শিক্ষক শিক্ষানীতি এবং অন্যান্য প্যাচাল ০১
বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি নেই বলে নীতিনির্ধারণী মহলে আক্ষেপের কমতি নেই, সবারই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত একটি বাক্যে গিয়েই সমাপ্ত হয়ে যায়, একটি শিক্ষানীতি থাকলে সেটার সাথে সকল শিক্ষালয়ের শিক্ষাপাঠক্রমের সমঞ্জস্য করা যেতো, কিন্তু গোড়ার কাজটি করা হয় নি। শিক্ষাবিদদের আন্তরিক এবং আন্তরিকতাবিহীন প্রচেষ্টায় অবশেষে শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে এবং সেই শিক্ষানীতিতে সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নির্মাণের আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়েছে। আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে এই শিক্ষানীতি থাকবে এবং সেটার ভিত্তিতে আমরা আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোর পাঠ্যক্রম সরকারী নীতিমালার সাথে খাপ খাইয়ে নিবো।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধ্যয়ন ও অনুধাবন ক্ষমতা যাচাইয়ের বিভিন্ন মাণাঙ্ক শিক্ষাবিদগণ নির্ধারোন করেছেন, প্রতিটি শিক্ষাস্তর অতিক্রম করবার সাথে সাথে শিক্ষার্থী সেসব বিষয় অনুধাবন করছে কিনা সেটা নির্ধারণের জন্য তারা মেধা যাচাই করেন বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে। শুধু তাই নয় প্রাথমিক পর্যায়ের অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তকেই শিক্ষক নির্দেশণা দেওয়া আছে।
শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের শিক্ষাদানে উৎসাহিত করতে যেমন পৃথক পারিশ্রমিক নির্ধারণের সুপারিশ রয়েছে তেমনই একজন শিক্ষার্থী যেন শিক্ষকের কাছ থেকে তার অধীত বিষয়টি সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারে সেজন্য তারা শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেছে।
প্রায় সম্পূর্ণ জীবনটাই ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে কাটিয়ে দেওয়ায় এখন বুঝতে পারি একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলো শিক্ষক, তার সাথে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক যাই হোক না কেনো, শিক্ষক তিনিই যিনি আমাদের তার প্রাজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে পাঠ্যক্রমে উপস্থাপিত বিষয় আমাদের যোগ্যতা ও অনুধাবন ক্ষমতা যাচাই করে আমাদের বুঝিয়ে দিতে পারেন। শিক্ষক ছাত্রকে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার বিষয়ে আগাম সংকেত দিতে পারেন, একজন মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারেন একজন উপযুক্ত শিক্ষক।
শিক্ষানীতি কিংবা পাঠ্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উপযুক্ত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া, শুধুমাত্র শিক্ষকের পাঠপ্রদানপদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় আমাদের অনেক বিষয়েই পড়বার আগ্রহ চলে গিয়েছে, অনেক বিষয়েই আমাদের তীব্র বিতৃষ্ণা এসেছে, এবং এটার অন্য পিঠ ভাবলে মনে হয় কোনো কোনো শিক্ষক আমাদের ভেতরে তীব্র আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছিলেন।
ছাত্র এবং শিক্ষক উভয় ভুমিকাতেই থাকবার কারণে আমার ইদানিংকার অনুভুতি শিক্ষকতা পার্ফর্মিং আর্ট, গায়ক, অভিনেতা, আবৃতিকারদের মতো তারাও প্রতিদিনই নিজের নির্ধারিত মঞ্চে উপস্থিত হন, তাদের দক্ষতা অনুযায়ী তাদের অধীত বিষয় উপস্থাপন করেন এবং তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার উপরে নির্ভর করে সে ক্লাশের শিক্ষার্থীরা কতটুকু গ্রহন করলো তার কাছে।
প্রতিদিন, প্রতিবেলাই তাদের বিভিন্ন যোগ্যতার ছেলে মেয়েদের সামনে উপস্থিত হতে হয়, প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ছেলে মেয়েদের অনুধাবন ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন, তাকে সেইসব স্তরের ছেলে মেয়েদের অনুধাবন ক্ষমতার সাথে মানিয়ে নিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়।
যেহেতু এটা পার্ফর্মিং আর্ট, সে কারণে এখানে যারা সফল হয় তাদের এই শিক্ষকতা বিষয়ে আলাদা প্যাশন থাকতে হয়, তারা প্রতিটি ক্লাশে যাওয়ার আগে আলাদা প্রস্তুতি গ্রহন করেন, প্রতিদিন বাসায় ফিরে গিয়ে নিজের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিজের নিক্তিতে পরিমাপ করেন, এবং পরবর্তী দিনের জন্য পুনরায় প্রস্তুতি নেন। তারা যেকোনো শিক্ষালয়ের সম্পদ। এর বাইরে প্রতিটি শিক্ষালয়ে আলাদা কয়েকজন থাকেন, তাদের বলা যায় গড়পরতা শিল্পী, তারা ততটা দক্ষ নন, সৃজনশীল নন কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন যথাযথ ভাবে।
এর বাইরে অধিকাংশই অযোগ্য শিক্ষক, যাদের অন্য কোনো সম্মানজনক পেশায় প্রবেশ করবার যোগ্যতা কিংবা উপযুক্ত দক্ষতা নেই বলে তারা শিক্ষক। তারা অধিকাংশ সময়ই উপযুক্ত প্রস্তুতি নেন না কিংবা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে ততটা মনোযোগ দিতে আগ্রহী হন না।
শিক্ষক শিক্ষার্থীকে অধীত বিষয় বুঝিয়ে দিবেন শুধু এমন না বরং তিনি তাদের ভেতরে জানবার আগ্রহটাও উস্কে দিবেন, তাদের নিজের বিচার বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ দক্ষতাকেও বাড়িয়ে দিবেন উপযুক্ত পরিমাণে যেনো তারা পরবর্তীতে নিজেরাও নিজেদের মতো বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে ।
আমাদের শিক্ষানীতি যেমনই হোক আমাদের পাঠ্যক্রম নিয়ে তেমন আপত্তিকর কিছু পাই নি আমি। বরং বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে যদি তুলনা করা যায় তবে আমাদের পাঠ্যক্রম মোটেও আদিম যুগের পাঠ্যক্রম নয়। যারা শিক্ষা পাঠ্যক্রম নির্ধারণের দায়িত্বে আছেন তারা নিজস্ব ভাবনা থেকে যেভাবে পাঠ্যক্রম সাজিয়েছেন তাতে তাদের ধন্যবাদ জানাতে হয়।
বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় যেতে হলে অনেক রকম শাখাপ্রশাখা জন্মাবে আলোচনার সে কারণে মূলত আলোচনাটা হবে বাংলা পাঠ্যক্রম নিয়ে। আমার বই প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ, চতুর্থ ভাগ পঞ্চম ভাগের সাথে বাংলা ব্যকরণ, এবং সহায়িকা বই পড়তে হয়েছে আমাদের। ক্লাশ টু এর চয়নিকা বইটা হয়তো অনেকের স্মরণে আছে, বেশ সুগ্রন্থিত পুস্তক ছিলো সেটি, কিন্তু সেটা যে সুগ্রন্থিত এবং চমৎকার একটি বই ছিলো সেই সত্য উপলব্ধি করতে আমাকে প্রায় ত্রিশ বছর সময় দিতে হয়েছে, দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়বার সময় বানান, যতিচিহ্ন এবং সাজানো প্রশ্নোত্তরের যন্ত্রনায় আসলে বইটির চমৎকারিত্বের কোনো উপলব্ধি আমাদের হয় নি।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এবং বিশ্বের অনেক ভাষার তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ একটি ভাষা , আমরা বাক্য নির্মাণ শিখবার পর থেকেই এই ভাষায় বাক্যালাপ করছি কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষা্য দক্ষতা সবচেয়ে কম।
স্কুলে সবচেয়ে খারাপ ভাবে যে কয়টা বিষয় পড়ানো হয় তার একটা বাংলা। বাংলাদেশ সরকারের টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে বিজ্ঞান শিক্ষকদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা যেনো শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত করতে পারেন, কিন্তু বাংলা বিষয়ে তেমন বিশেষ প্রশিক্ষণের বিষয়ে তারা ততটা মনোযোগী নন। অধিকাংশ স্কুলের বাংলা শিক্ষকের মান খারাপ।
আমরা পাতার পর পাতা মুখস্ত করেছি, ব্যাখ্যা শিখেছি এবং বিশ্লেষণ করেছি পরীক্ষার হলে, তবে আমি সেসব থেকে কিছু শিখেছি এমনটা জোর দিয়ে বলতে পারি না। বাংলা বিষয়ে আমার সামান্য যা জানা তা সবটুকুই নিজের আগ্রহে জানা বলা যায়,
বাংলা ভাষার অক্ষরগুলোর প্রতিটি উচ্চারণ অনুযায়ী আলাদা বর্গে ভাগ করা, এক একটা অক্ষরের জন্য নির্দিষ্ট উচ্চারণ তরিকা আছে, কণ্ঠ ধ্বনি, তালব্য ধ্বনি, দন্ত ধ্বনি, অনুনাসিক ধ্বনি এইসব ব্যকরণে পড়া শব্দগুলো কিংবা বিষয়গুলো কখনই আমলে আনি নি, কারণ আমাদের মাতৃভাষা বাংলা , আমার আশৈশব শুদ্ধ কিংবা অশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতে অভ্যস্ত। এমন কি কেউ যদি এসে বলে না দিতো তাহলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না আমাদের আশৈশব অভ্যস্ততায় আমরা কত ভুল উচ্চারণে নিজেদের দক্ষ করেছি।
আঞ্চলিক ভাষা এবং মান ভাষা বিষয়ক বিতর্কের জন্ম হয়েছে, সাধু ভাষা এবং চলিত ভাষা নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। সেসব শেখানোর উপযুক্ত স্থান ছিলো আমাদের প্রায় লাখ খানেক বাংলা মাধ্যমের স্কুল কিন্তু তথাকথিত শুদ্ধ উচ্চারণ শিখতে আসে ছেলে মেয়েরা শখের বশে, কৈশোরউত্তীর্ণ ছেলে মেয়েরা যখন আবৃতি শিখতে আসে কিংবা ভবিষ্যতের আরজে ডিজে আর উপস্থাপিকা সংবাদ পাঠিকারা যখন পেশাগত প্রয়োজনে বাংলা উচ্চারণ শিখতে আসেন তখন তারা উপলব্ধি করেন বিষয়গুলো।
কিন্তু আমাদের বাংলা বিষয়ের পাঠ্যক্রম সব সময়েই চমৎকার ছিলো। এস এস সি পরীক্ষার সময়ে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আমাদের পড়তে হয়েছিলো আবদুল্লাহ এবং পথের পাচালী, পদ্মা নদীর মাঝি এবং লাল সালু পড়েছি স্কুলে থাকতেই, এইসব উপন্যাস থেকে আমরা কত কম শিখেছি সেটা উপলব্ধি করেছি পরবর্তীতে পরিণত বয়েসে যখন এসব উপন্যাসের বিশ্লেষণ পড়লাম তখন।
য়ামাদের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে নির্ধারিত এই কয়েকটি উপন্যাস আমাদের কতটুকু ইতিহাস চেতনা জাগাতে পারতো সেতা ভেবে আশ্চর্য হয়েছি, আক্ষেপ করেছি আমাদের উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত বিষয়গুলো কেনো শিক্ষকেরা শেখালেন না এই ভেবে।
পথের পাচালী বিভুতিভূষণের অন্য রকম একটি উপন্যাস, উপন্যাসের বিশাল অংশ কিংবা পটোভুমিটা ইছামতি সংলগ্ন অঞ্চলের গ্রাম, সেই গ্রামের মানুষদের ভেতরে জটিলতা নেই, যন্তরযুগের ছোয়াবিহীন এই গ্রামের কারো ভেতরেই কোনো মনঃস্তাত্তিক সংকট নেই। অপু এবং দুর্গা, তাদের দাদী বাবা মা কেউই তেমন মনঃস্তাত্তিক সংকটে ভুগেন না, দুর্গার কিংবা অপুর অভাববোধ এবং চুরির ঘটনাটার বাইরে সবারই জীবনে তেমন আড়াল করবার কিছু নেই। বিভুতিভুষণের নির্মাণে এইসব চরিত্রের সারল্য এবং তাদের অপরাধবোধগুলো স্পষ্ট।
যন্ত্রযুগে অনুপস্থিতিতে কিংবা সভ্যতার অনুপস্থিতিতে মানুষের ভেতরে অভাববোধ কিংবা অন্য যেকোনো উপলব্ধি তার পরিপার্শ্বিকের সাথেই খাপ খাইয়ে নেয়, মহান মহত্তর কিছু সেখানে উঠে আসে না।
আবদুল্লাহ উপন্যাসটার পটভুমি বাঙালী মুসলমানের আত্মজাগরণের উপলব্ধি কালের, বাঙালী মুসলমান স্কুল কলেজে যাচ্ছে এবং তার ভেতরে একই সাথে আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যলগন্তার জড়তা ক্রিয়াশীল, বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও পরলৌকিক উপলব্ধিকে বস্তুতান্ত্রিকতার ঝাটায় উড়িয়ে দিতে পারছে না তারা। তাদের জীবনটা আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যকে খাপ খাওয়ানের ফিকিরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাঙালী মুসলমানের আত্মজাগরণ কালের পরবর্তী সময়ে একেবারে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের জবানীতে উঠে এসেছে লালসালু উপখ্যান,
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন সময়ে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু মনঃস্তাত্তিক উপন্যাস লেখা হয়েছে লাল সালু তাদেরই একটি। এখানে প্রতিটা চরিত্র তার অতীত অভিজ্ঞতা এবং বস্তুতান্ত্রিকতায় আলাদা। চরিত্রদের কার্যক্রম এবং মনোবিশ্লেষণের সামান্য সবক এখান থেকেই পাওয়া যায়। কিভাবে মানুষের ধর্মীয় অনুভুতিকে ব্যবহার করে ক্ষমতা অধিকার করতে হয় তার একটা উদাহরণ নির্মাণ করেছিলেন ওয়ালিউল্লাহ।
সেই সাথে পদ্মানদীর মাঝি, মানিকের অন্যতম সেরা একটি উপন্যাস। আমি এই বয়েসে এসে ভাবি, যদি কেউ সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট সমেত এই চারটি উপন্যাস পাঠ করে কিংবা যদি কেউ ্পথের পাচালী, আবদুল্লাহ এবং লালসালু পড়ে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে তার সামনে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবনার আন্দোলন এবং জড়তার একটা সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে উঠবে।
উপন্যাসগুলোর পটভুমি এবং সে পটোভুমিতে উপস্থাপিত চরিত্রগুলো কেনো কিভাবে পরস্পরের সাথে ভাব ও বাদানুবাদে লিপ্ত হয় সেটা উপস্থাপন করবার দায়িত্ব ছিলো শিক্ষকদের , তারা আমার কাছে উপস্থাপন করতে পারেন নি বলে আমাকে এই প্রায় অর্ধেক জীবন শেষে বুঝতে হচ্ছে উপন্যাসের অর্থ ও যথার্থতা।
আমাদের শিক্ষানীতির দুর্বলতা অনেক, কিন্তু শিক্ষানীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে যারা সেইসব শিক্ষকদের উপযুক্ত দক্ষতার অভাব সব সময়ই শিক্ষানীতির যথার্থ প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে।





আবদুল্লাহ উপন্যাসটা পড়ি সেই ক্লাস সিক্সে। বড় বোনের পাঠ্যবই ছিলো তখন। কেনো জানিনা, ঐ বয়সেই উপন্যাসটা মনে খুব দাগ কেটেছিলো। এরপর কতবার যে পড়েছি বইটা, প্রতিবার পড়ি আর একেকবার একেকটা অংশ নিয়ে চিন্তায় পড়ি। আমার নিজের দেখা পরিপার্শ্বের সাথে মিল খুঁজি...
আর লালসালু তো পুরোই অন্যরকম একটা জিনিস। আমার কত বন্ধুর সাথে যে এই উপন্যাসের খুটিনাটি নিয়ে তর্ক বিতর্ক করেছি...
পথের পাঁচালী আর পদ্মানদীর মাঝি নিয়ে বলার মতো ভাষা এখন পর্যন্ত আয়ত্ব করতে পেরেছি কিনা জানিনা...
এটা আসলেই সত্যি যে এই লেখাগুলো সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারলে অনেক কিছু সম্পর্কেই স্বচ্ছ একটা ধারনা তৈরী হবে...
শিক্ষানীতির সাথে পাঠক্রম যতোটা না সম্পর্কযূক্ত তার চাইতে পাঠদান পদ্ধতিটা বেশি সম্পর্কীত। একজন শিক্ষকের পাঠদানের বইটাও বাছাই করনের ক্ষমতা থাকা উচিৎ অনেক্ষেত্রে। শিক্ষকরা বই সাজেস্ট করবো কোন বইয়ের মনোনয়ন হইবো বোর্ডের পাঠক্রম তালিকায়...
তাই শিক্ষক বিষয়টা নিয়া ভাবার দরকার অনেক বেশি...
এই বার বই মেলায় রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলার পাঠ্য বই দেখছিলাম, বইটার নাম মনে নাই, কিনতে ইচ্ছা হইছিলো কিন্তু পকেটে পয়সা ছিলো না। যাউকগা, কথা হইলো শিক্ষক বই বাছাই করবেন একটা পর্যায়ে গিয়া তার আগে কাউরে না কাউরে তো ঠিক কইরা দিতে হইবো।
কোন বয়েসে কতটুকু শিখবে মানুষের বাচ্চা এইটা তো ধারাবাহিক গবেষণার বিষয়, অনেক তথ্য নিয়া বিষয়টা ঠিক করতে হয়, তার পরের বিষয় সেই বয়েস কিংবা ক্লাশ উপযোগী পাঠ্যবই লেখা, এখন বাংলাদেশে শ্রেণী অনুযায়ী পাঠ্য বই আছে দুই কিংবা তিন পদের, একটা ব্রাকের আছে, একটা জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের, সেইগুলা প্রাথমিক পর্যায়ের কোথা বার্তা, কিন্তু এর পরের বিষয়গুলার জন্যও আসলে তেমন উপযুক্ত পুস্তক নেই।
বাছাই করবার মতো পুস্তক থাকলে মানুষ বাছাই করবে, তিন গোয়েন্দা পড়াবে না ফেলুদা পড়াবে, বাছাইটা এখানে এসে থেমে যায় না, থ্রিলার না বায়োগ্রাফি না ফিকশন এইসব বাছাইয়ের বিষয় কিংবা আলোচনার একটা সুযোগ তৈরি করছিলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্যান কিন্তু সেইটাও মনে হয় সব জায়গায় প্রাপ্য না।
সে কারণে শিক্ষানীতি গুরুত্বপূর্ণ, সে কারণে শিক্ষা পাঠ্যক্রম এবং সেই পাঠ্যক্রম শেখানোর উপযুক্ত শিক্ষক তৈরীর প্রয়োজনীয়তা আছে। আমরা যদি ধরেন প্রাথমিক , মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অন্তত চার থেকে পাচটা বাছাই করবার মতো অবস্থায় আসি তাহলে আমাদের এইসব আলোচনা শুধুমাত্র পাঠ প্রদান বিষয়ক আলোচনা হইতো। আশা করি ভবিষ্যতে আমরা এই রক্ম আলোচনাই করবো
সাধারনত দেখা যায়, অন্য কোনদিকে কিছু না হইলেই মাষ্টারী করতে আসে স্কুলে, এইটাও একটা পয়েন্ট। নিজেই যে কাজ থেকে আনন্দ পায় না, সে ছাত্রদেরকে কি আনন্দদায়ক পাঠ দান করবে।
মন্তব্য করুন