অন্তর্জালিক যোগাযোগ
আবেগ নিয়ন্ত্রন করার অক্ষমতা কিংবা হঠাৎ সাময়িক উত্তেজনার বশে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মহত্যার সংবাদ শুনে বিষয়টা দু:খজনক কিংবা অগ্রহনযোগ্য এর বাইরে আদতে বলার কিছুই থাকে না অনেক সময়। আমাদের মানসিক অনুভুতিগুলো নিয়ন্ত্রনের কোনো কার্যকরী প্রশিক্ষণ আমরা পাই না, আমাদের অনুভুতিগুলো কাউকে না কাউকে জানাতে হয়, নিজের ভেতরের অনুভুতির দহন যখন দগ্ধ করে তখন বন্ধুর কাঁধে হাত-মাথা- রেখে তার কাছে উন্মুক্ত হয়ে নিজের দগ্ধাবশেষ রেখে আসতে হয়। দু:খজনক, লজ্জাস্কর, অপমানের কিংবা আনন্দের অনুভুতিগুলো নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা সব সময় সম্ভব হয় না।
নগরায়নের সাথে মানুষের ঘনত্ব বেড়েছে, সম্পর্কগুলো ততটা ঘনিষ্ট হতে পারে নি, বরং নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় সম্পর্কের গভীরতা এবং আন্তরিকতা কমেছে। সম্পর্কিত থাকবার আকাঙ্খার মৃত্যু হয় নি, নিতান্ত যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষের সহনশীলতা কমেছে, অন্যের অনুভুতিকে শ্রদ্ধা করবার মানসিকতাও কমেছে। স্বার্থান্ধতাই দায়ী এমনটা বলা সম্ভব হয় না এসব ক্ষেত্রে, বরং অপরাপর মানুষের সাথে বিচ্ছিন্নতা, প্রতিটা বিচ্ছিন্ন মানুষের নিজস্ব অনুভব অনুভুতি আছে এই সাধারণ বোধশূণ্যতা এবং পারিবারিক মহল এবং সামাজিক মহলে আদতে মানুষের আচরণে ভিন্নতা আসতে হয় এই প্রশিক্ষণের অভাবটুকু অনেক সময়ই দু:খজনক সব দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে 'ইভ টিজিং' কিংবা নারীর প্রতি কটু,যৌন রসাত্মক উক্তির সরস বয়ান হয়তো তেমন ধরণের দু:খজনক দুর্ঘটনাগুলোর জন্ম দেয়, কৈশোরের 'হরমোনাল ইনব্যালেন্স' কিংবা শাররীকপরিবর্তনজনিত বিভ্রান্তি, বিড়ম্বনা এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানগুলোকে এইসব ঘটনার জন্য দায়ী করা যায়, বলা যায় নিছকই 'বায়োকেমিক্যাল ডিসব্যালেন্স' এইসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
স্কুলে কিংবা অন্যান্য পরিবেশে নিয়মিত মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে একটা শব্দ প্রযুক্ত হচ্ছে- বুলিং, বিষয়টা নিয়মতান্ত্রিক সংঘবদ্ধ 'হ্যারাসমেন্ট' কিংবা দমন, বুলিং হজম করার ক্ষমতা সবার এক রকম নয়, কেউ আরও বেশী আত্মকেন্দ্রীক হয়ে উঠতে পারে, কেউ ইমোশন্যালী ডিসব্যালেন্স হয়ে হত্যাপ্রবন হয়ে উঠতে পারে, সংঘবদ্ধ এমন নির্যাতনের গুরুত্ব উপলব্ধি করে অনেক স্কুলেই সেসব আচরণ নিয়ন্ত্রনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সেসব স্কুলের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো স্কুল নেই।
স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'বুলিং', 'র্যাগিং' কিংবা 'হ্যারাসমেন্ট' এর শিকার হওয়া মানুষগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কোথাও অভিযোগ করা কিংবা মানসিক সহযোগিতার মতো প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলোও পায় না। সুতরাং বাংলাদেশের মানুষগুলো বিভিন্ন ধরণের অপমান, অবমাননা সহ্য করতে পারে, হাসিমুখে হজম করতে পারে। এই দমন কিংবা অবদমনের শিক্ষাটুকুই বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
সম্পর্কিত থাকবার বাসনায় মানুষ সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে গিয়ে বন্ধুত্ব করছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের ওয়েবসাইটগুলোতে, যেখানে 'চ্যাটিং' 'ভিডিও চ্যাটিং' ' ইমেজ ট্রান্সফার' এর সুযোগ সুবিধার সাথে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রাপ্তির মতো সুযোগ সুবিধাগুলো সহজেই পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মানুষ ঘরের নিরাপদ চৌহদ্দিতে থেকেই অনেকের সাথে সম্পর্কিত থাকতে পারছে। অন্য কোনোধরণের যোগাযোগের সম্ভবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় এইসব কল্পিত দুরবর্তী বন্ধুদের সাথেই নিয়মিত জীবনযাপনের খুঁটিনাটি লেনদেন করছে মানুষ।
কোনো রকম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতিবিহীন সম্পর্কগুলো হয়তো এসব ক্ষেত্রে চমৎকার টিকে থাকে, নিয়মিত লেনদেনের প্রেক্ষিতে যখন প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি তৈরি হয় কিংবা প্রতিদান পাওয়ার আকাঙ্খা তৈরি হয় তখন অনেক ধরণের জটিলতার মুখোমুখি হয় মানুষ, ফেসবুক, মাইস্পেস, হাইফাইভ কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের সাইটের আভ্যন্তরীণ ঝামেলায় মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে ইদানিং।
স্কুল কলেজের চৌহদ্দি থেকে ' বুলিং' ,হ্যারাসমেন্ট' কমিয়ে আনলেও সাইবার জগতে হ্যারাসমেন্ট এবং বুলিং এর মানসিক যাতনা নিয়ন্ত্রনের কোনো কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহন করা সম্ভব হয় নি। দায়িত্বশীলতা কিংবা দায়বদ্ধতাবিহীন সম্পর্কগুলো নিছক বিনোদন কিংবা টাইমপাসের মতো সাধারণ শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব হলেও আক্রান্তের জন্য বিষয়টা ঠিক সে রকম নয়।
ইন্টারনেটের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আরও বেশী দু:খজনক মনে হয় এ কারণেই। নির্দোষ আমোদে মানুষ আত্মহত্যা করছে এবং অধিকাংশ সময়ই যারা এর সূচনা করছে তারা হয়তো বুঝতেও পারছে না তারা কিভাবে নির্দোষ উক্তিতে একজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিশোধপরায়নতা কিংবা বন্ধুদের কাছে বাহবা পাওয়ার খেয়ালও কখনও কখনও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত মেয়ের কাছে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত তরুণ যখন সেই মেয়ের অন্যসব সাইবার ফ্রেন্ডের কটুক্তিতে আত্মহত্যা করে তখন প্রাথমিক অনুভুতিতে মনে হয়েছিল নিজের আবেগ ও আচরণকে নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ একজন মানুষ, যে এইসব ফালতু বিষয়কে এতটা প্রাধান্য দিয়ে বিমর্ষ হয় কিংবা বিষন্নতায় ভুগে, তার এই আত্মহত্যার ঘটনাটি দু:খজনক, তবে পরবর্তী বিবেচনায় মনে হলো বিষয়টা ভীষণ রকম বাস্তব সমস্যা এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোই ঘটনা।
বাংলাদেশে এখনও ফেস বুকের কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে নি, এখনও ফেসবুকের কারণে খুনের ঘটনা ঘটে নি, তবে যেভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে তাতে আত্মহত্যা, খুন, বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাগুলো পরবর্তীতে নিয়মিতই ঘটবে বাংলাদেশে। এইসব গভীর সম্পর্কগুলো কিংবা অগভীর সম্পর্কগুলো হয়তো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার হতাশা কিংবা ক্ষোভ থেকে ঘটবে কিন্তু অন্যসব নির্দোষ মজা, কিংবা আদর্শগত বিরোধজনিত ট্যাগিং, বুলিং এর জন্য যেসব ঘটনা ঘটবে সেসবের দায়দায়িত্ব কার?
আমি গতকাল ভাবছিলাম যৌনপ্রতিদানের প্রত্যাশাবিহীন অন্তর্জালিক নরনারীর সম্পর্ক যা কখনই প্রেম হয়ে উঠবার সম্ভবনা ধারণ করে না, সেইসব গভীর বন্ধুতার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে, আমাদের অন্তর্জালিক যোগাযোগ এমন গভীর বন্ধুতা কিংবা মমত্বময়তার জন্ম দিতে পারে, স্বার্থগন্ধবিহীন নির্ভেজাল বন্ধুত্বের আস্বাদ দিতে পারে আধুনিক বিচ্ছিন্ন মানুষকে।
তবে সব জলের গভীরেই কাঁদা থাকে, পঁচা গন্ধ থাকে, সম্ভবনাময় সম্পর্কের এই ভার্চুয়াল জগত এর ব্যতিক্রম নয়। যারা এখানে আসছেন তারা নিজের সামাজিক অস্তিত্বটুকুর বিস্তার ঘটাচ্ছেন এখানের উন্মুক্ত পরিসরে। আপনার অনুভব অনুভুতি অন্য সবার সাথে ভাগ করছেন, যৌক্তিক- অযৌক্তিক ক্ষোভ, আক্ষেপ প্রকাশ করছেন, দু:খে সান্তনা দিচ্ছেন, অর্জনে অভিনন্দন, ক্ষুদ্র ভুলে ভৎর্সনা করছেন, ব্যক্তিগত অহংবোধ সমেত যারা এখানে আছেন, তারা আরও একটু দায়িত্বশীল আচরণ করেন, যেসব অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে সেসব অনাকাঙ্খিত দু:খজনক ঘটনাগুলোর সম্মিলিত দায়ভার আমাদের নয়, তবে আমাদের সচেতন আচরণ অনেকক্ষেত্রেই এইসব দু:খজনক ঘটনার নতুন কোনো উদাহরণ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে।
নতুন বছরে সবাইকে অভিনন্দন।





বাংলাদেশে এখনও ফেস বুকের কারণে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে নি... কিংবা এখনও ফেসবুকের কারণে খুনের ঘটনা ঘটে নি... দুটোই অনুমান করে বললেন মনে হয়, হয়তো অনুসন্ধানী কোনো রিপোর্টার এমন ঘটনা খুঁজে পাবেন।
*লজ্জাস্কর শব্দটা একটু দেখবেন? লজ্জাকর/লজ্জাজনক হবে মনে হয়। লজ্জাস্কর তো সম্ভবত অশুদ্ধ।
আমিও তাই দেখলাম। লজ্জাস্কর শব্দটা অশুদ্ধ। লজ্জিত-তস্কর এর অনুভুতি লজ্জাস্কর এমন জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালানো যায়।
নতুন বছরে সবাইকে অভিনন্দন...
গতকাল আমার এক কাজিন... যে কিছুদিন আগে ইন্টার পাশ করেছে... সেই ছেলেটা আত্মহত্যা করলো। সে তার মায়ের কাছে ১০০০ টাকা চেয়েছিলো নতুন বছর বন্ধুদের সাথে উদযাপনে অংশ নেয়ার জন্য। তার মা তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল।
মৃত্যুর মত নিজেকে quit করে দেয়ার মত সিদ্ধান্ত নিলো শুধু মাত্র এই কারনে ... এখনো মানতে পারছি না। বেলা শেষে যেটা বুঝতে পারছি... আমাদের সাথে নতুন জেনারেশনের অনেক অনেক গ্যাগ... তাদের ধরতে পারছি না... তাদের পড়তে পারছি না...
ক্যামন যেন একটা হাহাকারের মধ্যে সময়টা পার করছি...
মন্তব্যটা হয়তো এই লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক নয়...
যথার্থ বলেছেন টুটুল ভাই । আপন সন্তানদের বুঝতে কষ্ট হয় আমার । জেনারেশন গ্যাপ কিভাবে মিনিমাম পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় সে বিষয়ে সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাবতে হবে । যে দুঃখজনক ঘটনার উল্লেখ করেছেন তার জন্য মর্মাহত !
ভাল থাকুন ।
চিন্তার ব্যবধান নয় বরং বেড়ে উঠবার ধরণে পার্থক্যটা বেশী। আবেগ সব সময়ই ছিলো, আমাদের সময়েও আবেগ ছিলো, সেই আবেগের প্রকাশও ছিলো, আত্মহত্যার অভ্যাসও ছিলো,
অর্থনৈতিক কারণে হয়তো কেউ আত্মহত্যা করে নি আমাদের সময়ে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ইদানিং অভিমাণে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো দেখে, পড়ে মনে হয় আমাদের স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রমে এইসব আবেগ নিয়ন্ত্রন নিয়ে আলোচনা প্রশিক্ষণ খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।
--- ঠিক কথা।
সবাইকে ২০১২ এর শুভেচ্ছা ।
ভাল চিন্তা।
ভাব্বে কে?
ভালো পর্যবেক্ষন।
সহমত।
বাংলাদেশে কি কি হয় সবতো আর পত্রিকায় আসে না। জরিপেও সত্যি কথা কেউ বলে না, নগরায়নের সুবিধার সাথে অসুবিধাগুলোও আসবে, সেটাই স্বাভাবিক
মন্তব্য করুন