ইউজার লগইন

সময়ের লাশ ২য় পর্ব

দাদুর কাছে পড়তে গেলে আগে দু’একদিন বন্ধ দিতাম। এখন পারলে দিনে দু’বার যাই। কারণ যখনই পড়তে যাই, তখনই ওকে দেখি। হয়, মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে; নয়তো, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দু’মাস বয়ে গেছে শুধু দেখা-দেখি। আমাদের বাসা থেকে খানিক দূরে দাদুর বাসা। দাদু, দীননাথ চক্রবর্তী আমার বাবারও শিক্ষক, তাই মায়ের কথামত দাদু বলি। আজ মা দাদুর জন্য পিঠা দিয়েছে। আমি পিঠা নিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠল। যাকে দূর থেকে আড়চোখে দেখতাম, সে আজ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কি করছে? ভয়ে ভয়ে এগোতে লাগলাম। দেখি, একটা কাগজ ইট দ্বারা চাপা দিয়ে ও সরে গেল। বুঝতে আমার বাকী রইল না। হেঁটে সোজা দাদুর বাসায় চলে গেলাম। চিঠির দিকে ভ্রুক্ষেপও নেই আমার। পরের দিনও দেখি চিঠি একই অবস্থায় ইটে চাপা পড়ে আছে। কিছুক্ষণ কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ কি যেন অনুভূতি জাগল মনে। ভয়ে ভয়ে কাগজটি উঠায়ে চারদিকে তাকালাম। না, কোথাও কেউ নেই। বেশ পাকা হাতে বুকের ভিতর কাগজটা লুকিয়ে রাখলাম। যেন, কেউ না দেখে।

রাত তখন বারোটা। রাম আমার পাশে শুয়ে আছে। চারদিক নিস্তব্ধ। কেউ জেগে নেই। ভয়ে ভয়ে বুকের ভিতর থেকে কাগজটি বের করলাম। খুলতে দারুন ভয় করছে, হাত কাঁপছে। সবুজ জমিনের উপর লাল বৃত্তের একটি কাগজ সুন্দর করে ভাঁজ করা। পুরো কাগজটা খুলতেই আরো দু’টি কাগজ বের হয়ে এল। একটা কাগজের ভিতর ওর নিজের আঁকা ছবি। কি সুন্দর হাসছে! আর একটা কাগজে আঁকা একটা মানচিত্র, পূর্ব বাংলার। আরেকটা কাগজে ছোট ছোট করে লেখা। কিন্তু হায়! সব উল্টা করে লেখা। একেবারে উপরে লেখা--take a mirror and...|। আমি আমার পড়ার টেবিল থেকে আয়না আনলাম। বুঝলাম, ও আমাকে কষ্ট দিতে চায়। ও চায়, ওকে নিয়ে আমি ভাবি। আমি আয়নার সাহায্যে পড়তে শুরু করলাম--‘রূপশ্রী, তোমাকে প্রথম থেকেই আমি চিনেছি। আমি কে? তুমি আমাকে চিনবে না। আমাকে চিনতে তোমার অনেক সময় লাগবে। আমি মহাকাশের কোন এক বিদ্রোহী উল্কাপিন্ড। না, এ পৃথিবীরই শুধু আমি বাসিন্দা নই, আমি মহাবিশ্বের। পৃথিবীর মত আরো পৃথিবী আছে, এ মহাবিশ্বে--যেখানে সংঘাত, বিশৃংখলা, দূর্নীতি, জালিয়াতি, অত্যাচারের ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়, সেখানকার অধিবাসী হয়ে জন্ম নিই আমি বারে বারে। তোমাদের এ ভারতবর্ষে আমাকে অনেক বার জন্ম নিতে হয়েছে। ভয় পাচ্ছ? ভয় নেই, তোমাকে মুক্ত করতেই এ মর্ত্যে আমার জন্ম। তোমাকে স্বাধীনতা দেব। তোমার বুকে একটা মানচিত্র আঁকব আর রক্ত দিয়ে মেখে মানচিত্রের পাকা দলিল তোমার হাতে দিয়ে যাব। তুমি সুন্দর। তুমি বাংলার মানে পূর্ববাংলার এক বিমূর্ত প্রতীক। পাগল ভাবছ? সব নারীরা পুরুষদের একটু পাগল ভাবে কারণ নারীরা পুরুষ জাতিকে গর্ভে ধারণ করে এবং তাদের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দেয়, ফলে পাগল সম্বোধনটা আদর অথবা ভালোবাসার কারণে চলে আসে। কিন্তু তাই বলে তুমি আমার মা, বোন কিবা প্রেমিকা না। তোমাদের কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজে যাদের তোমরা পিসি, মাসী, কাকা, মামা ইত্যাদি ডাক--আমি সে দলের কেউ নই। আমি অন্য রকম আত্মীয়; এ আত্মীয়ের স্বরূপ মধুসূদন, বঙ্কিম কিবা রবীন্দ্র--কেউ বর্ণনা দিয়ে যায়নি। রহস্য লাগছে, থাক পড়তে হবে না আর। কোথাও লুকিয়ে রাখ অথবা ছিঁড়ে ফেল, তারপর ঘুমিয়ে পড়। আমি গভীর রাতে সব বুঝিয়ে দেব। আমাকে বুকে রেখ না, তাহলে হৃদয়ে চলে যাব।’ ইস্! এত সহজ, দুষ্টু, এতক্ষণতো বুকেই ছিলে। যাও বুকেই থাক; হৃদয়ে যাওতো দেখি।

বালিশে মাথা রেখে চিন্তা করতে লাগলাম। চিন্তার ঘোরে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। সারা দেশ কাঁদছে আমার জন্য। কিন্তু এখানে কারা হাসছে? ওদের হাতে লাঠি, পিস্তল, বোমা, বন্ধুক কেন? আমার হাত যুদ্ধ বিমান হচ্ছে, পা ছুটে চলেছে ট্রেনের গতিতে, মুখ চিৎকার করছে--কেউ শুনছে না। আমার একটা কলঙ্ক আছে। একদল পাখি আমাকে শুনিয়ে দিয়ে গেল। কি সেই কলঙ্ক! আমার হৃদয় সমস্ত দেহের ভালোবাসা চায় অথচ অঙ্গ-পতঙ্গ আমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে কেন? আমার বুকে প্রবাহিত নদীগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। মাথার উপরে পাখিরা কাঁদছে। কাঁদছে আমার হৃদয়। হঠাৎ কোন এক অপরিচিত মহিলা--নিজেকে কবি পরিচয় দিচ্ছে, অনেকটা আমার মত দেখতে। তার লেখা ‘না গদ্য না পদ্য’ আমাকে শুনাচ্ছে--‘একটি মরুভূমি ভালবাসার প্রত্যাশায় যেমন সুদীর্ঘকাল অপেক্ষা করে সাগরের ছোঁয়া পেতে। সময়ের রুদ্র প্রখরে তীব্র তাপে তার হৃদয় যখন গলতে শুরু করে শ্মশানের জ্বলন্ত লাশের মত; তখন সে পাগলিনীর মত ডাকে--সাগর, সাগর--। কেউ তার ডাক শুনে না। শুনতে পায় না কোন মরুযাত্রী। সে ডাক বাজপাখী কিবা বাদুর পাখির ডাকের মত--যে ডাক বারবার প্রতিফলিত হয় খেঁজুর গাছের মাথা থেকে--সে ডাক আকাশকে কম্পিত করে--আকাশের বুকে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা পাহাড়কে ভীতি সঞ্চার করে জাগায়ে তোলে। সময়ের তীব্র ক্রোপানলে, আগুনের মতো জ্বালাময় কষ্টে মরুভূমির বুক খসে খসে ধূলো হয়ে যায়। ধূলো উড়ে যায় আকাশের বুকে, পাহাড়ের শিখরদেশে, বাতাসের নাসারন্ধ্রে, কালো মেঘ কন্যার কাছে। ধূলো-বাতাস পৌঁছে দেয়, মরুদুলালী হতভাগিনীর ব্যর্থ ভালবাসার শ্মশান জ্বালার করুণ হৃদয়স্পর্শী চিত্র; পৌঁছে দেয়, নির্মম বেদনার লেলিহান প্রখর দৃষ্টির ছোবল কাহিনী। আকাশ-বাতাস সবাই শুনে--সবাই দেখে--তারপর বিরহ বেদনায় খানিকক্ষণ আফসোস করে। বেদনা বেদনাই রয়ে যায়। কেউ তাকে ভালবাসে না। তার জ্বালা, তার বেদনা তার নক্ষত্রসমদূর কষ্ট ক্রমোত্তর বাড়তে থাকে। তবুও এক টুকরো জোনাকী আলোর মত ভালবাসা কারো কাছে প্রত্যাশা করেও আশাহত হয় বারবার।

সাগর-নদ-নদী-শাখা নদী সবার কাছে সে ভালবাসা চায়, এক টুকরো লাল ফিতা কিবা এক টুকরো ওড়নার মত ভালোবাসা কিন্তু তার কলঙ্ক জীবন যাকে ছুঁতে চায়, সেই তার মতো মরুময় হয়ে যায়। নদীর বুকে জেগে উঠে চর। তার কলঙ্ক ছোঁয়ায় জেগে উঠে সাগরের বুকে দ্বীপ। তাহলে কোন শতাব্দিতে, কোন সত্য যুগে সে ভালবাসা পেয়েছিল। আবার কত সহস্র কলিযুগ পরে সত্যযুগ আসবে--সে ভালবাসা পাবে। যখন সাগর তাকে বুকে আঁকড়ে ধরবে। সে তখন হবে সাগরিকা কিংবা সাগর কন্যা। তখন নদী, গাছপালা, পথ-প্রান্তর, পশুপাখী সবাই তাকে মুঠি মুঠি ভালোবাসা দেবে। তার বুকের স্রোতে ভাসবে জাহাজ, পাল তোলা নৌকা। তার পায়ে বাজবে ঘুঙ্গুর। তার হৃদয় কণ্ঠ থেকে শিবের শঙ্খ বাজবে। তখন তার প্রেমের গভীরতা সবাই বুঝবে; তার সুদীর্ঘ পরাধীনতার কলঙ্ক চিরতরে দূর হবে।’ কাঁধের পাটের ব্যাগ আমার বিছানায় রেখে মহিলা কবি কি যে বুঝাল--তার কিছুই বুঝলাম না। তবে উক্তিগুলি কেমন যেন রহস্য সৃষ্টি করল। বড় জটিল এর অর্থ কিন্তু শেষ উক্তিটির ‘পরাধীনতা’--শব্দটি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলল। বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে চোখ চুলকাতে গিয়ে দেখি আঙ্গুল জলবিন্দুতে ভিজে গেল। আশ্চর্য! চোখে জল কেন! তাহলে এ গদ্যের অর্থ আর যাই হোক, সম্পূর্ণটা বুঝলে যে চোখে ঝর্ণা ঝরবে--এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল--একটি মানুষ। সে প্রতিনিয়ত--সেই কবি হচ্ছে--আবার সুমাদ জাকারিয়া হচ্ছে--কখনো অবিকল আমারি মতো কিশোরী হচ্ছে। ক্রমাগত এই তিন রূপে একটি মানুষ পরিবর্তন হচ্ছে। সুমাদ একজন নেতা, সে আমাকে রক্ষা করার জন্য দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আশ্চর্য! দলে এখন কবি, সুমাদ আরো অনেকে। আর আমি পরাধীনতার শিকলে বন্ধি। কত মিটিং, কত মিছিল, কত রক্ত বয়ে যাচ্ছে আমার জন্য। হঠাৎ গুলিবর্ষণ, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ শুরু হয়ে গেল। দলের সবাই মরে যাচ্ছে। সুমাদের বুকে গুলি ...। না--, বলে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। মা-বাবা দু’জনে দৌঁড়ে এল। ভাগ্যিস, চিঠিটা রামের পিঠের নীচে চাপা পড়ে ছিল; তা না হলে, মা কি যে ভাবত! মা লবণ জল নিয়ে এল, আমাকে পান করাল। তারপর মা-বাবার কাছে সব বললাম। মা বলল, ‘তোমাকে কতবার বলছি, ভাল একটা ছেলে দেখ, মেয়ের বিয়ে দেই। না, মেয়েকে পড়াবে, পড়াও। মেয়েটি এত বড় হল। এখনো একা একা...।’

(চলবে)

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ভালই। চলুক।

ধারাবাহিক কোন লেখায় এতদিন গ্যাপ না দিলেই ভাল লাগে।

শাশ্বত স্বপন's picture


২৫ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ট্রাকিং এর জন্য বান্দরবানের রুমা বাজার-বগালেগ-কেওকারাডং-বাকত্লাই পাড়া-তাজিংডং-শেরখর পাড়া-থানচি-নাফাকুম-এ ছিলাম। ৩১ তারিখে হরতালের ধূয়া খেয়ে সকালে এসে বাসায় ব্যাগ রেখে অফিস...। বিকালে বই মেলায় আমার প্রকাশিতব্য বই এর খোঁজ খবর নেওয়া আর রাতে বসে আগের লেখা সময়ের লাশ এডিট করা...।

তাই ২য় পর্ব দিতে দেরী হয়ে গেল। লেখাটির ১ম পর্ব পড়ার জন্য তানবীরা, জ্যোতি, জেবিন, নিভৃত স্বপ্নচারী, আরাফাত শান্ত, বিষণ্ণ বাউন্ডেলে--আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
বিষণ্ণ ভাই,ঝরা পাতার শুভেচ্ছা। এ বছর বইমেলায় আমার দুইটি বই--একটি উপন্যাস, হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ( ৩য় সংস্করণ), একটি গল্পগুচ্ছ, ভাদ্র ভাসান(১ম মুদ্রণ) বের হচ্ছে। আপনাদের দোয়া/আশীর্বাদ কামনা করছি।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অসংখ্য শুভকামনা।

আরাফাত শান্ত's picture


পড়লাম!

শাশ্বত স্বপন's picture


গল্পটা রূপক। দয়া করে একটু ভেবে পড়বেন।

লীনা দিলরুবা's picture


দ্বিতীয় পর্ব পড়ে, সিরিজের প্রথম পর্ব পড়ে এলাম। আপনার লেখার হাত তো দূর্দান্ত ! ভীষণ ভালো লাগল লেখাটা। প্রায় নির্ভুল বানানে, নির্মেদ গদ্যের একটি চমৎকার উদাহরণ।

তানবীরা's picture


বই নিয়ে অনেক অনেক শুভকামনা রইলো। কোথা থেকে বই বেরুচছে, কি বই, কতো দাম, সেগুলো নিয়ে একটা আলাদা পোষট দেন। Big smile

লেখা চমৎকার। শুধু তাড়াহুড়ার কারণে অতি সাধারণ বানান ভুল করেন, পড়তে ভাল লাগে না তখন। Sad

শাশ্বত স্বপন's picture


তানবীরা, বানানগুলো একটু ধরিয়ে দিন না। লেখা পড়ার জন্য আবার ধন্যবাদ

শওকত মাসুম's picture


পড়ছি

১০

শাশ্বত স্বপন's picture


মুনে অয় ভাল করে পড়েন নাই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শাশ্বত স্বপন's picture

নিজের সম্পর্কে

বাংলা সাহিত্য আমার খুব ভাল লাগে। আমি এখানে লেখতে চাই।