হেফাজতের উত্থান পতন
লেখাটা ৭ই মে লিখেছিলাম সামান্য কিছু অদল বদল করে ব্লগে টুকলাম আজকে
৫ই মে গভীর রাত থেকে শুরু করে ৬ই মে সারাদিন অব্যহত পুলিশ অভিযান, সহিংসতা , অগ্নিসংযোগ শেষে অবশেষে হেফাজতে ইসলাম পিছু হটেছে। বাংলাদেশের চলমান বাঙালী জাতিয়তাবাদী সাংস্কৃতিক উত্থানের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামীর পশ্চাতমুখী বদ্ধ সংস্কৃতির ধারণা সাধারণের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও এর সাম্ভাব্য সমর্থকদের সার্বিক সংখ্যা সাধারণ মানুষদের আতংকিত করেছিলো। মিডিয়ায় তাদের নেতা ও কর্মীদের "গণতওবা", এবং 'কানে ধরা' ছবি তাদের বশ্যতা মেনে নেওয়ার, তাদের পরাজিত হওয়ার এবং মনোবল ভেঙে যাওয়ার প্রতীকি উপস্থাপনে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেয়েছে , আনন্দিত হয়েছে।
অপরিণামদর্শী অবিবেচক ক্ষমতা প্রদর্শনের দুর্নিবার আকাঙ্খায় লুপ্তবোধ মানুষেরা ক্ষত-বিক্ষত লাশ এবং আতংকিত কিশোরদের দেখে করুণা বোধ করে নি বরং তাদের সাথে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ও মানসিক ব্যবধান উপলব্ধি করে আনন্দিত হয়েছে, স্বস্তিবোধ করেছে। এমনিতেই করুণানির্ভর অনুদানে পরিচালিত অনুৎপাদনশীল এই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করা ছাত্রদের বিষহয়ে এক ধরণের বিচ্ছেদের অনুভুতি সাধারণের ভেতরে ছিলো।
মাদ্রাসার এইসব ছাত্রদের বিমানবিকরনের অমানবিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। এরা এই সমাজে বুদ্বুদের মতো বেঁচে আছে, আমাদের সামনে তারা হাঁটে কথা বলে, বিভিন্ন হাসি ঠাট্টা আমোদে তাদের শৈশব কৈশোর কাটায়, বেড়ে ওঠে কিন্তু আমরা তাদের স্পর্শ্ব করি না, তাদের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। হেফাজতের কর্মকান্ডে সে ব্যবধান আরও বাড়ছে, প্রচলিত ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের লড়াইয়ে লিপ্ত সবাই যে সামান্য করুণাটুকু ধারণ করতো এদের প্রতি তাও শূণ্য হয়ে গেলো।
নানামাত্রিক তৎপরতা, অনুরোধ, উপরোধ উপেক্ষা করে হেফাজতে ইসলামের নেতারা তাদের অনুগত মাদ্রাসা ছাত্রদের জীবনে পূঁজি করে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে এমন ঘোষণা তারা দিয়েছিলো বগুড়ায়, দিয়েছিলো মুন্সিগঞ্জের সমাবেশে, সাংগাঠনিক ভাবে দুর্বল বিএনপি এদের উপর ভিত্তি করে সরকার খেদাও আন্দোলন বলিষ্ট করবে এমন আগ্রহও বিএনপির নেতাদের ভেতরে ছিলো।
হেফাজতে ইসলামের নেতাদের কাছেও আসলে সংখ্যা ব্যতিত অন্য কোনো পরিচয় নেই এদের। এরা ব্যক্তিজীবনে কারো না কারো সন্তান, কারো না কারো ভাই কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে তারা নিছক একটা সংখ্যা, অবয়বহীন, পারিবারিক সম্পর্কবিহীন নিছক একটা জীব যাকে কখনও মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধুমাত্র লাশের তালিকায়, আহত নিহতের টালি খাতায় সামান্য একটা চিহ্নের বাইরে এদের অস্তিত্বের অন্য কোনো মূল্যায়ন হলো না।
হেফাজতে ইসলামি কিংবা এন্টি হেফাজতে ইসলামী সবাই ঘুরে ফিরে সেই একই কুমীরের ছানা দেখায়, লাখ লাখ তৈহিদী জনতার মোড়কে পোশাক বদলে শ্লোগান কন্ঠে নিয়ে পথে হাঁটে সেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই। ইসলামী দলগুলোর বিভিন্ন আন্দোলনে মাথাগুণতি বাড়ানোর বাইরে এইসব শিক্ষার্থীদের কতজন রাজনীতি সচেতন? কাওমী মাদ্রাসার অনুদানে প্রতিপালিত এইসব শিক্ষার্থীদের কতজন আসলে জেনে বুঝে আসছে সমাবেশে? তাদের অগ্রহনযোগ্যতার ক্ষোভ আছে তাদের ভেতরে, অপ্রাপ্তি, অধিকারহীনতা, বঞ্চনার সংগত ক্ষোভ নিয়ে সচেতন কতজন আসে মিছিলে।
গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে বাবুনগরী মিথ্যা বলেছেন, বলেছেন হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিলো না, ৬ই এপ্রিলের সমাবেশে তার এবং তাদের কারো ভাষণই সে কথার সত্যতা প্রমাণ করে না। তারা মাদ্রাসা ব্যবহার করে ইসলামি হুকুমত কায়েমের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটায় বাংলাদেশের মূল ধারার সকল রাজনৈতিক দলই সচেতন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলো।
সরকারী দলের কয়েকজন নেতার উদ্যোগে বিরোধী দলের সচেতন পৃষ্টপোষকতায় এবং ধর্মভীরু প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তায় হেফাজতে ইসলামীর ১৩ দফা সমেত যে দানবের উত্থান হয়েছিলো আতংকিত মধ্যবিত্তকে আশ্বস্ত করার জন্যে শাপলা চত্ত্বরে জমায়েত মাদ্রাসা ছাত্রদের হেনেস্তা করার প্রয়োজন ছিলো, প্রয়োজন ছিলো তাদের পরাজিত আতংকিত লাঞ্ছিত বিমানবিক করে তোলার পর্যায়গুলোকে চিত্রে-ভাষ্যে উদ্ভাসিত করে তোলার যেনো আঙ্গুল কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলা নির্বোধ সচেতন মানুষ আশ্বস্ত হয়ে ভাবতে পারে ' অবশেষে পশুটাকে শায়েস্তা করা হয়েছে'।
আল্লামা শফি, মাওলানা ইসহাক কিংবা অন্য যারা টেলিফোনে কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগে রাজনীতির লাশ সরবরাহের টেন্ডার নিয়েছিলো এইসব মানুষদের কোনো ক্ষতি হবে না, সরকারী দল , বিরোধী দল এদের প্রতিপালন করবে, নিরাপত্তা দিয়ে পুষবে, প্রয়োজনে হেলিকপ্টারে শহর ছাড়া করবে, কিন্তু এইসব মাদ্রাসার ছাত্রদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
এইসব অপদস্ত মানুষ দেখে আমি উল্লসিত হই না, তাদের সংঘবদ্ধতা আমাকে কখনও আতংকিত করে নি, আমি প্রবঞ্চিত কিংবা আক্রান্ত বোধ করি নি, প্রতিশোধ বাসনাও আমার ছিলো না।
তবে হেনেস্তার চিত্রায়ন দেখে আতংকিত প্রতিশোধ পরায়ন মানুষের প্রতিশোধ বাসনা তৃপ্ত হয়েছে, হেফাজতে ইসলামের নেতাদের ব্যক্তিস্বার্থে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকা শহরে চলে আসা মাদ্রাসার শিশু-কিশোরদের এমন অনৈতিক ব্যবহার, ইসলাম রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব নেওয়া নেতাদের অমানবিকতা একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে, ধর্ম পাঠ্যপুস্তক পড়ে শেখার জিনিষ না, ধর্মকে নিজের জীবনে উপলব্ধি করতে হয়।
যেকোনো ধরণের যৌক্তিক ভাবনাকে ধারণ করতে অক্ষম পশ্চাতপদ সমাজে বাস্তব এবং ভার্চুয়াল জীবনের ভেতরে ব্যবধান নির্ধারণ করতে ব্যর্থ মানুষ যখন ক্ষমতা প্রদর্শণ করে সংখ্যার শক্তিতে আলোচনার পরিবেশ বন্ধ করতে চায় তখন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যায়। এই অমানবিকতায় প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ভূমিকা থাকে, যারা লিখছে, যারা আক্রান্ত বোধ করছে, যারা গণমাধ্যমে এসব সম্প্রচার করছে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থপুরনের আগ্রহে, এবং যারা সামান্য আগুণকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা করায়ত্ব করতে চেয়েছে, গত ৫ সপ্তাহের সার্বিক ঘটনাগুলোতে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায় আছে।
বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে প্রতিটি রাজনৈতিক বিক্ষোভ কোনো না কোনো ভাবে আত্মপরিচয়নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রোধ আন্দোলন দীর্ঘ দিন পরে ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী করে তুলেছিলো, পাট চাষ করে ক্রমশ: ধনী হয়ে ওঠা কৃষকদের সন্তানেরা বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় নিজের মুসলমানিত্বকে ঢাল হিসেবে তুলে ধরেছিলো, পাকিস্তান আন্দোলন শেষ হওয়ার পরে এই কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্তরাই পুনরায় নিজের বাঙালি পরিচয়কে ধারণ করতে চেয়েছে, ২১শে ফেব্রুয়ারী যে বাঙ্গালীত্বের বোধন হয়েছিলো, সেটার চুড়ান্ত পর্যায় আমাদের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের যুদ্ধে জয়ী হওয়া।
তারপর পুনরায় আমাদের ভেতরে আত্মপরিচয় সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় অর্জনের খামতিজনিত হীনমন্যতার বোধ কাটাতে ধর্মজনিত পরিচয়ে অপরাপর মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যক্তিগত অর্জনকে নিজেদের বলে গর্বিত হয়েছে এদেশের মানুষ।
অনেকেই এই বিরাষ্ট্রীয় ধর্মীয় পরিচয়কে আত্মীকরণের স্বভাবের বিরোধিতা করেছে, সুতরাং ৫ই ফেব্রুয়ারী শাহবাগে গণজমায়েত শুরুর আগেই এই বাঙালী মুসলিম আর মুসলিম বাঙালী পরিচয়ের ভেতরে কোন শব্দটি প্রথমে বসবে এ নিয়ে অত্র অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভেতরে এক ধরণের সংকট ছিলো। আমারদেশ এবং ইনকিলাবের মতো পত্রিকায় ব্লগারদের ধর্ম অবমাননার প্রচারণা এই পরিচয়ের সংঘাতকে বিস্ফোরিত করেছে। সেটার ধারাবাহিকতায় এসেছে হেফাজতে ইসলামী মধ্যযুগীয় ১৩দফা বাস্তবায়নের আগ্রহ নিয়ে।
ধর্মীয় পরিচয়কে কুর্ণিশ করেছে সারা দেশ, যারা আমাদের আলোকিত করবেন প্রত্যাশা ছিলো তারা মেরুদন্ড শক্ত করে বলতে পারেন নি রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মপরিচয় তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক এবং এই রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে সমান অধিকার দেয়। তারা দৃঢ় স্বরে বলতে পারেন নি ব্যক্তিগত বিশ্বাস যেমনই হোক না কেনো প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, শুধুমাত্র বিশ্বাসের কারণে কাউকে হেনেস্তা করা চলবে না।
আমরা শঙ্কায় কিংবা মাথাগুণতিতে ভীত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি নি, সরকার দৃঢ় হাতে পুলিশ র্যাব বিজিবি দিয়ে হেফাজত উচ্ছেদ করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ আপাতত হেফাজতের আগ্রাসন থেকে বেঁচে গেলেও এই বোতলবন্দী আগুণ আসলে দৃশ্যপট থেকে আড়ালে চলে গেলো, বিদ্যমান ব্যবস্থার আশানুরূপ পরিবর্তন শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার না করলে সে তরল আগুণ তরল শোণিতে রাজপথ ভেজাবে পুনর্বার। রাজনীতিতে ধর্মের অব্যহত অত্যাধিক ব্যবহার ধীরে ধীরে 'মুসলিম বাঙালী' পরিচয় থেকে মুছে দেবে বাঙালী শব্দটাই, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপে আরও বেশী মুসলিম হয়ে ওঠার লড়াই করবো তখন।





দিন দিন আমরা আরো বেশী মুসলমান হয়ে যাচ্ছি।
দারুণ লেখা
অসাধারণ লাগলো!
আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলাম, ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ৬ মে'র পর এ যাবত আমাদের প্রিয় ব্লগাররা কেউ এনিয়ে বিশেষ কিছু লেখেননি । মীর ভাই ছিলেন ব্যতিক্রম । জাগরণ মন্চের চ্যূতির পর তিনিও একদম চুপ । এতদিন পর আপনি লিখলেন । আগ্রহ নিয়ে পড়লাম বারবার । আলোচনা করারধৃষ্টতা করছিনা, নিজের উপলব্দিটুকু লিখছি । আশা করি ভুলত্রুটি নেবেননা ।
সমাজদেহের একটা অংশকে জ্বরাগ্রস্থ রেখে বাকিটাকে নিরোগ রাখার ধারণা কোন সুস্থ ভাবনা নয় । অবহেলিত, নিগৃহীত এ লোকগুলোকে মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে নাপারার ব্যর্থতা পুরো জাতির । অচিরে যদি এ দায় কাটিয়ে উঠা না যায়, তাহলে এ ভুখন্ডের মানুষদের আরো অধিক মুসলিম হওয়ার দিকে ঠেলে দওয়া হবে ।
মনে রাখতে হবে, বংগ ভংগ ও ঢা বি প্রতিষ্টার আন্দোলন বা '৪৭ এর ভারত বিভক্তি এমনি এমনি হয়নি । প্রবলের দ্বারা সীমাহীন নিগৃহীত-নিষ্পেষিত হয়ে দূর্বল জেগেছিল সেদিন-- যতই এগুলোকে সাম্প্রদায়িক বলা হোকনা কেন-- কিছু যায় আসেনা । পরবর্তীতে '৫২, '৬২, '৬৬, '৭৯ এর গণ আন্দোলন, '৭০ এর ভোট, '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্টা সবই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা মাত্র ।
বাংগালী নীতিগতভাবে অসাম্প্রদায়িক, যদিও কখনো কখনো সার্থান্বেষী রাজনীতিক দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছ ।
মনে করেছিলাম হেফাজতের পতন ঘটে গেছে, এখন দেখছি নির্বাচনকে সামনে রাখে তাদের জিইয়ে রাখা হচ্ছে ঠিকই। নির্বাচন আসলে আমরা বেশি মুসলমান হই
হেফাজত ইস্যুতে এমন বিশ্লেষণাত্মক লেখা বহু কামেল লোকও লিখতে পারেন নি। আপনার কলম এত দৃঢ়, এতটাই অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণধারী, ভাবাই যায় না।
লেখার প্রতিটি উপলব্ধি সঠিক।
মন্তব্য করুন