আমি ও আমরা
আমরা প্রত্যেকেই সময়ে অসময়ে আত্মহত্যা করতে চাই কিন্তু আত্মহত্যার সাহস আমাদের থাকে না। বিদ্যমান লড়াই এবং ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাড়ায় ক্লান্ত আমরা এক এক সময়ে চাই এইসব কিছু ভুলে নিরুদ্বেগ সময় কাটাতে- অপরিসীম সময়ের ক্ষত নিয়ে আমরা সব ভুলে যেতে চাই, ঘড়ির কাঁটার মতো দিশা ঠিক রেখে সময়ের কাঁটায় বিক্ষত হতে হতে আমরা মূলত স্মৃতিবিস্মৃত হতে চাই, চাই পাগল হয়ে যেতে।
তবে আমাদের সবাই পাগল হতে পারে না, আমাদের সবাই আত্মহত্যার সাহস পায় না। আশ্চর্য হলো কেউ পাগল হয়ে গেলে আমরা সহানুভুতি কিংবা করুনা অনুভব করি- আমরা জানি আমাদের এই টিক টিক কাঁটা মেনে চলা জীবনের চাপ থেকে মুক্তি পেলেও সে আসলে অনেকটা নিজের কারাগারেই বন্দী। তার এই নিরুদ্বেগ আসলে এক ধরণের ছদ্মমুক্তির আনন্দ, তার জন্য সহানুভুতিটুকুই বরাদ্দ কারন যে নিজের ভেতরেই বন্দী হয়ে আছে। টিটকারি, জনগণের ধাওয়া আর থুতুর জীবনের প্রতি ভীতি থেকে আমরা নিজের মানসিক অবসাদের সাথে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাই কিন্তু কেউ আত্মহত্যা করলে আমরা মনে মনে আফসোস করি, ভাবি তার মতো সাহস যদি আমাদের হতো। আমরা মুখে সমবেদনা নিয়ে তাকিয়ে থাকলেও মনে মনে ইর্ষা করি তাকে।
নগরায়নের পাপ চৈতন্যে পুষি, বুলডেজারে পিষ্ট হয় আমাদের সম্পর্কগুলো আর প্রতিটা কোদালের কোপে আমাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। পুরোনো বাড়ীর ছাদে আঘাত করতে থাকা হাতুড়িগুলো এভাবেই আমাদের আশ্রয় ভেঙে দেয়, আমরা ভূমিচ্যুত জীবনযাপন করি, আমাদের আস্থা-আশা-আকাঙ্খাগুলো এভাবেই নগরে পরিবর্তিত হয়ে যায়, একটা শহরের কংকালের ভেতরেই বন্দি আমাদের শৈশবের কংকাল। শহরের কংকালে পলেস্তরা লেগে শহরের সৌকর্য বাড়ে আর আমরা আরও বেশী শ্রীহীন আশ্রয়চ্যুত উদাসীন উন্মাদ হয়ে যাই, আমাদের ভেতরে অপরাধপ্রবনতা বাড়ে।
আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের ঐতিহ্যের সবগুলো শেকড়েই ভূমিদস্যুদের লোভের থাবা পরেছে, প্রতিনিয়ত বাড়তি জনসংখ্যার চাপে ঐতিহ্যের শেকড় কেটে আমরা আরও বেশী নগরায়নে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ভুলে একটা সাইনবোর্ড এঁটে বুলডেজারে ইতিহাস ধর্ষণের মর্ষকাম আমাদের প্রবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অংশে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিলো , যে দরজা দিয়ে প্রথম মিছিলকারীরা বের হয়ে এসেছিলো, সে দরজা এখন বন্ধ, উপরের ময়লা সাইনবোর্ড না দেখলে কেউ জানতেও পারবে না কলাভবনের ঐতিহাসিক আমতলা আসলে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল আর ডেন্টাল কলেজের মাঝখানে অবস্থিত ছিলো। সেখানেই ছিলো রশীদ ভবন, সেখানেই আমাদের বাঙালী জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়েছিলো।
জগন্নাথ হলের ঐতিহাসিক সম্মেলন কক্ষকে ছাত্রাবাস বানিয়ে, গভর্নর হাউসকে বাংলা একাডেমি বানিয়ে আমরা নিজেরাই সচেতনভাবে ইতিহাস হত্যা করেছি। আমাদের ভেতরে এইসব ঐতিহাসিক স্মৃতিসংরক্ষণের আগ্রহ কম। পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলোকে সরকারী পর্যায়ে চিহ্নিত করে রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেওয়ার কথা ছিলো প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরকে, তাদের সচেতন অবগতিতে কিংবা অসচেতনতায় এইসব ঐতিহাসিক ভবনও বিয়েল এস্টেট হাউজিং কব্জা করেছে । আমাদের ৪০০ বছরের ঐতিহ্যস্মারকের ভেতরে যেসব এখনও দখল করা সম্ভব হয় নি সেসব দখল না হওয়ার পেছনে সরকারের সচেতন পদক্ষেপের ভূমিকা নেই বরং শরীকি ঝামেলায় এখনও বসুন্ধরা, আমিনমোহাম্মদ ভাইয়েরা সেখানে সাইনবোর্ড গেঁথে দিতে পারে নি।
সাম্প্রতিক অতীত নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গেরিলাতে কার্জন হলকেই সম্পূর্ণ ঢাকা শহরের প্রতিনিধিত্বকারী অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো, শহরের অন্য কোথাও পুরোনো স্থাপনার কোনো উপস্থিতি নেই, কার্জন হলেও রাজমিস্ত্রীর কণিক আর খুরপি কত ধরণের কারিগরী নক্সা এঁকেছে কিন্তু এরপরও কার্জন হল এখনও সবচেয়ে বেশী অবিকৃত প্রাচীন স্থাপনা।
শহরে ভূমিচ্যুত শৈশব, ৩০ মিনিট রিকশা চেপে বেশ দুরে গেলে হয়তো এখনও একটা ফড়িং খুঁজে পাওয়া যাবে কিন্তু শহরে জোনাকি নেই। এমন কি মফ:স্বলের কোথাও জোনাকি নেই, যদি ভবিষ্যতে কেউ প্রশ্ন করে আজকের শিশু উত্তর দিবে জোনাকি আছে কাজলাদিদির কবিতায়।





চমতকার লিখেছেন রাসেল ভাই!
সব হারাতে বসেছি আমরা।
ভাল লাগলো আপনার ভাবনাগুলো।
শুধু সমস্যা দিলে লাভ কম।
সাথে কিছু সমাধান বা প্রতিকারের উপায়ও দিলে পোস্তটি আরও ভাল হোত বলে আমার মনে হয়।
এই দুই বিঘত শহরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সাথে টক্কর দিয়ে ইতিহাস ঐতিহ্য বিষয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। সম্পর্কের আস্থা- অনাস্থার প্রয়োজনীয়তা কিংবা গুরুত্ব আসলে পূঁজি বিবেচনা করে না।
ঢাকায় এই মুহূর্তে বসতি স্থাপন করেছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ, এদের ভেতরে ৫০ লক্ষ আমাদের সামনেই থাকে কিন্তু তারা অদৃশ্য- বিপূল পরিমাণ ফেরীওয়ালা, রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টস শ্রমিক, টোকাই, ভবঘুরে এরা প্রায় ঘিঞ্জি বস্তিতে বসবাস করে, এদের আশ্রয় হিসেবে আছে শহরের জলাশয়ের তীর- সেখানে রিয়েল এস্টেট হানা দিলে এরা রাজপথে দাঁড়ায়, তখন এদের উপস্থিতিএবং সামষ্টিক ক্ষমতা বিষয়ে আমরা সচেতন হই।
এই সংকটের সমাধান আসলে বাংলাদেশে নেই। যদি বাংলাদেশ আফ্রিকায় বিশাল একটা ভূখন্ড কিনে প্রায় ৬০% মানুষকে পাঠিয়ে দিতে পারে তখন ইতিহাস ঐতিহ্য সচেতনতামূলক বানী দিলে লোকজন পিটানোর সম্ভবনা কম। এখন মেনে নিতে হবে বাস্তবতাটুকু।
শহরে এ মুহূর্তে জমি বেচে কোটিপতি মানুষের সংখ্যা অন্তত ৪০ হাজার- এদের এই অসচেতন কিংবা সচেতন বাছাইয়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিদিন অন্তত একটা বাসার ছাদ ভাঙছে রিয়েল এস্টেট, এদের গিয়ে বলা যায় পরিবেশ, ঐতিহ্যের গল্প, তবে সেটা খুব বেশী কার্যকর সমাধান হবে এটা আমি বিশ্বাস করি না।
সহমত
সহমত
সহমত।
দূর্দান্ত একটা লেখা পড়লাম
মন্তব্য করুন