সিদ্ধান্ত
প্রতি মুহূর্তের প্রতিটা সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফলাফল জীবন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটামাত্র সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্তে স্থির থেকেই পরবর্তী ঘটনাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার ভেতরেই জীবনের আনন্দ-বিভ্রম-সংশয়- জটিলতা। এরপরও আমরা প্রতি মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেই। পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে দুপুর-রাতের খাওয়ার মেন্যু আমাদের সারাদিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের ফলাফল এবং যতই হালকা করে দেখি না কেনো এই প্রতিটা সিদ্ধান্ত কোনো না কোনোভাবে ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করে। সময়ের সাথে প্রতিটা সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ে, পরিণামের ভয়াবহতা বাড়ে, অর্থমূল্য এবং ধকলের পরিমাণও বাড়ে, ফলে একটা নির্দিষ্ট বয়েসের পর শুধুমাত্র শার্টের রঙ আর খাওয়ার মেন্যুর বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে দিনের বরাদ্দ ৫০ টাকা কি কি খাতে খরচ হবে এই সিদ্ধান্ত নিতে হতো দুপুর ২টায়। ৩ কাপ চা, ৫টা সিগারেট, রিকশা ভাড়া দিয়ে সন্ধ্যার পর খুব বেশী ২টা সিগারেট কেনার পয়সা থাকবে হাতে- এই পরিস্থিতিতে জমে ওঠা আড্ডা বাদ দিয়ে বাসা ফিরে যাবো না কি রাতের ২টা সিগারেট আর রিকশা ভ্রমনের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে দুপুরে খেয়ে ফেলবো সিদ্ধান্ত নিতেও কিছুক্ষণ ভাবতে হতো। আমরা যারা আড্ডায় হেসে খুন কিংবা পরিস্থিতি বিবেচনায় কিঞ্চিৎ গম্ভীর তাদের অধিকাংশই সন্ধ্যায় টিউশনিতে যাবে, সন্ধ্যার অফিস ফেরত ভীড়ে বাসে ধাক্কা ধাক্কি করে ওঠার ধকল এই আড্ডা আর দুপুরের খাওয়ার খেসারত। ভালো একটা আড্ডামুখর সময়ের জন্যে অধিকাংশ দিনই সন্ধ্যার ভীড় বাসে অপরিচিত মানুষের জুতো আর কানুই এর গুতো খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পকেটে শুধুমাত্র ফেরার রিকশা ভাড়া আর বিতর্কটা বেশ জমে উঠেছে পরিস্থিতিতে বিতর্কের খেসারতবাবদ আরও ২ কাপ চা আর ২টা সিগারেটের দাম রেখে সাকুল্যে পকেটে থাকবে ৫ টাকা, সেই ৫ টাকায় বাস ভাড়া হবে না, দুপুরের খাওয়াও হবে না পরিস্থিতিতে দুই বন্ধু পকেট উলটে দুটো বাটার বন, দুই কাপ চা দিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে বিতর্কের চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অলিখিত অঙ্গীকার ছিলো ফেরার বাসভাড়াটা ও পকেট থেকেই দিবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বাসে না গিয়ে পাবলিক বাসেই যাবো সিদ্ধান্ত নিয়ে যে বন্ধুটা চায়ের দোকানে বসে পরলো, ৭টায় তারও টিউশনি কিন্তু আড্ডা টানছে ভীষণ- সারা দিনের সাজানো পরিকল্পনা, সপ্তাহের পরিকল্পনায় নিশ্চিত একটা ভজঘট পাকাবে বুঝেও গাছের গুড়িতে বসে মামা দুইটা চা লাগান বলার মতো সাহস তখনো ছিলো। আমরা যারা নির্বিবাদী মানুষ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস,পাবলিক বাস, দুপুরের খাওয়া, চা আর সিগারেটের সিদ্ধান্তের দোলাচলে কাটলেও উত্তর পাড়ার ক্যাডার বন্ধুদের একাংশ তখন আরও জটিল জটিল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতো।
৯৬ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতার পরপরই ছাত্রলীগের ক্যাডারেরা হল দখল করতে আসবে- ছাত্রদলের ক্যাডারদের একাংশের নাইট ডিউটি, অন্য অংশ সিঙ্গেল শ্যুটারের বীচি গুনছে বসে বসে, তাদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হয়, প্রতিরোধ না কি আত্মসমর্পন। আত্মসমর্পন মানেই হলের নির্দিষ্ট সীট ছেড়ে দিয়ে পরবর্তী ৫ বছর ছাত্রলীগের অনুগ্রহে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করা- ভেবেচিন্তেই এদের একদল ছাত্রলীগে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়-
সেই রাতের নাইট ডিউটিতে থাকা কয়েকজনের সিদ্ধান্ত অপরাপর বন্ধু আর কর্মীদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রদল--ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের ক্যাডারদের সিদ্ধান্ত শিক্ষাঙ্গনের বড় একটা অংশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আমাদের চা আর আড্ডার সাধারণ সিদ্ধান্তের চেয়ে এদের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অনেক বেশী ছিলো। তবে মাইক্রোবাসে উঠে আজকে কুমিল্লার একজনকে কোপাতে যেতে হবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে এদের ৩ মিনিটের বেশী কখনও লাগতো না। সিগারেটটা দে বলে কয়েকটা টান দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতো কুমিল্লায় যাচ্ছি সেখানে একশন আছে।
আমাদের বন্ধুদের একাংশ যারা নিজের সাবজেক্টে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম ৫ জনের ভেতরে থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষক হওয়ার লড়াই করছে তাদের সামনে ভবিষ্যতের ছক কাটা ছিলো, এক্কা দোক্কার ঘরের মতো ছক কাটা জীবনে তারা জানতো কোন ঘরে পা রাখাই যাবে না আর কোন ঘরে পা রাখলে পাক্কা। না ভালো না খারাপ টাইপ আমরা বেশী দুর ভাবতে পারতাম না, আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিস্তৃতি ছিলো ১ দিন, পরের দিন ৮টার ক্লাশে আসবো না কি গাপ মারবো এইটুকু পূর্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাভাবিকতা আমাদের ছিলো আর বাকী সিদ্ধান্তগুলোর অধিকাংশই ছিলো তাৎক্ষণিক।
সে বয়েসের প্রতিটি সিদ্ধান্ত যে জীবনে কাজে এসেছে এমন না। প্রায় প্রতিটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের সামগ্রীক ফলাফল খুব বেশী আনন্দময় হয় নি। তবে জীবন সম্পর্কে গভীর অনুধাবনের বয়েস তখনও আমাদের হয় নি, বৈষয়িকতা বিষয়টা বুঝে উঠতে পারি নি ঠিক মতো। পেছন ফিরে দেখলে মনে হয় সর্ববিষয়ে উৎসাহী না হয়ে নিজের প্রায়োরিটি ঠিক করে নেওয়াটা দরকার ছিলো, সেক্ষেত্রে জীবনের অনেক আনন্দ হয়তো অজানাই থেকে যেতো কিন্তু পরবর্তী জীবনটা একটা ছকে এঁটে যেতো।
এখন আমি জানি প্রতিটা সিদ্ধান্তই কোনো না কোনো ভাবে জীবনকে প্রভাবিত করে। কিছু সিদ্ধান্তের প্রভাব সামান্য, কিন্তু কিছু কিছু সিদ্ধান্ত জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে। সেসব সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনার সুযোগ সামান্য- জুয়ার বোর্ডে শেষ ১০০ টাকা কোন ঘরে রাখা উচিত সে সিদ্ধান্ত একবারই নেওয়া যায়, সেসব সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা যায় না। আসলে কোনো সিদ্ধান্ত থেকেই ফিরে আসা যায় না। জীবনটা আসলে ফিরে আসা সম্ভব ছিলো না এমন অনেকগুলো সিদ্ধান্তের সমষ্টি।





এখন আমি জানি প্রতিটা সিদ্ধান্তই কোনো না কোনো ভাবে জীবনকে প্রভাবিত করে। কিছু সিদ্ধান্তের প্রভাব সামান্য, কিন্তু কিছু কিছু সিদ্ধান্ত জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে। সেসব সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনার সুযোগ সামান্য- জুয়ার বোর্ডে শেষ ১০০ টাকা কোন ঘরে রাখা উচিত সে সিদ্ধান্ত একবারই নেওয়া যায়, সেসব সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা যায় না। আসলে কোনো সিদ্ধান্ত থেকেই ফিরে আসা যায় না। জীবনটা আসলে ফিরে আসা সম্ভব ছিলো না এমন অনেকগুলো সিদ্ধান্তের সমষ্টি।
"জীবনে যা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেগুলোর অনুশোচনার চাইতে যা করতে পারতাম কিন্তু সংকোচ/ভয় ইত্যাদি ইত্যাদি কারনে সিদ্ধান্ত নেই নাই সেগুলো বেশ অনুশোচনা দেয়"
আমার শ্বশুড় বাড়ির দিকের এক দাদা শ্রেণীর মুরুব্বি আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং প্রচন্ড মেধাবী (ইন্টারে খুলনা বোর্ডে প্রথম) এককালের ডাকসাইটে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন কর্মী পরে সিরাজ শিকদারে সাথে ধরা পরে ১২/১৪ বছর জেল খাটা। মানুষটা বেশ স্বল্পভাষী, বারোটা প্রশ্ন করলে একটা জবাব দেয়। উপরের উক্তিটা উনার।
মন্তব্য করুন