ইউজার লগইন

শাড়ী

মাঝে মাঝে একটা দৃশ্যেই আটকে যায় জীবন, একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে কল্পনায়, ইদানিং একটা শিশুর চোখে জলন্ত আগুণের প্রতিবিম্ব দেখি, সে আগুণে পুড়ে যাচ্ছে একটা পুতুল, আর আকাশ অন্ধকার করে নামছে বৃষ্টি, আগুণের আঁচ মরে যাওয়া রান্না ঘরের পাশ থেকে শিশুটা সন্তর্পনে ঢুকছে সেখানে, ভেঙে যাওয়া মাটির সানকির নীচে আধবলগ দেওয়া ভাত পরে আছে, কয়েকটা মুরগিছানা আর শিশুটা খুঁটে খাচ্ছে সে ভাত।

ভীত শিশুটা সামান্য শব্দেই এদিকে ওদিকে তাকায় আর কারো পায়ের শব্দ হলেই অন্ধকার আড়াল খোঁজে, দিনের আলোর সাথে কোনো দৃশ্যমান শত্রুতা না থাকলেও সময়টাই এমন, সবাইকে সতর্ক থাকতে হয়, মজা পুকুর আর ডোবার নলখাগড়ার ঝোপ, এক হাঁটু কাদা পানি আর মানকচুর দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে থাকে সারাদিন, আর কখনও সুযোগ পেলে এভাবেই পরিত্যাক্ত রান্নাঘরে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর শিশুটা উঁকি দেয়, কখনও ভাগ্য সহায় থাকে কিছু পায় আর বেশীর ভাগ সময়ই কপালে কিছু না জুটলে ঘাসের মাঠে একাকী খেলতে খেলতেই ঘুমিয়ে পরে।

মেয়েটার বয়েসটা আন্দাজ করা যায় না, শরীরের গঠন আর পোশাকের মাপ দেখে অনুমাণ করা যায় মেয়েটা হয়তো ৮ বছরের, তবে সেটা ১০ হওয়াও বিচিত্র না। পরনের ফ্রকটাও ময়লা হয়েছে, এখানে সেখানে কাঁদা লেগে আছে, মাথার চুলে জটা পড়েছে, অনেক দিন কেউ আদর করে গোসল করিয়ে দেয় নি মেয়েটাকে।

যখন তার চোখে আগুণের প্রতিবিম্ব দেখি তখন তার গালে শুকনো কান্নার একটা রেখা ছিলো, সাদাটে একটা আঁকাবাঁকা রেখা আর নিস্কম্প চোখের স্থিরতা স্পষ্ট করে দেয় এই মেয়ে অনেক কান্না লুকিয়ে রেখেছে।

আমার দিনগুলো অদ্ভুত ভাবে শুরু হয়, কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকলেও আমি অনুরোধে ঢেঁকি গিলে ফেলি সময় সময়, সময় সময় সাময়িক উত্তেজনায় অনেক বড় দায়িত্বও নিয়ে ফেলি কাঁধে, গত বছরের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই একজন একটা পরিকল্পনা দিলো, দিব্যি আনন্দিত হয়ে সে পরিকল্পনায় মাতলাম।

একদিন, দুইদিন, তিন দিন, এভাবে দুই মাস কেটে যাওয়ার পর বুঝলাম আমাদের ব্যক্তিগৌরব আর নিজস্ব শৈর্য্য-বীর্যের বিজ্ঞাপনের আড়ালে সবাই যখন নিজের ঢাক ঢোল পিটিয়ে ফাটিয়ে ফেলছে অনেকের গল্পই সেইসব বিজ্ঞাপনের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে। এমন একজন ঔডারল্যান্ড, আমাদের বিদেশী বীরপ্রতীক। তাকে নিয়ে একটা চলচিত্রের চিত্রনাট্য লেখার অনুরোধের জাহাজ গিলেছিলাম, কতকটা গল্পগাঁথার মতো কিছু কিছু বাক্যও জানা গেলো কিন্তু তার বিষয়ে বিস্তারিত যেহেতু তিনি লিখেন নি, যেহেতু নিজের ঢোলটি তিনি সময় মতো বাজিয়ে বাজার গরম করতে পারেন নি সুতরাং ব্যক্তি ঔডারল্যান্ডের প্রতিরোধ যুদ্ধের কোনো ধারাবাহিক বিবরণ আমাদের ইতিহাস বইতে নেই।

তিনি বাটা কোম্পানির কর্তা ছিলেন, কিছুদিন গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন টঙ্গী এলাকার আশেপাশের মুক্তিযোদ্ধাদের, তিনি যেহেতু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলেন সুতরাং তাদের সৈন্য পরিচলন সম্পর্কে তিনি কিছু সংবাদও মুক্তিযোদ্ধাদের আঞ্চলিক হেড কোয়ার্টারে পাঠাতে পেরেছেন। কামরুল ইসলাম ভুইঞা বললেন সেসব সংবাদ ঠিক গোয়েন্দা ইনফরমেশন নয়, সেখানে গুরুতর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকলেও তার এই সহযোগিতা আন্তরিক ছিলো। আমি ২ ঘন্টা শুকনো মুড়ি চিবাতে চিবাতে সেসব শুনলাম।

পরে অন্য একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তিনি সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন এবং কয়েকটি ব্রীজ ধ্বংস করেছেন। তিনি একক উদ্যোগে এমনটি করেছেন এটা ঠিক বাস্তবসম্মত মনে হয় নি আমার, কিন্তু তার সহযোদ্ধাদের নাম জানা গেলো না। যখন উপলব্ধি করলাম বিষয়টি, আদতে নিছক গালগল্পের বিষয় নয় এটি, এই ব্যক্তির অবদান বুঝতে হলে তার পথেই অগ্রসর হতে হবে, সেটা এক মাস কম্পিউটার টেবিলে বসে থাকলে হবে না বরং বৃহত্তর টঙ্গি, জয়দেবপুর গাজীপুর এলাকায় সরেজমিনে খুঁজে রীতিমতো খুঁড়ে তুলতে হবে তার অবদান। তাকে নিয়ে সাময়িক উচ্ছ্বাসের বাইরে বৃহৎ কোনো কাজ আদতে হয় নি বাংলাদেশে। তিনি যদি বড় কিছু করে নাই থাকেন তাকে বিরপ্রতীক উপাধি দেওয়া কেনো? সাদা চামড়ারএকজন মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেছিলো বলে আর্চার ব্লাডকে বীরপ্রতীক উপাধি দেওয়া উচিত ছিলো সে বিবেচনায়।

প্রতিটি অকালপক্ক এডভেঞ্চারের ভালো কিছু দিক থাকে, এক্ষেত্রে আমার প্রাপ্তি হলো বেশ কিছু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা পাঠ, শওকত ওসমান, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, সুফিয়া কামাল, জয়নাল আবেদিন, নীলা এরকম বিভিন্ন মানুষের একাত্তরের ডায়েরী পড়বার সুযোগ হলো। যাদের যাদের বয়ান গ্রহনযোগ্য মনে হয় এমন কয়েকজনের বয়ানও পাঠ করা হলো, যে উপলক্ষ্যে এত বয়ান পাঠ সেই চিত্রনাট্য লেখার কাজটিই সম্পূর্ণ হলো না। যিনি জানিয়েছিলেন উৎসাহ তিনি হঠাৎ মাস তিনেক পর বললেন চিত্রনাট্য লেখার প্রয়োজন নেই আর, সে প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস গল্প লিখবো না এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অনেক আগে, এই অপরিকল্পিত যুদ্ধের রোমাঞ্চের দিকটা ভাবলে আমার রীতিমতো আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে আমরা মাত্র ৯ মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষে সত্যি সত্যি বিজয়ী হয়েছি। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীদের সম্মিলিত অবদান এই বিজয়। কোনো সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় নয় বরং একেবারে স্থানীয় জনগণের বৈরিতা এবং বেপরোয়া কিছু মানুষের আত্মত্যাগের ফলে এমন বিষ্ময়কর ঘটনা সম্ভবপর হয়েছিলো। সেইসব সাধারণ মানুষের অবদান আদতে উপন্যাসে তেমনভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিংবা ততটা শক্তিশালী গদ্যের জন্ম হয় নি এখনও আমার ভেতরে।

আমি কয়েকটা প্লট নিয়ে ভাবছিলাম, সেসব প্লটের গায়ে মাল মশলার পরত পরে নি, এটাও হয়তো তেমনই একটা মিস এডভেঞ্চারের গল্পে পর্যবসিত হবে। কিন্তু দৃশ্যটা বারবার ঘুরে ফিরেই চোখের সামনে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

আগুণের প্রতিবিম্বের আগের দৃশ্যেই গল্পের শুরু, শহর থেকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য মরীয়া মানুষ যেকোনো প্রকারেই নদী পার করে পালাচ্ছে ঘীন গ্রামে। প্রাথমিক প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে এগিয়ে আসছে পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই মানুষের মুখের ভাষা আর ভাবনা বদলে গিয়েছে, যারা কয়েকদিন আগেই মুজিব আর নৌকা নৌকা বলে অজ্ঞান হয়ে যেতো তাদের অনেকেই এখন ভাবছে কাফেরদের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা পেলো একটি বিশাল মুসলিম দেশ, জনসংখ্যা বিবেচনায় যারা সর্ববৃহৎ হিসেবে গণ্য।

এমন সময় কোনো একটি অজানা গন্তব্যে নেমেছিলো মেয়েটি, সাথে মেয়েটির মাও ছিলো, ছিলো আরও অনেক উদভ্রান্ত মানুষ, যাদের অন্য কারো অস্তিত্বের দিকে নজর দেওয়ারও সময় ছিলো না।

তখন সন্ধ্যা, নদীর পাশে অপরিচিত একটা অঞ্চলে মেয়েটা আর তার মা বিভ্রান্ত দাঁড়িয়ে ছিলো, কয়েকজন যুবকএসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। তাদের পরিচিত এক বাসায় তাদের আশ্রয়ও জুটেছিলো।

পরের দিন পায়ে হেঁটে সীমান্তের দিকে রওনাও দিয়েছিলো তারা। সীমান্তের কাছাকাছি কোথাও দুবৃত্তেরা হানা দেয় সে কাফেলায়। মেয়েটা নলখাগড়ার ঝোপে লুকিয়ে পড়েছিলো, মা লুকাতে পারে নি, সংযোগ সড়কের বাবলা কাঁটায় গেঁথে ছিলো তার সবুজ ডুরে শাড়ী। বিকেলের দিকে মেয়েটা নলখাগড়ার ঝোপ ছেড়ে যখন বাইরে আসলো মায়ের কোনো খোঁজ পায় নি মেয়েটা। একাকী মেয়েটি বাবলা কাঁটায় গেঁথে থাকা শাড়ীর ঘ্রাণে মায়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলো, আর সেটাকে একটা পুতুল বানিয়ে মুঠোর ভেতর আটকে রেখেছিলো। এভাবেই যুদ্ধপরিত্যাক্ত একটি একাকী শিশু যুদ্ধের ভয়াবহতার ভেতরে নিজেকে লুকিয়ে পালিয়ে ঘুরছিলো,

তার মায়ের ঘ্রাণ লেগে থাকা শাড়ীটা পাশে রেখে সে যখন রান্নাঘরে খাবার খুঁজতে ঢুকেছিলো তখনও রান্না ঘরে আগুণ লাগিয়ে দেয় কেউ। সে আগুণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সেই মেয়েটা দেখছিলো তার মায়ের ঘ্রাণ পুড়ে যাচ্ছে। এত কাছে পুড়ে যাওয়া মায়ের গন্ধ উদ্ধার করতে পারে নি সে। যুদ্ধ মানুষকে অকালে বড় করে দেয়।

মেয়েটা জানে এই পৃথিবীতে এভাবেই একা বেঁচে থাকতে হবে তার। বাঁচতে হলে যেকোনো উপায়েই খাওয়ার জোগাড় করতে হবে। অহেতুক ভাবালুতা বরং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিবে।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

এ টি এম কাদের's picture


অনেকে নয়, কেউ কেউ হয়তো ভেবে থাকতে পারে যে '৭১ কাফেরদের ষড়যন্ত্র ! আমি আপনার ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি ! কারেক্ট করুন প্লিজ !

তানবীরা's picture


পড়লাম।

দেশের মানুষের নৃশংসতার কাছে আজকাল ভিনদেশিদের নৃশংসতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

এ টি এম কাদের's picture


আপনার মতের সাথে প্রায় আমার মত মিলে যায় । তবে প্রবলেম হচ্ছে কি জানেন, এরকম মতালম্বীর কে পি টেষ্টের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কেউ কেউ ! আমার কিনতু হাসি পায় । স্বপক্ষের কেউ অন্যায় করলে তা বলা যাবেনা কেন বুঝিনা !

রাসেল's picture


ভাই কাদের ছাগুমিটার নিয়ে ঘুরাঘুরি করা মানুষদের বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে আমার সহনশীলতা বেশ কম, ছাগুর ল্যাঞ্জা খুঁজে পাওয়ার অতিআগ্রহে সম্ভবত লেখাটা পুনরায় পড়বার সুযোগ হয় নি। ল্যাঞ্জা আর হাম্বা-ব্যাঁ এইসব অগ্রাহ্য করে লেখাটা ধীরে ধীরে বানান করে পড়েন। তাহলে হয়তো আপনার এই কথা ফিরিয়ে নাও কথা ফিরিয়ে নাও, কিংবা এই ছাগুমিটার নিয়ে ঝাপিয়ে পরবার উৎসাহ খানিকটা কমবে।

এ টি এম কাদের's picture


- @ রাসেল ভাই,
- প্রতি মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ । মন্তব্য করার পূর্বে আপনার লেখাটি আমি দু’বার পড়েছি । আপনার প্রতি মন্তব্যের পর খুঁটে খুঁটে আরো দু’বার ।

- আপনি লিখেছেন, ‘মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মানুষের মুখের ভাষা আর ভাবনা বদলে গিয়েছে , যারা কয়েক দিন আগে মুজিব আর নৌকা নৌকা বলে অজ্ঞান হয়ে যেত তাদের অনেকে এখন ভাবছে কাফেরদের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা পেলো একটি বিশাল মুসলিম দেশ, জন সংখ্যার বিবেচনায় যা সর্ব বৃহৎ হিসাবে গণ্য’ !

- ’৭১ এ আমার বয়স ছিল ১৯ । ২৩ মার্চ দুপুর থেকে ২৭ মার্চ সকাল ৯ টা পর্যন্ত্র দামপাড়া [চট্টগ্রাম] পুলিশ লাইনে আমার বন্ধু কে বি সাহার পিতা স্বর্গীয় ও. সি. রস রাজ সাহার বাসায় ছিলাম । পরে শহর ত্যাগী হাজারো মানুষের সাথে পায়ে হেঁটে রাউজান হয়ে বাড়ি ফিরি । স্বচক্ষে দেখেছি এক কাপড়ে সহায় সম্বল ছেড়ে নির্যাতীত হাজার হাজার মানুষের দেশ ত্যাগ, দেখেছি অসংখ্য বাড়ি-ঘর, দোকান- পাটের জ্বলে যাওয়া । কিন্তু কোথাও দেখিনি আপনার কথিত মত পরিবর্তন করা লোক । যারা দলে দলে চলে গেছিল কিংবা যারা মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে দেশের মাটি কামড়ে থেকে গিয়েছিল, তাদের কারো মাঝে ক’দিন আগের ভাবনা বদলেছ এমনটা দেখিনি ।

- জুলাই মাসে ভারত থেকে ফিরে এসে অনেক মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি, হাটে বাজারে গেছি, অসংখ্য মানুষের সাথে মিশেছি । সহযোগিতা পেয়েছি সবখানে ।

- আপনার লেখার উদ্ধৃতি আমি উপরে দিয়েছি, আপনার ওই বক্তব্যে আমার আপত্তি । এখনও আপত্তি । আমার মতে অনেক মানুষ নয়, কিছু মানুষ, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মত পাল্টে থাকতে পারে ।

- প্রতি মন্তব্যে আর যা বলেছেন সে ব্যাপারে আমি কিছু বলবোনা । আপনার পাঠকের প্রতি কি ভাষায় মন্তব্য করবেন সেটা আপনার ব্যক্তি-রুচির ব্যাপার ।

- আবারো ধন্যবাদ ।

রাসেল's picture


আপনার চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ এবং আমি দু:খিত যে আমি আপনাকে আমাদের সমবয়সী ভেবেছিলাম। আপনি সে সময়ের ভেতরে জীবনযাপন করেছেন, সুতরাং আপনাকে কথাগুলো বলা যায়

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব যারা দিয়েছিলো তাদের অধিকাংশ মূলত পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের আশাভঙ্গের কয়েকটি কারণও ছিলো, যে পাকিস্তানের পক্ষে তারা লড়াই করেছিলেন সদ্যোজাত পাকিস্তান সে আদর্শে তৈরি হয় নি। তাদের ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন ফিকে হতে সময় লাগে নি। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে যেসব ভ্রান্তির পথে এগিয়েছে সেসব ভ্রান্তি আদতে বাঙালী জাতীয়তাবাদ পৃষ্টপোষকতা করেছে, পাকিস্তান আন্দোলনের পরবর্তী শূণ্যতা পুরণ করতে পূর্ব বাংলায় যে শ্রেণী মূলত জনসচেতনতা তৈরি করতে সক্ষম হলো এবং পাকিস্তান আন্দোলন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মূর্তমান আদর্শ হিসেবেই আসলো বাঙালী জাতীয়তাবাদ।

আন্দোলনের নেতৃত্বের মানসিকতা এবং আন্দোলনের কর্মীদেরম মানসিকতার এই ব্যবধানটুকু কখনও কমে যায় নি। আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্রেসী মডেল এমন কি গ্রামেও এক ধরণের রাজনৈতিক ক্ষমতাবলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলো। বেসিক ডেমোক্রেসীর কল্যানে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠিরা পরবর্তীতে রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে সেনাবাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছে।

বাংলাদেশী হিসেবে নয় বরং গন্ডগোলের বছরে তাদের লক্ষ্য ছিলো যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত ফায়দা লুটে নেওয়া। গরম তাওয়া এবং চুলোর আগুণের ভেতরে যতটা সম্ভব সমঝোতা করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে।

কোনো রকম পরিকলপনা ছাড়াই স্থানীয় ব্যক্তিদের বৈরিতায় যেভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত হয়েছিলো তা সম্ভব হয়েছিলো এইসব স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায়।

কিন্তু এই সহযোগিতার একটা অংশে ঘোরতর সংশয়ও বিদ্যমান ছিলো, স্পষ্ট কোনো পক্ষাবলম্বন না করে দিনযাপনের অভ্যাস কিংবা মুখ গুঁজে থাকবার অভ্যাসটুকু সে সময়ে মানুষদের ছিলো। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, পাকিস্তানী সৈন্যদের ভূড়িভোজ করিয়েছে। এখন যদি আপনি বলেন তার প্রাণভয়ে ভূড়িভোজ করিয়েছে এবং ভালোবেসে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে সেটা এক ধরণের অবস্থান গ্রহন, আমার অভিমত তারা কোনো পক্ষের সাথেই সরাসরি বিরোধিতা করতে চায় নি, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ পরিস্থিতিতে যেভাবে জীবনযাপন করার কথা তারা ঠিক সেভাবেই জীবন যাপন করেছে।

রেজাকার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি কিংবা শান্তিকমিটিকে সহযোগিতার সব দুয়ারই তারা খুলে রেখে জীবনযাপন করেছে। তাদের ভেতরে কি ধারণা ছিলো সেটা যারা সে সময়ে বসবাস করেছে তারা ভালোভাবে বলতে পারবে। আমি ট্রেন্ড লাইনের দিকেই মনোনিবেশ করবো, শান্তিকমিটির গুড বুকে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গুডবুকে থাকতে চাওয়া অধিকৃত জনবসতির বাসিন্দাদের আমি দোষারোপ করি না। আভ্যন্তরীণ শরাণার্থী এবং ভারতীয় শরনার্থীদের ভেতরেও আমি কোনো তফাত করছি না।

দুটো স্পষ্ট পক্ষ বিদ্যামন ছিলো, আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্রেসী মডেলের সুবিধাভোগী একটা পক্ষ এবং অন্যপক্ষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়ছে, কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা পরিমাপ করলে দেখা যাবে মে মাসের শেষ সপ্তাহে সিংহভাগেরই তেমন রাজনৈতিক সচেতনতা বিদ্যমান ছিলো না। অধিকৃত ভূখন্ডে দালাল মানসিকতার মানুষের কমতি থাকে না, মানুষ নির্বিঘ্নে বাঁচতে চায় এবং বেঁচে থাকার আদম কামনাটুকু স্বাভাবিক। এর ভেতরেই অকুতোভয় মানুষেরা স্বাধীনতা যুদ্ধ অব্যহত রেখেছেন।

যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন কিংবা সহযোগিতা করতে বাধ্য হয়েছেন, প্রতিটি কলকারখানার ৫০ থেকে ৭০% শ্রমিক, ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালা ভ্যানওয়ালা, ট্রেনের ড্রাইভার, ট্রাক এবং লরীর ড্রাইভার, নৌকা চালক এবং কখনও সাতে পাঁচে না থাকা কৃষকেরা, এইসব জনগোষ্ঠীর কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছিলো না। তাদের কাছে সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধা আলাদা কোনো স্বত্ত্বা ছিলো না, যে পক্ষই জয়ী হতো তাদের বশ্যতা মেনে নিতে এদের দ্বিতীয় বার ভাবতে হতো না।

যদি আপনি এ কথায় দ্বিমত পোষন করেন তাহলে আমি আপনার কাছেই জানতে চাইবো এই সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগে ভোট দেওয়ার বাইরে আভ্যন্তরীণ ভাবে কতটুকু রাজনৈতিক সচেতন ছিলো?

রায়েহাত শুভ's picture


কিছু লেখা পড়ে আসলে বলার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর...

সামছা আকিদা জাহান's picture


আকাশের দিকে মুখ তুলে বসে আছি। কোথায় ঈশ্বরের বাস, তিনি কি সত্যিই আছেন সেখানে তিনি দেখছেন শুনছেন আর কত কণ্ঠস্বর তীব্র করলে তার কানে মানুষের অর্তনাদ পৌঁছাবে। লেখাটা খুব আবেগ তাড়িত করে দিয়েছে আমাকে।

টুটুল's picture


কিছু লেখা নিয়ে আসলেই কিছু বলার থাকে না

১০

একজন মায়াবতী's picture


Sad

১১

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


এই অপরিকল্পিত যুদ্ধের রোমাঞ্চের দিকটা ভাবলে আমার রীতিমতো আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে আমরা মাত্র ৯ মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষে সত্যি সত্যি বিজয়ী হয়েছি। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীদের সম্মিলিত অবদান এই বিজয়। কোনো সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় নয় বরং একেবারে স্থানীয় জনগণের বৈরিতা এবং বেপরোয়া কিছু মানুষের আত্মত্যাগের ফলে এমন বিষ্ময়কর ঘটনা সম্ভবপর হয়েছিলো।

১২

লীনা দিলরুবা's picture


কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

১৩

শওকত মাসুম's picture


Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.