ইউজার লগইন

হায় আমাদের চৈতন্যের দীনতা

বাংলাদেশে যুদ্ধাহত নারীদের বিষয়টি কোনো আলোচনায় উত্থাপিত হলে তাদের প্রতি শাররীক আগ্রাসনের বিষয়টির পুরুষতান্ত্রিক আহাজারি শুরু হয়, আজ একটি আলোচনা সভায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ বেশ আবেগমথিত ভাষায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, বিষয়টির পুরুষতান্ত্রিকতা ক্ষণে ক্ষণে বিব্রত করছিলো।

তিনি যখন বিবৃত করেন সম্ভ্রমহানির যন্ত্রনাটুকু প্রতিদিন একজন যুদ্ধবিক্ষত নারীকে মৃত্যুর আস্বাদ দেয় তখন তার পেছনে একজন পুরুষের উদ্যত থাবা দৃশ্যমান থাকে যে থাবায় নারীর সতীত্বের প্রতি সম্মান ও সম্ভ্রম বিদ্যমান। তার বক্তব্যে প্রকাশিত হয় যুদ্ধবিক্ষত নারীর গ্লানিবোধ করবার প্রয়োজন আছে। এ বিষয়টি হারানোর শোক-সন্তাপ এবং হাহাকার তার পুরুষতান্ত্রিক মানসকে তৃপ্ত করে হয়তো।

এবং একই সাথে অবৈধ একটা চাপের মুখোমুখি করে যুদ্ধবিক্ষত নারীকে, তার সম্ভ্রমহানীর আহাজারিটুকু প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে, তার উপর পুরুষতন্ত্র এই অহেতুক বাধ্যবাধকতাটুকু বাক্যে ব্যক্ত করে কিংবা ইশারায় চাপিয়ে দিতে চায়।

যুদ্ধবিক্ষত নারীদের নিয়ে যারা কাজ করেছেন বিশেষত আফ্রিকা এবং বসনিয়ায় তারা এক ধরণের অস্বীকৃতির সংস্কৃতির কথা বলেছেন, তারা বলেছেন নিপীড়নের শিকার নারী তার উপরে ঘটে যাওয়া আগ্রাসনের বর্ণনা দেওয়ার সময় আক্রান্ত নারী এবং নিজের ভেতরে একটা স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করেন, তার নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা হলেও তিনি সেটাকে ব্যক্ত করেন তৃতীয় পুরুষে, এক্ষেত্রে যুদ্ধবিক্ষত নারী তার অতীত অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চায় কিংবা সামাজিক ধ্যানধারণার চাপে নিজের অস্তিত্বকে অবদমিত করে। এটাকে তারা সেন্স ওফ সেলফ ডিনায়েল বলেছেন, বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে স্পষ্টই বলা যায় কিন্তু আমি বলতে পারি নাসির উদ্দীন ইউসুফ এমন নারীদের মুখমুখি হন নি, তার সামাজিক ধারণার প্রতি অবিনশ্বর আস্থা তাকে শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবেই উপস্থাপন করছে এখানে।

নারীর সম্মান বিষয়টুকুর ভেতরে সতীত্বের ধারনা চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের সামাজিক সংশোধনবাদী আচরণ। সেখানে নারীর অবস্থান এবং আচরণের পরিধিটুকু পূর্বনির্মিত, এর যেকোনো ব্যতিক্রম আদতে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতি বিদ্রোহ।
একজন যদি যুদ্ধবিক্ষত হয়েও সে অতীত ভুলে নিজস্ব জীবনযাপনে আগ্রহী হয় পুরুষতন্ত্র তার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারে, কেনো সে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে না, কেনো সে শোকসন্তপ্ত না হয়ে নিতান্ত বেহায়ার মতো উচ্ছলিত জীবন যাপন করছে, তবে কি সে যুদ্ধবিক্ষত হয়ে আনন্দিত?

বীরাঙ্গনার প্রতি এই আগ্রাসনের বিচার হওয়া প্রয়োজন কিন্তু তাদের সতীত্ব এবং সম্ভ্রমের প্রতি এই বাড়তি মনোযোগটুকু দেখে প্রশ্ন করাটাই সঙ্গত আদতে এই যে সহানুভুতির স্বর সেটা কি অবদমিত কাম না কি অবদমিত ক্ষোভের??

বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেওয়া যাবে না কারণ ১৯৭২ সালে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে , সেখানে বলা হয়েছে যারা অস্ত্র হাতে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা, এর বাইরে যারা তারা কেউই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। এ বিষয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফের অবস্থান কিংবা গেজেটের প্রতি তার শ্রদ্ধাবনত আস্থা আরও একটি নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, অস্ত্রহাতে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ব্যক্তির আলাদা মর্যাদাটুকু যুদ্ধবিক্ষত নারী শুধুমাত্র ধর্ষিতা হয়ে অর্জন করে ফেললে সেটাও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় এক ধরণের কলুষতা এনে দিতে পারে। তিনি বরং এদের যুদ্ধাহত হিসেবে আলাদা মাসোহারা দিতে আগ্রহী। সরকারের কাছে এ বিষয়ে তিনি দাবি উত্থাপন করতে চান কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলাতে তিনি নারাজ।

তিনি স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এইসব যুদ্ধবিক্ষত নারীদের পূনর্বাসন কেন্দ্রের কথা বলছিলেন, বলছিলেন ৭৫এর ১৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে অনেকগুলো পূনর্বাসন কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কথাটির সত্যতা কতটুকু জানি না, তার আগেও অনেকে পূনর্বাসন কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন, কিন্তু এইসব পূনর্বাসন কেন্দ্র থেকে যেসব নারীদের উচ্ছেদ করা হলো তারা উপায়ান্তর না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং কেউ কেউ পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত হয়েছেন।

তিনি যখন বীরাঙ্গনাদের পতিতাবৃত্তি বিষয়ে বাক্যটি বললেন, তার গলাটুকু মিইয়ে গেলো, তিনি লজ্জিত হলেন, পতিতাবৃত্তি যে অতিশয় নিকৃষ্ট একটি পেশা এবং সে পেশাজীবী মানুষের কথা যে সুশীল সমাজে উত্থাপন করা গর্হিত এ বিষয়ে তার স্পষ্ট সচেতনতা আছে।

আমি ভাবলাম হায়রে বীর পুরুষ তুমি উপায়ান্তরবিহীন একজন নারীর বেঁচে থাকবার শেষ লড়াইটুকুকেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছো। পতিতা যে সমাজের অধপতিত জীব, সে যে মনুষ্য পদবাচ্য নয় এই ধারণাটুকু তোমার মাথার ভেতরে কেউ পেরেক ঠুকে আটকে দিয়েছে। তুমি এইসব সামাজিক ক্ষুদ্রতার বাইরে যেতে পারলে না, আর তুমি লম্বা চওড়া বিশাল বিশাল প্রগতিশীল বাক্য সাজিয়ে কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করো।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


Sad

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


কোন দেশে থাকে তেলের খনি, কোন দেশে থাকে স্বর্ণের খনি, এই দেশ পেয়েছে চোর আর ভন্ডের খনি..

~

সাবেকা's picture


হুম!

তানবীরা's picture


ভাল লাগল লেখাটা

সাঈদ's picture


আমরা ঘুরে ফিরে ঐ পুরুষতান্ত্রিকতাই ভালোবাসি ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.