সহজসাধ্য নৈতিকতা
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম সকল নৈতিকতার গ্রহনযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইশ্বরের সন্তুষ্টি- অসন্তুষ্টি ভালো এবং মন্দ আচরণের প্রভেদাত্মক সীমারেখা, যে সীমারেখার একপাশে সকল আচরণ যা ইশ্বরকে সন্তুষ্ট করে এবং অন্য পাশে সকল আচরণ যা ইশ্বরকে অসন্তুষ্ট করে। মাণদন্ড নির্ধারণের এই প্রথায় অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটাই মোটামুটি শিক্ষাব্যবস্থা আচরিত নৈতিকতাশিক্ষাসহায়।
ইশ্বর এক ধরণের শীর্ষস্থানীয় নৈতিকতানির্ধারক হয়ে উঠায় মানুষ কিংবা ইশ্বরকে ভালোবেসে না বরং তার ভয়ে ভীত হয়ে একজন শিশু কল্যানমুখী আচরণে আগ্রহী হয়ে উঠে , পরম চরম শক্তিধর ইশ্বরের অসীম ক্ষমতা শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনপ্রবন শাস্তি উদ্ভাবনেই ব্যয় হয়েছে এ যাবতকালে। তবে ইশ্বরের অসীম বিরাগের একটা নমুনা হিসেবে তিনি পূর্বপুরুষের পাপের ফলশ্রুতিতে পরবর্তী প্রজন্মকে বিকলাঙ্গ করে দিতে পারেন কিংবা ইশ্বরের অসন্তুষ্টিই শাররীক বিকালঙ্গতার কারণ এমন একটা ধারণা যখন শিক্ষাঙ্গনের শিশুদের দেওয়া হয় তখন সেটা আমাকে খুব বেশী আনন্দিত করে না। যদিও আমার ধারণা যে শিক্ষক-শিক্ষিকা এই মতামতটুকু খুব সহজে শিশুকে দিচ্ছেন তিনি নিজেও স্বাভাবিক অবস্থায় এমনটা ভেবে অভ্যস্ত না।
ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হবে এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে এই ভালো এবং মন্দের ধারণাটুকু কিভাবে নির্ধারণ করা হবে এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত মাণদন্ড নেই। তবে মোটা দাগে সামাজিক নিয়ম কানুন মেনে চলা এবং সহনশীল আচরণ করাটা ভালো আচরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এক ধরণের সাবমিসিভ বিহেভিয়র শিক্ষা দেওয়া হয় এখানে। প্রশ্নাতীত আনুগত্য স্বীকার এবং ক্ষমতাকে নিরংকুশ করে তোলার প্রয়োজনটুকু এখানেও থাকে।
আমার ছেলের সহপাঠী একজন দুরন্ত, শাররীক শক্তি এবং আচরণ বিবেচনা করলে ক্লাশের অন্যান্যদের তুলনায় তার বলিষ্ঠতা সহজেই চোখে পরে। তার এই শাররীক শক্তি প্রয়োগের সময় সেটা যে ভুক্তভোগীর জন্য এক ধরণের নির্যাতন হয়ে যায় সেটুকু উপলব্ধির ক্ষমতা তার নেই। টেলিভিশনে তার প্রিয় অনুষ্ঠান রেসলিং, সুতরাং যদিও সেখানে বড় বড় করে লেখা থাকে বাসায় এসব চর্চা করা অনুচিত এই ছেলে সেই সাবধানবানীটুকু কখনও জেনেছে এমনটা মনে হয় না।
ক্লাশ এবং ক্লাশের বাইরে সেই ছেলের কুস্তির প্যাঁচে ধরাশায়ী সহপাঠীরা সবাই মিলে অভিযোগ করেছে ক্লাশটিচারের কাছে, ক্লাশটিচার সবচেয়ে সহজে যা মাথায় এসেছে বলেছেন, জানিয়েছেন যদি ও এমন পঁচা কাজ করতে থাকে তবে তার শাররীক বৃদ্ধি স্থগিত হয়ে যাবে, শাররীক এই বিকালঙ্গতার জন্য অন্য যেসব সামাজিক মানসিক পীড়নের ভুক্তভোগী হতে হয় সেই ব্যক্তিকে এই শিশু সেসব সামাজিক মানসিক পীড়নের ভুক্তভোগী হবে। যেহেতু ইশ্বর এমন আচরণ পছন্দ করেন না সুতরাং তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তার শাররীক বৃদ্ধি স্থগিত করে দিবেন ভাবনাটা আমার ছেলেকে আলোড়িত করেছে।
সুতরাং আজকে ক্লাশের গুরুত্বপূর্ন ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এক নি:শ্বাসে ও বললো জানো বাবা হোয়াট হ্যাপেনস হোয়েন গড গেটস এংগরি? হি কীপস দেম স্মল।
তার অবশ্য বিকলাঙ্গতা বিষয়ে কিংবা শাররিক খর্বতা বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞতা নেই ,এদের সামাজিক নিগৃহণের বিষয়টি সম্পর্কেও যে অবগত নয়, সুতরাং শাররীক ভাবে খর্ব মানুষদের নিয়ে সাধারণ মানুষ যে হাসাহাসি করে সেটা তার ধারণায় স্কুলের উপরের ক্লাশে উঠতে না পারার কুফল। যেহেতু সে অন্য সবার মতো বড় ক্লাশে পড়তে পারবে না সুতরাং সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে
আমি কিছুটা বিব্রত হলাম, কিছুটা উদ্বিগ্ন হলাম। পূর্বপুরুষের পাপে শাররীক অসংগতি দেখা যায় এই শিক্ষার আমি ঘোর বিরোধী। যদিও ইশ্বরের রোষের অন্যতম উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন শাররীক বিকলাঙ্গতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, পিতা মাতার পাপের সন্তানদের বিভিন্ন ধরণের বিকলাঙ্গতার শিকার হতে হয় এমন একটা ভাবনাকাঠামো তৈরি হয়েই আছে কিন্তু স্কুলের শিক্ষকেরা এই ভাবনার বিরোধিতা না করে এই ভাবনাটুকুই শিশুর উপরে চাপিয়ে দিবেন এমনটা মেনে নেওয়া ক্লেশকর।
আমি আমার মতো করে বললাম এমনটা ভাবা ঠিক না, আমার অসম্মতি তাকে বাক্যচর্চায় নিরত রাখলো কিন্তু আমি জানি না এই ধারণাটুকুর যে বীজ আজকে ওর ভাবনায় ঢুকলো আমার অসম্মতি কিংবা অনাগ্রহ সেটা উপড়ে ফেলতে সক্ষম কি না?





এটা আসলে ব্যক্তির ফাঁকিবাজি দেয়ার অভ্যাস থেকে উৎপাদিত খারাপ (রিজেক্ট) মাল। আপনার নামকরণেও এ ব্যপারে একটা ইঙ্গিত আছে। নৈতিকতা শিক্ষাদানের ব্যাপারটি সহজ নয়। নৈতিকতার শিক্ষা নেয়া বরং তারচেয়ে সোজা। তাই যারা ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নৈতিকতা শেখানোর গুরুদায়িত্বটি গ্রহণ করবেন, তারা এ ব্যাপারে অনেক, অ-নে-ক বেশি সচেতনতা নিজের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে ধারণ করবেন- এমনটাই আমরা চাই।
কথা যা বলতে চাইলাম, তা বলতে পারলাম কিনা কে জানে!
আপনার কি মনে হয়,
শিক্ষাব্যাবস্হায় কোন রকম ধর্মীয় প্রভাব না থাকলে শিশুদের নৈতিকতা শিক্ষাদান আরও সহজ হত?
আমি তাই মনে করি।
মানতে পারছি না।
কারন, ধর্মীয় নৈতিকতা টা পরিবার থেকেই শুরু হয়। কোন ধর্মই কিন্তু কাওকে খারাপ মানুষ হতে শেখায় না। আর এই পারিবারিক মৌলিক নৈতিকতা বোধ টা না থাকলে কেউ ভাল মানুষ হতে পারে বলে আমার মনে হয় না।
ওয়েবে ধর্ম নিয়া কথা বলতে স্বস্তিবোধ করি না। কারণ আছে।
সামনাসামনি কোনোদিন কথা বললে উদাহরণ দিয়া বুঝামুনে।
প্রত্যেক পরিবারে এতো ভাল ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার পরও দুনিয়াজোড়া এই খারাপ লোকগুলো কোথা থেকে আসলো, আসে বিষন্ন?! শিক্ষা কোন হাড়িতে তথা চুলায় যায় বলতে পারো?
পড়লাম।
মন্তব্য করুন