ভাঙচুরের ব্যবসা
হুমায়ুন আহমেদের নান্দাইলের ইউনুসের গল্পটা নিছক গল্প না বরং বঞ্চিত মানুষের আভ্যন্তরীণ ক্রোধের মাত্রাবোধহীনতার রূপায়ন। অবশ্য নান্দাইলের ইউনুসের উপখ্যান আমাদের জানতে হয় না, আমরা চলতি পথে বিচারের আড়ালে এমন অমানবিক নৃশংসতার উদাহরণ নিয়মিতই দেখতে পাই।
একটা সময়ে রাস্তায় ছিনতাইকারী কিংবা চাঁদাবাজ ধরা পরলে উত্তেজিত জনতা তাদের পিটিয়ে হত্যা করেছে, পকেটমার শিশু-কিশোরদের আঙ্গুল কেটেছে, আগুণে পুড়িয়ে মেরেছে, গণমাধ্যম নিয়মিতই এসব সংবাদ প্রকাশ করেছে কিন্তু এই অহেতুক বর্বরতার বিপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে পারে নি।
সমষ্টির ভেতরে অনেক ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ মানুষ থাকে, যারা জীবনে কোনো না কোনো সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে, যাদের বাজারের টাকা পকেটমার হয়েছে, যাদের ছোটো প্রতিষ্ঠান প্রাণের আতংকে চাঁদাবাজদের দাবিকৃত অর্থ পরিশোধে বাধ্য হয়েছে। অসংখ্য মানুষ যারা মূলত আইনী সুরক্ষা চেয়েছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা চেয়েছে কিন্তু রাষ্ট্র আইনী সুরক্ষা কিংবা নিরাপত্তা প্রদাবে ব্যর্থ। এইসব ক্ষুব্ধ ক্রুদ্ধ মানুষেরা ভীড়ের আড়ালে ভয়ংকর নৃশংসতায় অমানবিক ভাবে নিজের ক্রোধের উপশম খুঁজে পায়।
ন্যায় বিচারবঞ্চিত মানুষ অপরাধের প্রতিকার চায় না বরং বিচারের আড়ালে প্রতিশোধ চায়। বিচারের ধারণা এবং প্রতিশোধের ধারণার ভেতরের গুণগত পার্থক্য ভুলে অপরাধের কঠিন শাস্তি দাবি করে। সুশাসনপ্রদানে অক্ষম রাষ্ট্র অহেতুক কঠোর শাস্তির বিধান রেখে সংসদে আইন অনুমোদন করে, অপরাধের মাত্রার সাথে শাস্তির মাত্রার তারতম্য নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রশাসনের নজরে আসে না।
অবদমনের গল্পগুলো এমনই, ক্ষমতাধর এবং ক্ষমতাহীনের ভেতরে ভিন্ন উপায়ে দমন এবং অবদমনের ইতিহাস তৈরি হয়। ক্ষমতাধর দমন করে, বিদ্রোহ-অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা দমনের নামে তারা খুব বেশী কতৃত্বপরায়ন হয়ে মূলত রাষ্ট্রের সকল শক্তি ব্যবহার করে বিদ্রোহী ভাবনাকে প্রতিহত করে।
ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রের তান্ডবের প্রতিকার খুঁজে না পেয়ে এই অহেতুক হয়রানি মেনে নেয়, কিন্তু তার রক্তে প্রতিশোধবাসনা আরও দৃঢ় হতে থাকে। সুযোগসন্ধানী মানুষ রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে প্রতিশোধবাসনা চরিতার্থ করে কিন্তু এই ভীড়ের ভেতরে অসংখ্য মানুষ যারা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তারা মূলত রাস্তার হট্টগোলের অপেক্ষায় থাকে, সেখানে তারা তাদের ক্রোধের আগুণে পিষ্ট করে অন্য একজন মানুষকে, অমানবিক নৃশংস হলেও সাময়িক উত্তেজনায় তারা ভুলে যায় এর পরিণাম এমন কি প্রশাসনও এমন জনবিক্ষোভকে আইনের আওতায় নিয়ে আসে না। সেটাকে রাজনৈতিক আড়াল দেয়, ফলে অপরাধী গণের আড়ালে এক ধরণের আইনী সুরক্ষা পেয়ে যায়।
হরতালে গাড়ী ভাঙা মানুষগুলোর সবাই যে রাজনৈতিক দলের সমর্থক হবে এমনটা নিশ্চিত বলা যায় না, সেখানেও সুযোগসন্ধানী মানুষেরা আছে। তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় ভাঙচুড়ের সময় শ্রমিকের সাথে এরাও ছুটে যায় ঘটনাস্থলে, লুটপাট করে। এমন প্রতিষ্ঠানিক অবহেলায় বিচারবঞ্চিত মানুষের দঙ্গলে অনেকেই থাকে সাময়িক উত্তেজনায় যাদের বিচারবুদ্ধি লুপ্ত হয়ে যায়।
গতকাল বিবিসিতে এংগার রুমের প্রতিবেদন দেখলাম। পয়সা দিয়ে যেখানে নিজের পছন্দের দৃশ্যপটে ভাঙচুড় করা যায়। খুব দ্রুত এমন এংগার রুমের ধারণা বিস্তৃত হচ্ছে, বাণিজ্যিক ভাবে মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের ভেতরেও আগ্রহ জাগাতে পেরেছে। আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আইরিসের এংগার রুমের মূল ভোক্তা নারীরা। তারা পয়সা খরচ করে জিনিষপত্র ভেঙে তীব্র আনন্দিত। তাদের পছন্দের সজ্জার ভেতরে অবশ্য তাদের সমাজের গঠন এবং দৈনন্দিন বাস্তবতা মুর্ত হয়ে উঠে। যে নারীর স্বামী অফিস থেকে বাসায় ফিরে কম্পিউটারে মগ্ন , কম্পিউটারে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করছে এবং কম্পিউটারের অলীক সঙ্গে স্ত্রীকে অবহেলা করছে, সেই সম্পূর্ণ যন্ত্রটার উপরে স্ত্রীর তীব্র ক্ষোভ, কম্পিউটারের মনিটর, কিবোর্ড প্রিন্টার ভেঙে এক ধরণের সাময়িক মুক্তির আনন্দ সে নারী পাচ্ছে।
যাদের স্বামী মদ্যপ তাদের সম্পূর্ণ ক্রোধ অবশ্য মদের বোতলে, তারা মদের বোতল ভাঙছে, দেয়ালে ছুড়ে মারছে, এইসব নারীরা প্রতিনিয়ত নিজের ভেতরে এমন ভাঙচুড়ের কল্পনা করে, সামাজিক বাস্তবতায় তাদের এসব কল্পনা বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয় না। তারা পয়সা খরচ করে ২০ ২৫ মিনিট এসব ভাঙচুড় করে নিজের ক্ষোভ প্রশমিত করে।
যদি বাংলাদেশে কেউ উদ্যোগী হয়ে এমন কোনো ভাঙচুরের দোকান খুলে বসে তাহলে অতি অবশ্যই কম্পিউটার এক্সেসরিজ ভাঙার আগ্রহ থাকবে নারীদের, পুরুষের আগ্রহ থাকবে মোবাইল ফোন ভাঙচুরের, শিক্ষার্থীর আগ্রহ থাকবে ক্লাশরুম আর বইখাতা পোড়ানোর, তবে খুব বেশী হলে ১ ডজন সেট আপের ভেতরেই আমরা আমাদের সবগুলো ক্ষোভকে প্রকাশিত হতে দেখবো, হয়তো সেই ১ ডজন সেট আপের ভেতরেই আমাদের যাবতীয় ক্রোধের জন্ম। আমাডের পারিবারিক কাঠামো, আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো, আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নানাবিধ আরোপের জায়গাগুলো খুব স্পষ্ট। আমরা মুক্ত হতে চাই, ক্ষোভ-ক্রোধ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চাই, আমরা এসব ভেঙে সামনে আগাতে চাই।আমার ধারণা বাংলাদেশে গার্মেন্টস ব্যবসার মতো লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠবে এটা।





অনেকদিন পর এবি-তে আসতে শুরু করেছি এবং রাসেলের লেখাটাও অনেকদিন পর...। পড়বো। তারপর মন্তব্য দেবো।
ব্যবসার চিন্তা কিন্তু খারাপ না
আমি হাড়ি পাতিল ভাঙবো। আমার রানতে ভাল লাগে না
(
তিতা'ফু, আপনে হাড়ি পাতিল ভেঙ্গে ফেলে দিবেন আর আমি ঐগুলি টোকায়ে নিয়ে বেচে কটকটি খাব .
খুব কাজের আইডিয়া!
আমি কি ভাঙব?
ভাল আইডিয়া, কাজে লেগে পড়েন
মন্তব্য করুন