আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের মুগ্ধতা, আমাদের বিষ্ময়
নিবির নিষ্ঠায় খালি চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা নক্ষত্র কিংবা মৃত জ্যোতিস্ক দেখেছি। আমাদের প্রাচীন অগ্রজেরা অসংখ্য স্থির নক্ষত্রের পটভুমিতে যে ৭টি চলমান জ্যোতিস্ক দেখেছে (চন্দ্র- সূর্য, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহঃস্পতি, শনি ) তাদের প্রত্যেককে এক একটা দিন উৎসর্গ করেছে। এসব নিয়মিত জ্যোতিস্কের সাথে তারা উল্কা, ধুমকেতু দেখেছে। প্রতিটি চলমান গ্রহ, গ্রহকণা, নক্ষত্রের সাথে নিজেদের চলমান সময়ের অনুভুতি মিশিয়ে অসংখ্য গল্প-গাঁথা নির্মাণ করেছে। মহাবিশ্ব বিষয়ে আমাদের প্রাচীন অগ্রজদের কোনো মুগ্ধতা ছিলো না, ছিলো ভীতিমিশ্রিত বিস্ময়।
মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের জন্যে জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহ জন্মায় নি। আকাশে ঈশ্বরের বসবাস, তার অনুগ্রহের উপর নির্ভর করছে সম্রাটের ক্ষমতা এবং সম্রাজ্যের ভবিষ্যত। ঈশ্বরে গ্রহ-নক্ষত্রকে নানা বিন্যাসে সাজিয়ে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন- এমন দৃঢ় ধারণা থেকে প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতায় সম্রাটের অনুদানে মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। সম্রাট সূর্যের কাছে জ্যোতি এবং শাসন ক্ষমতা অর্জন করেন, চন্দ্র তাকে উপহার দেয় স্নিগ্ধতা, পুরোহিত নক্ষত্র গুণে সম্রাজ্যের ব্যপ্তি পরিমাপ করেন এবং মহাকাশকেন্দ্রীক সকল তৎপরতায় অনিবার্যভাবেই এক ধরণের পবিত্রতা আরোপিত হয়।
নিউটন অংক কষে দেখিয়েছেন আমাদের পৃথিবী সাধারণ, মাঝারি মাপের একটা নক্ষত্রের নগন্য একটা গ্রহ-মাত্র, মহাকর্ষের টানে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে।প্রতিটি নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় বল পরিমাপের সাধারণ প্রক্রিয়া শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন বস্তুর ভর বাড়লে তার মহাকর্ষীয় টানের পরিমান বাড়ে- তারই ধারাবাহিকতায় একজন প্রশ্ন করেছেন নক্ষত্র কতটুকু ভারী হতে পারে?
ততদিনে মানুষ আলোর গতি মাপতে শিখেছে, মহাবিশ্বের আনুমানিক সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করছে। যতদুর আলো যায়, যেতে পারে, মহাবিশ্ব হয়তো তার চেয়ে বড়। হয়তো অনেক অনেক নক্ষত্রের আলো আমাদের পৃথিবীতে এখনও পৌঁছাতে পারে নি, তাই রাতের আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই বিপুল বিস্তৃতির মাঝে কোথাও না কোথাও এমনও নক্ষত্র থাকবে , অন্তত সে সম্ভাবনাটুকু তো রয়েই যায়, যার ভর এত বেশী যে আলোও তার মহাকর্ষীয় টান উপেক্ষা করতে পারবে না। প্রকান্ড, আলোকিত এক নক্ষত্রের দীপ্তি তার সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। নিজ সীমান্তে প্রচন্ড উজ্জ্বল একটা অন্ধকার নক্ষত্র কোথাও না কোথাও জ্বলছে, কি অদ্ভুত দ্বিধান্বিত মুগ্ধতা।
নিছক তাত্ত্বিক এই অন্ধকার নক্ষত্রের নাম " ব্ল্যাক হোল" কিংবা কৃষ্ণগহ্বর।
আইন্সটাইন মহাকর্ষতত্ত্ব প্রকাশের পরপরই শোয়ার্সচাইল্ড আইন্সটাইনের প্রস্তাবিত সমীকরণ সমাধান করে দেখলেন মহাকর্ষ তত্ত্বের সমাধানেও এমন একটা সাম্ভাব্য পরিস্থিতি বিদ্যমান।
গত ১০০ বছরে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানা-শোনা বেড়েছে, অন্তত ৩টা মহাকাশকেন্দ্র প্রতিনিয়ত মহাবিশ্বের মানচিত্র তৈরী করছে। প্রাচীন সুমেরীয়, মিশরীয় পুরোহিতের অজ্ঞতা কিংবা অন্ধবিশ্বাস আমরা কাটিয়ে উঠেছি। আমাদের অনুসন্ধিৎসু মন অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করেছে। আমরা এখন নিশ্চিত জানি মহাবিশ্বের বিশালতা, এর বৈচিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা অত্যন্ত সীমিত, এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা সীমাহীন।আইন্সটাইনের তত্ত্ব বলছে কোনো ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো বেঁকে যায়। তাত্ত্বিক অনুমাণ ছিলো "গ্রাভিটেশনাল লেন্স" [gravitational lens],দুরবর্তী নক্ষত্রের একটা প্রতিবিম্ব তৈরী করবে। এমন গ্রাভিটেশন্যাল লেন্সের প্রতিবিম্ব পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
ষাটের দশকে নতুন করে ব্ল্যাকহোল, মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে আগ্রহ তৈরী হওয়ার পর থেকেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা দুটো ব্ল্যাকহোলে যদি কখনও সংঘর্ষ হয়, পৃথিবী থেকে সে সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব এবং ২০১৫ সালে আমরা প্রথমবারের মতো মহাকর্ষীয় তরংগের অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম। আরও ব্যপক পরিসরে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্যে ভারতে আরও একটা মহাকর্ষ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। বিশেষত উপমহাদেশের চরম দরিদ্র সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করছে প্রতিদিন, এমন বিশাল স্থাপনা নির্মাণ, সামষ্টিক উদ্যোগে কয়েকলক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করে মহাকর্ষীয় ক্ষীণ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের উদ্যোগকে নেহায়েত অর্থ অপচয় মনে হতে পারে।
এমন প্রতিটি যান্ত্রিক উদ্ভাবন আমাদের জানার সীমানা প্রসারিত করে। অসংখ্য নতুন প্রশ্ন নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরী করে। অসংখ্য অন্ধ সমীকরণের পরস্পরের যোগসূত্র নির্মাণের কৌশল শেখায়।
আলো এবং ছবিতে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের একটা সীমাবদ্ধতা ছিলো, মোটা দাগে আমরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৩ লক্ষ বছরের পরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করতে পারি, অথচ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে আমরা আরও অতীতের ইতিহাস খুঁড়ে দেখতে পারি। মহাবিশ্বে নানা ধরণের কাঠামো তৈরীর অসংখ্য তত্ত্বের ভেতরে কোনটা অধিক গ্রহনযোগ্য হবে, সেটুকু আমরা এখন যাচাই করার একটা সুযোগ পেয়েছি। হয়তো মহাবিশ্ব জন্মমূহুর্তের কাছাকাছি সময়টার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারি।
আমাদের ভাবনা কাঠামোর অন্তর্গত অজ্ঞতা থেকে মুক্তি নেই আমাদের। আমাদের সে অজ্ঞতা আমাদের নির্মিত। নতুন কোনো ভাবনা কাঠামো নির্মিত হওয়ার পর বর্তমান ভাবনা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাটুকু আমরা উপলব্ধি করতে পারবো। এই ধরণের যন্ত্র সে সুযোগটা আমাদের সামনে নিয়ে আসে। আমরা আমাদের অজ্ঞতা উপলব্ধি করি, আমাদের অজ্ঞতা আমাদের বিস্মিত করে। আমাদের প্রাণান্ত প্রয়াসের মাঝেও কত রহস্য আড়াল করে আছে প্রকৃতি- সে ভাবনাটা আমাদের বিস্মিত করে এবং সম্ভবত আমরা ভীতিমিশ্রিত বিস্ময়ের বদলে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে রাতের আকাশ দেখি।





অভিনন্দন। খুবই চিন্তা উদ্রেককারী লেখা। এ ধরণের আরও লেখা সময়ের দাবী। ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন