ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান এবং বুদ্ধিজীবিগণ
ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান সংবাদের বিষয়বস্তু হিসেবে নিতান্তই গৌন, গতকালের সাম্ভাব্য সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি তারচেয়েও কম গুরুত্ব পেয়েছে। বিশাল সংবাদ সম্মেলন করে পঁচা ইঁদুরের বিবর্ধিত ছবি দেখানোর আয়োজনটুকু চমৎকার হলেও ইঁদুর শেষ পর্যন্ত ইঁদুরই, তার ছুঁচালো মুখ কখনই মাংসাশী আকার পায় না।
পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বিডিআর বিদ্রোহপরবর্তী সেনা অসন্তোষ এর চেয়ে গুরুতর ছিলো, সে সময়ের সেনা বিক্ষোভ দক্ষ হাতে সামলানোর কৃতিত্বটুকু দিতে হবে মইন উ আহমেদকে। সে পরিস্থিতির তুলনায় জনৈক মেজর জিয়ার ই মেইল এবং বক্তব্য যতটা আয়োজন করে প্রকাশ হলো সেটা নিতান্তই হাস্যকর।
রাজনৈতিক ভাবে সেনাবাহিনীর কতিপয় ধর্মান্ধ ব্যক্তির অংশগ্রহনের বিষয়টুকু সেনা সদর দফতর ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সেনা কর্মকর্তাদের বিএনপি জামায়াত ঘেঁষা কর্মকর্তাগণ ক্ষিপ্ত, এ বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ , তারা এবং আরও অনেক ব্যক্তিরা মিলে এক ধরণের চক্রান্ত করছেন এমন একটা বিষয় বারংবার প্রচারিত হয়েছে, সেনা সদর দফতরের বক্তব্যে প্রকাশ পেলো এমন বিষয়টি প্রায় ভিত্তিহীন।
সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়মানুবর্তিতার ভেতরে নিয়মিত মসজিদে ধর্না দেওয়ার একটা রীতি প্রচলিত ছিলো, এখন কতটুকু প্রযোজ্য সেটা আমার জানা নেই, এখনও কি জুনিয়র কমিশনড অফিসারদের ভোরে ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে হাজিরা দিতে হয়? সে চর্চায় ইশ্বরানুগত্যের সাথে ক্ষমতাবানদের প্রতিও এক ধরণের আনুগত্যবোধ হয়তো জন্মায়।
ই মেইল ছড়িয়ে পরা এবং তার প্রায় ৩ সপ্তাহ পরে এক ধরণের উৎসবমুখর পরিবেশে ই মেইলের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করার ভেতরে সামান্য হলেও কৌতুককর উপাদান আছে। প্রায় ৪ সপ্তাহ আগেই জনৈক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে, এবং মেজর জিয়াকেও হয়তো আটক করা হয়েছিলো, সেটার সত্যতা স্বীকার করবে না সেনা সদর দফতর।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া নেই তেমন, সেনা শাসনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এখনও জনমত বলিষ্ঠ নয়, গণমাধ্যমে বিদ্যমান্রাজনৈতিকগুলোর বিকল্প হিসেবে সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না। বরং অহিংসা গান্ধিবাদী এবং কবরে এক পা দিয়ে রাখা অবসরপ্রাপ্ত আমলা, শখের লেখক এবং কলাম লেখকদের সংগঠন বানিয়ে এদের সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা নির্মাণের একটা নির্লজ্জ উদ্যোগ নিয়েছে। জনসম্পৃক্তিবিহীন এইসব কলাম লেখকদের সংগঠন শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে কার্যকরী হয়ে উঠবে না। এদের দিয়ে মজলিসে শুরা ধাঁচের কোনো সর্বদলীয় নির্দলীয় পরিষদ তৈরি করে বাংলাদেশের সরকার পরিচালনার কাজটি সাম্ভাব্যতা বিচারে অসম্ভব।
এইসব কলাম লেখক চলমান অসঙ্গতি বিষয়ে খুরধার করে কলাম লিখবেন, বিভিন্ন সেমিনারে দায়িত্বশীল বক্তব্য-প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করবেন, তবে তারা রাজনৈতিক দলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবেন না। কমরুদ্দীন আহমেদ পাকিস্তান সেনাশাসনের সমাপ্তির সময়ে পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি গ্রন্থটি লিখেছিলেন, সেখানে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী কিংবা ঢাকাই বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করেছেন, মাঝের ৪০ বছরে এদের অবস্থানও তেলাপোকার মতোই, তাদের তেমন মানসিক বিবর্তন ঘটে নি। তাদের চারিত্রিক অপরিবর্তনশীলতা একটি দিকই নিশ্চিত প্রকাশ করে, বাংলাদেশের সমাজে বুদ্ধিজীবী হিসেবে টিকে থাকতে হলে ক্ষমতাবানদের পকেটে গিয়ে তাদের আদর আহ্লাদ এবং মৃদু পিঠ থাবরানি খেয়ে আনন্দে গোঁ গো করা ছাড়া বুদ্ধিজীবীদের বিকল্প কিছু করনীয় নেই।





ঠিক বুঝলাম না রাসেল ভাই। জনমত বলিষ্ঠ হওয়াটা কি জরুরী?
আমাদের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের মত প্রশাসনিক ভবন গুলোতেও লাল-সাদা-নীল রঙের চামচার বাচ্চাদের ঘোৎ ঘোৎ আমরা যেমন উচ্চস্বরে পাই ঠিক একই ঘোৎ ঘোৎ শব্দ জলপাই ভবন থেকেও খুব চাপা আওয়াজে হলেও কানে আসে। এই লুপ থেকে মনে হয় আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কখনোই বের হতে পারবো না।
সেনাকতৃক দেশ অধিগ্রহনের ন্যুনতম গ্রহনযোগ্যতা থাকতে হয়, হাতে বন্দুক মাঠে কামান থাকলেও সেনাবাহিনী জনগণের খুব সামান্য একটা অংশ এবং এই সেনা কর্মকর্তাদের ভেতরে বিভিন্ন ধরণের বৈরিতা আছে, জনগণের ভেতরে গ্রহনযোগ্যতা থাকলে সেইসব সেনা কর্মকর্তা অন্তত এক ধরণের জনসমর্থন পেয়ে যান, যা তাদের আচরণকে বৈধতা দেয় এবং আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে তাদের নিরাপত্তা দেয়।
প্রায় নিয়মতান্ত্রিক সেনা অভ্যুত্থানের জন্য উপরের সারির কয়েকজন কর্মকর্তার ভেতরে সমঝোতা হওয়াও দরকারী। সেনাপ্রধান, উপ সেনাপ্রধান এই পদমর্যাদার মানুষেরা যদি মনে করেন তারা দেশের ক্ষমতা দখল করবেন তাদের পক্ষে বিষয়টা সম্ভব কিন্তু নীচু সারির কর্মকর্তাদের পক্ষে এইসব উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন শাররীক ভাবে হানিকারক।
বিদ্যমান পরিস্থিতি জনরোষ যদি তেমন মারাত্মক হয়ে যায় সেক্ষেত্রে নীচু সারির কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের গ্রহনযোগ্যতা না থাকলেও তারা ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভবনাটুকু পেয়ে যান।
যত ধরণের বিশ্লেষণই আসুক না কেন, দেশে অশুভ শক্তি ক্ষমতায় আসুক এটা কাম্য নয় । হাসিনা খালেদার দেওয়া গণতন্ত্র যত নিম্নমানেরই হোক তবু আমরা পাকিস্থান থেকে যে অনেক ভাল আছি এটাই বোধ হয় আমাদের কিছুটা শান্তনা । বিশেষ করে দেশের বাইরে যারা থাকেন তাঁরা এই ব্যাপারটা আরো ভাল করে উপলব্ধি করেন ।
মজাটাই এখানে, যখন গণমাধ্যম সেনাবাহিনীর গ্রহনযোগ্যতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে তখন আর এই সেনাবাহিনীকে অশুভ শক্তি মনে হবে না। গণমাধ্যম বিষয়টা এখনও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি।
যা হয়েছে সেটা নিয়ে বলা যায় অনেক কিছুই, কিন্তু না বলাই ভাল...
একটা প্রশ্ন মাথায় আসলো..
কর্নেল (অব) তাহের এবং লে. কর্নেল (অব) ইউসুফ এর বিপ্লব চেষ্টার মধ্যে কি তেমন কোন পার্থক্য আছে?
~
আমাদের ইতিহাস অসচেতনতার সাথে পাল্লা দিতে পারে এমন উদাহরণ সম্ভবত খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, প্রতিটি ইতিহাসের উপাদান চরম ভাবে রাজনৈতিক, রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে ইতিহাসের উপাদান নিয়ে নাড়াচাড়ার অনীহাটুকু আমাদের গবেষণা সংস্কৃতির দীনতাও প্রকাশ করে।
বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মুখী স্মৃতিচারণের ফাঁকফোকর দিয়ে ইতিহাসের অলিগলি অনুসন্ধান করা যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর। কর্নেল আবু তাহের( আমার ধারণা তাহের এবং ইউসুফ দুজনে সহোদর এবং ৭৫ এর নভেম্বরের ঘটনাটুকুই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে) এবং জাসদের তৎকালীন রাজনৈতিক বিশ্বাস সফল কোনো বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয় নি, সিপাহীদের অসন্তোষের একটা কারণ ছিলো আত্মসচেতন আত্মমর্যাদাবোধ। নিম্নশ্রেণীর সৈনিকদের প্রতি কমিশনড উপরওয়ালাদের দাসসূলভ আচরণের ক্ষোভটুকু সাধারণ সৈনিকদের অফিসারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে কিঞ্চিৎ ভূমিকা রেখেছিলো।
নিম্নপদস্থ সৈনিকদের সাথে দুর্ব্যাবহারই সিপাহী জনতা বিপ্লবের একমাত্র কারণ নয়। এটা অসংখ্য কারণের একটা, আমার ধারণা অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ অফিসারদের ভেতরে পদমর্যাদাজনিত বৈরিতা, পাকিস্তানফেরত অফিসার এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ভেতরে এক ধরণের বৈরিতা ছিলো, পাকিস্তান ফেরত অফিসারগণ মুক্তিযোদ্ধা মেজরদের অদক্ষ বিবেচনা করতেন। পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী থেকে পলাতক কিংবা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে ট্রেইনিংপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ১৯৭১ এর সেপ্টেম্বর অক্টোবর থেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে অন্তরীণ বাঙালী সেনা কর্মকর্তাগণ একই রকম প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আত্মীকৃত সেনা কর্মকর্তাদের অনেকের প্রশিক্ষণের মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ, পাকিস্তানে অন্তরীণ সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়ে একটা অবিশ্বাসের হাওয়া ছিলো মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের এবং পাকিস্তানে অন্তরীন সেনা কর্মকর্তাদের মনোভাবের একটা অংশে ছিলো এইসব মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের অদক্ষতা।
একই সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার ক্রমরাজনৈতিকরণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনতে হবে, সব মিলিয়ে ক্ষোভ একটা ছিলো কিন্তু শেখ মুজিবর রহমান নিহত হওয়ার পর অভিযুক্তদের অধিকাংশই পাকিস্তান ফেরত হওয়ায় এক ধরণের স্পষ্ট পোলারাইজেশন তৈরি হয়েছিলো। মুজিবর রহমানের শাসক হিসেবে অদক্ষতা সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন।
সুতরাং এই ধরণের পরস্পরবিরোধী স্রোতে সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো জানা যেতো সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা তথ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে, সেসব তথ্য উপাত্ত নাছোরবান্দা গবেষকদের হাতে পৌঁছাতে পারে নি, কিংবা রাজনৈতিক কারণে সেসব ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে কিংবা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় হিসেবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছে।
আমাদের ইতিহাস সচেতনতার মাণ যেমন তাতে আমার অনুমাণ উইপোকা খেয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার পর আমরা অক্ষর বিশ্লেষণ করে ইতিহাস পুননির্মাণের উদ্যোগ গ্রহন করবো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৩ ট্রাংক ভর্তি নথি কোথায় হাপিশ হয়েছে সেটা এখনও সরকার জানে না। ৭৫ এর এইসব তথ্য উপাত্ত আদৌ টিকে আছে কি না সেটাই বা কে বলতে পারবে?
পড়লাম। সাবেকার কথাটা ভালো লাগলো
এই বিষয়ে আজকের সংবাদপত্রগুলোর খবর নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।
সেনা ষড়যন্ত্রের কাহিনীকে আওয়ামী সরকার, পত্র/পত্রিকা এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এখন পযর্ন্ত ব্যাংকক, লন্ডন, তারেক জিয়া পযর্ন্ত নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। এখন আই এস আই , সি আই এ, এবং মোসাদের ভুমিকা জানার অপেক্ষায় আছি। মেজর জিয়া কি আসলেই পলাতক ? নানা সন্দেহ জাগে।
মন্তব্য করুন