বৃষ্টিবিলাস
অসংখ্য অনুষঙ্গ না থাকলে শুধুমাত্র বৃষ্টি আমার কখনও ভালো লাগে না। আকাশে মেঘ জমলে হৃদয়ে উল্লাস জাগে না আমার। বৃষ্টির সৌন্দর্যের বদলে বৃষ্টিপরবর্তী ঝঞ্ঝাট মনে করে কিছুটা বিরক্তও হই। ছোটোবেলার বৃষ্টির আনন্দ ছিলো, সে আনন্দের সাথে অবধারিতভাবেই " আজকে স্কুলে যেতে হবে না" শর্ত ছিলো। হাফ ইয়ার্লির বৃষ্টির বিষ হজম করে কাদা প্যাঁচপ্যাঁচে মফঃস্বলের রাস্তা ডিঙিয়ে ভেজা ভেজা হাতে পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর লিখে বিদ্যাদিগগজ হয়ে যেতে হবে পরিস্থিতির বাইরে ছোটোবেলার বৃষ্টি অনেকটাই সহনীয় ছিলো। এক টানা ৩-৪ দিন বৃষ্টির পরে যখন মহল্লার মাঠ আর হেড়িং বোন সড়কটা আলাদা করা কঠিন সে সময়ে আরও এক ঘন্টা বৃষ্টির অভিশাপ সহ্য করা সম্ভব হতো না কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টিতে ভেজা হতো নিয়মকরেই, বৃষ্টিতে ভিজলে ঘামাচি মরে।
মফঃস্বল থেকে ঢাকা শহরে এসেও বৃষ্টিবিভীষিকা দূর হয় নি। বড় শহরে বড় জঞ্জাল, বড় বড় ড্রেন, বড় জলাবদ্ধতা, বড় ডাস্টবীনে দুর্গন্ধের মাত্রাও বেশী। বৃষ্টির ভালোলাগার দিকগুলোর সাথে দুপুরের মাঠে এন্তার ভিজে বন্ধুদের সাথে ফুটবল, তারপর খিচুড়ি, গরু ভুনা আর আচারের শেষে সন্ধ্যা অবধি ব্রে আর স্পেড ট্রামের যোগাযোগ আছে। সন্ধ্যায় পিঁয়াজু, গরম চা আর ভেজা ভেজা বাতাসে ফ্যান ছেড়ে কাথা গায়ে শুয়ে গল্পের বইয়ে ডুবে যাওয়ার বিষয়গুলো থাকলে বৃষ্টিবন্দী সময় কাটানো উপভোগ্য।
বৃষ্টি আমাকে রোমান্টিক করে না, বরং অসংখ্য চাহিদা তৈরী করে। যেসব চাহিদা পুরণ হলে বৃষ্টিকে ভালো লাগতো আমার। আমার বরং বৃষ্টির পরের হাইওয়ে ভালো লাগে। বাংলাদেশের প্রায় একই রকম প্রকৃতির ভেতরে একই রকম মাঠ- ক্ষেত আর ব্রীজ কালভার্টের মাঝের একই রকম হাইওয়ের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির পরে কোথাও যাওয়ার আনন্দ অন্য রকম। বাংলাদেশকে অন্য কোনো সময় এত স্নিগ্ধ, এত মায়াময় এত সুন্দর লাগে না। রাস্তার দুইপাশের গাঢ় সবুজ বৃষ্টি ধোয়া প্রকৃতি আর ঝকখকে তকতকে কালো হাইওয়ে আরও দূরে যাওয়ার আমন্ত্রন জানায়। আমি গাড়ীর জানালায় বৃষ্টিস্নাত বাংলাদেশ দেখি আর প্রতিবার নতুন করে বাংলাদেশের প্রেমে পরি।
ইদানিং একা একা বৃষ্টিতে ভেজার আগ্রহ পাই না, বরং বৃষ্টির সম্ভবনা দেখলে চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকি। ছাদের দরজা খুলে চুপচাপ সিগারেট টানি আর আশেপাশের ছাদের বৃষ্টিবুভুক্ষু মানুষদের উল্লাস দেখি। প্রত্যেকের বৃষ্টিতে ভেজার নিজস্ব ধরণ আছে।
প্রতিবার মানুষের বৃষ্টিবিলাস দেখে আমার ধারণা বৃষ্টি নারীদের কিশোরীবেলাকে পুনর্জীবিত করে প্রতিবছর। এই বৃষ্টির ঘোরটোপে নিজের ছাদের নির্জনতায় সবাই আসলে কৈশোরে ফিরে যায়। ১৫ থেকে ৩৫ সব মেয়েই একই রকম ভঙ্গিতে বৃষ্টিতে ভেজে। মাথার চুল খোপা করে বৃষ্টির মাঝখানে স্থানু দাঁড়িয়ে থাকে নইলে ছাদের রেলিং এ চুপচাপ বসে থাকে। এ সময় কেউ কারো দিকে তাকায় না। এই পর্ব শেষ হওয়ার পর তারা অপরাপর সবার দিকে তাকিয়ে হাসে, হাতের মুঠোয় বৃষ্টি ধরে সঙ্গীর দিকে ছুড়ে দেয়। তারপর তারা হাসে , প্রাণ খুলে হাসে। কিশোরী বেলার মতো গোল্লাছুট খেলে। বৃষ্টির পানিতে তাদের সামাজিক শৃঙ্খল ধুয়ে যায়, তারা স্বাধীনতার উল্লাস ফিরে পায়।
সময়ের সাথে বৃষ্টি ধরে যায়, বৃষ্টির ধার কমে, বৃষ্টির তেজ কমে, এদিক ওদিক থেকে দমকা বাতাস এসে ধাক্কা দেয় শরীরে, চুলের সীমান্ত দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানির শীতল স্পর্শ্বে তারা অবশেষে সম্বিত ফিরে পায়। খানিক আগের উল্লাসে কিছুটা অবসন্ন, কিছুটা বিষন্ন হয়ে ছাদে জমা পানির দিকে তাকায়, পায়ের আঙ্গুল দিয়ে ছাদ খুঁটে, পানি ছিটিয়ে ওড়নাটা একবার মুচড়ে আবার শরীরে জড়ায়। তারপর শহরের ছাদগুলোতে জড়ো হওয়া বিভিন্ন বয়সের কিশোরীরা ধীরে ধীরে নীচে নেমে যায়।





বৃষ্টিকালীন হাইওয়ে আমার আরও ভালো লাগে..
চমত্কার বৃষ্টিবর্ণনা ভালো লাগলো। তবে হুট করে শেষ না হয়ে আরো কিছুক্ষন চললে বেশ হতো।
আসলেই তাই মনে হয়।
বৃষ্টি ---- হয়তো একই আছে, মানুষ বদলে যায় কিংবা গেছে
বৃষ্টি!!!!!!!!!!!!!!!!! আমার অসম্ভব প্রিয়
মন্তব্য করুন