অনেকদিন পর বাংলাদেশে
প্রায় ২ বছর পর যখন বাংলাদেশকে দেখলাম ১০ হাজার ফুট উপর থেকে, বানের পানি নামছে বাংলাদেশের শরীর বেয়ে। ইরাবতীর ঘোলা স্রোত সুরমা মেঘনা হয়ে আরো নীচে যমুনার সাথে মিশছে যেখানে, মাঠ, নদী আর লোকালয় ওতটা উপর থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় না, যেমন বুঝা যায় না সীমানার ব্যবধান, কোথায় অচিহ্নিত কোন পাহাড়ের ঢালে সীমান্ত সংকেতে লেখা আছে বাংলাদেশ ০ কিলোমিটার, মাঝের ৫০০ গজ নো ম্যানস ল্যান্ডের এপারে বিডিআর ওপাশে বিএসএফ কিংবা বার্মা সীমান্ত রক্ষীবাহিনী। এত উপর থেকে কিছুই বুঝা যায় না। একটা ঘোলা নদী, সবুজ মাঠ আর সবুজাভ যমুনা এক বিন্দুতে মিলে যাচ্ছে। শহর আর গ্রাম, নদী আর জমি, ওত উঁচু থেকে সবই একই রকম লাগে। যদি উজানে ঘন বৃষ্টি না হয় এখন যে পানি দেখছি উপর থেকে ঠিক দুই দিন পরে পানিগুলো সমুদ্রে মিশে যাবে। বানভাসি মানুষ স্কুলের বারান্দা থেকে নিজের ঘরে ফিরবে, ত্রানতৎপরতা কিংবা সংবাদকর্মীর ক্যামেরা, অনিশ্চিত উৎকণ্ঠার সময়গুলো ধারণ করতে অক্ষম। অনেক দিন পর বাংলাদেশকে দেখছি- বন্যার আবির্ভাব আমার আনন্দ ম্লান করতে পারছে না।
পুরোনো ঢাকার রাস্তার হৈ-হট্টগোল, পুরোনো সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক দিন পর অনেক কণ্ঠস্বর শুনছি। সবার সংলাপের স্বর ভিন্ন, তবে শব্দগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বেপরোয়া রিকশার টুংটাং আর ইঞ্জিনের গর্জন মিলে মিশে দুর্বোধ্য। পাশের দোকানের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম সে দোকানী কোথায়? জানলাম দোকানী মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা আর দোকান খুলছে না। অসংখ্য অকাল মৃত্যুর সংবাদ শুনেছি গত ২ বছরে, এই মৃত্যু অনাকাঙ্খিত হলেও অপ্রত্যাশিত না।
অনেক রকম উচ্চাশা নিয়ে আসলেও বাংলাদেশে কাটানো সংক্ষিপ্ত সময়গুলো খুব বেশী আনন্দময় ছিলো না। নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার প্রদর্শনী শহরে। শপিং মলে মেটাল ডিটেক্টর, নাম-ঠিকানা-মোবাইল নাম্বার লিখে প্রবেশ এবং প্রস্থানের আয়োজন প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে আমরা আমাদের স্বদেশে নেই।অনভ্যস্ত মুঠোফোনের ১১টা সংখ্যা মনে রাখা ভীষণ কঠিন। আমি পরিদর্শনবহিতে যখন যে সংখ্যাটা মনে হয়েছে আমার মুঠোফোন নাম্বার হতে পারতো, সেটাই অবিকল লিখে এসেছি এবং প্রতিবার ভেবেছি যে কেউ যেকোনো সংখ্যা এবং যেকোনো নাম এখানে লিখতে পারে। সঠিক নাম-ঠিকানা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা কোথাও নেই। চোরা ক্যামেরায় কোথাও নিজের মুখচ্ছবি জমা হচ্ছে রাষ্ট্রের কোষাগারে আর বেওয়ারিশ নাগরিক শহরের পথে পথে ঘুরছে।
স্টার কাবাবের এক পাশে বেওয়ারিশ মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ঢুকলাম, উপরে লেখা ২১৪৮। বিশ্বাস করা কঠিন সারা দিনে মাত্র ২১৪৮ জন ঢুকেছে সেখানে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখলাম যতজন মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে ঢুকছে তার চেয়ে বেশী মানুষ মেটাল ডিটেক্টরের পাশ দিয়ে হেঁটে ঢুকে যাচ্ছে। কেনো এই আয়োজন বলা কঠিন। এইসব ছদ্মনিরাপত্তা আয়োজন আদতে নিজেদের সান্তনা দেওয়া। সোচ্চার নজরদারির ভেতরেই কোথাও গুম খুন হচ্ছে, কোথাও নম্বরপ্লেটবিহীন মাইক্রোবাসে মানুষ উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের লাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, সংবাদপত্রে প্রেসবিজ্ঞপ্তি আসছে। রক্তের স্ত্রোত মারিয়ে পাপোষে জুতা মুছে আমরা ঘরের দরজা বন্ধ করছি। আমাদের নিরাপত্তাহীনতা এবং আমাদের অনিশ্চয়তার ভেতরে কোনো একদিন ভোর বেলায় পাশের গলিতে একজনকে খুন করে তার বিছানায় ফেলে রেখে গেলো কেউ। পুলিশের সাইরেন, গলির ভেতরের রিকশাজট সিগারেটের ধোঁয়ায় মিলিয়ে দিয়ে হাসি মুখে সন্ধ্যার খাওয়ার খেলাম আমরা সবাই।
আমাদের এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে। অদ্ভুত একটা সময়ে বেঁচে আছি আমরা। কোনো মানুষই অন্য মানুষকে বিশ্বাস করছে না। খুব বেশী ঘনিষ্ট না হলে বন্ধুর হাসির ভুল ব্যাখ্যা করছে মানুষ। তোকে দেখে নিবো না কি আবার দেখা হবে- বন্ধু যাওয়ার আগে কি বলে গেলো? চারপাশে অবিশ্বাসের বাতাস বইছে। মানুষ প্রশাসনের কথায় আশ্বস্ত হচ্ছে না। প্রশাসন ভাবছে সবাই আদতে অপরাধী, তাদের লাঠির ভয়ে সবাই সোজা হয়ে আছে। রাজনীতিজীবীরা এখনও সবচেয়ে ঘৃণিত জনগোষ্ঠী।
ছাত্র ইউনিয়নের একজন কর্মী তার প্রেমিকের হাতে খুন হলো, তেজগাঁ কলেজের ছাত্রলীগের নেতা, ভীষণ ঔদ্ধত্ব্য নিয়ে জানালো মেয়েটার পরিবারকে কি আর করার ভুল হয়ে গেছে। আসেন আমরা সব কিছু মিটমাট করে ফেলি। আমি প্রায় একান্ত আড্ডায় বললাম ভীষণ এই অপরাধটাতে অপরাধী চিহ্নিত না হলে বড় একটা আন্দোলন হতে পারতো। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো সদস্য ছাড়া ভিন্ন কেউ অপরাধী চিহ্নিত হলে সে হত্যাকে কেন্দ্র করে বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা কঠিন। প্রেমিক হয়তো প্রেমিকাকে ভীষণ নৃশংসভাবে, তার অনুভুতি আবেগকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের প্রতিহিংসার সবটুকু পুরণ করতে হত্যা করেছে। বীভৎসতা, শিউড়ে ওঠা অনুভুতিগুলো সবার ভেতরেই আসবে কিন্তু অপরাধী অচিহ্নিত থাকলে যেভাবে আন্দোলনটা এগিয়ে যেতো, অপরাধী চিহ্নিত হওয়ায় সবাই আসলে ব্যক্তিকেন্দ্রীক আন্দোলন করবে। রাষ্ট্রের সচেতন উদাসীনতা কিংবা উপেক্ষা যেভাবে অপরাধকে প্রশ্রয় দেয় এবং যেভাবে সবাইকে আক্রান্ত করে, ব্যক্তির অপরাধ সেভাবে আক্রান্ত করে না। গত ১ মাসে সেই অপরাধীকে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ চোখে পরে নি। বাংলাদেশে চাইলেই যেকোনো সনদ তৈরী করা সম্ভব। হত্যাকান্ডটি শেষ পর্যন্ত দাম্পত্যকলহজনিত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে হারিয়ে যাবে।
বাইরে যাওয়ার উপায় নেই, ঘরে জমে থাকা ঈদ সংখ্যাগুলোর একটা তুলে নিয়ে কিছুটা পড়ার চেষ্টা করলাম। প্রতিবছর এইসব ঈদ সংখ্যায় অন্তত ৬০০ কবিতা ছাপা হয়। যেকোনো একটা কবিতার প্রথমটুকু পড়ে আর পড়ার আগ্রহ থাকে না। আঙ্গুলের নীচে পাতা সরে যাচ্ছে, কালো কালো অক্ষরের সারি, পাশের কোলাজ, কিছুই টানছে না। কি ছাইপাশ লিখেছে? এই প্রশ্নটাও মাথায় আসে না, বরং ভাবার চেষ্টা করি কেনো এইসব লিখেছে? এমন শব্দসম্ভোগে, শব্দ আর দৃশ্যে চমক তৈরীর প্রতিযোগিতায় তারা যা লিখছে সম্ভবত তাদের যাপিতজীবনের সাথে এইসব শব্দের কোনো যোগাযোগ নেই। প্রাণহীন শব্দের কংকালের ভেতরে কবিতার স্পন্দন খুঁজে পাওয়া কঠিন। মাকিদ হায়দার, শাহনাজ মুন্নী, মারুফ রায়হান রাইয়ান রাইম নামগুলো তাদের কবিতার তুলনায় বেশী আকর্ষণীয় এখন। কবিতার চেয়ে কবির বাহারী নাম দেখে কবিতা পড়ার চেষ্টা করেও বাড়তি কোনো ফায়দা হলো না।
ভেবে দেখলাম গত ১০ বছরে কোনো দৈনিকের সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত কোনো কবিতাই পড়া হয় নি। শুনলাম এইসব জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যসম্পাদকগণ না কি মফঃস্বলের কবির জগতে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আমি জানি না এইসব দৈনিকের সাহিত্যপাতা কতজন মানুষ পড়ে? ৫ লক্ষ কিংবা ৫ হাজার, জাতীয় দৈনিক যে পরিমাণেই ছাপা হোক না কেনো, এসব দৈনিকের পাঠকেরা সবাই কবিতার পাতা পড়েন না। জাতীয় দৈনিকে কবিতা ছাপানো অনেকটা ফেসবুক-ব্লগে লেখার মতোই, সম্ভাবনা আছে অন্তত ১০০ কোটি মানুষ লেখাটা পড়বে কিন্তু আদতে হয়তো ৫০ জন লেখাটার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে। ব্যক্তিগত স্বজনের বাইরে দৈনিকের সাহিত্যপাকায় প্রকাশিত ছাইপাশের পাঠক মূলত সম্পাদক কিংবা সম্পাদকের নিজস্ব বলয়ে বসবাসরত কবিসংঘকে নির্দয় ভাষায় কবিতার পবিত্রতা ধ্বংসের দায়ে অভিসম্পাত জানাতে আগ্রহী বিরোধী কবিসংঘ। এই পরিস্থিতির ভেতরেই দেখলাম জিনিয়াস ছবিটা। যুক্তরাষ্ট্রের মহামন্দার সময়ের জনপ্রিয় লেখক থমাস উলফের সাথে তার সম্পাদক ম্যাক্সওয়েল পার্কিনসের বন্ধুত্বের সিনেমা। সিনেমার একটা সংলাপে থমাস উলফের প্রেমিকা বলে,
এই যে এখন, এখানে, তোমার দিকে তাকিয়ে আছি, ভেতরে কোনো অনুভুতি তৈরী হচ্ছে না- তুমি ভাবতেও পারবে না কতটা যন্ত্রনা সহ্য করে আমাকে এই পথটুকু পারি দিতে হয়েছে। ফেরার পথে দরজাটা বন্ধ করে যেয়ো, তুমি তো জানো দরজাটা কোথায়।
এমন নির্লিপ্ত প্রত্যাখ্যানের সংলাপ খুব বেশী শোনা হয় নি। অসংখ্যবার কাঁচির ক্ষত সহ্য করে সম্পাদনের টেবিল ঘুরে এসব সংযত ক্ষোভ ভাষা পায় চলচিত্রে। ব্যক্তিগত নির্বাচনের বাইরে কোথাও কোনো সম্পাদকের আঙ্গুলে লাল পেন্সিল নেই এখানে। আমার ধারণা রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা তার কোনো সম্পাদক ছিলো না যে তাকে বলবে সকল ভাবনাকে ভাষা দিলেও সকল ভাবনা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করতে নেই। এক বিকেলে যত ধরনের বিচিত্র অনুভব আর শব্দের বুদবুদ তোমার মাথার ভিতরে ঘাঁই মারছে, সবগুলো আলাদা করে কাগজের পোটলায় বেধে ছাপাখানায় দৌঁড়াতে হবে না, কিছু ভাবনা নদীতে ভাসিয়ে দিতে হয়, কিছু পুড়িয়ে ফেলতে হয়, এসবের বাইরে যা কিছু রয়ে যাবে, সেখান থেকে ভেবে-চিন্তে একটা পান্ডুলিপি তৈরী করতে হবে।
হেলাল হাফিজের বিবেচনাবোধ প্রবল। তবে তারও কিছু মায়া ছিলো, অসংখ্যবার পড়ার পরও নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় পড়ার সময় মনে হয় সম্পূর্ণ কবিতার সাথে " কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে" কোনোভাবেই যায় না। ওটা কবিতার একেবারে অপ্রয়োজনীয় একটা অংশ। ওটা বাদ দিলে কবিতাটা আরও সংহত হতো।
অসংখ্য ভাবনার আবর্জনা পাশ কাটিয়ে, জীবনের অনুসঙ্গগুলোর সাথে, জীবনের বর্তমান পশ্চাতপটে ব্যক্তির অনুভবগুলো অকপট প্রকাশ করলে হয়তো অসংলগ্ন সংলাপগুলো কবিতা হয়ে উঠতো। যে পড়ছে সে এইসব শব্দ আর অনুভবের সাথে কিছুটা সম্পর্কিত বোধ করতো। অন্ধ বধির সময়ে যেখানে মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করছে না, অস্থিরতার ভেতরে শিল্পে সাহিত্যে খানিকটা আশ্রয় খুঁজে পেতো মানুষ। এই আশ্রয়হীন সময়ে নিজের অন্ধকূপে মাথা গুঁজে বেঁচে থাকার দিনগুলো ভালো কাটলো না।





এই লেখাটা মাঝেমাঝেই হোম পেইজে আসলে পড়ি।
মন্তব্য করুন