সাম্প্রতিক অনুভুতি
আমরা অধিকাংশ সময়ই অপ্রস্তুত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করি, আমাদের মৃত্যু পারিবারিক অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের মৃত্যুতে স্বজন শোকগ্রস্ত হওয়ার আগেই ক্ষুব্ধ হয় এবং ইহজাগতিক বিভিন্ন বিষয়ের মতভিন্নতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভাবনায় যুযুধ্যমাণ হয়। মৃত্যু নিয়ে আমাদের অনেক আকাঙ্খা থাকলেও আমাদের মৃত্যু অসুন্দরই হয় অধিকাংশ সময়।
আমরা বিভিন্ন রকম মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে মরে যাই, গ্রামের সম্পন্ন কৃষক মৃত্যুর আগে তার আবাদি জমি আর বসতবাটির ঘরগুলোও সন্তানদের ডেকে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়- উত্তরের চাতালের জমি ছোটোর, বড় ঘরটা আর পুকুরটা মেজোর, শিমুল গাছ তলার সাথের জমিটা বড়কে দিবা আর আমার ঘরটা তোমাদের মায়ের থাকবে- এই মৌখিক নির্দেশনার কোনো আইনীভিত্তি নেই- কৃষক মরলো তার সৎকার বাদ দিয়ে ছেলে মেয়েছুটলো জমির দখল বুঝে নিতে- মৃত্যুশয্যায় শুয়েও আমাদের ভাববিলাসিতা কমে না।
আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক ধরণের উপাদান আছে কিন্তু আমাদের সামাজিক ভাবনায় আর যাই থাক বাস্তববোধ নেই, বাস্তববোধবিহীন আমাদের ভাববাদী আচরণ ইহজাগতিক স্বার্থকে পুরণ করতে পারে না। হতে পারে আমাদের উকিলভীতি- হতে পারে জীবিত অবস্থায় পরিজনদের সংঘাত দেখবার অনীহা যেকোনো কারণেই হোক না কেনো আমাদের মৃতদের সম্পদ বিতরণের কোনো লিখিত নির্দেশনা থাকে না। এটা এক ধরণের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। খুব কম মানুষই বেশ চমৎকার মৃত্যু বরণ করেছেন বাংলাদেশে।
হুমায়ুন আহমেদ মৃত্যুবরণ করলেন, তার সৎকার নিয়ে বিশ্রী পরিস্থিতি তৈরি হলো, জনপ্রিয়দের ব্যক্তিদের সাফল্যপরবর্তী জীবন এবং মৃত্যু পাবলিক প্রোপার্টি হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভবনা থাকেই, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের খন্ডাংশ গিলে আমাদের কৌতুহলের ক্ষিধে মিটে। সফলব্যক্তির প্রতি ইর্ষা-ঘৃণা ও বিদ্বেষ যুগপৎ অনুভব করি আমরা। অন্যান্য সাধারণ মানুষের চেয়ে হুমায়ুন আহমেদ অনেক বেশী গসিপের চরিত্র তার কর্মগুণেই-
তার লাশ নিউইর্য়কে প্লেনে ওঠার আগ থেকেই এই বিতর্ক শুরু হয়েছিলো, মহাসমারোহে কয়েকটা টিভি চ্যানেলে তারমহাআগমণবার্তা প্রচারিত হচ্ছিলো, যীশুর পুনরুত্থানের সময় যদি টিভি চ্যানেল থাকতো তাহলে সেমন শোরগোল উঠতো হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর পর তার চেয়ে বেশী শোরগোল উঠেছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট লাশের দখল নিয়ে মৃতের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করেছে। টিভির টেলেপে ছুটছে তাকে বনানী গোরস্থানে দাফন করা হবে, তার শেষ ইচ্ছা ছিলো নুহাশ পল্লীর গাছের শেকড়ে মিশে যাওয়া, তাকে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানেই দাফন করা হোক, তাকে দাফন করা হোক বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে
এই বিতর্কটা ঘনিষ্ঠ পরিজনের বৃত্ত থেকে বের হয়ে একেবারে জনতার মাঝখানে চলে আসলো, জনতার ভিন্ন ভিন্ন মতামতও তৈরি হলো। ইহজাগতিক মানুষ শাওনের নুহাশপল্লী দখলের ষড়যন্ত্র খুঁজে পেলো, বিষয়টা কতটা ভয়ংকর হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া গেলো আজকের কালের কণ্ঠে, শাওন সেখানে ঘোষণা করেছে নুহাশপল্লীকে শান্তিনিকেতনের মতো গড়ে তোলা হবে।
কোনটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন কোনটা সামাজিক জীবন, কোনটাতে হস্তক্ষেপ করা উচিত কোনটাতে নাক গলানো উচিত না এইসব বিবেচনাবোধ আমাদের কম। প্রয়োজনীয়- অপ্রয়োজনীয় মতামত দেওয়া শালীনতাবোধবিবেচনাহীন এইসব মতামত দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের আছে কি না সেসব যাচাই না করেই মতবাদ প্রচারের দায়িত্বটা যন্ত্রযুগে অনেক সহজ। ফেসবুকে একজনকে দেখলাম শাওনের ভবিষ্যত জীবন নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। শাওন অচিরেই বিয়ে করে ফেলবে- তখন নুহাশপল্লিতে সে এবং তার নতুন স্বামী থাকবে- আমি অবশ্য বুঝি নাই শাওন নতুন কাউকে বিয়ে করে ফেললেই বা ক্ষতি কি?
শাওন যদি কাউকে বিয়ে করতে চায় সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়, তার বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক বাধা নেই। তার ব্যক্তিগত জীবন সে যেভাবে খুশী যাপন করবে, সেটা নিয়ে ভাববার আমি-তুমি কে? ইতিহাসে শুধুমাত্র স্পষ্ট নির্দেশনা থাকায় মুহাম্মদের স্ত্রীদের পরবর্তী বিয়েটা সম্ভব হয় নি, সেসব দুর্ভাগা রমণী পরবর্তী দীর্ঘজীবন একাকী কাটাতে বাধ্য হয়েছে। হুমায়ুন আহমেদের প্রতি ভক্তদের অপরিসীম ভক্তি আছে, কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ কোনো ধর্মপ্রচারক না আর তার সাথে সম্পর্কিত বিধায় অন্য কারো ব্যক্তিগত অভিলাষ থাকবে না এমনটা ভূল।
আমরা বরং সবাইকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সুযোগটুকু দেই। যে যার নিজের মতো জীবনযাপন করুক, আমাদের কল্পনা কিংবা কৌতুহলের পীড়ন থেকে হুমায়ুন স্বজনরা মুক্তি পাক।





একেবারে আমার মনের কথা...
আমরা আমাদের লিমিট বুঝতেছিনা।

লেখা খুব চমতকার-সময়োপযোগী।
এই কয়েকদিনে মিডিয়ার বাড়াবাড়িকে খুবই অস্বস্তিকর লেগেছে।মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপনকে ব্যক্তিগতই তো রাখা উচিত।
`আমরা বরং সবাইকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সুযোগটুকু দেই'...শুধু এক্ষেত্রে নয়, সবার ক্ষেত্রেই যদি কথাটা মানতে পারতো সবাই!!!
একেবারেই সময়োপযোগী লিখা।
সমস্যা কি?! হুমায়ুন আহমেদ তার লেখাতেই নিজের পরিবার-পরিজনকে এনে তাদেরকে ঠিক আর ব্যক্তিগত রাখেননি। আর সেলেব্রিটিদের ব্যাপারে সারাবিশ্বের সব মানুষই একইরকম কৌতুহলী হয়, এটা বাঙালিদের আলাদা কোন বৈশিষ্ট্যা না।
"সেসব দুর্ভাগা রমণী পরবর্তী দীর্ঘজীবন একাকী কাটাতে বাধ্য হয়েছে।" -- তারা দূর্ভাগা ছিলেন সেটা কি আপনিই সিদ্ধান্ত নিছেন নাকি তারা আপনাকে কানে কানে বলেছে? তারা তো নবী মারা যাওয়ার আগেই জানতেন যে নবী মারা যাওয়ার পর আর বিয়ে করতে পারবেনা, তাদেরকে একবার ফ্রি হওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। তারা তো তবুও সে জীবনই বেছে নিয়েছিলেন। তাদের ফ্রি চয়েসের কনসিকোয়েন্স তারা জানতেন। সেখানে অন্য কাউকে বিয়ে করতে না পারাতে দূর্ভাগা হয়ে গেল সেটা তো কোন যুক্তিই না।
তারা যে দুর্ভাগা এই সিদ্ধান্তটা আমার।
আর ফ্রি হওয়ার সুযোগ বিষয়টা বুঝি নি,দাম্পত্যকলহ এবং রাত্রি ভাগবাটোয়ারাজনিত সংকট এড়াতে না পেরে ১ মাসের মসজিদে নির্বাসনের বিষয়টা বুঝালেন আপনি? সে সময় একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো , আয়েশা সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো আবু বকর কিছু বলতো না সেভাবে কিন্তু ধরেন হাফসা যদি সিদ্ধান্তটা নিতো উমর তাকে কেটে দুই ভাগ করে ফেলতো না এই বিষয়ে আপনি নিঃসন্দেহ হচ্ছেন কিভাবে?
মাথায় তলোয়ার ধরে রেখে নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে বলার বিষয়টা আমার হাস্যকর না কাননাকর লাগে আজকাল। ডু দ্যা হ্যাড এ চয়েজ? চয়েজ করে কয়জন নবীকে বিয়ে করেছিলেন? চয়েজ থাকলে কয়জন করতেন?
সহমত
খুবই সত্য কথা।
যে দেশে রাস্তা খুড়তে গেলেও লোকজন ঘিরে ধরে দাড়ায়ে দেখে , সেখানে হুমায়ুন আহমেদ কে নিয়ে বাড়াবাড়ি হবে - স্বাভাবিক।
ভালো লাগে না এইসব!
এই লেখায় মহানবীর পারিবারিক জীবনের ইতিহাস টেনে আনাটা চুড়ান্ত পর্যায়ের অপ্রাসঙ্গিক মনে হল।
কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক সেটা মেনে নিতেই হবে।
বঙ্গদেশে বিধবাবিবাহ দিতে গিয়ে বিদ্যাসাগর মশাই সর্বসান্ত হয়ে গেলেন তবুও বঙ্গবাসীদের বিধবাবিবাহ সম্পর্কিত ভাবনায় পরিবর্তন আসলো না।
মুসলমান সমাজে বঙ্গদেশে দ্বিতীয় বিবাহ আপত্তিকর ছিলো না, তালাকপ্রাপ্তাদেরও বিবাহ হয়েছে, যদিও লেখার সময় তাদের নাম মনে করতে পারি নি, এখনও মনে পড়ছে না কিন্তু বঙ্গদেশে নারী শিক্ষা ও প্রগতিতে অবদান রেখেছেন এমন একজন নারীর দ্বিতীয় বিবাহ হয়েছে। [তসলিমা নাসরিনকে বাদ দিয়ে আলোচনা হচ্ছে]
ডিক্রী করে দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ করার অন্য নজির মুসলমান সমাজে নেই, এমন কি ষোড়শ শতাব্দীর একটা ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম যদিও খ্রীষ্টান কিংবা ইহুদিদের ভেতরে তালাকের নিয়ম নেই কিন্তু মুসলমান প্রতিবেশীদের দেখে তারাও অহরহ তালাক দিচ্ছে এবং সেটা নিয়ে সমাজপতিরা উৎকণ্ঠিত।
এই পরিস্থিতিতে বঙ্গদেশের সচেতন শিক্ষিত সমাজে ক্ষুদে মুহাম্মদের আগমন দেখে কিঞ্চিৎ চিন্তিত হওয়ায় নিতান্ত প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হলেও মুহাম্মদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানাটানি করতে হলো। তার ব্যক্তিগত জীবন তিনি কতটুকু ব্যক্তিগত রেখেছিলেন সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ, প্রাইভেসী কিংবা স্ত্রীর সম্মান বিষয়টা সংকলিত হাদিসে প্রায়ই উপেক্ষিত , কিছুটা তার বয়ান কিছুটা আয়েশার বয়ান শুনে অন্তত আধুনিক যুগের প্রাইভেসী সংক্রান্ত বয়ানের সাথে তাদের উপলব্ধির ততটা মিল খুঁজে পাই নি।
খারাপ না। সবারই প্রাইভেসি আছে। সেটাকে সম্মান দেখানো উচিত।
মন্তব্য করুন