চীনের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে যাওয়া আর ফেরার জন্যে সবচেয়ে সস্তা প্লেনের টিকেট পেলাম চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সে। যদিও যাত্রাপথে অপেক্ষার প্রহর অনেক কিন্তু ভালো প্লেন কোম্পানীর প্রায় অর্ধেক দামে বাংলাদেশে যাওয়ার সুযোগ কেউ দিচ্ছে না। দুই-তিন বার প্লেন বদলে মাঝে এক রাত চীনে কাটিয়ে বাংলাদেশে যেতে হবে। যাওয়ার পথে রাত্রি বিরতি কুনমিং এ আর ফেরার পথে রাত্রি বিরতি বেইজিং এ। কুনমিং এর বাংলা হোটেল লিখে ইন্টারনেট খুঁজে অনেকগুলো বাংলা হোটেলের সন্ধান পাওয়া গেলো। কোনোমতে এয়ারপোর্টে পৌঁছালেই কোনো না কোনো হোটেলের লোকজন খুঁজে পাওয়া যাবে। কথা মিথ্যা না।
কুনমিং এয়ারপোর্টে রাত দেড়টায় পৌঁছানোর পর যখন ব্যাগের অপেক্ষা করছি শুনলাম কেউ একজন বলছে ভাই কি বাংলাদেশী?
শব্দের উৎস খুঁজে পেলাম, দোতালার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রশ্নটা করেছে। মাঝরাতে কয়েক পদের ভাজি-ভর্তা আর মাছ ভাজা খেতে খেতে চীনা ইমিগ্রেশনের কিঞ্চিৎ হয়রানি ভুলে গেলাম।
বেইজিং এ তেমন বাংলাদেশী হোটেলের সংবাদ পাওয়া গেলো না ইন্টারনেটে। মাঝরাতে কোনো বাংলাদেশী রেলিং এ দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে না ভাই কি বাংলাদেশী? তবে কাছে-পিঠেই সস্তা হোটেল আছে। ভাষার ব্যবধান আর কতটুকু ঝামেলা করবে ভেবে বেইজিং এ নেমেছিলাম। অসংখ্য বাক্স আর আড়াআড়ি দাগ তত বেশী ভীতিপ্রদ ছিলো না, তবে রাত ১০টা বাজতেই বেইজিং এর রাস্তায় পাবলিক বাস অনিয়মিত হয়ে যায়। এয়ারপোর্টের এদিকে ওদিকে হেঁটে হেঁটে কোনো মতে ইংরেজীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছি। আই নিড এ হোটেল ফর টুনাইট-
আই নিড এন একোমোডেশন ফর টুনাইট-
বিভিন্ন কায়দায় একই প্রশ্ন করতে করতে ব্যর্থ হয়ে মাথার একপাশে দুই হাত দিয়ে ঘাড় কাত করে দুই চোখ বন্ধ করতেই সাহায্যকারীর চোখে আলো ফুটলো। তার পরামর্শ শুনে কিছু দুর আগাতেই একজন হোটেলে নিয়ে গেলো। মাঝারির চেয়ে নিচু একটা হোটেলে উঠলাম। বুঝলাম বেচারা গভীর রাতে নভিশ আমাকে পেয়ে একচোট লুটপাট করলো। মেনে নিলাম। এক রাতে অপরিচিত শহরে এভাবে নাকাল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। সে আঘাত এত বেশী বুকে লাগতো না কিন্তু সকালে এয়ারপোর্টে পৌঁছে এ মাথা ও মাথা হেঁটে যখন লাউঞ্জে পৌঁছালাম ততক্ষণে লাউঞ্জ বন্ধ করে সবাই বোর্ডিং পয়েন্টে চলে গেছে।
এত বড় একটা প্লেন মিস করার অভিজ্ঞতা আগে ছিলো না জীবনে। সে অভিজ্ঞতা হলো এবার। প্লেনের টিকেটের দিন বদলের দন্ডি দিয়ে হাতে যা ছিলো ভেবেছিলাম দিনটা কাটিয়ে দিতে পারবো হেসে খেলে।
গতকাল সারা দিন তেমন কিছু খাওয়া হয় নি। ভেবেছিলাম কোনোমতে বাসায় পৌঁছে রাতে ভরপেট খাবো। সে সুযোগ পেলাম না। এয়ারপোর্টের অহেতুক দামী রেস্টুরেন্টে ১৫০ চীনা টাকা খরচ করে ভালোমন্দ খাওয়ার বিলাসিতা করার সাহস পেলাম না।
অঘটনের সংবাদ বাসায় জানাতে হবে। এয়ারপোর্টের ইন্টারন্যাশন্যাল কলিং কার্ডের যে দাম সে দামে এক বেলা ভালো খাওয়া যাবে। উপরে উঠে দেখলাম একটা ইন্টারনেট লাউঞ্জ আছে, সারা রাত খোলা থাকে। সারা দিনের জন্যে খরচ ৬৮ টাকা আর সারা রাতের খরচ ১০০ টাকা। গতকাল রাতে এর অস্তিত্ব জানা থাকলে এত বেশী হয়রানির মুখোমুখি হতে হতো না।
মানুষ তার প্রতিটা দুর্ভোগ থেকে শিখে। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখলাম
পরবর্তী কোনো ভ্রমনে এমন যা হওয়ার হবে ভঙ্গিতে বের হওয়া যাবে না। এয়ারপোর্টে র মেঝেতে মাদুর পেতে রাত কাটাতে শিখতে হবে। যে দেশের ভাষা অজানা সে দেশের মাটিতে পা দিলে আরও হিসেব করতে হবে।
এখন মাঝরাতে ১০০ চীনা টাকায় বিশ্রাম আর ইন্টারনেট এক্সেস নিয়ে বসে আছি। চীনা আগুণ দেয়াল জিমেইল ফেসবুক নিষিদ্ধ করেছে। বাসায় নিজের দুর্ঘটনার সংবাদ জানানোর সুযোগ নেই। এয়ারপোর্টের ২৪ ঘন্টার দোকান থেকে সস্তা কাপনুডলস গরম পানিতে ভিজিয়ে খেলাম। বিস্বাদ নুডলস দিয়ে ইমিগ্রেশনের হয়রানি গিলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। চীনা কতৃপক্ষকে আগামীকাল সকালে ৫০০ চীনা টাকা জরিমানা দিতে হবে।





ভালোই বিপদে পরছেন দেখি
মাঝরাতে কয়েক পদের ভাজি-ভর্তা আর মাছ ভাজাই বা মন্দ কী!
এখন কি অবস্থা? আশা করি আপনি যেন ভালভাবে দেশে ফিরতে পারেন।
মীর, কী খবর?
এই তো আপু, আছি ভাল। আপনি কেমন আছেন?
গত বছর ডিসেম্বরে বেইজিং এ স্টপওভার ছিল । অভিজ্ঞতা অনেকটুকু আপনার মতোই । ৮ ঘণ্টা ছিল কানেক্টিং ফ্লাইটের । রাতে নামার পর দেখি এয়ারপোর্ট জুড়ে দালালে ভরা । রাতে এয়ারপোর্টেই ছিলাম । এয়ারপোর্টে ঘুমানোর জন্য একটা সাইট আছে , সেটায় পাওয়া যায় কোন এয়ারপোর্টে কোথায় ঘুমানো যায় , সে হিসেবে বেইজিং সুবিধার না । এক দেশী লোকের সাথে পরিচয় হলো , সে আবার আমার মামার ফ্রেন্ড । এয়ারপোর্ট বলে স্মোকিং ফ্রি ! পাব্লিক বাহিরে ধুমায়া টানছে । চায়নায় রোমিং করালে জিমাইল বা ফেসবুক এক্সেস করা যায় । বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে ঘুমানোর অভ্যাস থাকায় জায়গা বের করে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম , কমলাপুর স্টেশন স্টাইলে । ফেরত আসার সময় হোটেলে ছিলাম , এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার করার ব্যবস্থা থাকলেও গাড়ি আসে নাই । ট্যাক্সিতে ১০০ চায়নিজ কারেন্সি দিয়ে গেলাম , অচেনা জায়গায় ট্যাক্সিতে ধরা খাওয়াই নিয়ম । একটা সমস্যা দেখলাম , কেউ ইংলিশ এর ঈ ও জানে না । টার্মিনাল ১ এ খাওয়ার ব্যবস্থা বেশি , টারমিলাল ৩ থেকে হেটে যেতে ১০/১৫ মিনিট লাগে ।
জীবনে অভিজ্ঞতা অর্জন করা ভালো।
ভবিষ্যতে কোথঅও আটকাতে হবে না।
মন্তব্য করুন