এমন হয়?শৃধৃ নিজের মত করেই সাজায় সবকিছুকে।
কলিজাটা ছুঁয়ে গেলো
নিজের মা বাবার কথা চিন্তা করে চোখে পানি এসে গেল। আসলেই খুব হ্দয়বিদারক কাহিনী।
মন্তব্য করুন